গর্ত ।। সান্তিয়াগো রোনকাগলিওলো

Send
তর্জমা : তানভীর আহসান
প্রকাশিত : ১৬:০১, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৬, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৯

‘যাওয়ার আগে এটা তোমার অবশ্যই দেখে যাওয়া উচিত,’ ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল। ‘এটা বাদ দেয়ার মতন না। সেটা অবশ্য যদি তোমার হিম্মত থাকে তাহলেই ...’

সকালের শুরুর দিকটায় ওয়ার্ডসওয়ার্থ খানিকটা খেঁকুড়ে হয়ে থাকে; এই সময়টায় গ্রাঁ ওতেল দেস ওয়াগন-লিস বারে খদ্দের বলতে বউ না থাকা বেটাগুলো আর পাঁড়মাতালদেরকেই পাওয়া যাবে। সত্যি বলতে কি, আমি লোকটাকে সহ্য করতেও পারি না-ওর ঔদ্ধত্ব আর হামবড়া ভাবটা একেবারে গা জ্বালানো-কিন্তু ১৯৩৭ সালের পিকিংয়ে পান করার সাথী হবার মতো লোক তেমন ছিল না।  জাপানিরা শহরের মাইলকয়েক দূরেই ছাউনী ফেলেছে, আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যে জনাকয়েক আছে সবাই কূটনৈতিক কোয়ার্টারে গোঁজ দিয়ে পড়ে রয়েছে। রাতে বের হওয়াটা আত্মহত্যার শামিল।

তারপরও আমি বললাম, ‘আমায় ওখানে নিয়ে চলো, এখনই চলো।’

‘গাড়িটা আমি বের করছি না শুধু যদি তুমি মত বদলাও এই কারণে,’ সিগারেটের ধোঁয়ামেঘের ভেতর থেকে ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল।

‘শুনলে না আমি কি বললাম?’ আমি বললাম, ‘চলো।’

সেই সময়টায় সবাই তখন লোটাস ক্লাবের কথা বলছে। বলতে গেলে পিকিংয়ে তখন ওটারই একেবারে একচেটিয়া কদর, কিন্তু, সেকারণেই কাউকেই ওখানে সদস্য করা হচ্ছিল না। ক্লাবটার এমন খানদানি নামডাক যে আমি ভেবেছিলাম ওটার আসলে কোনো অস্তিত্বই নেই। যাই হোক, মাতাল বকাবাজ হওয়ার কারণেই, ওয়ার্ডসওয়ার্থ ফাঁস করে দিল যে, ও ওখানকার একজন সদস্য আর আমাকে ওখানে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবও দিল।

‘শুধুমাত্র একটাই শর্ত,’ সাবধান করে দিল ও, ‘তোমাকে শপথ করতে হবে যে ওখানে যা ঘটে তার কিছুই তুমি কাউকেই বলবে না।’

‘কেন?’ আমি জানতে চাইলাম, ‘ওখানে কী এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে?’

‘সেটা আমি কখনোই প্রকাশ না-করার শপথ করেছি,’ ওয়ার্ডসওয়ার্থ বেশ রহস্য করে বলল।

‘কোনো সদস্য যদি কখনো সেই শপথ ভাঙে?’

‘কেউ ভাঙবে না,’ সে মৃদু হেসে বলল। 

আমিও চলেই যাচ্ছি। পরের দিনই। শহরে আমার সবগুলো পারিবারিক ব্যবসা বিক্রি করে দিয়েছি। আমার হবু স্ত্রী মিনা লন্ডনে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। ওর পরিবার বেশ ধনী। আমি বেশ একটা আরামের কিন্তু একঘেঁয়ে জীবনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। মাঞ্চুরিয়া থেকে আসা নিষিদ্ধ আফিম নিয়ে আখড়াগুলোতে নাড়াচাড়া করার সময়টা, কাঁকড়া বিছের কাবাব আর কোরিয়ান বারবনিতাদের কথা আমার বেশ মনে পড়বে। আর তাই সে রাতে আমার বিছানায় যাবার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। পিকিংয়ে আমার শেষ সময়ের প্রতিটা মুহূর্ত আমি রসিয়ে রসিয়ে উপভোগ করতে চাইছিলাম। আমি রোমাঞ্চ চাইছিলাম। আমি ওর শর্তে রাজি হয়ে গেলাম।

‘বেশ, নিয়ে যাব তোমায়,’ একটা নজরকাড়া চীনামাটির অ্যাশট্রেতে সিগারেটটা চেপে নিভিয়ে ফেলতে ফেলতে ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল। ‘এটা তোমার বিদায়বেলার উপহার। আমার মনে হয় এটা তোমার প্রাপ্য।’

ওর সাদা ভোয়াসাঁয় সওয়ার হয়ে আমরা কূটনৈতিক কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে গেলাম, আর একেবারে আসল চায়নার লাল কাগজের লণ্ঠন এবং সেনা টহলের মধ্যে গিয়ে পড়লাম। ওয়ার্ডসওয়ার্থ ফরবিডেন সিটির কাছেই হুতোঙ পর্যন্ত চালিয়ে গেল আর একটা নিঃশব্দ ধূসর কাঠামোর সামনে গাড়িটা দাঁড় করাল।

‘তুমি নিশ্চিত তো?’ ইঞ্জিন বন্ধ করতে করতে ও জানতে চাইল।

আমি মাথা ঝুঁকিয়ে হ্যাঁ বললাম।

আমরা অজস্র শাখা-প্রশাখা আর বাঁকে-ভরা একটা বিচ্ছিরি গলি ধরে এগুলাম। সে রাতে চাঁদ জ্বলজ্বল করছিল, আর পথ ধরে আমরাও নির্ঝঞ্ঝাটে এগুতে পারছিলাম। দৈবাৎ ঘুমন্ত ভিখিরিদের আমরা পেরিয়ে গেলাম। ওদেরই একজন, আমরা এগুতেই, জঘন্যভাবে গা ঝাড়া দিয়ে উঠল, দেখলাম ও বিকলাঙ্গ, কিন্তু আমাদের পথ আটকাবার কোনো চেষ্টা সে করল না। আমি বেওয়ারিশ কুকুরদের ডাক শুনলাম, শুনলাম কিছু একটার ওপর কামড় বসানোর শব্দ, কিন্তু আমি এদের কিছুই দেখতে পেলাম না।

ওয়ার্ডসওয়ার্থ একটা দরজার সামনে থামল, এটাই এ রাস্তার সবচেয়ে জরাজীর্ণ দরজা। আমার আশঙ্কা হচ্ছিল যে ক্লাব দেখার পুরো ব্যাপারটাই না শেষে ঘেঁটে যায়, দেখা গেল নিরানন্দ কোটিপতিদের একটা হতশ্রী আখড়া, কিন্তু আমি চুপ রইলাম। আমার সঙ্গী পাঁচবার টোকা দিল, আর মনে হচ্ছিল আমাদের চারপাশের বাতাস জমে গেছে। একটা সংক্ষিপ্ত কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক প্রতীক্ষার পর কেউ একজন গ্রিলটা ভেতর দিকে টেনে নিল। খুব ক্ষীণ, প্রায় শোনাই যায় না এরকম গ্লাসের টুংটাং আর হাসির শব্দ ভেসে এলো। ওয়ার্ডসওয়ার্থ কিছু বলল না বরং হাত দিয়ে পাসওয়ার্ডের মতন কিছু একটা ইশারা করল। দরজা খুলে গেল।

আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে বিলাসবহুলভাবে সাজানো কক্ষে আমি ঢুকলাম। ছাদ থেকে ঝুলছে স্ফটিকের ঝাড়বাতি, ছাদটা আবার আশাতীতরকম উঁচুতে, যেন ঘরটি বাইরে থেকে ভেতরেই বেশি বড়। দেয়ালে মার্বেল লাগানো এবং সেখানে সোনার তবক মোড়ানো সব ফ্রেমে আয়না ঝুলছে। এই অসাধারণ পরিবেশটি একটি ককটেল পার্টির। ভদ্রমহোদয়গণ সব শ্যাম্পেনের গ্লাস ধরে আছেন এবং ভদ্রমহিলারা ফার আর হীরায় শোভিত হয়ে ঝলমল করছেন। আমি ফরাসি রাষ্ট্রদূত, পুলিশ প্রধান, বেশ কয়েকজন কুওনমিনটাং সেনাপ্রধান এবং জনাকয়েক সম্পদশালী সাদা রাশিয়ানকে চিনতে পারলাম। যদি চিয়াং কাই-শেক নিজেই পার্টি দিতেন তাহলেও এরাই অতিথি থাকতেন।

ওয়ার্ডসওয়ার্থ আর আমি ভিড়ে মিশে গেলাম। জনাকয়েক আমাকে দেখে অবাক হলেন এবং আমাকে উষ্ণ স্বাগত জানালেন। তাতে করে তাঁরা অবশ্য আমায় তেমন অভিভূত করতে পারলেন না। আর মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা পরেই আমার কাছে তাঁদের আর কোনো মূল্যই থাকবে না।

‘এটাই?’ আমি ওয়ার্ডসওয়ার্থের কানে কানে বললাম। ‘মহান লোটাস ক্লাব? কোয়ার্টারে তো আমরা এরচেয়েও ভালো পার্টি দিই।’

‘তুমি বেশ অধৈর্য, তাই না?’ ও ধমকের সুরে বলল আর একজন ওয়েটারের হুইস্কির গ্লাসভর্তি ট্রের দিকে ফিরতে ফিরতে বলল, ‘আমাড় বন্ধু গর্তটা দেখতে চায়। তুমি কি ওকে একটু নিয়ে যাবে?’

ওয়েটার মাথা ঝোঁকালো। একটা টেবিলের ওপর ট্রেটা রাখল আর আমাকে নিয়ে গেল মাঝের আঙিনাটায় আর সেখান থেকে চীনামাটির ড্রাগন আর ফুলদানিতে প্রচ- সুন্দর করে সাজানো আরেকটা ঘরে নিয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত সে একটা লাগোয়া ঘরে থামল আর দরজাটা খুলে দিল, আমাকে ভেতরে যেতে ইশারা করল।

ঘরে কোনো আসবাব নেই। থাকার মধ্যে ছাদের মাঝ থেকে ঝোলানো একটা কাগজের বাতি। এবং, ঠিক তার নিচে, একটা গর্ত।

ভালো করে দেখার জন্যে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। গর্তটা প্রায় ফুট পনের গভীর, আর তলায় একটা মানুষ বসে আছে, হাত-পা বাঁধা। আমি ভাবলাম হয়তো বন্দী কোনো জাপানি সৈন্যকে প্রদর্শনীর অসুস্থ চিন্তাভাবনা থেকেই ওখানে ফেলে রাখা হয়েছে। সে কাঁদছিল। আমি ওকে ডাকলাম।

‘এই! তোমাকে কে ওখানে ফেলেছে?’

লোকটা যেন আশা পেল। সে তার হাত উঠাল এবং মাথা তুলল, শেকল ঝনঝন করে উঠল।

‘দয়া করে আমাকে এখান থেকে বের করো। এদের হাত থেকে আমায় বাঁচাও। এরা উন্মাদ!’

ওর কথায় লন্ডনের টান। সত্যি বলতে কি ওকে চেনাচেনা লাগছে। ধীরে ধীরে গর্তের অন্ধকার আমার চোখে সয়ে এলো। আর তখনই আমি তাকে পরিষ্কার দেখতে পেলাম। আতঙ্কে আমি জমে গেলাম : ওটা আমি।

‘ওরা এখন যে কোনো সময় আমায় ধরতে চলে আসবে,’ ও মিনতি করল। আমি যে পোশাক পরে আছি ওর পরনেও তাই আর ওর মুখ আর চুল একদম আমার মতোই দেখতে। এটা আমি, প্রতিটি ইঞ্চিতে আমি, যেন নরকের আরশীতে কোনো প্রতিবিম্ব। ‘দয়া করে আমায় এখান থেকে বের করো। আমি তোমায় পয়সা দেব।’

আমি আর শুনতে চাইলাম না। দৌড়ে আমি ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম, আঙিনা পেরুলাম এবং পার্টির মাঝ দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেলাম। রাস্তার গোলকধাঁধায় আমি হারিয়ে গেলাম তবে শেষ পর্যন্ত পথ খুঁজে পেলাম আর ভোরের আলো ফোটা অবধি দৌড়–তেই থাকলাম যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি আমার হোটেলে পৌঁছোই।

দুদিন বাদে জাপানিরা পিকিংয়ে ঢুকল।

শহরটাতে আমি আর কোনোদিন ফেরত যাইনি।


 

[সান্তিয়াগো রোনকাগলিওলো সমসময়ের পেরুর কথাসাহিত্যের একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত লেখক। জন্ম ১৯৭৫ সালে, পেরুর রাজধানী লিমায়। লেখালেখির পাশাপাশি সাংবাদিকতাও করেছেন। বহু বছর ধরে এস্পানিয়ায় থিতু হয়েছেন। তাঁর লেখালেখির প্রধান বিষয়গুলোর একটি হলো আতঙ্ক বা ভয়। পুদোর (২০০৪) এবং আব্রিল রোহো (২০০৬) তাঁর উল্লেখযোগ্য দুইটি উপন্যাস। এই গল্পটির ইংরেজি অনুবাদ বেরিয়োছল দ্য শর্ট স্টোরি প্রোজেক্ট.কম-এ। কিট মডের করা ওই অনুবাদ অবলম্বনে এই বাংলা তর্জমাটি করা।]

//জেডএস//

লাইভ

টপ