ট্রাভেলগ নয়নাভিরাম কান্তজীর মন্দিরের কথা

Send
নাকিবুল আহসান নিশাদ
প্রকাশিত : ১৬:১৪, জুলাই ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৩, জুলাই ০৬, ২০১৯

কান্তজীর মন্দিরউত্তরবঙ্গের দিনাজপুর জেলার কান্তজীর মন্দির একনামে সবাই চেনে। বাংলাদেশে যত পুরনো মন্দির রয়েছে সেগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। প্রাচীন মন্দিরটির বয়স প্রায় ৩০০ বছর। কান্তজীউ মন্দির নামেও এর পরিচিতি আছে। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক এটি দেখতে ভিড় জমান। 

হিন্দু ধর্মের কান্ত বা কৃষ্ণের মন্দির এটি, যা লৌকিক রাধা-কৃষ্ণের ধর্মীয় প্রথা হিসেবে বাংলায় প্রচলিত। ধারণা করা হয়, মহারাজা সুমিত ধর শান্ত এখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নির্মাণশৈলীর জন্য দেশ-বিদেশের পর্যটকদের মধ্যে এই প্রাচীন মন্দিরের জনপ্রিয়তা ব্যাপক।

কান্তজীর মন্দির শ্রীকৃষ্ণের জন্য নিবেদিত। কালিয়াকান্ত জীউ অর্থাৎ শ্রী-কৃষ্ণের বিগ্রহ স্থাপনের জন্যই মন্দিরের নামকরণ হয়েছে কান্তজীউ, কান্তজী বা কান্তজীর। মন্দিরটির সুবাদে এলাকাটি কান্তনগর নামে পরিচিতি পায়। সেজন্য পরবর্তী সময়ে এর আরেক নাম হয়ে যায় কান্তনগরের মন্দির। 

জনশ্রুতি রয়েছে, মন্দিরের নির্মাণ সামগ্রী সুদূর আসামের পর্বত ও হিমালয় থেকে আনা হয়েছিল। এর নির্মাণকাজের জন্য বেশিরভাগ কর্মী পারস্য থেকে এসেছিলেন। ইতিহাস ও গঠনশৈলীর জন্য এটি দেশের বিখ্যাত মন্দির। 

দিনাজপুর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে ও কাহারোল উপজেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে সুন্দরপুর ইউনিয়নে। সেখানে দিনাজপুর-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেঁপা নদীর তীরে অবস্থিত কান্তজীর মন্দির। এর উত্তর দিকের ভিত্তিবেদীর শিলালিপি অনুযায়ী, তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় নিজের শেষ বয়সে মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু করেন। ১৭২২ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এরপর প্রাণনাথের পোষ্যপুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণকাজ শেষ করেন।

মন্দিরের বাইরের দেয়াল জুড়ে পোড়ামাটির ফলকে লেখা রয়েছে রামায়ণ, মহাভারত ও বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি, উদ্ভিদ, প্রাণীর জ্যামিতিক চিত্র ইত্যাদি। পুরো মন্দিরে প্রায় ১৫ হাজারের মতো টেরাকোটা টালি আছে। ওপরের দিকে তিন ধাপে উঠে গেছে মন্দিরটি। চারদিকের সব খিলান দিয়ে ভেতরের দেবমূর্তি দেখা যায়।

কান্তজীর মন্দিরমন্দিরে ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়বে দুটি বড় বড় পায়রার বাসা। এজন্য এর সৌন্দর্য আলাদাভাবে চোখে পড়ে। মন্দির প্রাঙ্গণ আয়তাকার হলেও পাথরের ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো ৫০ ফুট উচ্চতার এই স্থাপনা বর্গাকার। নিচতলার সব প্রবেশপথে বহু খাঁজযুক্ত খিলান রয়েছে। দুটি ইটের স্তম্ভ দিয়ে খিলানগুলো আলাদা করা হয়েছে। স্তম্ভগুলো সুন্দর অলঙ্করণযুক্ত। পশ্চিম দিকের দ্বিতীয় বারান্দা থেকে সিঁড়ি ওপরের দিকে উঠে গেছে। নিচতলায় ২১টি ও দোতলায় ২৭টি দরজা-খিলান রয়েছে। তবে তৃতীয় তলায় তা মাত্র তিনটি করে।


শুরুতে চূড়ার উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে কান্তজীর মন্দিরটি ভূমিকম্পের কবলে পড়লে চূড়াগুলো ভেঙে যায়। মহারাজা গিরিজানাথ এতে ব্যাপক সংস্কার করেছিলেন। তবে চূড়াগুলো আর সংস্কার করা হয়নি। স্থাপত্য রীতি, গঠনবিন্যাস, শৈল্পিক মন্দিরটির সামগ্রিক দৃশ্যকে এতই মাধুর্যমণ্ডিত করে তুলেছে। এর চেয়ে নয়নাভিরাম মন্দির দেশে দ্বিতীয়টি নেই।

কান্তজীর মন্দিরের সামনে লেখকযেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস ও ট্রেনে দিনাজপুর যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে দিনাজপুরগামী বাসগুলো সাধারণত গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে ছাড়ে। এই রুটে নাবিল পরিবহনের এসি বাসের ভাড়া ৯০০ টাকা। এছাড়া হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এসআর ট্রাভেলস, কেয়া পরিবহন, শ্যামলী পরিবহনের নন-এসি বাস আছে। ভাড়া ৫০০-৫৫০ টাকা।

ঢাকার আসাদগেট, কলেজগেট, শ্যামলী, কল্যাণপুর, টেকনিক্যাল মোড় অথবা গাবতলী থেকে নাবিল বা বাবলু এন্টারপ্রাইজের চেয়ার কোচে চড়ে সরাসরি দিনাজপুর যেতে হবে। প্রায় সারাদিন আধঘণ্টা ও এক ঘণ্টা পরপর গাড়িগুলো ছেড়ে যায়। তাছাড়া উত্তরা থেকে কিছু পরিবহন দিনাজপুরে যাত্রীসেবা দিয়ে থাকে।

ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্তঃনগর ট্রেন দ্রুতযান এক্সপ্রেস ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে। আর আন্তঃনগর একতা এক্সপ্রেস ছাড়ে সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে। ঢাকা থেকে একতা ও দ্রুতযান এক্সপ্রেস বন্ধ থাকে যথাক্রমে মঙ্গল ও বুধবার। ভাড়া শোভন শ্রেণি ১৮৫ টাকা, শোভন চেয়ার ২৫০ টাকা, প্রথম শ্রেণি চেয়ার ৩৫০ টাকা, প্রথম শ্রেণি বার্থ ৫৩৫ টাকা, এসি চেয়ার ৬১৮ টাকা, এসি বার্থ ৮৯৭ টাকা। দিনাজপুর শহর থেকে অটোরিকশায় চড়ে কান্তজীর মন্দিরে যাওয়া যায়।

ছবি: লেখক

/জেএইচ/
টপ