মধুমতি

Send
হামিরউদ্দিন মিদ্যা
প্রকাশিত : ১৪:২৮, মে ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৫০, মে ২৫, ২০১৯

আমার দাদুর বাড়ি ছিল বাংলাদেশে। মধুমতি নদীর ধারে। টালি ও খড়ের ছাউনি দেওয়া ছোট ছোট কয়েকটা মাটির ঘর পেরলেই বাঁশবন, তারপর কুল কুল শব্দে বয়ে যাওয়া নদী। রাত্রে কান পাতলে ঘরের ভেতর থেকেও মিষ্টি শব্দটা কানে আসত। দাদু কোমরে গামছা জড়িয়ে, সারা গায়ে জবজবে সরষের তেল মেখে নদীতে স্নান করতে যেত। কোনোদিন শখের গাই গরু বুধীর মাকেও ঘাটে নামিয়ে স্নান করিয়ে আনত। বুধীও মায়ের পিছু পিছু গুট গুট করে চলে যেত।

আমার বাবা তখন খুব ছোট। যেটুকু শুনেছি দাদুর মুখেই। দাদু খেপ জাল দিয়ে নদীতে মাছ ধরত,

আর আমার বাবা মাছ রাখার খালুই ধরে পিছু পিছু হাঁটত। না নিয়ে গেলে খুব কান্নাকাটি করত। বেশি তো হাঁটতে পারত না বাবা। দাদু মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করত, হ্যাঁ রে খোকা, পাগুলা ধইরা গ্যাছে? —বলে কোলে তুলে নিয়ে, গামছা দিয়ে মাথার রোদ আড়াল করত। কখনো ধানের খেত দেখতে গেলেও কাঁধে বসিয়ে বাবাকে নিয়ে যেতে হত।

দেশভাগের সময় সব ছেড়েছুড়ে, বাবার হাত ধরে এপারে চলে আসে দাদু। এখানেও নদী আছে। নদী বলতে দামোদর। মধুমতির মতো কুল কুল শব্দে জল বয়ে যায় না। শুখা নদী। সারাবছর বালি বেরিয়ে মরুভূমির মতো ধূ ধূ করে। শুধু বর্ষায় টলমলে জল। তখন নৌকা চলে, জেলেরা মাছ ধরে। শীত আসতে না আসতেই সরু ফিতের মতো গুটিয়ে যেতে থাকে নদীটা।

এপারে আসার পর থেকেই দাদু কেমন যেন হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষজন পাগল বলেই জানে। অনেক জায়গায় দাদুর চিকিৎসা করানো হয়েছে, তবুও যেমনকার তেমন। এখন শুধু সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়ায়। দামোদরের পার ধরে হেঁটে হেঁটে অনেক দূরে হারিয়ে যায়। কোনদিন মিনি মার্কেটে গিয়ে বসে থাকে।

মিনি মার্কেট হল সবজির বাজার। বাজারটিকে ঘিরে যেসব ছোটখাটো গ্রাম, সবই প্রায় দাদুর মতো ছিন্নমূল মানুষদের বাস। নদীর ধারে নরম পলি মাটিতে আলু, কপি, মুলো, বাদাম চাষ হয়। দু'পার জুড়েই সবুজের সমারোহ। বাজারের আড়তে চাষীরা সবজি দিয়ে যায়। দাদু তাদের সঙ্গে হারানো দিনের গল্প করে। সংসারে একদম মন নেই। কোনদিন ঘরে ফিরতেও ভুলে যায়। বাবা বিরক্ত হয়ে খোঁজাখুঁজি করে ধরে আনে। আমার ওপরও খোঁজার ভার পড়ে কোনো কোনো দিন। মা বলে, যা রে খোকা, তোর দাদুকে খুঁজে আন।

মায়ের নির্দেশে আমি দাদুকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ি। দাদুকে খোঁজা কি চাট্টিখানি কথা! কোনদিন জেলেদের ডিঙির পাটাতনে শুয়ে আকাশ দেখে দাদু। কোনদিন নদীর পারের খেতে মুনিশজনদের সঙ্গে কাজে হাত লাগায়। কেউ কেউ সুযোগ বুঝে খাটিয়ে নেয়। আবার কেউ সহানুভূতি জাগিয়ে বলে ওঠে, আরে, এ কী করছেন নিধিবাবু! যান, যান। বাড়ি গিয়ে শুয়ে থাকুন। এই রোদের মধ্যে কী কাণ্ড দেখো তো! আপনার ছেলে এখুনি খুঁজতে আসবে যে। দেখলে কী বলবে!

দাদু গম্ভীর মুখ করে পীরপুকুরের ঘাটে চলে যায়। দামোদর নদী থেকেই একটা নালার মতো অংশ বেরিয়ে সৃষ্টি হয়েছে পুকুরটার। খুব গভীরতা। পূব পাড়ে পীরের মাজার। কী যে রহস্য লুকিয়ে আছে জলের ভেতরে! এলাকার সব পুকুর শুকিয়ে গেলেও পীরপুকুরের জল যেমনকার তেমন।

ঘাটে হয়তো কোনো মেয়েমানুষ স্নান করতে এসেছে, দাদুকে দেখে খুব অস্বস্তি বোধ করে। কয়েকজন ঘরে এসে নালিশ জানিয়েও গেছে।

—বুড়ো বয়েসে নিধিবাবুর এ কী ভীমরতি ধরল গো! মেয়েছেলেরা ঘাটে যে একটু নামবে...। পাড়টিতেই বসে থাকবে চুপ করে।

মা সামাল দেয়, কিছু মনে কর না বউমা। ওর কী মাথার ঠিক আছে! দিনকে দিন মানুষটা কেমন হয়ে গেল গো! তুমি যাও, আজ আসুক। আচ্ছা করে বলব।

বাবা তো শুনেই রেগে বোম! খুব বকাঝকা করল। আসলে দাদুকে নিয়ে হয়েছে সবার জ্বালাতন।

যেমন হল সেদিন আর কী। দাদুকে খুঁজতে খুঁজতে আলাতন হয়ে পড়েছি। ফেরার পথে দেখি দামোদারের ধারেই একটা বটের তলে দাদু গামছা পেতে বসে আছে নদীর দিকে চেয়ে।

কাছে গিয়ে চুপচাপ বসলাম। আমাকে দেখল দাদু, মুখে কোনো কথা নেই। দূরের দিকে চেয়ে আছে। আচমকা নীরবতা ভেঙে বলল, জানিস দাদু ভাই, এহানে বসলে মনে হয় বাবার কোলে বইস্যা আছি। আমার আর কোনো ডর লাইগে না।

আমি অবাক হয়ে একবার দাদুকে, আর একবার বটগাছটা দেখলাম। ছবিটা মনে মনে মেলানোর চেষ্টা করলাম। কিছুতেই স্পষ্ট হচ্ছে না। দাদু কি সত্যিই পাগল হয়ে গেল নাকি! সেদিন আমার বন্ধু বাবলু বলল, জানিস জয়দেব, তোর দাদুর মাথার তার কাটা। সামান্য লেগে আছে, দেখে শুনে রাখিস, নাহলে ফুল তার কাটা হয়ে যাবে। —বলে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসছিল।

বাবলু আমার বাল্য বন্ধু। সেই ন্যাংটো বেলা থেকে। আমি কিছু বলিনি। মনে খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। আমার দাদু পাগলই হোক আর যাই হোক ওভাবে তার কাটা বলবে কেন!

আজ মনে হল বাবলু ঠিকই বলেছিল। দাদু বলে কী! বাবার কোল! তার মানে বটগাছটা দাদুর বাবা! দাদু, বাবা, আমি সব বটগাছ!

দাদুকে জিজ্ঞেস করলাম, কী খোঁজো দাদু? ঘরে বসে থাকতে পার না? তোমাকে নিয়ে সবাই চিন্তা করে!

—আমাকে নিয়া কে এতডা ভাবে রে! তোর মা ছাড়া?

—কেন দাদু! বাবা, তোমার নাত বউ ওরা তোমার কথা ভাবে না?

দাদু প্রসঙ্গ পালটে বলল, নাত বউ খাসা মেয়ে দাদু ভাই!

আমি লজ্জা পেলাম। —কী যে বল না দাদু!

আমি কী খুঁজি জানিস না? ওই দেখ—বলে দাদু আঙুল বাড়িয়ে নদীর ওই দূরের দিকে দেখাল, যেখানে দামোদরের সরু একফালি স্রোত এঁকেবেঁকে কাশবনের আড়ালে মিলিয়ে গেছে। আমি কিছু বুঝতে পারি না। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকি। দাদুও সেদিকে চেয়ে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে তলিয়ে যায়। হঠাৎ বলে ওঠে, মধুমতি নদীটা কোথায় গেল ক' দিনি দাদু ভাই?

আমি বলি, ধুর দাদু! তুমি না সত্যিই পাগল! মধুমতি নদী এখানে কোথায় পাবে? এটা তো দামোদর। মধুমতি, সে তো অন্য দেশ।

দাদুর চোখগুলো লাল হয়ে গেল। কটমট করে আমার দিকে তাকালো। আমার খুব ভয় লাগছে। আমি যাই বলি, দাদু আমার দিকে ওমন করে তাকাবে কেন!

দাদু আচমকা গর্জে উঠল, অন্য দ্যাশ!এডা তুই কী কস দাদু ভাই? যে দ্যাশে জন্ম হল, যে নদীর কোলে বড় হলাম, সেডারে তুই অন্য দ্যাশ কস! যা, যা। আমার চোক্ষের ছামু থিকা দূর হইয়া যা!

আমার ইচ্ছা হয় যেদিকে দুচোখ যাই, ছুটে পালাই। দাদু যা পারে করুক! কিন্তু দাদুর দিকে তাকাতেই কেমন মায়া হল। থরথর করে কাঁপছে দাদু। আমি জাপটে ধরি।

—এরকম কর না দাদু। চলো, বাড়ি চলো।

দাদু আমাকে ছিঁটকে ফেলে দিয়ে নিজেই হন হন করে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। আমিও পিছু পিছু  চললাম। এমন ভাব দেখাচ্ছে দাদু, যেন আমাকেই খুঁজে নিয়ে যাচ্ছে।

 

***

নীলার হঠাৎ শরীর খারাপ। মানে পেটে যন্ত্রণা। সঙ্গে সঙ্গে কাছের হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হল। রাত দু'টোর সময় আমি এক কন্যা সন্তানের বাবা হলাম। মনের মধ্যে কী যে আনন্দ হচ্ছে! বাবা হওয়ার এতো যে আনন্দ আমি জানতাম না। গোটা বাড়িময় খুশির জোয়ার বইতে লাগল। সেই স্রোতে আমি আর নীলাও গা ভাসিয়ে দিলাম।

নীলা খুব ধনী ঘরের আদুরে মেয়ে। দুঃখ কী জিনিস, তেমন টের পাইনি। লাভ ম্যারেজ না হলে  আমি কী নীলাকে পেতাম!

দাদুর জন্য মাঝেমধ্যে নীলা খুব দুঃখ প্রকাশ করে।

—হ্যাঁ গো! দাদু কী কোনদিন ভালো হয়ে উঠবে না?

—সেটা কী করে বলব বলো। মানুষটা জীবনে অনেককিছুই হারিয়েছে। স্বাধের ঘর-দোর, ভিটে-মাটি, এমনকি ঠাকুমাকেও আনতে পারেনি। চোখের সামনে মিলিটারির গুলিতে মধুমতির জলে লুটিয়ে পড়তে দেখেছিল। সেই শোকেই বোধহয় দাদুর মাথাটা গেছে।

তিন চারদিন পর নীলাকে বাড়িতে আনা হল। মেয়ের মুখটি হয়েছে মায়ের মতো। গোলগাল গড়ন। টিকালো নাক। সবাই এখন মেয়ের কী নাম রাখা হবে, তা নিয়েই ভেবে ভেবে আকুল।

দূর্গাপুর থেকে নীলার বাবা-মা, আর আমার ছোট শালী, মানে শিউলি এসেছে। শিউলি তো এসেই বোনঝির পাশে শুয়ে সেলফি তুলে নিয়েছে।

এতদিন বাড়িটা কেমন খাঁ খাঁ করত। ঘর, ঘরের সামনে একফালি উঠোন, উঠোনের পাশে বাতাবি লেবুর গাছ, কলতলা—সব চুপচাপ পড়ে থাকত। একদম নিশ্চুপ। ঘরে একটা বাচ্চা না থাকলে হয়!

এখন কেউ না থাকুক, মা কিংবা নীলা সংসারের রান্নাবান্না টুকিটাকি কাজকর্ম করতে করতেই মেয়েকে কোলে নিয়ে একটু আদর করতে পাবে। দোলনায় শুয়ে থাকলেও হাজার কাজ ফেলে একবার দোল খাইয়ে ছড়া কাটবে।

দাদু একবার উঁকি মেরে দেখেছে মেয়েকে। তেমন ভাবগতিক পরিবর্তন দেখছি না। ঘরে কুটুম্বজন, তবুও দাদু সারাদিন বেপাত্তা। আজ খুঁজতে যাওয়ারও অবসর থাকেনি। বাজার গিয়ে কেনাকাটা করে এনেছি।

সন্ধেবেলায় আমরা ঘরে বসে আছি, দাদু হঠাৎ অপরাধীর মতো মাথা হেঁট করে ঢুকল।

শ্বশুর মশাই বললেন, কী খবর? কোথায় ছিলেন সারাদিন?

শ্বশুরের কথায় সামান্য বিদ্রুপ মেশানো। পরিস্থিতিটা সামাল দিল নীলা।

—জানো বাপি, দাদুকে আমরা কোনো কাজই করতে দিই না। এই বয়সে আবার কী করবেন! সারাদিন খাবেন, দাবেন, ঘুরবেন। তাতেই তো মন ভালো থাকবে, তাই না?

হ্যাঁ অবশ্যই—বলে শ্বশুর মশাই দাদুর দিকে ঘুরে বলেন, আমিও আপনার সাথে হাত মেলাব ভাবছি। এ জীবন আর ক'দিন!

মা চা দিয়ে গেল সবাইকে। বলল, টগরবালা নামটা কেমন হবে বল তো? টগরফুলের মতোই দেখতে না!

নীলা সঙ্গে সঙ্গে বাধা দিয়ে উঠল, ছাড়ুন তো মা। মান্ধাতা আমলের একটা নাম।

শাশুড়ি আর শালী সাপোর্ট করল নীলাকে। শ্বশুর মশাইয়ের বোধহয় ইচ্ছা ছিল।

নীলা মাথায় আঙুল ঠুকে একটুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর বলল, আমার মেয়ের নাম হবে সোনামণি। বলেই মেয়েকে আদর করতে লাগল, আমার সোনা সোনা, আমার মোনা মোনা।

শিউলি বলল, কী কিউট নাম রে দিদি!

নীলার মুখে নামটা শুনেই আমার মন কূ কেটে উঠল। দাদুরও দেখলাম মুখটা গম্ভীর। বললাম, ধ্যাৎ! খুব কমন নাম।

সবাই ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকালো। আমার কী হল জানি না, শুধু দাদুর মুখে শোনা নদীটার কথা মনে পড়ল। মুখ দিয়ে ফস করে বেরিয়ে গেল—মধুমতি।

দাদুর দিকে তাকালাম। দেখলাম সজনে খাঁড়ার মতো সরু লিকলিকে হাত-পাগুলো আনন্দে দোলাচ্ছে। যেন মধুমতির জলে সাঁতার কাটছে দাদু।

তাহলে কি দাদু সত্যিই নদীটা পেয়ে গেল! 

//জেডএস//

লাইভ

টপ