এই স্বীকৃতি প্রতিদিন লেখার দিকে নিয়ে যাবে : মামুন অর রশীদ

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : অনন্য মুশফিক
প্রকাশিত : ১৯:০০, নভেম্বর ১৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০০, নভেম্বর ১৬, ২০১৭

মামুন অর রশীদ এ বছর যৌথভাবে জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। তার জন্ম ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৮৫। জন্মস্থান : নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। বসবাস : জাহাঙ্গীরনগর, সাভার। পেশায় সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে ছুটি নিয়ে সরকারের ভাষা-প্রযুক্তি পরামর্শক হিসেবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে কর্মরত।

 

প্রথমেই আপনাকে অভিনন্দন জানাই। জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার পাবার সংবাদ শুনে কেমন লেগেছে?

অবশ্যই ভালো লাগছে, ধন্যবাদ। পুরস্কার পাওয়া আমার কাছে ট্রেনে উঠতে পারার মতো ব্যাপার। সামনে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আর নিজেকে ‘স্টোরি-টেলার’ বলতে পারব, এটাই সবচেয়ে আনন্দের।

 

পুরস্কার পেয়ে কী বিশেষ কিছু মনে হচ্ছে?

কিছুটা দায়িত্ব বাড়বে মনে হচ্ছে। একথা ভয় নিয়েই বলি যে, লেখা নিয়ে পেশাদারিত্ব আমাদের মধ্যে বেশ কম। লিখে বাঁচার চেষ্টা করছি- এমন লেখক হাতে গোনা। প্রবল আবেগ, খামখেয়ালী আর অহংকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমরা লিখছি মনে হচ্ছে। আমারও এই সীমাবদ্ধতাগুলো রয়েছে। হয়তো এখন এই বিষয়গুলো কাটিয়ে উঠতে পারব। প্রতিদিন লিখতে পারার মতো আনন্দ আর নাই। এই পুরস্কার, এই স্বীকৃতি আমাকে প্রতিদিন লেখার দিকে নিয়ে যাবে।

 

‘ঊন নয়নে অন্ধ কার মুখ’ লিখতে শুরু করেছিলেন কবে?

তেরো সাল থেকে। ঝুলিতে খুব বেশি জমা হয়নি। এই গল্প লেখা শুরু করেছিলাম একটা বোধ দ্বারা তাড়িত হওয়ার পর। উন্নয়ন আমাকে আনন্দিত করে না। আমি জানি এই উন্নয়ন মানুষকে রাত্রি ও তারা ভুলিয়ে দেবে। লেবুর ঘ্রাণ ও লেবু পাতার ঘ্রাণ যে আলাদা তাও ভুলে যাবে মানুষ। ভুলে যাবে শালিকের ঝুঁটির রং। বাড়বে ন্যাচারাল মিউজিয়াম, বাড়বে ভার্চুয়াল জগতের সীমা আর বিষণœতা। নদীগুলো মরে যাবে। নদী ও সরল সারসের জন্য আমি লিখি, সত্যি।

 

আপনি কীভাবে লেখেন? কখন লেখেন?

আমি প্রচুর বাসে ভ্রমণ করি, মানে ঢাকা টু জাহাঙ্গীরনগর, আবার প্রতিদিন ফিরতি যাত্রা। বাসের সিটে বসলে আমার মাথার মধ্যে কিছু ইমেজ আসে, হুট করে। আমি ভাবি এবং ভাবতে থাকি। কোনো এক বেলা একটা ধাক্কা অনুভব করি, এখুনি লিখতে হবে। ল্যাপটপ নিয়ে বসে যাই। এগুতে থাকে। না এগুলে থামিয়ে দিই, কখনো বাদ দিই। নিজের কাছে কোনো প্লট বা ভাষা ভালো না লাগলে অহেতুক এটা নিয়ে বসে থাকি না। লেখার বিষয়ে প্রকাশ করতেই হবে, এমন আবেগ আমি এখন সংবরণ করতে পারি। মানে হলো, আমি খুবই পারফেকশনিস্ট, নিজের লেখার জায়গায়। কোনো চাপ বা ডেট লাইন থাকলে আর লেখা হয়ে ওঠে না। মনে হয়, এটা আমার সীমাবদ্ধতা।

সাধারণত রাতে লিখি, এগারটার পর, ঘুম না নামা পর্যন্ত। ছুটির দিনে সকালে মোবাইল বন্ধ করে। মনে ধরা লাইনগুলো চিরকুটে লিখে রাখি, বিশেষ করে জার্নালগুলো। একটা গল্পের আইডিয়াতো টিস্যু পেপারে লিখে রেখেছিলাম। অঞ্জন দত্তের গানের মতো, ছন্দা এই চিঠিটা লিখছি তোমায়...।

 

কার কার গল্প আপনার ভালো লাগে?

ইলিয়াস আর শহীদুল জহিরকে খুব চেষ্টা করে দূর করেছি মাথা থেকে। এঁদের আমি মুগ্ধ পাঠক, কখন না আবার প্রভাবিত হয়ে যাই, সেই ভয়! এই দুজনের বাক্যের বুনন যেকোনো বাংলাদেশী পাঠক ও লেখককে প্রভাবিত করে ফেলতে পারে। পড়া শুরু করলে বেরুনোর উপায় নেই। আমার প্রিয় মার্কেস। দুনিয়া জুড়ে মার্কেসের মতো কেউ নেই। তাঁর মতো কেউ গল্প বলতে পারেনি। মার্কেসের গল্প পড়ার পর একটা ঘোরে থাকতে হয়। এ আমি কী পড়লাম- টাইপের। ভয়াবহ একটা মোচর তৈরি হয়, চিন্তা ও কল্পনার জগতে।

একটা সময় ছিল আর্থার সি ক্লার্ক, আইজাক অ্যাসিমভ পড়তাম, জুল ভার্ন মুখস্থ। এরপরের সময়টা কাটলো যৌনতা বুঝতে গিয়ে। গল্পে যৌন উপকরণ থাকলে পড়তাম। না থাকলে হরহর করে পরের গল্পে। কিন্তু জীবনে যৌনতার বাইরেও আরো কয়েকটি গভীর মানবীয় বোধ আছে- তা যখন অনুধাবন করলাম, তখন পাঠভ্যাস বদলে গেল। বদলে গেল ভালো লাগার তালিকা। ভালো লাগে অনিল ঘড়াইয়ের গল্প। বনফুল ভালো লাগে।

 

আপনার গল্প বিষয়ক ভাবনা কী?

আমার কোনো গল্প নেই। আমার গল্পের লোকজন তেমন সংলাপ বলে না। অনেক চেষ্টা করেছি, এদের ডায়ালগে আনতে, পারিনি। মূল কারণ অবশ্য গল্পের দুনিয়া ভেঙে যাওয়া। খাজুরে আলাপ থেকে সমাজ সরে গেছে, গল্পহীনতার জগত তৈরি হয়েছে। ভারতীয় টিভি বিশেষ এক ধরনের ডেইলি সোপে একজন বলে, বাকিরা চুপ করে শোনে। জগতে এমন ঘটে না। আমার দুনিয়া সংলাপহীন। আমার কাছে গল্প মানে মগজে ইমেজের অবিরত প্রবাহ, গন্ধও পাওয়া যাবে। টেক্সট থেকে ছবি-গন্ধ বেরুবে। টেক্সট পাঠকের ইন্দ্রিয়গুলোকে সজাগ করতে না পারলে, সে গল্প করার মানে নেই।

গল্প বলায় ‘পয়েন্ট অব ভিউ’র ব্যাকরণ আমি রক্ষা করি না। রক্ষা করতে পারি না বলাই সংগত। বাক্যস্রোত আর ইমেজস্রোত গল্প তৈরি করে দেয়। এদের কোনো শৃঙ্খলে বাঁধা কঠিন।

গল্পে বাক্যের দৈর্ঘ্য একটা বড় ব্যাপার। হুমায়ূন আহমেদ ছোট ছোট বাক্যে লিখতেন। এতে এক ধরনের সুবিধা। সহজপাচ্য এবং পরের বাক্যের জন্য আগ্রহ তৈরি হয় দ্রুত। বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন, ইলিয়াস ও শহীদুল জহির। দীর্ঘ, মিশ্র ও জটিল বাক্যের প্রবাহ তাদের গদ্যে। আমি এ নিয়ে দোটানায় আছি, কোনটি অবলম্বন করব।

গল্প লিখতে গেলে প্রথমে মাথায় থাকে রূপকথা-উপকথার সঙ্গে আমাদের বিচ্ছিন্নতা। ইয়োরোপ প্রকৃতরূপেই আমাদের ব্রেনওয়াশ করে দিয়েছে। পুরো দুনিয়া জুড়েই মানুষ আইসোলেটেড হয়ে যাচ্ছে। যৌথপরিবার নির্ভর সমাজ ভেঙে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে গল্প ও সম্মুখ যোগাযোগহীনতা কমছে। এই গল্পহীনতা আমি ধরার চেষ্টা করছি, অনেকের সঙ্গে।

 

লিখতে পরিবারের সদস্যরা উৎসাহ দেয়?

উৎসাহ দেয় বলা যায়, আবার উল্টোও বলা যায়। নিরবচ্ছিন্ন লেখালেখি করার প্রধান বাধা কিন্তু সংসারধর্মে নিমজ্জন। লেখা জমে উঠেছে, এই মুহূর্তে শুনতে পেলাম, কাঁচা বাজারে না গেলেই নয়, ওষুধও লাগবে। এটা ঠিক যে, আমি ল্যাপটপে কাজ করার সময় বাসার কেউ ইন্টারফেয়ার করে না। যদিও পরিবারের পাওনা কিছুটা সময় লেখালেখিতে চলে যায়। তাই মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়। কিন্তু এখন আশা করছি, এই পুরস্কার প্রাপ্তির ফলে পরিবারের কাছে আমার লেখক পরিচয় গুরুত্ব পাবে!

 

আপনি কবিতা লেখেন। বই-ও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু গল্পে পুরস্কার পেলেন। বন্ধুরা কবি বলবে আর?

এটা একটা মজার সংকট। সব জায়গায় আছি, আবার কোনোটাতেই গুরুত্ব নিয়ে নেই। সৈয়দ হকও এমন অনুধাবন করেছিলেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আমার গবেষণা-গল্প-কবিতার সবই অভিন্ন কাব্যবোধের প্রবাহ। আমি মগজে তৈরি হওয়া ইমেজগুলো সবার সাথে শেয়ার করতে চাই, সেটা গল্পের হতে পারে, কবিতার হতে পারে, ফর্ম আলাদা মাত্র। এই ইমেজগুলোর জন্যই আমি লিখি।

//জেডএস//

লাইভ

টপ