ঈদ কেনাকাটা জমজমাট ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লী

Send
ইমরোজ খোন্দকার বাপ্পি, পাবনা
প্রকাশিত : ১৭:২১, মে ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৭, মে ২৯, ২০১৯

ঈদকে সামনে রেখে ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীতে ২০ কোটি টাকার শাড়ি বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। রোজার শেষ দিকে বেশ জমে উঠেছে ফতেহ মোহাম্মদপুরের এই বাজার। শেষ মুহূর্তের ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে এখানকার কারিগররা।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বেনারসি পল্লীতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,  চার শতাধিক কারখানার প্রায় তিন-চার হাজার কারিগর তুমুল ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে।  কারখানার নারী শ্রমিকের পাশাপাশি আশেপাশের বাড়ির বৌ-ঝিরাও পুঁতি ও কারচুপির কাজ করছেন।

ঈদ উপলক্ষে এখানে শাড়ির পাশাপাশি লেহেঙ্গা, অনারকলি তৈরি হচ্ছে। শাড়িতেও আছে বৈচিত্র্য। কারিগররা জানান, ফুলকলি, নেট কাতান, পিওর কাতান কুমকুম, জানেবাহার,  প্রভৃতি নামের বাহারি শাড়ি তৈরি হচ্ছে। তবে এবারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কাতানের নাম ‘জাবেদ কাতান’ এটাই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয় তাঁত মালিকরা জানালেন, এখন প্রতি সপ্তাহে প্রায় এক হাজার পিস শাড়ি উঠছে তাঁত থেকে। ঈদ যত এগিয়ে আসবে শাড়ি ওঠার সংখ্যা তত বাড়বে। ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোর বিপণীবিতানে এখানকার শাড়িগুলোই ২০-৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা আরও জানালেন, আশার কথা এই যে, আগে যেখানে পাকিস্থান থেকে চোরাপথে শাড়ি আসত এখন ঈশ্বরদীর তৈরি শাড়িই যাচ্ছে ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে। দেশের মধ্যে ঢাকা রাজশাহী, খুলনা, কুষ্টিয়া, নাটোর, টাঙ্গাইল ইত্যাদি জেলায় যাচ্ছে।

জাবেদ বেনারসির কর্ণধার জাবেদ হোসেন জানান, তার শাড়ির ব্যপক চাহিদা থাকলেও তিনি হিমসিম খাচ্ছেন শেষ মুহূর্তে। তিনি  শ্রমিক সংকটে পড়েছেন। ঈশ্বরদীতে অনেক বড় বড় স্থাপনা ও কারখানা হওয়ায় এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা পেশা পরিবর্তন করেছে। ঈদকে সামনে নিয়েই বেশ কিছু শ্রমিক তাদের বর্তমান পেশা ছেড়ে তাঁত শিল্পে এসে যুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, জাবেদ কাতান, বেনারসি, জামদানির কদর বেশ রয়েছে বাজারে। এবারের ঈদেও তিনি আশা করছেন ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী শাড়ি সরবরাহ করতে পারবেন।  

ব্যবসায়ি ওয়াকিল আলম জানান, এবার ঈদে ব্যবসায়ীদের জন্য সুসংবাদ হলো গত বছরও যেখানে বেনারসি শিল্পের জন্য কারিগর পাওয়া যাচ্ছিল না এবার সেখানে পেশা বদল করা লোকগুলো তাদের আগের পেশায় ফিরে এসে বেনারসি তৈরি করছেন।

জামান টেক্সটাইলের মালিক নাসিম সরকার বলেন, কয়েক বছর আগেও ভারত-পাকিস্তান থেকে কাতান-বেনারসি চোরাই পথে বাংলাদেশে আনা হতো। এখন ঈশ্বরদীর তৈরি বেনারসি দেদারসে ভারত যাচ্ছে। আগের চেয়ে অনেকগুণ বেশি উন্নতমানের শাড়ি এখন ঈশ্বরদীতে তৈরি হচ্ছে। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঈশ্বরদীর তৈরি শাড়ি দেশের ব্যাপক চাহিদা মেটাতে পারবে।

বেনারসি পল্লীর শ্রমিক (কারিগর) সোলেমান জানান, একটি শাড়ি তেরিতে একজন শ্রমিকের ৩-৪ দিন সময় লাগে। একজন বেনারসী শ্রমিক শাড়ি তেরির কাজ করে সপ্তাহে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা আয় করে থাকেন। শাড়ি  তৈরি করা ছাড়া আমরা আর কোনও কাজ পারি না বলেই দেনিক ১২/১৪ ঘণ্টা কাজ করে সপ্তাহে দুটি শাড়ি তেরি করি।

তবে কারিগরদের অভিযোগও রয়েছে। তারা জানায়, বাহারি রং, ডিজাইন আর নকশার কাপড় বুনন করা হলেও এই পল্লীতে নিজস্ব ক্যালেন্ডার মেশিন না থাকায় ঢাকা থেকে ক্যালেন্ডার পালিশ করতে গিয়ে, অনেক সময় অপচয় হয়ে যাচ্ছে। শুধু সময় নয়, গুনতে হয় বাড়তি টাকা, চাহিদা মতো শাড়িগুলো ক্যালেন্ডার করে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য।

তারা আরও জানান, আমরা ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লীতে শ্রম, ঘাম মেধা দিয়ে কাজ করে একটি শাড়ি তৈরি করলেও কতিপয় ঢাকার ব্যবসায়ীরা ঈশ্বরদীর তৈরি বেনারসি শাড়ি মিরপুরের শাড়ি বলে বিক্রি করে ক্রেতাদের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন।

ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীর স্টেট অফিসার ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ঈশ্বরদী শহরের ফতেহ মোহাম্মদপুরে অবস্থিত বেনারসি পল্লীর নিয়মিত তাঁতীদের পাশাপাশি বিভিন্ন বাসা বাড়িতে প্রত্যেকেরই নিজস্ব তাঁত রয়েছে। এছাড়াও কয়েক হাজার শ্রমিক বিভিন্ন ধরনের শাড়িতে পুঁতি ও কারচুপির কাজে ব্যস্ত। এবারের ঈদে তাদের শুধুমাত্র একটিই টার্গেট কাতান ও বেনারসি।

তিনি আরও জানান, বিন্দিয়া কাতান, পিওর বেনারসি শাড়িতে বিশেষ কারুকাজ, আনারকলি ও ফুলকলি ছাড়াও  নেট কাতান, পিওর কাতান, বেনারসি জুট জামদানি, কুচি জামদানি, মাসরাইস কাতান, ওপেরা কাতান, লেহেঙ্গা শাড়ি ও বিভিন্ন মানের থ্রি-পিস তৈরি করছে ওই তাঁতগুলো। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ও ঈদের জন্য এখানকার শ্রমিকরা দিনরাত কাজ করছেন। তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রশাসন সব-সময় খোঁজ খবর রাখছে। আমরাও তাদের সুবিধা-অসুবিধার খোঁজ রাখছি। 

/এফএএন/

লাইভ

টপ