behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

জ্যামাইকা থেকে মিনেসোটা হয়ে আমার নিজের কাছে

মার্লন জেমস১২:১৯, নভেম্বর ০৩, ২০১৫


2আমি জানতাম, আমাকে নিজের দেশ ছাড়তেই হবে— হয় বিমানে, নয়তো কফিনে।

জ্যামাইকার লেখক মার্লন জেমস এ বছর তাঁর ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব সেভেন কিলিংস’ উপন্যাসের জন্য ম্যান বুকার পুরস্কার পেয়েছেন। ৪৪ বছর বয়সী মার্লন ম্যান বুকার পুরস্কার প্রদানের ৪৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম জ্যমাইকান লেখক। তাঁর আত্মজৈবনিক এই লেখাটি অনুবাদ করেছেন ফাহমিদা দ্যুতি।’’ 

 

শহরে নিজের রুমে থাকার উদ্দেশে বাবা মায়ের পোর্টমোরের বাসা ছেড়ে এলাম। পোর্টমোর হলো কিংসটনের বাইরের উপশহর। আমার থাকার জায়গাটা এক বেডরুমের স্টুডিও, বড় জোর ছয়শো বর্গফুট; মেঝেতে হলুদ রঙের পশমের কার্পেটিং, সামনে জেলখানায় ব্যবহৃত শিকের মতো মোটা শিক দিয়ে ঘেরা একটা চত্বর। আমার বেডরুমের জানালা দিয়ে আরেকজনের বেডরুম দেখা যায়; মাথার ওপরের ছাদ হাত দিয়ে ছোঁয়া যায়। দুটো তালা ব্যবহার করে আশপাশের মানুষজন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতাম।  
সাত বছর কলেজের বাইরে থাকার কারণে আটাশ বছর বয়সে আমার দৃঢ় ধারণা জন্মে গিয়েছিল, আমার কণ্ঠই আমাকে বের করে দিয়েছে, ক্লান্তিকর মনে করে আমি অপরিচিত লোকদের সঙ্গে কথা বলাই বাদ দিয়ে দিলাম। নীরবতা আমার মানসিকতার ওপরে বেশ স্পষ্ট ছাপ ফেলে গেল: আমার পুরো শারীরিক অবয়ব একটা আলস্যের গর্তের মধ্যে পড়ে গেল; আমি যেন আশ্রয় নিলাম বাঁকানো সিন্দুকের মধ্যে যাতে সে সময়ের সকল প্রভাবকে হজম করে ফেলতে পারি। দীর্ঘ সাত বছর কাটিয়েছি ছেলেদের স্কুলে। দুহাজার ছেলের সবাই একই রকম খাকি পোশাক পরে মারমুখো ভঙ্গিতে এদিক ওদিক চলাফেরা করছে, সদম্ভে লাঞ্চরুমে, ক্লাসরুমে, পোশাক বদলানোর রুমে ঢুকে যাচ্ছে সবাই; যারা এমন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারে না তাদের ধরার জন্যও তাদের সবার চেষ্টা অব্যাহত। আমার দিকে কেউ এগিয়ে এলে মুখে খিস্তি ঝেড়ে, বন্ধ ঠোটের নিচে দাঁতে দাঁত চেপে আমার দুর্বল কব্জি ভাঁজ করে গা বাঁচানো দূরত্বে অবস্থান করে নিজের সুরক্ষা বজায় রাখতাম। সব পরিস্থিতিতে শান্ত থেকে কুল পয়েন্ট অর্জনের লক্ষ্যে স্কুলে আমি পেন্টহাউসের একটা কপি নিয়ে যেতাম। তার জন্য ছেলেরা অনেকে আমাকে সপ্তাহের পাঁচ দিনের প্রতিদিনই ‘নিতম্বী পোলা’ বলে খেপানোর চেষ্টা করত। আমার বড় ভাই স্বভাবে চুপচাপ ছিলেন। তাকে বাঁচানোর জন্য তার সাথে এমনভাবে আচরণ করতাম যেন আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। বাড়িতে আমি ডিকেন্সের লন্ডন, হাকফিনের মিসিসিপি নদী আর প্রফেসর জেভিয়ারের মেধাবী তরুণদের স্কুল নিয়ে ডুবে থাকতাম। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি না ফিরে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কয়েক মাইল পাড় হয়ে চলে গেলাম কিংসটন বন্দর পর্যন্ত। বন্দরের একেবারে পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে ঠিক করলাম পরের বার এলে আরো বহুদূর হেঁটে চলে যাব।

1 

মার্লন জেমস

 

ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্ববিদ্যালয় আমার জন্য ছিল একটা বিশাল খোলা দরজা। আমি ওখানে কয়েকজন বন্ধু পেয়েছিলাম। মনে হয় ওরা আমার জন্য অপেক্ষায় ছিল। কখনও স্পিনের একটা পুরনো সংখ্যা হাতে নিয়ে লাইব্রেরিতে ঢুকলাম। এক বন্ধু জিজ্ঞেস করল, স্পিনের যে সংখ্যাটা টম ওয়েটসকে নিয়ে করা হয়েছিল আমার হাতেরটা সেই সংখ্যা কি না। পরিচিতদের মধ্যে এমনও কেউ কেউ ছিল যারা চালচলনে বেশি চটপটে নয়, কেউ কেউ ছিল চোখা কথা দিয়ে খোঁচা মারায় ওস্তাদ; কেউ কেউ আশির দশকের রক এবং সিনেমা সম্পর্কে বেশ ভালো ওয়াকিবহাল। ‘স্মিথ’ কিংবা ‘দ্য র‌্যাথ অব খান’ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিল তাদের। তবে আগে এরা আমার বন্ধু ছিল না। তাদের সঙ্গে মাঝে মধ্যে তর্কযুদ্ধও লেগে যেত। কারণ হয়তো কেউ একজন বলে বসল, ‘টাইম বান্ডিটস’ সর্ব কালের সেরা সিনেমা। কিন্তু অন্য সবাই জানে ‘লাইফ অব ব্রায়ান’ হলো সেরা। আমাদের মধ্যে সস্তা পানীয়, পটেটো চিপস, পরিহাসমূলক বুদ্ধিদীপ্ত সরস মন্তব্য এমনকি মিশেল টেপও চলত। তবে কলেজ শেষ হওয়ার সঙ্গে বাড়ি ফিরে আসি। বিজ্ঞাপনের একটা কাজ পেয়ে যাই। এরপর আবার নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে যাই। আবার ফিরে গিয়ে দেখতে পাই বন্ধুবান্ধবরা আমার জন্য অপেক্ষায়ই আছে।
অফিসে আমার কিউবিকলে ঢোকার পথে এক বসকে পার হয়ে ঢুকতে হতো। বিভিন্ন বিষয়ে লোকটার আগ্রহের অন্ত নেই। জিজ্ঞেস করতেন, আমার ম্যাগাজিনগুলোতে সব পুরুষ মানুষের ছবি কেন, জিকিউ মানে কী, প্লেবয় কোথায়— ইত্যাদি। অফিসে সব পুরুষের বগলদাবা ছিল একজন করে নারী। বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত তাতে কোনো হেরফের নেই। এক নারীতে সন্তুষ্ট যারা তাদের সমকামী মনে করা হতো। দুঃস্বপ্নের মতো ছেলেবেলার স্মৃতিগুলো ফিরে আসতে লাগল। আবার স্কুল বালকের বয়সে ফিরে এলাম। প্রতি রাতে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলাম, আমি যেন সকালবেলা ঘুম থেকে জাগার সময় আরেক অবয়ব নিয়ে উঠি যার হাঁটা এবং কথাবার্তা শুনে কেউ প্রশ্ন করার সাহস না পায়। বয়সটা তো এমন নয় যে, বাড়ির আশেপাশে আট বছরের একজনের সাথে নয় বছরের আমি ফূর্তি খেলে বেড়াব।
একদিন একটা বইয়ের দোকান থেকে হারমান হেসের ‘স্টেপেনউলফ’ কিনে নিয়ে এলাম। বইটার প্রথম দিকের একটা জায়গা থেকে অদম্য এবং খণ্ডনহীন এক আত্মহত্যা প্রবণতা যেন লাফ দিয়ে বের হয়ে এসে আমার ঘাড় মটকে ধরল। বইটার ওই জায়গাটাতে প্রধান চরিত্র যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে সে আত্মহত্যা করবে, দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলে তখন বুঝতে পারে সে সবকিছুই মানিয়ে নিতে পারছে, সবকিছু সহ্য করতে পারছে। সবকিছুর মধ্য দিয়েই তার ভোগান্তি চলতে থাকে; কারণ সে জেনে ফেলেছে কখন সে এ জীবন থেকে বিদায় নেবে। ষোল বছর বয়সের পর থেকে কখনও আত্মহত্যা করার চিন্তা আসেনি আমার। কিন্তু ওই বইটা পড়ার পর থেকে মাঝে মধ্যে ঘুম থেকে কেঁদে জেগে উঠতে লাগলাম। কখনও কখনও দেখতে লাগলাম, আমি জেলখানার শিকের মতো মোটা শিক দিয়ে ঘিরে রাখা চত্বরটাতে গিয়ে বসে আছি। ঘুম থেকে ওখানে কীভাবে উঠে গেলাম মনে নেই। ভেলভেট আন্ডারগ্রাউন্ডের ‘আমি একটা কারণ পেয়েছি’ গানটি বার বার শুনতে লাগলাম। ‘আমার আছে দৃঢ় বিশ্বাস/ যদি কিছুই ভালো না লাগে নিও না নিঃশ্বাস’।  যে দুঃখ আমার নেই সে দুঃখের জন্যও কাঁদতাম।
আমার বয়স তখন মাত্র আটাশ। অথচ আমি নিজের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছি। কথাটার মধ্যে বৈদ্যুতিক আবহ আছে। আমি প্রথম শুনেছিলাম কিংসটনের একটা গির্জার পাদ্রীর নসিহতের সময়। তিনি বলেছিলেন, তুমি যখন নিজের জ্ঞানের সীমার শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাও তখন তোমার যে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য একজনই থাকেন; তিনি হলেন ঈশ্বর। অফিসে আমার এক নতুন বন্ধু আমার ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়। সে স্কুলে পড়াশোনা করেছে কানাডায়। আমার কথাবার্তা শুনে সে প্রতিরক্ষার কৌশল হিসেবে আমাকে একদিন বলল, এই রবিবার তোমার গির্জায় আসা উচিত। ততদিনে আমার মনের ওপর আতঙ্কের আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। আমি এক চিকিৎসকের কাছে গিয়েছি। তাকে জিজ্ঞেস করেছি, আমি কি স্বাভাবিক আছি? তিনি কৌশলে বললেন, স্বাভাবিকতা হলো একটা মাপকাঠির মতো অবস্থা; এরকম অবস্থায় বাম পাশ স্বাভাবিক থাকে; ডানপাশ অস্বাভাবিক থাকে। আমার অবস্থা হলো বাম পাশটা মাঝামাঝি অবস্থায় আছে। তিনি আমাকে জানাক্স ট্যাবলেট সেবনের উপদেশ দিলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন আমি প্রোজাক চাই কি না। আমি বরং সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম।  
সে গির্জার জমায়েতকে বলা হতো হাততালির জমায়েত, মানে বোঝানো হতো এখানে ঐশ্বরিক ব্যাপার-স্যাপার আছে। তবে সে জমায়েতে থাকত উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকেরা। আর শান্ত স্বভাবের যাজক সাহেব স্পোর্টসের গাড়ি চলাতেন। এক বুধবার রাতে যাজক সাহেব আমাদের বলছিলেন, ঈশ্বরের আশীর্বাদ পাঁচ মাইল উজানে; কাজেই আমাদের ইনকের মতো ঈশ্বরের জন্য অপেক্ষা করা উচিত। আমি তখন বাইবেলের চামড়ায় বাধানো খাপের আড়ালে সালমান রুশদির ‘শেইম’ পড়ছিলাম। আগে এরকম বই কখনও পড়িনি। বইটা ছিল টিউলিপের মধ্যে হাতবোমার মতো। তাঁর গদ্যভঙ্গি মারাত্বক দুঃসাহসী। বইটার বাস্তবতা এমন সোজাভাবে তুলে ধরা হয়েছে, প্রথমে বোঝার উপায় নেই, এখানে রাজনীতি কত তীক্ষ্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, কতটা ভয়াবহ বাস্তবতা লুকিয়ে আছে এখানে। বইটা পড়ে আমি বুঝতে পারলাম, বর্তমান সময়কে নিয়ে আমি আমার মতো করে লিখতে পারি। তারপর কলেজ জীবনের পরে আবার লেখা শুরু করলাম। তবে কী লিখছি গোপন রাখলাম। কারণ আমার লেখা পবিত্র কোনো বিষয় নিয়ে নয়। গির্জায় আমার অবস্থান প্রায় নয় বছরের। একবার এক নারীর সঙ্গে ডেট করার চেষ্টা করছিলাম; তাকে বুঝিয়ে বললাম, সম্পর্কের ব্যাপারে আমার আগ্রহ না থাকার কারণ হলো আমার যিশু-প্রীতি। ৩৪ বছর বয়সে ২০০৫ সালে আমার প্রথম উপন্যাস ‘জন ক্রোস ডেভিল’ প্রকাশ করলাম। যুক্তরাষ্ট্রে বই সম্পর্কে প্রচারে যাওয়ার গোটা সময় ধরেই লিখতে থাকলাম।

alauddin al azad.. 

অলঙ্করণ : সঞ্জয় দে রিপন

ছয় নম্বর ট্রেন থেকে স্প্রিং স্ট্রিটে নামলাম। কালো কমব্যাট বুট পরে হাঁটার সময় নাচার মতো এক ধরণের দোলা লাগে। এরকম ‘নাচার মতো দোলা লাগা’ কথাটা সত্যিই প্রায় বিশ বছর আগের পুরনো; তবে আমি নিজের জন্য ব্যবহার করলাম, কারণ ওই সময়ে আমার এরকম বুটের খুব দরকার ছিল। লেভি’র অফেন্ডার জিন্স ত্বকের সঙ্গে লেগে আমার পাকে যেন হাড্ডিহীন করে ফেলেছে; ওপরের দিকে নিতম্ব পর্যন্ত চাপা, কোমরে আঁটো, তবে হাঁটুর নিচ থেকে বুট পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া। ব্লু স্টেরিও ল্যাবের টি-শার্ট বেল্টের ওপরে এসেই থেমে গেছে; সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে চোখ বাঁচানোর জন্য পরেছিলাম কেলভিন ক্লিন শেড। জিনিসটা অবশ্য সস্তায় কিনেছিলাম সেনচুরি ২১ থেকে। সাবওয়ের বাইরে পা রেখে বেকার বসে থাকা অবস্থা থেকে প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো করে উঠে দুহাত শক্তভাবে আড়াআড়ি করে বাফেলো স্টান্সে বিস্ময়সূচক চিহ্নের মতো দাঁড়াই। স্প্রিং স্ট্রিটে যেখানে ব্রডওয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেদিকে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাই। শুনেছিলাম আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে যৌনাবেদনময়ী স্থান এটা। এখানে মডেলিং এজেন্সির কর্তারা ওস্তাদি চোখে হবু মডেলদের ময়ুরের মতো দর্পভরা পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করেন।  
আমার জন্য অপরিচিতির সুবিধা ছিল; অপরিচিতির সমুদ্রে ইচ্ছে করলেই ডুবে থাকা যেত। স্টোনওয়াল নামের ক্লাবটাতে কোনো দিন যাইনি। ভেতরে ঢোকার মতো মানসিকতা থেকে বছর বছর দূরে ছিল আমার অবস্থান। তাছাড়া ওখানে যাওয়ার মতো আমার কোনো বন্ধুও ছিল না। দোকানের উইন্ডোতে দেখা কোনো ব্যক্তি হয়তো কখনও আমাকে অতর্কিতে ধরার মতো কিছু কিনতে সেধেছে। দ্য স্ট্র্যান্ড বুক স্টোর, টাওয়ার রেকর্ডস, আদার মিউজিক, শেক্সপিয়ার অ্যান্ড কোম্পানি— এগুলো সবই আমার অন্য দেশে ফেলে আসা ব্যক্তিত্বের কাছে মাত্র কয়েক কদম দূরে।
সন্ধ্যা নেমে আসছে। অবশ্য গ্রীষ্মকালে দিন অনেক লম্বা হয়ে থাকে। তবু আমাকে ব্রঙ্কসে ফিরে যেতে হবে। আমার সৎ ছোটভাই আর ওর মা থাকেন ওখানে। ওদের আশপাশে অনেক জ্যামাইকান অভিবাসী। হাঁটতে হাঁটতে আমি ইউনিয়ন স্কয়ারের বার্নেস অ্যান্ড নোবলে পৌঁছে যাই। ওখানে বাথরুমে ঢুকে ‘বিশেষ প্রয়োজনের’ টয়লেটে ঢুকে দরজা বন্ধ করি। এই একই স্টলে আমি সাত ঘণ্টা আগেও ঢুকেছিলাম। ব্যাগের ভেতর থেকে সাধারণ পোশাক সব বের করে গা থেকে নিউ ইয়র্কের টাইট পোশাক খুলে ফেলি। আবার ফিরে যাই ঢোলা টি-শার্ট, ঢোলা জিন্সে। পায়ে কাপড়ের জুতা; আর বুট ঢুকিয়ে ফেললাম ব্যাগের মধ্যে। পাঁচ নম্বর ট্রেন ধরে ব্রঙ্কেসে ফিরে যাই।
ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে পড়ানোর সময় বলি, চরিত্ররা আমাদের প্রয়োজনেই উঠে আসে। এখন, নিউ ইয়র্কে যে ব্যক্তিকে তৈরি করেছি সেটাই আমি হতে চেয়েছিলাম। পরের দুবছরে আমি এসেছি এবং শিক্ষার্থী ভিসার মেয়াদ ঠেলে মাঝে মধ্যে চলেও গেছি। বন্ধুবান্ধবও পেয়েছি। তবে এমন নিকটে পৌঁছিনি যাতে তারা আমাকে গভীর কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারে। যখন সত্যিকারের গুটিয়ে থাকার মানসিকতা তৈরি হয়েছে সবার থেকে দূরত্বে থাকার ভান করেছি। সমকামী বারগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে গেছি, ফিরে এসেছি; কিন্তু কখনও প্রবেশ করিনি। বাড়ি ফিরে আবার গির্জার আশ্রয় নিয়েছি, অবশ্য জানতাম আমি আর আগের মতো নেই। একবার কোড সুইচ টিপতে ভুল করে জে এফ কে-র বাথরুমে ধাক্কা খেয়েছিলাম। তখন কিংসটনে ফিরছিলাম। আমার বিমান ছাড়তে মাত্র কয়েক মিনিট বাকি ছিল। বাথরুমে ঢুকেছিলাম স্কিনি জিন্স আর হুপ এয়াররিং খুলে রাখার জন্য। আত্মহনন মানসিকতায় আক্রান্ত হয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছনোর আট বছর পরে আমি যেন ধার করা সময়ের মধ্যে ছিলাম। আমি নিশ্চিত জানতাম, আমাকে জ্যামাইকা ছাড়তেই হবে— হয় বিমানে, নয়তো কফিনে।
তারপর মিনেসোটার সেইন্ট পলের ম্যাকালেস্টার কলেজ থেকে ডাক এল। আমার দরখাস্ত, জীবনবৃত্তান্ত এবং আমার প্রথম উপন্যাস কর্তৃপক্ষের পছন্দ হয় এবং আমার সাক্ষাৎকার নিতে চান তারা। মিনেসোটা সম্পর্কে আমার যাবতীয় জ্ঞান বলতে যা ছিল সেটা পেয়েছিলাম প্রিন্সের চলচ্চিত্র ‘পার্পল রেইন’ থেকে। যাদের কাছেই মিনেসোটা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি সবাই বলেছে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ওখানে। সাক্ষাৎকারে উপস্থিত হওয়ার জন্য জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে যাই। কাজ শেষে আবার জ্যামাইকায় ফিরে আসি। অপেক্ষা করতে থাকি, চেষ্টা করি যেন হতাশায় না পড়ি। মার্চ মাসে ম্যাকালেস্টার থেকে ই-মেইল আসে: এক বছরের চুক্তি হয়; তবে ফুল টাইম। আমার যাবতীয় জীবন, মানে বইপত্র গুছিয়ে নিই। এক বছরের চুক্তি হলেও জানতাম, আর ফিরব না। যাওয়ার সময় পিছুটানের কোনো আবেগ অনুভব করিনি। পৌঁছে কাজে যোগ দেয়ার আগে মিনেসোটার কিছুই দেখিনি।
ওখানে আমার থাকার শূন্য রুম দেখে হতাশ হলাম। শূন্য মানে কয়েকটা চেয়ার আর বসা বা শোয়া যায় এমন একটা আসন। টার্গেট থেকে একটা এয়ারবেড কিনে আনলাম। দিন সাতেক ভেতরে থেকে দৌড়ানোর জুতো পরলাম। ডাউনটাউন মিনিয়াপোলিসের দিগন্ত রেখার মতো সুন্দর একটা জিনিস না দেখা পর্যন্ত দৌড়তেই থাকলাম। লোকে কোন কাজে কী ভাববে এমন চিন্তা আমার ছিল। হেঁটে যাওয়ার সময় সবাই হাই হ্যালো বলছে এমন চিত্রের ‘মিনেসোটা নাইস’ খ্যাত জায়গাটা সম্পর্কে আমার সন্দেহ ছিল। কিন্তু প্রথম সপ্তাহের শেষেই দেখতে পেলাম, আমার সাথে শুধু দেখা হয়েছিল— এই পরিচয়েই ঘোরার জন্য একজন তার সাইকেল দিয়ে দিলেন; আরেকজন আমার জন্য কফির মগ কিনে আনলেন। আরেক প্রফেসর ক্যাসি, তিনিও এখানে পড়াতে এসেছেন, মাই ব্লাডি ভ্যালেন্টাইন এবং প্রজেক্ট রানওয়েতে ছিলেন। ছত্রিশ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে গেল। স্কুল হাউসিং থেকে এক বছরের আগেই আমার নিজের প্রথম অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবস্থা হয়ে গেলে। ওঠার দিনই আমার প্রতিবেশি অ্যালেক্স এসে দরজায় নক করল, আরে ভাই, এস না আমাদের সাথে; স্মোকিং বোউল চলবে না? তার সাথে পেছনে এসে ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে ছিল অ্যালেক্সের বন্ধু। তার নাম জনজন। এই দুজন সুদর্শন ছেলে আমাকে জীবনের সন্ধান দিতে তাদের বন্ধু বানিয়ে নিল আমাকে। বেশিরভাগ সময়ে ওরা আমাকে আমাদের রাস্তার মাথায় অবস্থিত আইরিশ বারে নিয়ে যেত, একটুখানি নেশাটেশা করানোর জন্য।  

ropreston_1430323847_MarlonJAMES101914
 মার্লন জেমস

দুএকবার সমকামীদের পানশালায় পা রাখা মাত্র ভয়ংকর নির্যাতন বিভ্রান্তি নিয়ে বের হয়ে এসেছি। গে প্রাইড উইকে একবার অ্যালেক্স আর জনজন আমাকে জোর করে টেনে নিয়ে যায় ক্যাম্প নামের একটা পানশালায়। চারপাশটা ডিস্কো বল আর অক্টোপাসের শুঁড় দিয়ে সাজানো। অ্যালেক্স সেদিন কাউবয় সেজেছিল। আর জনজন সেজেছিল ‘সাটারডে নাইট ফেভার’-এর ট্রাভোল্টা। আমার চেহারাও অনেকটা কাউবয়ের মতোই হয়েছিল: ওয়েস্টার্ন শার্ট, গেঞ্জি আর বুটকাট জিন্স পরেছিলাম। ওখানে কী হয় না হয় আমার তেমন কোনো ধারণা ছিল না। ওদের দুজনেরও ছিল না। আমরা শুধু পান করেই গেলাম।
তিন বছর পরে আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী ইনগ্রিদ জ্যামাইকা থেকে আমার কাছে বেড়াতে এল। রুমে ঢুকে আমার দেয়ালের দিকে তাকাল সে: ছবি আর পোস্টারে ঢাকা, বইয়ের স্তুপ ছাদ ছুঁয়েছে। চারটা ভিনাইলের তাক। জিকিউ, বুক ফোরাম আর আউট ম্যাগাজিনের কপি এখানে ওখানে ছড়ানো। এরপর ইনগ্রিদ আমার টি-শার্টের দিকে তাকাল: শার্টে লেখা ‘সিমিলি ইজ লাইক মেটাফর’। তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, এই হলে তুমি, বাবু সাহেব। আমি আগে কখনও তোমাকে তোমার মতো অবস্থায় দেখিনি। আমি নিজেও টের পাইনি কখন কীভাবে আমার মধ্যে সত্যি সত্যি এসব ঘটেছে, আমি ভান করা ছেড়ে দিয়েছি। নিউ ইয়র্কের পোশাক পরে আমি ক্লাসে গিয়েছি, রাস্তায় বের হয়েছি, ক্লাবে গিয়েছি। আমার জিন্সের নয় ইঞ্চি রাইজ দেখে কারো মাথা ব্যথা হয়নি; অন্ধকারে আমি আর নিজের কাঁধের ওপর দিয়ে পিছু তাকাইনি।  

 

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune
টপ