কাজী আনিস আহমেদ যখন হাতের তারায় সূর্য খেলান

Send
জাকির তালুকদার
প্রকাশিত : ১১:৫৯, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৩, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৮

কাজী আনিস আহমেদ, আমার কাছে এই গ্রহের সবচাইতে শক্তিমান জীবিত গল্পকথকদের একজন জি এম কোয়েৎজি-র মতোই, পাঠককে হাত ধরে তার রচনার সামনে বসিয়ে দিয়ে নিজে সরে যান। বইয়ের শব্দগুলো তখন কথা বলে পাঠকের সঙ্গে। একই সঙ্গে পাঠককে সম্মোহিত এবং সচেতন করতে থাকে। কিন্তু গল্প বলার জাদু তাকে নিষ্কৃতি দেয় না। এমনকি ‘হাতের তারায় বিশ্ব খেলে’ উপন্যাসটির আক্ষরিক  পাঠ শেষ হয়ে গেলেও। অন্তত আমার ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছে। একটা কারণ হচ্ছে, আমাদের নিজেদের দেশটাও যে আমাদের কত অচেনা তা আমাকে আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছে এই উপন্যাসটি।

এই উপন্যাসের পাত্র-পাত্রী, পরিবেশ, চরিত্রদের ক্রিয়া-কলাপ কথাবার্তা, চিন্তার ধরন— কোনোটার সঙ্গেই আমার পরিচয় নেই বললেই চলে। অথচ তারা সবাই এই দেশের অধিবাসী, তাদের ভূগোলও আমাদের এই ভূখণ্ডের মানচিত্রের মধ্যেই অবস্থিত। কিন্তু আমি তাদের চিনি না। কাজী আনিস আহমেদের উপন্যাসটি আমার কাছে এক বিস্ময়মাখা শৈল্পিক আনন্দের দরজা খুলে দেয়। বেদনারও। আমাদের দেশের সাহিত্য ও সাহিত্যিকমহলে একটি ধারণা বদ্ধমূল প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে যে, জীবনঘনিষ্ঠ রচনা মানেই তা হতে হবে নিম্নকোটির প্রান্তবাসী মানুষদের নিয়ে লেখা। তার একটা কারণ হতে পারে এটা যে আমরা সিংহভাগ লেখক-সম্পাদক-সমালোচক উঠে এসেছি ওই নিম্নকোটির অল্প একটু ওপরের দাগ থেকে। তাই তারাই আমাদের কাছে সবচাইতে পরিচিত জনগোষ্ঠী। তাদের নিয়ে লেখালেখিতেই আমাদের স্বাচ্ছন্দ্য বেশি। তদুপরি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখ এই শ্রেণিকে কেন্দ্রে রেখে এমন কিছু কালজয়ী উপন্যাসের জন্ম দিয়েছেন যে আমরা রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’র কথা পর্যন্ত ভুলে যাই। ফলে এই চিন্তা আরো বেশি প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। আমরা ভুলেই যাই যে কেবলমাত্র বিষয়ের জন্য নয়, ওই উপন্যাসগুলো মহৎ উপন্যাস হয়ে উঠতে পেরেছে রচনাশৈলী এবং নির্মাণ-কুশলতার কারণে। তাঁদের প্রতিভাদীপ্ত সমাজপাঠ এবং শিল্পদৃষ্টির সমন্বয়ের কারণেও। তাই মধ্যবিত্তকে নিয়েও যে মহৎ উপন্যাস রচনা করা সম্ভব, সে কথা আমরা ধর্তব্যেই আনি না। আর উচ্চকোটির মানুষ তো সাহিত্যের বিষয় হিসাবে প্রায় অচ্ছ্যুত। কিন্তু কথাসাহিত্য সৃষ্টি করার প্রাথমিক একটি শর্ত হচ্ছে লেখক যে শ্রেণিকে সবচাইতে ভালো চেনেন-জানেন, তাদের নিয়েই লিখবেন। সেই সততার পরিচয় কাজী আনিস আহমেদের ‘হাতের তারায় বিশ্ব খেলে’। সার্থকতারও পরিচয় বটে।

শুরু থেকেই আমি এই উপন্যাসের প্রশংসা করে চলেছি। তার মানে এই নয় যে এই উপন্যাসটিকে কেবলমাত্র অবিমিশ্র প্রশংসা করার জন্য কৃতসংকল্প হয়ে লিখতে বসেছি। কিন্তু সততার সঙ্গে বলতে গেলে বলতে হবে, এই উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে আমি প্রশংসা করার মতো যতগুলো উপাদান খুঁজে পেয়েছি, গত কয়েক বছরে কোনো বইতেই তা পাইনি। তাই আমার এই লেখাটি সত্যিকারের সমালোচনা হয়ে উঠল কি না তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। সমালোচনা নয়, পাঠ-অভিজ্ঞতার বর্ণনাই এই রচনার লক্ষ্য।

২.

আখ্যান-গল্প-উপন্যাসে আমরা একজন কেন্দ্র-চরিত্রকে খুঁজে বের করতে অভ্যস্ত। যেমন সিনেমাতে হিরো। কাজী আনিস আহমেদের এই উপন্যাসে ব্যক্তির পরিবর্তে কেন্দ্রচরিত্র আসলে সময়। আরো নির্দিষ্ট করে বললে ১/১১ পরবর্তী দুই বছর। তবে যে মানুষিক চরিত্রগুলো এখানে সেই সময়ের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে, তারাও কেউ কম গুরুত্বপূর্ণ নয় উপন্যাসে।

যেমন কায়সার। সময়ের বিশাল ব্যবসায়ী। বিশাল বলতে সত্যিকারের বিশাল-ই। যাদের সম্পদের সীমা-পরিসীমার হিসাব নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা আমাদের মতো লেখকরা কল্পনাই করতে পারে না। তবে, এই দেশের বিশাল সব ব্যবসায়ীদের মতো এই উপন্যাসের কায়সার রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে ওঠা ব্যবসায়ী নয়। সে রাজধানীতে এসেছিল উচ্চশিক্ষার জন্য। যে শহরে তার জন্ম সেখানে ‘ছেলেরা বড় হয় ত্রয়ী আতঙ্ক নিয়ে : টিকা, খতনা আর স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্টের দিন।’ সেই কায়সার ‘অনন্যসাধারণ আত্মবিশ্বাস সম্বল করে’ রাজধানীতে এসেছিল। তার ধনী হয়ে ওঠার সংক্ষিপ্ততম বর্ণনা আছে উপন্যাসে— ‘অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পাবার বিরল কৃতিত্ব দেখালেও পিতা আর শিক্ষকদের রাগের মুখেও এমএ করার চিন্তা বাদ দেয় সে। সামান্য কদিনের জন্য একটা কোম্পানিতে কাজ করেছিল। তারপর গ্র্যাজুয়েশনের খুব বেশি হলে বছর দুয়েকের মধ্যে অলস ধনী বন্ধুদের রাজি করিয়েছিল তার প্রজেক্টে বিনিয়োগ করতে। কয়েক বছরে ওদের প্রায় সবকিছু কিনে নিয়ে কোম্পানিতে নিজের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য পাকাপোক্ত করেছিল সে।’ আর কথিত সময়ে দেশের বৃহত্তম আবাসিক শহর নির্মাণের প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত সে। সরকারের বাইরে কোনো ব্যবসায়ী তার আগে এত বড় প্রজেক্টে হাত দিতে পারেনি কখনো।

ব্যবসা শুধু তার জীবিকাই নয়, জীবনের অন্য অর্থও বটে। অথচ যে নাতাশা তার স্ত্রী, সেই নাতাশার পিতার কাছে ব্যবসায়ী কোনো যোগ্য পাত্র বলে বিবেচিতই ছিল না। ‘শিক্ষকের পেশা— বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে— হলো তাঁর দৃষ্টিতে সবচেয়ে মহৎ আর সম্মানজনক কাজ। সবচেয়ে প্রচলিত পুরোনো পালিতপুরি (রাজধানী) মর্যাদা-তালিকায় এর পরেই আছে হাইকোর্টের জজ, ডাক্তার, প্রশাসনের কর্তা। ব্যারিস্টার এবং ইঞ্জিনিয়ার সম্মানীত পেশাজীবী বলেই বিবেচিত। ব্যবসায়ীর স্থান চোর আর চোরাচালানির ঠিক ওপরে' [ নিম্নরেখা এই আলোচকের]।

ব্যবসায়ী অপছন্দ ছিল তাঁর কাছে, তবে ধনকুবের ব্যবসায়ী জামাইকে কোন চোখে তিনি দেখতেন তা বলা নেই উপন্যাসে। উপন্যাসে আমরা কায়সারের সুখের দিনের বর্ণনা পাই না। পাই জীবনে নেমে আসা বিপর্যয়ের শুরুর কথা যা ঘটেছে সেনা-সমর্থিত সরকারের আমলে। সেই সময় আড়ালে বসে দেশচালানো সেনাশাসকরা বেশ কিছু ব্যবসায়ীর ওপর খড়গহস্ত হয়েছিলেন, তা আমরা সদ্য ইতিহাস থেকে জানি। তবে জানি না কেন তারা ব্যবসায়ীদের প্রতি এতটা বিরূপ হয়ে উঠেছিলেন। যেমন কায়সারও বুঝতে পারছিল না— ‘এমন অনেকেই আছে যারা বিলিয়ন ডলার দামের জেট প্লেন বা তেলের ব্লকের চুক্তির সাথে জড়িত। এমন অনেকেই আছে ভোটের আগে যাদের একটা ল্যান্ডফোনও ছিল না, কিন্তু লাইসেন্স আর পারমিটের ব্যবসা, টেন্ডারবাজি আর নিয়োগবাণিজ্য করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে রাতারাতি বেশ বড় হোল্ডিং কোম্পানি ফেঁদে বসেছে। তাহলে তার মতো মানুষ কেন সেনা-সরকারের শুদ্ধি অভিযানের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠবে?’

ঠিক যেমনটি সে বুঝতে পারে না কেন তার মতো লোকদের দেশ বা সমাজ মূল্যায়ন করতে চায় না। বিতৃষ্ণা নিয়ে ভাবে ‘এ এমন এক দেশ যেখানে তার মতো মানুষকে স্বীকৃতি দেবার কোনো গরজ বা ব্যবস্থা দেখা যায় না, অথচ প্রতিভাহীন বিস্মরণযোগ্য কবি, রাজনীতিক, পণ্ডিত আর সমাজকর্মীদের অকাতরে জাতীয় পুরস্কার বিতরণ করা হয়।’

ছাত্রজীবনে রবীন্দ্রনাথের কিছুটা ভক্ত ছিল সে। কিন্তু বর্তমানে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে স্ত্রী নাতাশার কাছে ঠাট্টার ছলে প্রকাশিত  মনোভঙ্গি হচ্ছে  ‘যে প্রেম কবিতা দিয়ে শেষ হয়, সঙ্গমে নয়, সেরকম প্রেম আমি সহ্যই করতে পারি না।’ এবং ‘একটা কবি সারা দুনিয়ার মেয়েদের শুধু খেপিয়ে বেড়াচ্ছে, শেষ অব্দি যাবার কোনো ইচ্ছাই নাই। এমন লোককে শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছা করে?’

এইসব কথা এবং উদ্ধৃতি থেকে মনে হতে পারে কায়সার বোধহয় নিরেট পয়সার পেছনে ছোটা মানুষ একজন। কিন্তু আসলে তা নয়। অনেক সূক্ষ্ম বোধ এবং অনুভূতিরও অধিকারী কায়সার। তবে সেগুলো সবই ব্যবহৃত হয় অসাধারণ সাধারণ চিন্তায়— কেবলমাত্র নিজের পরিবার এবং বন্ধুদের স্বাচ্ছন্দ্য কামনায়। ব্যবসায়ী হিসেবে মানুষের পরিবর্তনশীল পণ্যমোহ বুঝতে পারে সে। দেশের রাজধানীতে ‘বিবেকহীন, লোভী ক্রেতাদের প্রথম প্রজন্মের জন্ম হয়েছে। পুরুষ ফ্যাশন লাইনে ফেলিনি— সত্যিকার দামি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর ঠিক পরপরই যার অবস্থান; ছেলেদের পোশাক তৈরির ইংরেজ প্রতিষ্ঠান মনরো’স এসে গেছে তাদের কাওয়ার্কি স্টিচের কাপড় দিয়ে তরুণ ফ্যাশন-প্রজন্মকে টানতে; আর স্পা-সুলভ নিরিবিলি পরিবেশ আর অন্দরসাজ নিয়ে এসেছে মহিলাদের বস্ত্রবিতান সেরিনিটি— লোকজনকে সাহায্য করতে, যাতে তারা একজোড়া জুতার জন্য পাক্কা একটি হাজার ডলার ফেলে দিতে পারে সামান্যতম আফসোস বা দুশ্চিন্তা না করে।’ কায়সার ব্যবসা করেছে তার অ্যাটলাস টাওয়ারে এইসব ব্র্যান্ডগুলোকে বড় পরিসরে জায়গা করে দিয়ে। কায়সারকে সঙ্গে পেতে চেয়েছে সেনা-সরকার। বড় দুই রাজনৈতিক দলকে ঘায়েল করার জন্য জোর করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ তোলাতে চেয়েছে তাকে দিয়ে। কিন্তু দূরদর্শী কায়সার রাজি নয়। তার ভাষ্য হচ্ছে— ‘এই ভাঁড়গুলো থাকবে বড়জোর দু’বছর, আর দলগুলো থাকবে দশকের পর দশক। তাহলে কাদের কাছ থেকে আমাদের দূরে থাকা উচিত?’

এই দূরদর্শিতাই কাল হয়েছে কায়সারের। সে ধারণা করতে পারেনি তার কথিত ভাঁড়গুলো দুই বছরে তার যতটা ক্ষতি করতে পারবে, রাজনীতিকরা তা দুই দশকেও করতে পারবে না।

সহযোগিতা না করার অপরাধে কায়সারকে তুলে নিয়ে গেছে সাদা পোশাকের লোকেরা, ক্যান্টনমেন্টের নির্দিষ্ট টর্চার চেম্বারে রেখে দিয়েছে, বাইরের পৃথিবীর কেউ জানতে পারেনি কোথায় আছে কায়সার, তার বন্ধু হিশাম অনেক অনুরোধ করেও ব্রিগেডিয়ার বখতিয়ারের মাধ্যমে মুক্ত করতে পারেনি কায়সারকে, এবং অবশেষে স্ত্রী-সন্তানকে ব্ল্যাকমেইলিং-এর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ওভারডোজে ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করতে হয়েছে কায়সারকে।

৩.

হিশামের নামটি আমরা উল্লেখ করেছি ইতোমধ্যে। কায়সারের বন্ধু। কায়সারের স্ত্রী নাতাশা ছিল যার স্বপ্নের নারী। এই উপন্যাসের সবচাইতে বিস্তৃত চরিত্রও হিশামই। তার পরিব্যাপ্তিও সবচাইতে বেশি। পত্রিকা অফিস থেকে দেশের নীতিনির্ধারণী দপ্তর, পানশালা থেকে ক্যান্টনমেন্ট। সবচাইতে বেশি মানুষের সঙ্গে তার সংযুক্তি। সেইসব সংযুক্তি কখনো কখনো ঘটনাবহুল, কখনো কখনো ঘটনার সূত্রপাতকারী। কায়সারের মতো সফল মানুষ সে নয়। লেখক জানিয়ে দিচ্ছেন— ‘সে The Daily Pandua  কাগজের উপ-সম্পাদক, পণ্ডিত মানুষ, কথায় হুল ফোটাতে পারে, পাঁড় নাস্তিক।’ সেইসঙ্গে আমরা আরো জানতে পারছি— ‘হিশামের লাইব্রেরির দেয়ালজোড়া সাজানো বিখ্যাত আর মহৎ সব বই। ওদিকে তার অফিসে যারপরনাই নীরস বইপত্রের গাদা : সারা দুনিয়ার যত উন্নয়ন-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রিপোর্ট। আর এই সবকিছুই তার পড়া। অল্প বয়সে জ্ঞানের ভারী ভারী শাখাগুলোর ওপর তার আস্থা ছিল, যদিও দর্শন আর সাহিত্যের দিকে টানটা বেশি ছিল, এবং ইতিহাস আর বিজ্ঞানের প্রতি ছিল বিশেষ সমীহ।... গুপ্ত জ্ঞানের এই ভান্ডার, সঙ্গে চুল গজানোর ওষুধ আর বাংলায় লেখা রগরগে চটিবই, তার শোবার ঘরেই লুকানো থাকে।’

অনেক নারীর সংস্পর্শে এলেও, কারো কারো সঙ্গে সম্পর্কটা বিয়ে পর্যন্ত গড়ানোর পর্যায়ে পৌঁছালেও বিয়ে করাটা তার হয়ে ওঠেনি। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি, নিজস্ব উপার্জন, উচ্চবিত্ত সমাজের সঙ্গে সখ্য, ক্ষমতার বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, উচ্চবিত্তের বিনোদন জগতে প্রবেশাধিকার, নারীসঙ্গ— সবমিলিয়ে সে একটা ভোগী ব্যাচেলর জীবনযাপন করতে পারে। করেও অনেকটা। কিন্তু নিজের ভেতরের কিছু জিনিস তাকে তৃপ্ত হতে দেয় না। আবার কিছু মূল্যবোধ তাকে পুরোপুরি নষ্ট হতেও দেয় না। পত্রিকার উপ-সম্পাদক পদটি পেরিয়ে সম্পাদক হবার স্বপ্ন সে দেখে, কিন্তু পদটি তার ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যায়। এমনকি বৃদ্ধ সম্পাদক গত চারমাস ধরে কোমায় আক্রান্ত হয়ে থাকলেও পরিচালনা পরিষদ তাকে অন্তত ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের পদটিতেও বসাচ্ছে না। অথচ এই পত্রিকার উপ-সম্পাদক পদের কারণেই তাকে সামরিক পরিচালকদের চোখে পড়ে যেতে হয়। সামরিক বাহিনীর বিশেষ একটি বিভাগের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার বখতিয়ার তাকে কেবলমাত্র সেনাশাসনের পক্ষে জনমত গঠনের কাজেই নয়, লাগাতে চায় কিংস পার্টি তৈরি করার কাজেও। বিনিময়ে তাকে দেওয়া হয় দুইটি টোপ। একটি হচ্ছে তাকে পত্রিকার সম্পাদক করার জন্য পরিচালনা পরিষদকে রাজি করানো হবে। এটি তার স্বপ্নের একটি পদ হলেও দ্বিতীয়টি হিশামের একেবারে হৃদয়ের চাওয়া। তা হচ্ছে তার বন্ধু কায়সারকে সামরিক সরকারের কোপদৃষ্টি থেকে মুক্ত রাখা। কায়সার, হিশামের স্বপ্ননারী নাতাশার স্বামীই শুধু নয়, তার সবচাইতে প্রিয় বন্ধুও বটে। হিশাম সবসময় সতর্ক থাকে, কায়সারের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের বিন্দুমাত্র ফাটলও যাতে না ধরতে পারে। কায়সারের দিক থেকে তার প্রতি কোনো ‘অবিশ্বাস তো দূরের কথা, দুজনার মধ্যে কোনো দূরত্বও হিশামের কাছে অভিশাপের মতো’। এতটা যত্নবান সে অন্য কোনো কিছুতেই নয়। সেনা সমর্থিত সরকার বলা হলেও সবকিছু যে সেনারাই চালাচ্ছে তা পরিষ্কার। তারা দুর্নীতি দমনের নামে একের পর এক ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরি করছে, প্রকাশ করছে, তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অত্যাচার এবং মামলা রুজু করছে। সবচাইতে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে আস্ত মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে ক্রসফায়ার নামে একটি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। দাগি অসংশোধনযোগ্য অন্যায়কারীরা আইনের ফাঁক গলে বার বার বেরিয়ে যায়। তাই তাদেরকে আইনে সোপর্দ না করে কোনো বাহিনীকর্তৃক হত্যা করানোর নাম ছিল ক্রসফায়ার। সন্ত্রাস-দুর্নীতিতে জর্জরিত মানুষ একধরনের মৌন সমর্থনও জানিয়েছিল ক্রসফায়ারকে। কিন্তু সেনাশাসিত সরকার সেই পথে না গিয়ে গ্রহণ করেছে গুমের পথ। তা অনেক বেশি ভয়ের, শিরদাঁড়া এবং হৃৎপিণ্ডে কাঁপন ধরানোর। ব্যবসায়ীদের ব্যবহার করা হচ্ছিল কোনো নেতা বা নেত্রীর নামে চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করানোর বাদি হিসাবে। কায়সারকে যাতে এই ধরনের কোনো বেকায়দায় পড়তে না হয়, সেজন্য নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও ব্রিগেডিয়ার বখতিয়ারের দেওয়া অনেক কাজে সম্পৃক্ত হয়েছে সে। কিন্তু ফলাফল একই। অনিবার্য।

এই সময়টিতে ‘সুশীল সমাজ ভাগ্যান্বেষীদের একটা দল, যারা মিলিটারির লেজ ধরে ক্ষমতার মসনদে ওঠার চেষ্টা করছে, ওদের আশা আর্মির ট্যাংকগুলো ওদের রাস্তা পরিষ্কার করে দিক।’ আর্মিও প্রথম দিকে সেটাই করছিল। কিন্তু সুশীল সমাজ দিয়ে বেশিদিন দেশ চালানো যায় না। তাই তাদেরসহ অন্যদের নিয়ে কিংস পার্টি গড়তে সচেষ্ট তারা। তারা সামনে আনতে চায় ‘নোবেল শান্তি পুরস্কারের’ জন্য নাম প্রস্তাবিত ব্যক্তিত্ব সাবিন সরকারকে।

হিশাম অনিচ্ছায় জড়িত হলেও সে এক পর্যায়ে উপভোগই করতে থাকে প্রক্রিয়াটি। বখতিয়ারের কথাগুলো তার মনেও কিছুটা প্রভাব বিস্তার করে। রাজধানীর আদি বনেদি বাসিন্দাদের একটা হচ্ছে তাদের পরিবার। কিন্তু তারা এখন কোনো প্রভাবশালী অবস্থানে নেই। আর রাজনীতি এবং ব্যবসাও চলে গেছে খারাপ লোকদের হাতে। তাই তালিকা থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়ার জন্য বড় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ যখন তার শরণাপন্ন হয় তখন হিশাম— ‘পরিস্থিতির এই বর্তমান পরিবর্তনটা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিল।’ কারণ— ‘যেসব লোককে সে শিক্ষা, সভ্যতা-ভব্যতা আর যোগ্যতায় খাটো বলেই জানত; যারা তার মতো পুরোনো পালিতপুরিদের কাছে পয়সা, স্ট্যাটাস, পদ-পদবি আর ক্ষমতার গরম দেখাত; নিজেদের গেঁয়ো আর নোংরা রুচির বড়াই করত, শেষ অব্দি তাদের বাধ্য হয়ে ওর গুরুত্ব স্বীকার করতে হলো।’ একই সঙ্গে বখতিয়ারের মতো সে-ও ভাবতে শুরু করেছিল— ‘যোগ্য আর সৎ লোকদের তাদের প্রাপ্য সম্মান, এমনকি পুরস্কার দেবার এটাই উপযুক্ত সময়। আর যেসব বদমাশ গায়ের জোরে, অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর অন্তঃসারশূন্য চাকচিক্য দিয়ে একেবারে নিচুতলা থেকে পালিতপুরি সমাজের উঁচু স্তরে জায়গা করে নিয়েছে, তাদেরকে তাদের আসল জায়গাটা চিনিয়ে দেওয়া দরকার।’

এই দল গঠনের প্রক্রিয়ায় নেমে হিশামের আরেক প্রাপ্তি তার নতুন প্রেমিকা দুনিয়া। যার বয়সটা এই রকম প্রক্রিয়ায় জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে সত্যই অনেক কম। সেইসঙ্গে— ‘সাংঘাতিক সুন্দরীও—  বাঁকা ভ্রুর নিচে বড় বড় চোখ, উঁচু চোয়াল। উদ্ধত পীনোন্নত স্তন ওর নকল-আদিবাসী পোশাকের ভারী কাপড় ফুঁড়ে বেরোতে চাইছে। আর গায়ের রঙটাও দুর্দান্ত— উজ্জ্বল মধু আর গাঢ় গিরিমাটির রঙের দুর্লভ মিশ্রণ।’

দুনিয়ার সঙ্গে গভীর প্রেম হয় হিশামের। একসঙ্গে দিন-রাত কাটাতেও শুরু করে তারা। বিয়ে করার জন্য একমত হয়। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও যায় দু’জনে বিয়ের সাক্ষী সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু, উপন্যাসে এই একটি জায়গাতেই নাটকীয়তা নিয়ে আসেন লেখক, সেই সময়টিতেই ফোনে খবর আসে যে কায়সার আত্মহত্যা করেছে। তখন ম্যাজিস্ট্রেটের কক্ষে ঢোকার বদলে হিশাম চলে যায় হাসপাতালের দিকে, যেখানে কায়সারের মৃতদেহ আছে। আর এই ঘটনাটি থেকে দুনিয়া ধরে নেয়, হিশামের কাছে সে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান নয়। যার কাছে সে সবচেয়ে মূল্যবান নয়, তাকে বিয়ে করা ঠিক হবে না। সে ভেঙে দেয় বিয়ে, চুকিয়ে দেয় হিশামের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক।

আসলে দুনিয়া ঠিকই ধরতে পারে, হিশামের মনে দেবীর আসনে বসে আছে যে নারী, সে নাতাশা। হয়তো হিশামও এত পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারে না নাতাশার প্রতি তার এই অন্ধ ভালোবাসা। তবে নাতাশার সঙ্গে দেখা হলেই সে সবসময় একটু পরিশুদ্ধির অনুভূতি উপহার পায়।

৪.

উপন্যাসে পাঠকের বাড়তি পাওয়া ঘটে এই ভূখণ্ডের মানুষ যে ধরনের দর্শন নিয়ে নিজেদের দৈনন্দিন জীবন কাটায় সেগুলোর সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হবার মাধ্যমে। আসলে মানুষের জীবনের দর্শনকে উপন্যাসে ফুটিয়ে না তুললে তো মানুষটাকে আদৌ ফুটিয়ে তোলা হলো না। এই জিনিসটাই গৌণ ঔপন্যাসিকদের সঙ্গে কাজী আনিস আহমেদের ভেদচিহ্ন।

দেশের মধ্যচিন্তার মানুষের কাছে ধর্মের একটা প্রয়োজনীয় তাফসির রয়েছে। শবে বরাতের সন্ধ্যায়  নাতাশার একান্ত ভাবনার মাধ্যমে লেখক সেটি তুলে ধরেন। নাতাশার স্বামী কায়সারের কাছে ধর্ম প্রায় একটা কুসংস্কার। আর পুত্র সাইমন অন্য অনেক কিছুর মতো ধর্ম বিষয়েও নেহায়েতই নিস্পৃহ। মধ্যবর্তী অবস্থানে আছে নাতাশা। নিজেকে সে ধর্মবিশ্বাসী মনে করে। তবে— ‘মোল্লাদের ধার সে ধারে না। আর ভয় দেখিয়ে কিংবা সন্ত্রাসী কায়দায় জানোয়ারের মতো যেভাবে তারা নিজেদের বুঝ অন্যদের ওপর নির্বিচারে চাপিয়ে দিতে চায়, সেটাও ওর একদমই অপছন্দ।... ওর বিশ্বাস একান্তই আন্তরিক, তবু ধর্মীয় নিয়মের ব্যাপারে কিছু শিথিলতায় ওর দ্বিধা নেই। কখনো কখনো রোজা বাদ দেয় ও, আর ভালো মদ ভালোবাসে। আর নামাজ পড়ার ব্যাপারে ও মনে করে, ওটা যন্ত্রের মতো করে যেতে বলা হয়নি, মনের ভেতর থেকে তাগিদ এলেই সেটা করা উচিত। তবে নিয়মিত চর্চা করলে হয়তো মনের তাগিদ জাগতেও পারে, এ বিশ্বাসও আছে তার। ওকে নাড়া দিতে পারে ভয় বা কৃতজ্ঞতা অথবা করুণার অনুভূতি, কিংবা সে আনন্দিত বা বিস্মিত হতে পারে স্রেফ খুব সাধারণ কোনো কিছুতে, অথবা তাতে ওর নিজের অসম্ভাব্য ও ক্ষণস্থায়ী উপস্থিতিতে, কিন্তু কোনো অশিক্ষিত মোল্লার কাছে সে নেকি-গোনা ইমানের বাহাস শুনতে রাজি নয়। ইমান এত সহজে আনা বা বিসর্জন দেওয়া যায় না। অভিজ্ঞতা থেকে ও জানে, বহু বছরের অবহেলাতেও তা অটুট থাকতে পারে, আর তারপর নিজের অজান্তেই মানুষের মনে পল্লবিত হয়ে উঠতে পারে আকিদা ও ইমান।’ 

উপন্যাস থেকে উদ্ধৃতি দিয়েই যদি আলোচকের বলার কথাটি বলা হয়ে যায়, তাহলে উদ্ধৃতি তুলে দেওয়াটাই যথেষ্ট হয়। এই আলোচনার ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটে চলেছে। আরো ঘটবে। আমাদের দেশ, যাকে উপন্যাসে ‘পাণ্ডুয়া’ বলা হয়েছে, সেই দেশের অধিবাসীদের সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক প্রসঙ্গ এসেছে উপন্যাসে। সেগুলি কখনো  সত্য, পরিস্থিতি বিবেচনায় কখনো অর্ধসত্য, কখনো বা মনে হবে সত্য থেকে অনেক দূরের। তবে জাতিগত পর্যবেক্ষণের একটি পর্যায়ে ঔপন্যাসিক যখন বলেন— ‘পাণ্ডুয়ার মানুষেরা একটা প্রাচীন জাতিসত্তার উত্তরাধিকার বহন করে। আর সে কারণেই মানবসত্যের অনেক কিছুই তাদের জানা, যা পাশ্চাত্য বিজ্ঞান অনেক পরে এবং অনেক কষ্ট স্বীকার করে বুঝতে শুরু করেছে। বহু শতাব্দী ধরেই তারা  জানে যে, জীবনের অর্থ কিংবা গভীরতম সুখ, কোনোটাই অর্থোপার্জন, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতির মধ্যে নেই। এ সবই ক্ষণস্থায়ী সম্পত্তি, প্রায়শই অন্যের খেয়াল-খুশির ওপর নির্ভর করে। ভালোবাসার পেছনে ধাওয়া করা কিংবা তা পাওয়ার মধ্যেও নেই কোনো স্থায়ী সুখ, যে ভালোবাসা প্রায়শই এক অলীক মায়া— অন্য সব রকম সৌন্দর্যের মতোই করুণ অবসানই যার বিধিলিপি। একটি জিনিসই কেবল এই সবকিছুর সীমা অতিক্রম করে যেতে পারে; একটা জিনিসকেই অনেকদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব যথেষ্ট দক্ষতা আর ভাগ্যের সহযোগে, আর তাই এই একটা জিনিসই কেবল মানুষের প্রচেষ্টার লক্ষ্য হতে পারে : মর্যাদা।’— তখন লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে উপায় থাকে না। আমরা কেবল যোগ করতে পারি ব্যক্তির সঙ্গে সঙ্গে জাতিগত মর্যাদার কথাটাও।

ব্যক্তিগতভাবে আমি কাজী আনিস আহমেদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কারণ, তিনি আমাকে একটি সত্যিকারের ভালো উপন্যাস পাঠের সুযোগ করে দিয়েছেন। ভালো উপন্যাস পাঠের সুযোগ পাওয়ার ঘটনা আমাদের দেশে খুব বেশি ঘটে না।   

 

হাতের তারায় বিশ্ব খেলে ( THE WORLD IN MY HANDS ); কাজী আনিস আহমেদ; ভাষান্তর : তপন শাহেদ; প্রকাশ (ইংরেজি) : পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউজ ইন্ডিয়া, ২০১৩; প্রকাশ (বাংলা) : কাগজ প্রকাশন, প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর; অমর একুশে গ্রন্থমেলা,২০১৭; মূল্য : ৪৫০ টাকা।

 

 

//জেডএস//

লাইভ

টপ