ছুটির সন্ধ্যা নামে রাইনের তীরে

Send
ফাতেমা আবেদীন
প্রকাশিত : ০৮:০০, জুলাই ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৬, আগস্ট ২৭, ২০১৯

দেশ থেকে এসেছি সাত দিন হয়ে গেলো আজ। বাড়ির সবচেয়ে কাছের গির্জায় ঢং ঢং করে ১২টার ঘণ্টা বাজলো। একটা ট্রেন গগণবিদারি হুম হুম আওয়াজ তুলে পার হয়ে গেল পথ। হয়তো অনেক দূরের কোনও দেশে যাচ্ছে। অনেকদিন কাটবে পথে। সাউন্ডপ্রুফ এই নগরে ট্রেনের শব্দ  আর হঠাৎ হঠাৎ শুনতে পাওয়া গির্জার ঘণ্টায় আমার একসঙ্গে ২০টি মসজিদ থেকে ভেসে আসা আযানের জন্য মন কেমন করে। আযানের শব্দ শুনে বাড়ির ছোট্ট মেয়েটি রেডিওর আওয়াজ কমিয়ে মাথায় ঘোমটা দিলেও, এখানে গির্জার ধ্বনি শুধুই সময় বলে, আর হুহু করে বাতাস বাড়ে। কখনও নাকের ডগা ভেজানো বৃষ্টি। যে বৃষ্টিতে নাকের ডগা ভেজে না, সেই বৃষ্টিতে রাস্তা ভিজে কুপোকাত। ভেজা রাস্তায় ছপছপ করে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করি—এই শীতে এত বৃষ্টি কেন বাপু? আজতো আমার বিয়ের দিন না। শুধু আমার বিয়েতেই তো শীত ছাপিয়ে ঝুম বৃষ্টি হয়েছিল। নতুবা ফাল্গুনের চার তারিখে কোনোদিন বৃষ্টি হয় বলে কেউ শুনেছে? অবশ্য আমার মায়ের বিয়ের দিনও বৃষ্টি হয়েছিল। নভেম্বরে তো হাড় কাঁপানো শীত থাকার কথা ছিল সেই ৪০ বছর আগে, তখন তো আর গ্লোবাল ওয়ার্মিং ছিল না। তবু নাকি বৃষ্টি হয়েছিল।

সেই আকাশ ভাঙা বৃষ্টি নিয়ে সাতদিন আগে নেমেছিলাম ফ্রাংকফুর্ট এয়ারপোর্টে। ফ্রাংকফুর্ট বিমানবন্দরে নামার পরপরই মনে হলো আমি কোনো গোডাউনে ঢুকে পড়লাম। চারটা ফ্লাইট একসঙ্গে নেমেছে। বিশাল লম্বা লাইন। মাত্র দুইটা কাউন্টার খোলা। বাংলাদেশ বিমানবন্দরের মতো ৭টা কাউন্টার নেই—প্রবাসী বাংলাদেশি, বিদেশি পাসপোর্টধারী বাংলাদেশি, প্রবাসী শ্রমিক বাংলাদেশি, সরকারি কর্মকর্তা বাংলাদেশি টাইপের আলাদা কোনো কাউন্টার নেই। চার ফ্লাইট থেকে হাজার দেড়েক লোক নেমেছে। তাই দয়া পরবস আরেকটি কাউন্টার খোলা হলো। প্রায় ৪০ মিনিট পর আমি কাউন্টার পর্যন্ত যেতে পারলাম। সেখানে পৌঁছানোর আগেই বিমানবন্দরের ওয়াইফাইয়ের দেখা পেয়ে গেছি। ফ্রাংকফুর্ট নাম শুনলেই বইয়ের শহর বলে মনে হয় টাইপ একটা ফেসবুক স্ট্যাটাসও ঝেড়ে দিয়েছি। তাই ৪০ মিনিট বোরিং লাগেনি।

তাপমাত্রা ৭ আর আকাশে কালো মেঘ। মন খারাপ করা দুপুরে নেমেই গলিঘুপছি ঘুরে লাগেজ নামক সেই বস্তা খুঁজে বের করলাম। টিকেটে লেখা ছিল বাকিটা পথ ট্রেনেই যাত্রা। অগত্যা বস্তাগুলো টেনেটুনে ট্রেন স্টেশনের দিকে যাত্রা। ব্যাগপ্যাক, কেবিন লাগেজ, মেইন লাগেজ ও শীতের জোব্বাটি সঙ্গে নিয়ে ট্রেন স্টেশনের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিতে দিতে অনলাইনে থাকা একজন জানালেন, এয়ারপোর্ট থেকে স্টেশন অনেক দূরে, যেতে হবে বাসে। তখনও সিম কেনা হয়নি। যোগাযোগের জন এয়ারপোর্টের ওয়াইফাই ভরসা। এদিকে দেশে উৎকণ্ঠিৎ স্বজনেরা। কতদূর গেলাম, কী হলো।

বাইরে বের হয়ে, ইংরেজি বলতে পারবে এমন একজন খুঁজে পেয়ে বাসের কথা জিজ্ঞাসা করতেই বিস্ময়সূচক হাসি দিলেন। রাস্তার ওপারে দোতালা দেখালেন। বললেন, ওটাই স্টেশন। এলিভেটরের সামনে নাকাল অবস্থা, টায় টায় ৩০ কেজির লাগেজ, কাঁধের ব্যাগে দুনিয়ার জিনিস, হাতে ট্রলিব্যাগ। নীল রঙের ট্রলি ব্যাগটা হাতিয়েছি ভাইপো থেকে। ওরা জেদ্দা থেকে কিনেছিল। পাপা, ফুপ্পি পুলিশ-গাড়ি আনবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে কত কায়দা-কানুন করে ইউরোপের দিকে যাত্রা করিয়েছি মধ্যপ্রাচ্যের এই ব্যাগের। আর ৩০ কেজি সমান ঠেসে ভরেছি যে ব্যাগে সেটা বোন জামাই গাড়ি করে দিয়ে গেছে। মালয়েশিয়া গিয়ে তার একবার লাগেজ পার্টির মতো জিনিস আনতে হয়েছিল, সেই বেলায় এমন দশাসই বস্তা এনে রেখেছিলেন। আমার জর্মন যাত্রা সে বেলায় রক্ষা পেল। অমন বিশাল সাইজের ব্যাগ হাতে নিয়ে ভাবছিলাম এর মধ্যে আমার কী আছে। সত্যি বলতে কী, কয়েকটা টুকিটাকি প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় ছাড়া আমি আর কিচ্ছু আনিনি। বিদেশ যাওয়ার ঝক্কি আমার হাড়ে হাড়ে আছে। আমি ফেরার সময় আবোল-তাবোল শপিং করে নিয়ে যাই, কিন্তু আসার সময় একদম নয়। আমি প্রবাসী ভাই-বোনদের জন্য দেশি তেল, লবণ, মসলা, শিমুল তুলার বালিশ, পঠনযোগ্য বই, কোনো কোনো বই আবার ৩/৪ কপি নিয়ে নিয়েছি।

আমার নাকাল দশা দেখে এগিয়ে এলেন এক ভদ্রলোক। ৬ ফিট ৪ ইঞ্চি নীল পুলওভার পরা লোকটির বয়স আন্দাজে বলতে বললে সত্তরই বলবো। কিন্তু যেমন কায়দা করে লাগেজ তুলে ফেললেন, মনে হলো আরে না ইনি তো মাত্র সত্তর বছরের যুবক। মাথাটা ঝুঁকিয়ে একটু হাই বললাম। এরা সব বিদেশি, কেউ বাংলা বলে না। তার বদান্যতায় এলিভেটর, এস্কেলটর সব পার হয়ে বস্তা নিয়ে নাকাল আমি দোতালায় পৌঁছে বহু কায়দা কানুন করে এক খাবারের দোকানে থামলাম। কাতার এয়ারওয়েজের খাবারে সবাই মুগ্ধ হলেও আমি ভীষণ বিরক্ত,  ভাতের বদলে নারকেল দেওয়া সেমাই আর মুরগি ভুনা ধরিয়ে দিয়েছিল ফ্লাইটে। আসলে আমার নিজেরই সিলেকশনে ভুল হয়েছিল। ভেজ কিছু খাওয়া দরকার ছিল। ইন্ডিয়ানগুলোকে দেখলাম খিচুড়ি আর ছোলা ভুনা দিয়েছে। ঐ মেনুটা কেনো জানি আমার কার্ডে দেখতে পাইনি। কিংবা পেয়েছি, কিন্তু বুঝতে পারিনি হয়তো। এদিকে বিমানে বসেছিলাম এক বৃটিশের সঙ্গে, ইউরোপ যাচ্ছে কোনো কাজে। এমন ঘনঘোর মেঘ থমথমে কণ্ঠে ইংরেজি বলছিলেন যে, ওটা শুনেই বুঝে নিলাম এই ভদ্রলোক খাঁটি ব্রিটিশ। চোখ বন্ধ করে উনার কথা শুনতে গিয়ে বারবার চট্টগ্রাম ব্রিটিশ কাউন্সিলের সাবেক পরিচালক মার্ক বার্থালোমিওর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। মনে করে চেক ইন দেইনি বলে আমার সিট আইলের পাশে পড়েছিল। তার দিকে খুব মিষ্টি হেসে বলেছিলাম ক্যান উই এক্সচেঞ্জ? পাল্টা জবাবে যেভাবে নো নো বলে তেতে উঠেছিল তাতে মনে হয়েছিল আমি তার কিডনিটাই চেয়েছিলাম। পরে অবশ্য আমার শাপেবর হয়েছে। তার সম্ভবত বহুমূত্র আছে। ৬ ঘণ্টার ফ্লাইটে এতবার টয়লেটে গেল যে, আমিই মনে মনে বললাম, উপরওয়ালা যা করে ভালোর জন্যই করে। নইলে কতবার যে উঠতে হতো। তাকে অবশ্য ক্ষমা করে দিয়েছিলাম দুইটা কারণে, আমার ডাটা ক্যাবল খুঁজে পাচ্ছিলাম না, সে তার নিজেরটা দিয়েছিল। আর খাবারের সময় ঘুম থেকে ডেকে তুলে দিয়েছিল।

বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার পথে আমি আগেই বেছে বেছে জানালার কাছে সিট নিয়েছিলাম। পাশে যে বাংলাদেশি ছেলেটা বসেছিল সে যাচ্ছিল তানজানিয়ায়। দোহাতে ট্রানজিট। খুব অবাক হয়েছিলাম। বইয়ে পড়া আফ্রিকার দেশগুলোতেও আমাদের মানুষ আছে। সে খুব চার্জার পয়েন্ট খুঁজছিল, তার ফোন বন্ধ হয়ে যাবে বলে দুশ্চিন্তায় ছিল। কিন্তু আমরা সিট খুঁজে কোথাও চার্জার পয়েন্ট পাইনি। ঢাকা থেকে দোহা যে বিমান যায় বা দোহা থেকে ঢাকায় যে বিমান আসে সেটাকে এক অর্থে লক্কড়-ঝক্কড়ই বলা যায়। লক্কড়-ঝক্কড় বিমানের কাহিনি অবশ্য দোহা থেকে ফ্রাংকফুর্ট গিয়ে বুঝেছিলাম। বিমানের বোয়িং নম্বর লিখে যখন ফেসবুক পোস্ট দিয়েছিলাম তখন দুই বিমান ফ্রিক ছোট ভাই জানালেন ইউ আর লাকি। কী দারুণ একটা বিমানে যাচ্ছেন। আসলেই এত কমফোর্ট এর আগে কোনো বিমানে পাইনি।

দোহা এয়ারপোর্ট বেশ বড়, তবে আচানক একটা আকাশ সমান উঁচু গাবরের মতো টেডিবিয়ার কেনো বসায়া রাখছে বুঝলাম না। দুইপাশে খেজুর গাছ, তার মধ্যে টেডিবিয়ার। তিন ঘণ্টার ট্রানজিট আমার। ইমিগ্রেশন চেকিং পাড়ি দিয়ে প্রথমেই ওয়াশরুমের দরজার সামনে গিয়ে মনে পড়লো হাতে যেন কী নেই, জোব্বা সাইজের জ্যাকেটটা ফেলে এসেছি। আবার দৌঁড়ে চেকিংয়ে আসলাম। আফ্রিকান ইমিগ্রেশন পুলিশ জানতে চাইলো কী রঙের জ্যাকেট। রঙ বললাম। এরপর প্রশ্ন কী আছে পকেটে। মনে ছিল—শুধু বোর্ডিং পাস তাতে ছিল। বললাম। উত্তর মিলে যাওয়ায়, পাসপোর্ট চেক করে ফেরত দিল জ্যাকেট। এবার ফুডকোর্ট খুঁজে বের করলাম। ফুডকোর্টের ডানে বাংলাদেশি বামে বাংলাদেশি। খুব নাগেটস খেতে ইচ্ছা করলো। ওদের কাছে টাকা নেই। ডলারে কিনতে হলো। ৮ ডলারের ম্যাক নাগেটসের পরিমাণ দেখে মনে হলো এটা বিমানেও খাওয়া যাবে। কিছুক্ষণ খেয়ে উঠে পড়লাম, খাবারের ট্রেতে অনেক খাবার পড়ে আছে। এক বাংলাদেশি ক্লিনার ভাইকে অনুরোধ করলাম খাবারগুলো নিয়ে নিতে, উনি বললেন, আমি যেন রেখে যাই। আমার কাছ থেকে নিতে পারবেন না। আমার গন্তব্য ৮ নম্বর গেটের দিকে। খুঁজে বের করতে হবে। দীর্ঘদিন জেদ্দাহ থাকার ফলে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দরে আমি বেশ অভ্যস্ত ছিলাম। দোহা বিমানবন্দরও ছোট না। এইসব বিমানবন্দরের সামনে নিজের দেশের বিমানবন্দরকে গাবতলীর বাস কাউন্টারের চেয়েও ছোট আর নোংরা লাগে। কী যে কুঁকড়ে যাই ভেতরে! কবে যে আমাদের একটা আধুনিক বিমানবন্দর হবে। তবে ফ্রাংকফুর্ট বিমানবন্দর দেখে ভেতরে বেশ কুঁকড়েই গেছিলাম। চারপাশে কাঁচঘেরা একটা গোডাউন বলা চলে। বিমান ল্যান্ড করে টার্মিনাল পর্যন্ত আসতে সময় নিয়েছিল পাক্কা ১৭ মিনিট। চারপাশে ঘন জঙ্গল। আসলে জঙ্গল না, পাইনের বন। সেখানেও নিশ্চয়ই নিরাপত্তা ব্যুহ তৈরি করা আছে। এমন একটা সময় আসলাম যখন এই পাইনের পাতা ঝরাই দেখতে হলো। মনে মনে বেশ আফসোসই লাগছে। এই সবুজ জঙ্গল দেখতে পাব না। যখন আমি এই বিমানবন্দর হয়েই ফিরবো তখনও বেশ ঠাণ্ডা থাকবে। সবুজ হয়ে উঠবে না চারপাশ। অকারণেই বিষণ্ন লাগতে শুরু করলো।

কিন্তু পেটের ক্ষুধা মানে না বিষণ্নতা। বিমানবন্দর আর রেলস্টেশনের মাঝখানের করিডোরে এক ফলের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালাম। অসম্ভব সুন্দরী এক মেয়ে দোকানে সামলাচ্ছে। ক্রেতাদের পণ্য বুঝিয়ে দিচ্ছে, কফি বানাচ্ছে। হটডগ গরম করে দিচ্ছে। আমার দিকে চোখাচোখি হতেই একটা হাসি দিল, দোকানদারকে বোঝাতে সক্ষম হলাম—একটা পানি ও কেটে রাখা ফলের গ্লাস নিতে চাই। টাকা পয়সা মিটিয়ে হাঁটা দেওয়ার সময় খেয়াল করলাম এখন খাওয়া খুব কঠিন। হাতে এত লাগেজ নিয়ে আর যাই করা যাক, খাওয়া যায় না। এদিকে বড় বিমানবন্দরের সবাইকে আমার ড্রাগ পেডলার মনে হয়। মনে হয় এই বুঝি লাগেজে কিছু ঢুকিয়ে দিল। জীবনে প্রথম বিমানে চড়ার সময় সামরিক কর্মকর্তা মামা এই ভয়টা মনের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তাই ব্যাগ সামলানোটাই প্রধান কাজ। পানি খেয়ে ট্রেন স্টেশনের দিকে ছুটলাম। গন্তব্য রাইন নদীর তীরে বন শহর...

//জেডএস//

লাইভ

টপ