behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

প্রতিশোধ

এসএম লুৎফর রহমান১৪:৪৪, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৬

সেরা দশ গল্প

সন্ধ্যাবাতি তখন কেবল লাগতে শুরু করছে।  তিতাসের পলি ধোয়া চরের উপরে ছোট ছোট ঢিবির উপরের বাড়ি ঘর গুলো যেন এক একটা নৌকার মতন। দূর হতে দেখলে মনে হয় বর্ষাকালে পোয়াতি নদীর মাঝখানে নৌকার গলুইয়ের মাথায় কেউ টিম টিমা বাতি জ্বালাইয়া কারো জন্যে অপেক্ষা করতেছে। চান্দিনা গ্রামের এইটাই বর্ষাকালের চিত্র। এবার বর্ষা দেরিতে হইলেও পানি নামতে শুরু করছে। বাড়ির নিচে লাগোয়া জমিগুলো হতে পানি প্রায় নাইমা গেছে। কোন কোন ক্ষেতের পানি নামি নামি করতেছে।

রোকেয়া রান্নাঘর হইতে কুপি বাতি হাতে নিয়া রশি ঘরে ঢুইকা গেলো। পৈডার মধ্যে কুপি রাইখতেই মনের মইধ্যে একটা অনুভূতি খেইলা গেল। তার মনে হইলো উঠানের কোনাকুনি কেউ একজন হাইটা যাইতেছে। পায়ের কদমের কোন শব্দ নাই কিন্ত এ পদ পতনের ছন্দ, অদৃশ্য পায়ের অশ্রুত শব্দগুলা রোকেয়ার বেশ পরিচিত। যতটা কানে বাজ তার চাইতে অনেক বেশি আপন হইয়া বুকের মাঝখানে বাজে। তবুও ডাক ছাড়ে কেডা যায়?

ছায়ামূর্তি থমকাইয়া দাড়ায়। কোন উত্তর না দিয়া আবার হাঁটতে শুরু করে। এক ঝটকায় ঘরের পৈডা থাইকা ঘরের দরজা ছাড়াইয়া উঠানের মাঝামাঝি চইলা আসে রোকেয়া। ছায়ামুর্তি ততক্ষনে উঠানের মাঝখান ছাড়াইয়া পুর্ব দক্ষিন কোনাকুনি বাড়ির ঘাডার সামনের মেড্ডা গাছ ধইরা নামার প্রস্তুতি নিতেছে। পিছন থাইকা রোকেয়া ডাকে মাসুক।

নামতে গিয়াও থমকাইয়া দাড়ায় মাসুক। কোন উত্তর করেনা। রোকেয়া আবারোও ডাকে মাসুক। মাসুক এবার নামার বদলে উইঠা আসে। রোকেয়া এইবার সামনে গিয়া দাড়ায়। ঘর থাইকা রোকেয়ার মায়ের ডাক আসে- রোকি।

রোকেয়া মাসুকের মুখের দিকে তাকাইয়া মায়ের ডাকের জবাব দেয়-আইতাছি মা।

তার মা ততক্ষণ নামাজের পাটিতে ছিল। নামাজের দাড়াইয়া শুনছে রোকেয়া মাসুকরে ডাকতে ডাকতে ঘর থাইকা বাহির হইছে। তবুও সালাম ফিরায়া রোকিরে ডাকে। জিগায়-কিরে? কার লগে কথা কস?

রোকি তার নাম বলেনা। রোকির মা বুঝতে পারে,  পুনরায় আর কোনও কথা বলেনা। রোকেয়া এইবার মাসুকের মুখামুখি। আবছা আলোতে একে অন্যের মুখ দেখা যাইতেছেনা। কিন্তু এরা এক আরেকজনরে চিনতে বেশুমার আলোর দরকার হয়না।

কি কবি ক-

তুমি আমার কাছ থেইকা পলাইয়া থাহো ক্যন?

পলাইয়া থাহিনা। আব্বা আর বড় ভাই..............

ভাইয়ের কতা কও ক্যন? তুমার নিজের কতা নাই।

আছে। আমি ঢাহাতে চাকরি পাইছি। পরশু দিন ঢাহা যামুগা।

হেরপর............. আমার কি অইবো?

আমি জানিনা

জানিনা কইলে তো অইবোনা। তোমার তো জাননই লাগব।

তুই কি কইতে চাস?

কি কইতে চাই এইডা কি আবার বুঝাইয়া কওন লাগব?

আমি বি এ পাস দিসি। ঢাহাতে চাকরি পাইছি। তুই কোনও পড়ালেহা করস নাই। এখন সমাজের টানের লগেতো টানাটানি দিয়া পারতাছিনা।

ভালই কইসো। তুমি বি এ পাশ দিসো। শহরে যাইবা। তুমার সমাজ বদলায়া গেছে। তুমি জাতে উঠছ। আমি রোকি লাইঠালের ঝি থাইকা কামলা হইছি। এইগুলা বাইরের ছুরত চিহ্ন। কিন্তু...............

চোখে ছল ছল কইরা উঠে রোকেয়ার। আন্ধারে এইসবের কিছু চোখে পড়েনা মাসুকের। তার কান বন্ধ দৃষ্টি অন্ধ হইয়া গেছে। সে এখন শহরের আলোর ঝলমল আলোতে কল্পনার জাল বুনায়। রোকেয়ার কাঁপা কাঁপা কণ্ঠ তার হৃদয় পর্যন্ত যায়না। তবুও কথা কইতে থাকে রোকেয়া।

কিন্তু.................। আমার শইল্যের গন্ধ আগের মতনই আছে। একটুও বদলায় নাই। তোমারে দেখলে আমার শইল্যের ভিতরে জলের ঢেউ লাগে, যৈবনের বান ডাকে তা তো আগের মতনই আছে। তোমার লেহাপড়া সমাজ এই সব বদলাইতে পারে নাই। তুমি বদলাইলা কেমনে?

আমি এই সবের কিছুই জানিনা।

পিছন ফিরা ঘাঢা ধইরা নামতে শুরু করে মাসুক। আবারো পিছন থেইকা ডাকে রোকেয়া - মাসুক। তয় কি এইডাই তোমার শেষ কতা?

মাসুক নিজেও জানতোনা এইডা আসলেই তার শেষ কথা হইবো। সারা তিতাসের জলের তৃষ্ণা জাইগা উঠে রোকেয়ার বুকের ভিতরে। বাতাস উষ্ণ হইয়া বাস্পের নহর বইতে শুরু করে। নহরটা ক্রমশ লম্বা হইতে থাকে যার এক মাথা রোকেয়া বুকের ভিতরে আরেক মাথা গিয়া লাগে তিতাসের টলটলা ঢেউয়ের লগে। একটা জলের নহর দীর্ঘ থাইকা আরও দীর্ঘতর হইতে থাকে। কিছুদিন আগে রোকেয়ার বুকে তৃষ্ণা জাগতো। তিতাসের জল তির তির কইরা নিচের দিকে নামতো। একটু আগেও জল বুকের ভিতর থাইকা সোজা চোখের জল হইয়া উপচাইয়া পড়ছে। কিন্তু এখন একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ভিতরে বাতাসের কুণ্ডুলী পাকাইতাছে। সেই কুণ্ডুলী বুকের ভিতরের জলডারে নিচে উপরে কোথায় যাইতে দিতাছেনা। কেবলই উষ্ণ থেইকা উষ্ণতর করতাছে। রোকেয়া অনুভব করে তার বুকের ভিতরে আগুন লাইগা গেছে। আগুনের সাথে জলের মিলমিশে আগুনের তুফান আরো বাড়তাছে।

উত্তর পশ্চিমের বিনাশিনী তুফান ভর করে রোকেয়া শরীরে। রোকেয়া মাসুকের পিছন পিছন আগাইতে থাকে। তয় হাটার গতিতে না, রীতিমত ঝড়ের গতিতে। উড়তে থাকে বাতাসের সাথে একটা তীরের চকচকা ফলার মতন। সেই তীর সরাসরি ঝাপাইয়া পড়ে মাসুকের ঘাড়ে। কন্ঠ থাইকা বাহির হয় গগন বিদারী চিৎকার—মাসুক। রোকেয়া দুই পা দিয়া মাসুকের কোমড় পিছন থাইকা আকড়াইয়া ধরে। বাম হাতে মাসুকের ঝাকড়া চুলে আর ডান হাত চইলা যায় মাসুকের ডাইন ঘাড়ে। মাসুক আন্দাজ করে রোকেয়া তার ডাইন কানে কামড় দিয়া ধরছে। রোকেয়া এইবার রাক্ষসী হয়া গেছে। পলি ধোয়া চরের জমিতে প্যচ প্যচে কাদার মইধ্যে মুখ থুবড়াইয়া চাইপা ধরে, যে কিনা তারে আলোর স্বপন, বুকের কাপন ধরাইছিল। যে বান্দা নিছিল রোকেয়ার পাঁচ বিঘা জমি।

মাসুক ঘাঢা ছাইড়া নিচে নামতে পারেনা। হঠাতই মনে হয় তারে কেউ ঝড়ের গতিতে নিচে নামায়া দিছে। প্যচ্চেত কইরা একটা শব্দ হইলো এরপর সে আর চোখ খুলতে পারতেছেনা। কানের ব্যথাটার কথা ভুইলা যাইতেছে যখন সে দেখল চোখ খুইলা কিছুই দেখতে পাইতেছে। শ্বাস টানতেই নাকের মইধ্যে কাদা পানি ঢুইকা পড়ছে। এইবার মুখ দিয়া শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে মাসুক। মুখ খোলার সাথে সাথে ধক কইরা কাদা আর ঘোলা পালি ঢুইকা পড়ে তার মুখে ভিতর।

রাক্ষসী রোকেয়া মাসুকের পিঠের উপর উইঠা বসে। শরীর, শাড়ি কাদায় মাখামাখি। মাসুক ঘুইরা শোয়ার শক্তি পাইতেছেনা। উপুড় হইয়া জমির কাদা মাটি খাইতেছে আর পা দুইটা উপর নিচ করতে করতে একসময় তার পায়ের তপড়ানি থাইমা যায়। রাক্ষসীর বুকে ঝড় তখনও থামে নাই। ঝড় আর শ্বাস একত্রিত হইয়া নাক মুখ দিয়া বাহির হইতেছে, প্রচন্ড তাপে বুক উঠা নামা করতেছে কামাড়ের হাতের হাপড়ের মতন। শাড়ি এলোমেলো হইয়া যায়। রোকেয়া খেয়াল করে তার মুখে নোনতা খুনের স্বাদ। এক হাতে উন্মুক্ত বক্ষের অস্ত্বিত্ব অনুভব কইরা আরেক হাতে শাড়ি খোঁজ করতে থাকে।

বাড়ির ঘাঢা ধইরা উইঠা আসে রোকেয়া। পিছন ফিরা দেখে কাদা মাটিতে মাসুকের নিথর দেহ। তার কোন কথা সে শুনবেনা জানে তবুও এলোমেলো বুলি আউরায়।

বিনিময় ছাড়া কোনও কিছু হয়না। এতদিন তিতাসের চরে ঘুইরা ঘুইরা শইল্যের তাপের যে সওদা করছো আইজ তার দাম সুদে আসলে নিয়া গেলাম। কেডায় কয় ভালবাসায় পরতিশোধ নিতে নাই। বিনিময় আর পরতিশোধ ছাড়া জীবনে কিছু নাই। আসলে থাকতে নাই।

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ