ওয়াল্ট হুইটম্যান : আরেক বিদ্রোহী কবি

Send
অমল চক্রবর্তী
প্রকাশিত : ১৪:৫১, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৫, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৯

দুইশ বছরে পা দিলেন ওয়াল্ট হুইটম্যান। অনেক লম্বা সময়, কিন্তু এখনো সজীব, প্রাণবন্ত তরুণ। তিনি আদতে সেই মহৎ কবিদের একজন যিনি শুধুমাত্র কবিই নন, আপন সাধনা ও ধীশক্তির বলে হয়ে উঠেছেন জাতীয় চেতনার প্রতীক। তার কবিতায় আমেরিকার মহান স্বাধীনতার আদর্শ মূর্ত হয়ে উঠেছে। নিজের প্রাণ-প্রাচুর্য, উদ্ভাবনী শৈলী ও জাতীয় মানসিকতাকে তার কবিতায় এতটাই তুলে ধরেছেন যে, তার কবিতা না পড়ে আমেরিকান সাহিত্য আলোচনা বাহুল্য মাত্র। এমিলি ডিকিনসনের পাশাপাশি তিনি আমেরিকার অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে বিবেচিত। ‘লিফস অব গ্রাস’-এর দেড়শতম বার্ষিকীর সূচনায় সাহিত্য সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম লিখেছিলেন, ‘আপনি যদি আমেরিকান হন, তবে ওয়াল্ট হুইটম্যান আপনার মানসিক বাবা এবং মা’।

ওয়াল্ট হুইটম্যানের জন্ম ১৮১৯ সালে নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে। খুব তরুণ বয়স থেকেই তিনি ছিলেন উদ্যমী ও প্রথাবিরোধী, যা তার কবিতায় পুরোপুরি প্রকাশ পেয়েছে। তিনি এমনই একজন রোমান্টিক কবি যিনি নিজের ‘আমিত্ব’ বা ‘অহম’-কে সর্বোচ্চ আবেগ দিয়ে প্রকাশ করেছেন। তার ব্যক্তিক উচ্ছ্বাস ও নিয়ম ভাঙার সচেতন প্রয়াস তাকে অগ্রগণ্য আমেরিকান রোমান্টিক কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

হুইটম্যানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘লিফস অব গ্রাস’ ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত হয়। আমেরিকান মহাকাব্য লেখার উদ্দেশ্যে একে হুইটম্যান সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ভাষা ও শৈলীতে মুক্তছন্দে লিখেছেন। নিজের ব্যক্তিসত্তার শ্রেষ্ঠত্বকে উদযাপন করেছেন প্রমেথিয়ান কিংবদন্তির ভাষায়। এই বোধেই শক্তি ও প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা উচ্চারণে ‘সং অফ মাইসেলফ’ কবিতায় তিনি লেখেন:

আমি একটুও পোষ মানিনি
আমি অনুবাদযোগ্য নই
আমার বন্য ধ্বনি উচ্চারণ করি
পৃথিবীর শিখরে উঠে...

রোমান্টিক কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য ব্যক্তি-অহম চেতনার অনাবিল প্রকাশ। তীব্র অহমবোধ হুইটম্যানের কবিতায় এক ভিন্ন ব্যঞ্জনা এনে দিয়েছে। নিজেকে এমন অকপটভাবে প্রকাশের মধ্য দিয়ে হুইটম্যান ইন্দ্রিয়পরায়ণতা বা ‘sensuality’-কে এক নতুন মাত্রায় প্রকাশ করেছেন।

মতে, পথে ও প্রকাশে হুইটম্যান বিদ্রোহী। তা সে কবিতা লেখার ক্ষেত্রে হোক, আর ব্যক্তিগত জীবনে হোক, কোথাও হুইটম্যান কোনো তন্ত্র-মন্ত্রের ধার ধারেন নি। তার কাছে একমাত্র বিবেচনার বিষয় ছিল মহাপ্রকৃতি। হুইটম্যানের রোমান্টিক সত্তা দেহ ও আত্মার চরম উদ্বোধন ও উদযাপনের পক্ষে। এমনকি কাম সম্পর্কিত কথাবার্তাও তিনি রাখঢাক ছাড়াই বলতেন—ইন্দ্রিয়পরায়ণ ইচ্ছাগুলো যেন অতীন্দ্রিয়কে ধরার চেষ্টা। তিনি নগ্ন স্নান এবং নগ্ন রোদ উপভোগ করতেন। এ ‘সান-বাথড—নেকডনেস’ কবিতায় তিনি নগ্ন স্নান এবং নগ্ন রোদ উপভোগ করেছেন:
এর আগে আমি কখনই প্রকৃতির এত কাছে যাইনি; এর আগে কখনো সে আমার এতো কাছাকাছি আসেনি...প্রকৃতি উলঙ্গ ছিল এবং আমিও ছিলাম...

১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুলের যে দ্রোহ প্রকাশ পেয়েছে তারও অনেক আগে ১৮৫৫ সালে লেখা ‘সং অফ মাইসেলফ’ কবিতায় হুইটম্যান রোমান্টিক আত্মদর্শনের চূড়ান্ত প্রকাশ করেছে এভাবে:

আমি নিজেকে উদযাপন করি এবং নিজেই গান করি,
এবং আমি যা অনুমান করি আপনি তা ধরে নেবেন,
ভালো প্রতিটি পরমাণু আমার হিসেবে আপনার জন্য।...

যে বিষয়টি হুইটম্যানের রোমান্টিক মানসকে আলাদা করেছে তা হল তার অতীন্দ্রিয়বাদ। হুইটম্যান গভীরভাবে সর্বেশ্বরবাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ‘সং অফ মাইসেলফ’-এ হুইটম্যানের রোমান্টিক সত্তা তাকে এক মরমীবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। হুইটম্যানের রোমান্টিক বোধ ও মরমীবাদ দুটোই একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে তার শ্রেষ্ঠ কর্ম ‘লিফস অব গ্রাসের’ ছত্রে ছত্রে। হুইটম্যান ‘সং অব মাইসেলফ’ কবিতায় ব্যক্তিকে চূড়ান্ত সমষ্টির একজন মনে করেন। তিনি লিখেছেন:

সবকিছুর ওপর দিয়ে, মধ্যে দিয়ে ওড়ে,
প্রকৃতি, সময় ও শূন্যতার হৃদয় ফুঁড়ে
যেন সমুদ্র দিয়ে অগ্রসরমান এক জাহাজ
আত্মার ভ্রমণ—
শুধু জীবন নয়, মৃত্যুর—অসংখ্য মৃত্যুর গান গাই...

এই উদ্ধৃতি হুইটম্যানের দর্শনের অনন্য অতীন্দ্রিয়বাদকে তুলে ধরে, যেখানে তিনি একই সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের গান গাইলেও আসলে তা ইন্দ্রিয়াতীত।

হুইটম্যানের বিদ্রোহী চেতনায় ‘আমি’ শব্দটি বার বার ঘুরে ঘুরে আসে। এই কবিতায় আমি ‘এক সর্বশক্তিশালী সত্তা’ যা ব্যক্তি-চেতনার ঊর্ধ্বে। তিনি যে শুধু একজন ব্যক্তি নয় বরং সকলের, তা বুঝতে পারি যখন তিনি লেখেন:
‘আমি মুমূর্ষুর সাথে মৃত্যুবরণ করি আর নবজাতকের সাথে জন্মি’(সপ্তম অংশ)
আর কবিতার প্রথম অংশে তো বলেই দিয়েছেন:
‘আমার সকল অনু-পরমাণু তোমাতেও বিরাজমান’
কবিতার শেষে ৫১ নং অংশে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন ‘আমি বিশাল; আমি অসীম অসংখ্যের’।
একইসঙ্গে এই বোধ হুইটম্যানের রোমান্টিক চেতনা ও গণতান্ত্রিক বোধের নমুনা। আমেরিকান সাহিত্যে এই দুটোই তিনি দেখতে চেয়েছেন।

হুইটম্যানের রোমান্টিক সত্তায় জাতীয়তাবোধ উচ্চকিত। এজরা পাউন্ডের ভাষায়: ‘ওয়াল্ট হুইটম্যানই আমেরিকা’। তার ‘সং অফ মাইসেলফ’ কবিতায় আমেরিকার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য সমুন্নত।
তিনি লেখেন:
আমি আমেরিকার গান শুনি, আনন্দের গান শুনি,
শ্রমিকেরা, প্রত্যেকে আনন্দের গান গায়,
ছুতার তার তক্তা মাপতে মাপতে গান গায়,
রাজমিস্ত্রি...
এখানে সকল শ্রেণির আমেরিকানদের উল্লেখের মাধ্যমে হুইটম্যান গণতন্ত্রকে উদযাপন করেছেন। হয়তো এই প্রসঙ্গে প্রেমেন্দ্র মিত্রের কথা বলা যায়, যিনি লিখেছেন:
‘আমি কবি যত কামারের আর কাঁসারির আর ছুতোরের/ মুটে মজুরের/ আমি কবি যত ইতরের!’
হুইটম্যান চেয়েছেন এমন ভাষায় লিখতে যা হবে ‘ঘাসের মতো সহজ’। একারণেই তার কবিতার ভাষা ও শৈলী আমজনতার কাছে পৌঁছাতে পেরেছে। এটি তার গণতান্ত্রিক মানসের পরিচায়ক।
তবুও মনে রাখা ভালো, হুইটম্যান যতই গণতান্ত্রিক হোন, শেষ পর্যন্ত তিনি কিন্তু নিজের ব্যক্তিসত্তাকে তার কবিতায় প্রধানভাবে প্রতিধ্বনিত করছেন। ‘Are you the new person drawn toward me?’ কবিতায় তিনি বলেছেন:
আমার প্রতি কি তুমি আকৃষ্ট নতুন মানব?
আগেই বলে দেই হে! আমি কিন্তু একেবারেই আলাদা!...

হুইটম্যানের বিদ্রোহী চেতনার সঙ্গে এখানে নজরুল মানসের তুলনা করা যায়। হুইটম্যানের মতো নজরুল তার কবিতায় বুনোভাবে নিজেকে মেলে ধরেছেন। বিশেষ করে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নজরুলের আত্ম-উদ্বোধনের সার যেখানে তিনি ‘আমি’ বা রোমান্টিক সত্তাকে বিবেচনা করেছেন। কিন্তু নজরুলের ‘আমি’ কখনোই সমষ্টির কাছে সমর্পিত না। নজরুলের স্বকীয়তাবোধ স্পষ্ট। একই ধরনের:

‘আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ’

নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা প্রচণ্ড গতিশীল ও বন্ধনহীন। আধুনিক মানুষের চরম আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আবহমান মানুষের জীবন-সংগ্রামকে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নজরুল ব্যক্তিকে প্রমিথিউসের উচ্চতায় নিয়ে গেছেন—অস্তিত্ববাদী দর্শনের সার তিনি ধারণ করেছেন আপন মানসলোকে। তাকে খুঁজে পাই তীব্র জীবনবাদী দ্রোহী হিসেবে, যখন তিনি লেখেন:

আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,
আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!

হুইটম্যানের রোমান্টিক মানসের সঙ্গে বিদ্রোহী কবির মানসের মিল অবশ্যই চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এই দুই মহান কবির পার্থক্যও চোখে পড়ে। ওয়াল্ট হুইটম্যান ব্যক্তি মানসের সঙ্গে বৃহত্তর প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক জগতের সংযোগ স্থাপন করতে চেয়েছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুল আত্ম-স্বাধীনতা উদ্বোধনের গান গেয়েছেন। নজরুলের কবিতায় ব্যক্তিসত্তার চরম উদযাপন কবির সার্বভৌমত্বের প্রতিভূ। তাই এটা মোটেই সঙ্গত নয় যে, ‘বিদ্রোহী’ কবিতা হুইটম্যান দ্বারা সর্বাংশে প্রভাবিত। বরং হুইটম্যান যেখানে হিন্দু উপনিষদের সর্ব-অস্তিত্ববাদের আধিভৌতিক জগতে সমর্পিত, নজরুলের অহমবোধ সেখান থেকেও আরো বহুদূরে ধাবমান:

মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত...
অর্থাৎ মানবতার চরমমুক্তিই একমাত্র আকাঙ্ক্ষিত পূর্বশর্ত। এই বিবেচনায় নজরুলীয় সত্তা আরো বেশি আপোষহীন। হুইটম্যানের রোমান্টিক মানস উপনিষদের ধোঁয়াশায় যেখানে আবর্তিত; নজরুলের দ্রোহ সেখানে আপোষহীন ও সুস্পষ্ট।

দুইশ বছর পূর্তিতে ওয়াল্ট হুইটম্যান আবার পাঠকের কাছে নতুনভাবে আবির্ভুত হচ্ছেন তার অদ্বিতীয় কাব্যশৈলী, সাহসী শব্দ-চয়ন, আধুনিক মানসিকতা, ইন্দ্রিয়পরায়ণতা, রোমান্টিক চেতনা ও অতীন্দ্রিয়বাদের জন্য। মাত্র একটি কবিতা দিয়ে যদি আমেরিকাকে চিনতে হয়, তবে সেটি অবশ্যই ‘সং অফ মাইসেলফ’। ঠিক যেমন ‘বিদ্রোহী’ কবিতা দিয়ে এক নতুন যুগ শুরু হয় বাংলা কবিতায়। নজরুলের ‘দুর্বিনীত আমি’ সাগরপাড়ের কবি হুইটম্যানের কাছে ‘একটুও পোষ না মানা আমি’ রোমান্টিক দ্রোহের চরম প্রকাশ। দুইশ বছর পরেও হুইটম্যান আমাদের চেতনায় চির বিদ্রোহী, চির নতুন।

//জেডএস//

লাইভ

টপ