উনিশ শতকের সামাজিক আলোড়ন ও বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান

Send
ফিরোজ আহমেদ
প্রকাশিত : ০৭:০০, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫১, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৭

জীবনী ও আত্মজীবনী

নানান সীমাবদ্ধতার কারণেই হয়তো বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান (বিবাআ) প্রণেতাদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ অনেক জীবনীগ্রন্থের প্রতিও সমান মনোযোগ দেয়া সম্ভব হয়নি। যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধির নাম পেলাম না অভিধানের উৎসগুলোর মাঝে। এই শিক্ষাব্রতী ১৮৮৭ সালে সার্থক একটি পদার্থ-বিজ্ঞানের পাঠ্য বই লিখেছিলেন, যদিও সেটা এমন উদ্যোগের দিক থেকে ছিল দ্বিতীয়। অনেক খেটেখুটে প্রাকৃতিক-ভূগোলেরও প্রথম পাঠ্যবই তিনি লিখেছিলেন। আরও অনেকগুলো পাঠ্যপুস্তক তিনি রচনা করেছিলেন যেগুলো বাংলা ভাষায় আধুনিক পর্বের প্রাথমিক পর্যায়ে রচিত পাঠ্যপুস্তকের নিদর্শন হিসেবে গূরুত্বপূর্ণ। তার আত্মজীবনী যদিও মৃত্যুর বেশ পরে ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু এই আত্মজীবনীতে সংবাদ পাওয়া যায় উনিশ শতকের শেষ দিকে তার রচনা করা, জনপ্রিয় পাঠ্যপুস্তকে পরিণত হওয়া পদার্থবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকের ভাষা নিয়ে বহু বিতর্কের।

আলোচনা সংক্ষিপ্ত করার জন্য একটি মাত্র উদাহরণ ব্যবহার করা যাক। যোগেশচন্দ্র নতুন একটি পরিভাষা ব্যবহার করেছিলেন, ‌‌‍মৌলিক পদার্থ। ‘মৌলিক’ শব্দটির এই প্রয়োগের নিন্দা করে ‘পদার্থ-বিদ্যা’ নামের আরেকটি পাঠ্যপুস্তক প্রণেতা লেখেন, ‘কুলীন পদার্থ থাকলে মৌলিক পদার্থ থাকত।’ কে এই আলোচ্য পদার্থবিদ্যার গ্রন্থকার, সেটা উদঘাটনও বিবাঅ উদ্যোগতাদের দায়িত্ব, কেননা বাংলা একটি শব্দের তাৎপর্য পাল্টে যাবার এমন অসাধারণ একটা উদাহরণে যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধির সঙ্গে তিনিও যুক্ত।

মৌলিক ভুক্তিটিতে আছে ভারতচন্দ্রের ১৭৬০ সালের ‘মৌলিক কায়স্থ, পদবীতে হোড়’। এখানে মৌলিক বলতে কায়স্থের সভ্রান্ত বংশগত অবস্থান বোঝানো হয়েছে। এর পরেরটি আছে মূল অর্থে, বঙ্গিম ১৮৮৭ : ‘দ্রৌপদীকে লইয়াই মৌলিক মহাভারত’। কিন্তু এরপর জগদীশ চন্দ্রে যাওয়া হয়েছে প্রথম উদ্ভাবিত এই অর্থে, ‘যুগান্তকারী গবেষণাসমূহ তাহাদের মনে একটি প্রবল আকাঙ্ক্ষা জাগরি করিয়াছে।’

ভুক্তিগুলি জরুরি সন্দেহ নেই। কিন্তু মাঝখানে হারিয়ে গিয়েছে মৌলিক পদার্থ বোঝানো ভুক্তিটি, যা ছাড়া বাংলা ভাষায় রসায়ন পাঠ শুরু করাই সম্ভব না। মৌলিক পদার্থের মতো একটি প্রয়োজনীয় পরিভাষার জন্মের বিস্তারিত বিবরণ দেয়া যদি সম্ভব নাও হয়, শব্দটার বর্তমান ব্যবহারের জন্মোল্লেখের সন্ধান অন্তত আমাদের জানা দরকার। যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধির সেই পাঠ্যপুস্তকগুলো চোখে দেখার সৌভাগ্য ব্যক্তিগতভাবে আমাদের হয়নি, কিন্তু সেগুলোর সন্ধান মোটেও অসম্ভব নয়। এমনকি তার তথ্যঠাসা আত্মজীবনীটা যথাযথভাবে ব্যবহার করলে অজস্র বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি সম্পর্কিত শব্দের প্রথম ব্যবহারের নিদর্শন উদ্ধার করতে কোথায় কোথায় অভিযান চালাতে হবে, সেই সূত্রগুলো অন্তত পাওয়া যাবে।

অনুবীক্ষণ নাই, বীক্ষণ ভুক্তিতে কী কী যেন আছে বিবিঅ-এ। অনুবীক্ষণ শব্দটিরও একটি পুরনো ব্যবহারের খবর পাওয়া যায় যোগেশচন্দ্রের আত্মজীবনীতে, সেখানে তিনি স্বরচিত ‘রত্মপরীক্ষা’ নামের একটা গ্রন্থের সংবাদ দিয়েছেন। সেখানাকার উদ্ধৃত অংশে শব্দটির সহজ সাবলীল প্রয়োগ থেকে অনুমান হয়, এই শব্দটা বাংলা ভাষায় এর আগেই প্রচলিত হয়ে গেছে, সাল তারিখ উল্লেখ না-পেলেও তার পূর্ববর্তীরা যে শব্দটি ববহার করেছেন, তার কিছু নিদর্শন আছে।

পাঁচ.

যোগেশচন্দ্র হয়তো পুরনো ভুলে যাওয়া দিনের লোক! জাতীয় মননে নিজের ইতিহাসকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হলে যদিও অন্তত শিক্ষা ও প্রযুক্তিচিন্তা বিকাশের ইতিহাসে তিনি এভাবে বিস্মৃত হতেন না, কিন্তু সেই নালিশও যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধি ভুলতেই পারেন তার পরবর্তী প্রজন্মের আর একজনের দুঃখ দেখে। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নাম নেই বিবাঅ-এ। সত্যেন বসুর বিজ্ঞান সম্পর্কিত অজস্র বাংলা লেখা ঘাটলে নতুন শব্দের, কিংবা শব্দের তাৎপর্যবৃদ্ধির সন্ধান পাওয়া যেতে পারতো। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের নামও নেই। এরা পরস্পরেরর সঙ্গে বাংলা বৈজ্ঞানিক পরিভাষা বিষয়ে বিরাট সব বিতর্ক করেছেন, পরিভাষার চরিত্র, বৈশিষ্ট্য ও আত্মীকরণের প্রক্রিয়াটি নিয়ে দিকনির্দেশনামুলক বক্তব্যও রেখেছেন, মাঝে মাঝে কিঞ্চিৎ তিক্ততাও সৃষ্টি করেছেন সব মিলিয়ে বাংলায় বিজ্ঞান চর্চায় প্রাণপাত করেছেন।

উনিশ শতকের মহাজনেরা বৃটিশ আমলে যখন বাংলায় শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তারে নেমেছিলেন, কাজটা কঠিন ছিল, পথটা ছিল অজানা। কিন্তু সামাজিক উদ্দীপনার অভাব ছিল না। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর শেষ কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব যারা উপনিবেশ-উত্তর পর্বের ম্লান ও উৎসাহহীন পরিবেশে যুদ্ধটা চালিয়ে গেছেন। বিবঅ-তে অর্ন্তভুক্ত হবার জন্য এইটুকু যথেষ্ট নয়। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ মৌলিক রচনা ও অনুবাদ তার আছে যে, তার হাতে ছাপ বাংলা বিজ্ঞান চর্চার ভাষায় থাকবে না, তা প্রায় অসম্ভব। ‘পাউলি ও তাঁর পরিবর্জন নীতি’ নামে তিনি স্বাদু বাংলায় গদ্য লিখেছেন,  লিখেছেন বহু নিবন্ধ। পরিবর্জনের এই ব্যবহার সম্ভবত টেকেনি, অপবর্জনই ব্যবহার হয় এখন। কিন্তু অপবর্জনও তো নেই বিবাঅ-এ। পরিবর্জন বা অপবর্জন যাই হোক না কেন, তাদের উল্লেখটা বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা বিকাশের ধারাকে বোঝার জন্য জরুরি।

সত্যেন বোসের এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষায় উচ্চতর বিজ্ঞান চর্চা যে সম্ভব, সেটা প্রমাণ করা, লক্ষ্য ছিল তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে বিজ্ঞানের প্রণোদনা তৈরি করা। বর্জন শব্দটা এখানে পদার্থবিদ্যার একটা বিশেষ পরিভাষা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে, এর সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কের বর্জনের সাদৃশ্য সামান্যই। কিন্তু বর্জিত থেকে গেলো এই শব্দগুলো। সত্যেন বোসের উদ্যোগে খানিকটা ধুলোবালি জমেছে, সত্য, কিন্তু বিজ্ঞানে প্রচলিত বাংলা পরিভাষাগুলোর জন্মের সুলুক সন্ধান তো ভাষার ইতিহাস নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

আলোকবর্ষ শব্দটির প্রথম ব্যবহারে আছেন কবি জীবনানন্দ দাশ! সত্যতা বিশ্বাস করা কঠিন হলেও, বিষয়টা চমকপ্রদ। কিন্তু বাংলায় রচিত বিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তক, পত্রিকা-সাময়িকীকে অবহেলা দেখিয়ে বিবাঅ যে শিরোপা জীবনানন্দকে দিয়েছে। সেটা আরেকটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গ্রহণ করা যেত।

ছয়.

সামাজিক আন্দোলন

বাংলা ভাষায় প্রচুর নতুন শব্দের প্রবর্তক কিংবা প্রস্তাবক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা ভাষাকে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের, বিশেষত বিজ্ঞান-ভূগোল-দর্শনের উপযুক্ত করার সমস্যা নিয়ে যারা ভেবেছেন এবং নতুন নতুন শব্দ প্রস্তাব করেছেন তাদের মাঝে তিনি অগ্রণী। শুধু তাই না, তার হাত দিয়ে অজস্র শব্দ বর্তমান অর্থে স্থিত হয়ে পরিণতি পেয়েছে। তার এই অগ্রণী ভূমিকাটিকে স্মরণে রেখেই একটা বিপজ্জনক ভ্রান্তি আমাদের যথাসম্ভব এড়ানো উচিত, সেটা হলো : সম্ভাব্য প্রথম ব্যবহারকারী হিসেবে কোথাও রবীন্দ্রনাথ অনুমিত হলে যথাসাধ্য চেষ্টা করা, তার পূর্বের কোনো ভুক্তি আছে কিনা।  

যেমন ‘নমঃশূদ্র’ ভুক্তির প্রথম উল্লেখটি আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, ‘সে নমঃশূদ্রদের পাড়ায় যায়’ ১৯১৫। কিন্তু বাংলায় নমঃশূদ্র শব্দটির জন্মের ইতিহাস ও তৎসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক জটিলতা এই ভুক্তিটি দিয়ে ধারণাই করা যাবে না। পূর্ব-বাংলার বিশেষত দক্ষিণ অঞ্চলের কৃষিজীবী হিন্দু সম্প্রদায়কে ‘চণ্ডাল’ জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে তাদেরকে হিন্দু সমাজবহির্ভূত করা হয় ১৮৯১ সালের আদমশুমারিতে  জাতি বিভাজনে। এর ভিত্তি ছিল ভদ্রশ্রেণির উচ্চতর বর্ণ হিন্দুদের মর্যাদাবোধ। কিন্তু এই আদমশুমারির আগে থেকে এই উত্তেজনা চলে আসছিল। ১৮৭০ দশকে বাকেরগঞ্জ ও ফরিদপুর এলাকার হিন্দু ভদ্রশ্রেণির সঙ্গে তাদের সকল রকম সামাজিক বিচ্ছেদ শুরু হয় মর্যাদার প্রশ্নে। বোঝা যায় এই উত্তেজনা বেশ আগে থেকে ঘনীভূত হচ্ছিল। খুব সম্ভবত এই দ্বন্দ্বের রেশ ধরেই নমঃশূদ্র কথাটির আবির্ভাব বাংলা ভাষায়। উনিশ শতক জুড়েই কাছাকাছি সময়ে পুরো বাংলা প্রদেশ জুড়েই অজস্র এমনতর মর্যাদা পাবার আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের কৈবর্ত চাষীরা উপবীত ধারণ করার সামাজিক আন্দোলনে রত হয়েছেন। পৌণ্ড্ররা ক্ষত্রিয় মর্যাদা দাবি করেছেন। এছাড়া উত্তরবঙ্গেও ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ কিংবা এমন কোনো বেদস্বীকৃত উচ্চকূলের সঙ্গে নিজেদের উৎপত্তিকে সম্পৃক্ত করে নতুন সামাজিক অধিষ্ঠান ঘোষণা করেছেন।

‘নমঃশূদ্র’ বাংলায় একদমই নতুন একটি সম্প্রদায়, চণ্ডাল অভিধা মুছে দিয়ে যে তার মর্যাদার দাবিতে সংগঠিত এবং সেই অনুযায়ী রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশাল এক কর্মযজ্ঞের প্রবাহ। এই কর্মযজ্ঞের তীব্রতা দিনে দিনে কী পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে তা বোঝা যাবে এই ‘নমঃশূদ্র’ শব্দটি গ্রন্থ-শিরোনামেই আছে, এমন কী কী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল, তার একটা চিত্র থেকে ১৯০৯ সালে (১৩১৬ বঙ্গাব্দ) খুলনা থেকে প্রকাশিত একটা গ্রন্থের নাম পাওয়া যাচ্ছে নমঃশূদ্র দর্পণ। ১৯১৪ (১৩২১ সালে) সরল নমঃশূদ্র দ্বিজদর্পণ, খুলনা থেকে। ১৯১১ সালে নমঃশূদ্র দ্বিজতত্ত্ব, বরিশাল। ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বেঙ্গল ন্যাশনাল নমঃশূদ্র অ্যাসোসিয়েশন। নিশ্চয়ই, বিশাল ব্যাখ্যার সুযোগ একটা বিবর্তনমূলক অভিধানে থাকে না। কিন্তু বিবর্তনমূলক অভিধান প্রণয়ন করতে হলে, নমঃশূদ্র আন্দোলনের মতো একদা গভীর ও যুগান্তরকারী আন্দোলনের ভুক্তির বেলায় নমঃশূদ্রদের নিজস্ব দলিল থেকে উল্লেখই বাঞ্ছনীয় হবার কথা। বিশেষ করে সেটা যখন কালের দিক দিয়েও বেশ খানিকটা অগ্রবর্তী।

তবে, সত্যি কথা যে, নমঃশূদ্রদের এই মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি ভদ্রশ্রেণির বিরুপতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল বলে রবীন্দ্রনাথের একটা চরিত্রের ১৯১৫ সালে নমঃশূদ্রদের সম্মেলনে যাবার তাৎপর্য কম নয়। সেটা শিক্ষিত সমাজের উদার অংশের মনোভাবের প্রতিনিধিস্থানীয় হবে। সেই প্রয়োজনেই এই ভুক্তিটি থেকে যেতে পারে, কিন্তু ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই অতি অবশ্যই তার চেয়ে পুরনো ভুক্তিগুলো উল্লেখ করতেই হবে। এমনকি, এই উল্লেখগুলোর অনেকগুলো ইংরেজি ভাষায় হয়ে থাকলেও তা আমাদের শব্দের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিধায় সেগুলোকেও উৎস হিসেবে বিবেচনা করা কর্তব্য। যে যুক্তিটি আমরা এর আগে সংস্কৃত ও ফারসি সূত্রগুলো সম্পর্কে দিয়েছি। ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেছেন যে, এই প্রশ্নটির মীমাংসা করতে মণকে মণ আবেদনপত্র জমা পড়েছিল সাহেবদের দপ্তরে। ফলে নমঃশূদ্র, চণ্ডাল ইত্যাদি বিষয়ক ভুক্তিতে আদমশুমারিটি-সহ এর আগে কার কোনো ঔপনিবেশিক দলিলপত্রে আছে কি না, তারও অনুসন্ধান প্রয়োজন, একই কথা অন্য সকল বিষয়ে প্রযোজ্য।

সাত.

বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে উৎস হিসেবে শ্রীযুক্ত তারকচন্দ্র সরকার রচিত বাংলা ১৩২৩ সালে (১৯১৬ খৃস্টাব্দ) প্রকাশিত শ্রী শ্রী হরি লীলামৃত গ্রন্থটির ব্যবহার আদৌ  নেই। এই গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের যুগান্তকারী নতুন ধর্মীয় আন্দোলন ‘মতুয়া’ ধর্মমতের  উদ্‌গাতা ফরিদপুরের কেওড়াকান্দির শ্রী হরি চাঁদ ঠাকুরের মাহাত্ম প্রচারের উদ্দেশ্য। গঠনগত ও রূপগত দিক দিয়ে এ যেন এক আধুনিক কালের চৈতন্য চরাণামৃত। পার্থক্য এই যে, বর্ণের রাজনীতির পাকেচক্রে এই কীর্তিমান ব্যক্তিটি চৈতন্য মহাপ্রভুর মত সার্বজনীন স্বীকৃতি পাননি। নিজ নমঃশূদ্র সম্প্রদায়কে অসম্মান থেকে মুক্তি দেয়াই ছিল তার আরাধ্য, সম্প্রদায়ের বাইরে তার বাণীর বিস্তার ঘটেছে কম। কিন্তু এই সম্প্রদায়ের, এবং সেই অর্থে তাঁর তাৎপর্য হ্রাস পায়নি। আবির্ভাবের পর থেকে ‘৪৭ সালের দেশভাগ পর্যন্ত বাংলার রাজনীতিতে অন্যতম নির্ধারক শক্তি ছিল মতুয়া সম্প্রদায়। গ্রন্থটির ভূমিকায় বলা হয়েছে “এই গ্রন্থে মহাপ্রভুর আজীবন- জীবনী,অর্থাৎ জন্ম, বাল্যখেলা , কৃষিকার্ষ্য, বাণিজ্য, শ্রীক্ষেত্র হইতে প্রসাদ প্রেরণ, লীলা প্রকাশ প্রাচুর্য , প্রভৃতি বহুতর উপদেশপূর্ণ বচনাবলী সম্বলিত কবি রসরাজ শ্রীযুক্ত তারকচন্দ্র সরকার কর্তৃক প্রণীত।”

যাই হোক, এই গ্রন্থটিতে স্থানীয় ও লোকজ অজস্র বাংলা শব্দের ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যাবে, সেগুলো বিবঅ থেকে প্রাচীনতর। কিংবা, পাওয়া যাবে শব্দের ভিন্ন তাৎপর্যমণ্ডিত ব্যবহারের উল্লেখ। যেমন:

বুনো। বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে এই ভুক্তিতে দশটি উল্লেখ আছে। এর মাঝে ৬টি বন্য প্রাণী (ছাগল, পাখি, মোষ, হাতি ও হাঁস), দুটো বৃক্ষাদি (সিম ও ফুল) এবং একটি স্বভাব অর্থে বুনো। সবচে পুরনোটি দেয়া আছে রবীন্দ্রনাথ থেকে, ১৮৮১ সালের(একটা বুনো ছাগল তেড়ে এসে মেরেছে ঢুঁ)। এই ভুক্তির সঙ্গে দ্বিতীয় যে ব্যক্তিটির নাম উল্লেখ আছে, তিনি বিভূতিভূষণ, ১৯২৩ সালে- কিন্তু বুনো শব্দটি বাংলা ভাষায় অনির্দিষ্ট কয়েকটি জনজাতিকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। ব্যবহারটা কত পুরনো জানি না, শব্দটার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে বহু বছর ধরে দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদন মারফত এই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের সুযোগ হয়নি, একবার দু-বার যানবাহন থেকে চোখের দেখা হয়েছে। হয়তো কৃষি সংস্কৃতিতে উত্তরিত হতে না- পারা কোনো প্রাচীন অরণ্যচর জাতির অবশেষ হবেন এরা, কিংবা পরবর্তীকালে এসেও থাকবে পারেন। তেমন কোনো সংবাদ কেউ জানাতে পারেননি। পত্রিকায় মাঝে-মাঝে তাদের দুর্দশা নিয়ে প্রতিবেদন দেখে ভ্রাম্যমান শিকারী কিংবা আহরণজীবী বলে ধারণা হয়েছিল। অধিকাংশ প্রতিবেদন সেই পদ্মা অববাহিকার ফরিদপুর-যশোহর অঞ্চলে, যেখানকার আদি জনগোষ্ঠীকে চণ্ডাল বলে ডাকতো সেই ভদ্রলোক শ্রেণি, যা মতুয়া ধর্মের উৎপত্তির কারণ। দেখুন ওই ‘শ্রী শ্রী হরি লীলামৃত’ বুনো জাতি নিয়ে কিছু কথা:

বুনোজাতি তারা ক্ষেত করিয়াছে ভালো।

নব নব বেগুনে করেছে ক্ষেত আলো।।

দেখি দুই তিন বন্দে বেগুন উত্তম।

তার মধ্যে এক বন্দে অতি মনোরম।।

বুনোজাতি নাম তার বুধই সর্দার।

তাহার বেগুন ক্ষেত বড়ই সুন্দর।।

বুনো কিন্তু এইখানে বনে বাসকারী জাতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি, বরং বেগুনের চাষ করা এক গৃহস্তকেই বুনো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই ‘বুনো’ অভিধাটিই ইঙ্গিত দেয় তাদের অনেকেই তখনো প্রধানত প্রাক-কৃষি পর্বের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। এমনকি বেগুন ফলালেও কৃষক সুলভ আরও বহু বৈশিষ্ট্য তাদের নাই, সেটাও কাব্যে একটু পরে জানানো হযেছে। মতুয়া ধর্ম যাদের মাঝে প্রচারিত হয়েছিল, তাদেরকে উচ্চতর মর্যাদার গোষ্ঠীগুলো চণ্ডাল বলে অভিহিত করলেও এই কাব্যটি পাঠ করলে বোঝা যায়, বুনোরা নমঃশূদ্রদের তুলনায় ছিল মর্যাদাহীন, কৃষি সংস্কৃতির মাপকাঠিতে বিবেচনা করলে আরও একধাপ পিছিয়ে থাকা। কিন্তু মতুয়া ধর্ম এবং শ্রী শ্রী হরি এমনকি এই জাতহীন, সবার নীচে থাকা বুনোদের মাঝেও প্রেম বিলাতে, তাদের ভক্ত হিসেবে গ্রহণে কার্পণ্য করেননি, আলোচ্য আখ্যানটিতে তারই বর্ণনা আছে।   

চিড়া কিংবা মুড়ি না বানাবার অভ্যস্ততা হয়তো বুনোদের নিকট সাম্প্রতিক কালে কৃষির সংস্কৃতির আওতায় আসারই ইঙ্গিতবহ, কেননা বিবঅ থেকেই আমরা জানি যে, মধ্যযুগের সাহিত্যেই চিড়া, চিড়াভাজার উল্লেখ প্রচুর আছে। ‘ভাজাভুজি’তে রবীন্দ্রনাথের উল্লেখ থাকলেও ভাজাপোড়া শব্দটি বিবঅ-তে নেই, যদিও ভাজাপোড়া শব্দটিই ভাজাভুজির চেয়ে বেশি প্রচলিত। ভাজাভুজির উল্লেখ এখানে মিলছে:

 বুড়ি বলে মোরা বুনো শোন ওরে বাবা।

ভাজা পোড়া ঘরে নাই খেতে দিব কিবা।।

চিড়া না বানাই মোরা মুড়ি না বানাই।

বানাইতে নাহি জানি ভাত মাত্র খাই।।

বুধই বলেছে মাতা বড় ক্ষুধা পাই।

মা বলেছি তব ভাত খেলে দোষ নাই।।

বুড়ি ভাবে মা বলে চরণে দিল হাত।

ভক্তি করে সেবা দিল খেতে চায় ভাত।।

বড়ই মমতা হ’ল বুড়ির অন্তরে।

জল দেওয়া পান্তাভাত দিল বুধইরে।।

বিবাঅ-তে পান্তা ভাত ভুক্তিটিতে সংজ্ঞাটি কোনক্রমে উল্লেখ করে বলা আছে বিদ্যা, ১৮৯১। কোন সাহিত্যিক উদাহরণ নেই। কিন্তু পান্তা ভাতের মত প্রায় জাতীয় খাদ্যে পরিণত হওয়া, সামান্য প্রস্তুতিতে পাওয়া দিনের প্রথম খাবারটির উল্লেখ কৃষিসংস্কৃতি পুষ্ট বাংলা সাহিত্যে এর আগে না থাকার সম্ভাবনাটা অস্বস্তিকর ঠেকে।

নিতান্তই আধুনিক কালের সূত্র

প্রথমেই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য দুটো ভুক্তি নিয়ে আলাপ তোলা যাক। সাহিত্য কর্মী অর্থে সাহিত্যিক শব্দটি কখন প্রথম ব্যবহৃত হয়? বিবাঅ বলছে: “ মন প্রাকৃতিক জিনিসকে মানসিক করিয়া লয়; সাহিত্য সেই মানসিক জিনিসকে সাহিত্যিক করিয়া তুলে।” রবীন্দ্রনাথ, ১৯০৭ সাল। কিন্তু সাহিত্যিক শব্দটা এখানে রবীন্দ্রনাথ আমাদের চেনা ‘সাহিত্যকর্মী’ অর্থে ব্যবহার করেননি। রবীন্দ্রনাথ শব্দটিকে ব্যবহার করেছেন, বিবাঅ অনুসারেই, ‘সাহিত্য বিষয়ক’ অর্থে।

ওদিকে প্রমথ চৌধুরী কিন্তু সাহিত্যিক শব্দটির ব্যকরণগত যথার্থতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বাংলা পৌষ ১৩১৯ সালে, মানে ইংরেজি ১৯১২ সালে। বর্তমানে প্রচলিত সাহিত্যকর্মী হিসেবে সাহিত্যিকের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি ছিল তাঁর, কারণ তিনি মনে করতেন শব্দটি ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ নয়। ‘বঙ্গভাষা বনাম বাবু-বাংলা ওরফে সাধু বাংলা’ নামের প্রবন্ধে তিনি লেখেন :

‘সাহিত্যিক’ এই বিশেষণটি বাংলা কিংবা সংস্কৃত কোনো ভাষাতেই পূর্বে ছিল না, এবং আমার বিশ্বাস, উক্ত দুই ভাষার কোনটির ব্যাকরণ অনুসারে ‘সাহিত্য’ এই বিশেষ্য শব্দটি ‘সাহিত্যিক’-রূপ বিশেষণে পরিণত হতে পারে না। বাংলার নব্য-সাহিত্যিকদের বিশ্বাস যে, বিশেষ্যর ওপর অত্যাচার করিলেই তা বিশেষণ হয়ে ওঠে। এইরূপ বিশেষণের সৃষ্টি আমার মতে অদ্ভুত সৃষ্টি।”

প্রমথ চৌধুরীর মত ব্যক্তিত্বের কাছে অশুদ্ধ শব্দ হিসেবে চিহ্নিত হবার পরও ‘সাহিত্যিক’ শব্দটা কিভাবে সাহিত্য যিনি করেন, ধীরে ধীরে তার পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠলো, সেই অনুসন্ধান কি জরুরি নয়? যতদূর দেখা যাচ্ছে, ‘ঢাকা রিভিউ’ নামের যে পত্রিকাটির সমালোচনা করতে গিয়ে প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যিক শব্দটিকে খারিজ করেছিলেন, সেখানেই প্রথম সাহিত্যকর্মী অর্থে সাহিত্যিক শব্দটি হিসেবে ব্যবহার ঘটেছিল। পত্রিকাটি শব্দটি উদ্ভাবন করেছিলো সমাজে নতুন গড়ে ওঠা সাহিত্যকর্মী বর্গটির পরিচিতি হিসেবে, নাকি ইতিমধ্যেই প্রচলিত শব্দটি তারা ব্যবহার করেছিলেন, আমরা তা জানি না। উল্লেখ্য,সাহিত্যকর্মী হিসেবে সাহিত্যিক শব্দটার উল্লেখটি বিবাঅ-তে প্রথমবার হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেটি প্রথম চৌধুরী-ঢাকা রিভিউ বিবাদের বেশ পরেরকার, ১৯২১ সালের।

সাহিত্যকর্মী অর্থে সাহিত্যিকের এই ব্যবহার বিষয়ে বিবাঅ-তে প্রমথ চৌধুরীর এই উল্লেখ তো থাকা দরকারই, ‘ঢাকা রিভিউ’র সেই সংখ্যার সন্ধানের চেষ্টাও প্রয়োজন সাহিত্যিক শব্দটির আধুনিক অর্থে ব্যবহারের সুলুক সন্ধানে। এমন যদি হয়ে থাকে যে সাহিত্যকর্মী হিসেবে সাহিত্যিক শব্দটার প্রথম ব্যবহার ঢাকা শহরের ‘বিশেষ্যর-ওপর-অত্যাচার-করা’ কিংবা ব্যাকরণ-ভাঙা কোন সাহসী উদ্যোগ থেকেই শুরু হয়েছিল, তার তাৎপর্য আছে বৈকি!

শুরুতে সাহিত্য সম্পর্কিত অর্থে ব্যবহার করলেও পরবর্তীকালে  রবীন্দ্রনাথ নিজেও সাহিত্যকর্মী বোঝাতেই সাহিত্যিক শব্দটা ব্যবহার করেছেন, যেমন মুন্সী প্রেমচান্দ সম্পর্কে এবং আরও কয়েটি প্রসঙ্গে। ফলে তিনিও হতে পারেন এর প্রচলনকারী, নাও হতে পারেন। বর্তমান নিবন্ধকার রবীন্দ্রসাহিত্যে সাহিত্যকর্মী অর্থে যতগুলো উল্লেখ পেয়েছেন সাহিত্যিকের, তার প্রতিটি প্রমথ চৌধুরীর এই বিতণ্ডার পরবর্তীকালের ঘটনা। সাহিত্যকর্মী অর্থেও যদি রবীন্দ্রনাথই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করে থাকেন, তা যেমন উদ্ধৃত হওয়া প্রয়োজন ছিল, কোনো অবস্থাতেই প্রমথ চৌধুরীর তোলা বিতর্কটির উল্লেখ বাদ দিয়ে এই ভুক্তি পূর্ণতা পেতে পারে না, কেননা তা বাংলা ভাষার ব্যাকরণগত শুদ্ধতা বিষয়ক বহু তর্কে আজও আলো দেখাতে সক্ষম।

ভাষাভাষী শব্দটার ভুক্তিতে বিবাঅ দেখিয়েছে  ১৯৩৩ সালের একটি উদ্ধৃতি, বুলবুলের:  ‘বঙ্গভাষাভাষী বাঙ্গালী মুসলমান’। কিন্তু এই শব্দটা নিয়েও এর এক যুগ আগেই কাণ্ডটা ঘটে গিয়েছে। ঢাকা রিভিউ নামের ওই একই পত্রিকায় এই শব্দটির ব্যবহার নিয়ে আপত্তি জানিয়ে একই রচনায় প্রমথ লিখেছেন: ‘ভাষাভাষী’ সমাসটা এতই অপূর্ব যে, ও কথা শুনে হাসাহাসি করা ছাড়া আর কিছু করা চলে না।

ভাষাভাষী পরিভাষাটির প্রথম অস্তিত্বের সংবাদও আমরা এখন পর্যন্ত পাচ্ছি আলোচ্য ওই ঢাকা রিভিউ পত্রিকাটি প্রসঙ্গে প্রমথ চৌধুরীর নিন্দার উপলক্ষেই। বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান এক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই প্রমথ চৌধুরীর মত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রমথ চৌধুরীর মত তুলনামূলক উদার ও সহনশীল মানুষও কত অনায়াসে ভাষার গতিশীলতা ও মানুষের প্রয়োজন বোধের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হলেন, বাংলা ভাষার বিবর্তনের ইতিহাসের রীতিমতো আধুনিককালের সেই ছবিটা তুলতে, দেখাই যাচ্ছে, বিবাঅ সক্ষমতা দেখায়নি। 


আরো পড়ুন-

মধ্যযুগের অন্য উৎসগুলো ব্যবহার

 

 

 

//জেডএস//

লাইভ

টপ