Vision  ad on bangla Tribune

জীবিকা

এস এম মাসুদুল ইসলাম১২:২৭, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৬

সেরা দশ গল্প


কদিন ধরে কাজে যেতে পারছে না সুমি।

এমন শীত। উফ! বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না সন্ধ্যার পর। কদিন এমন শীত থাক কে জানে। তার উপর শরীর খারাপ করেছে। মাসের এ কয়েকটা দিন খুব খারাপ কাটে সুমি’র। একটা অস্বস্তি ঘিরে রাখে। শীত আর শরীর খারাপ কোনোটার উপর তার নিজের কোন হাত না থাকলেও এখন সে দুইটার উপর বিরক্ত। বেশ বিরক্ত বলা চলে। নিজের শরীর আর মরার শীতের উপরে রাগে ফুঁসে উঠছে সে। গরীবের সুখ নেই। মনে মনে গজগজ করতে থাকে সুমি। ঘরে চাল নেই। মুদি দোকানে বাকি জমে গেছে। সেও আর বাকি দেবে বলে মনে হয়না। বস্তিতে ধার পাওয়া যায় না। সুদে টাকা ছাড়া এক টাকা ও কেউ কাউকে দেয়না। কে দেবে? সবার এক অবস্থা। খেয়ে না খেয়ে পরে আছে। বাচ্চা দুইটা কই কই ঘুরছে কে জানে । সকালেও কিছু খায়নি। দুপুরেও খাবার নেই । রাতে না খেলে ঘুম আসেনা। পেটে ক্ষুধা নিয়ে ঘুম হয়? নাহ! আজ বের হতেই হবে। দেখা যাক কপালে কি আছে। যদি ভাগ্য ভাল থাকে তাহলে কিছু জুটে যেতেও পারে। 

সাতপাঁচ ভেবে সুমি ঘর থেকে বের হয়। কদম ভাইয়ের খোজ করতে হবে। সুমি বাইরে গেলে সাধারণত কদম ভাইকে নিয়ে যায়। কদম ভাই লোকটা ভালো। পুলিশের সঙ্গে ভালো খাতির। আর সুমির সঙ্গে খারাপ কিছু করে না। বিপদে ভরসা রাখা যায়। এমন এক কাজ করে সে যে পারে সেই সুযোগ নিতে চায়। গায়ে হাত দিতে চায়। যেন জগতে সে এসেছে শুধু অন্যের জন্য মজা আর আনন্দ বিলাতে। কপাল আরে কাকে বলে। দুইটা বাচ্চার কথা ভাবে সে। নাহলে কবে রেলের নিচে ঝাপ দিতো। জীবন জুড়াতো, পাপ কম হত, শান্তিও পেত। তা আর হল কই? নষ্ট জীবন বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

সামনের গ্যারেজে কদম ভাইকে পেয়ে বলে এলো। সন্ধ্যায় বের হবে। কদম রাজী হতে চায়নি। এই দিনে নাকি খদ্দের পাওয়া যাবে না। সুমি জোর করে বলেছে। ঘরের অবস্থা শুনে কদম ভাই বলেছে,চল। যদি পাস তাহলেতো ভালোই।

সংসদ ভবনের রাস্তায় রিকশা নিয়ে এপাশ ওপাশ করছে। লোকজন তেমন নেই। একটু আগে হাইকোর্টের মাজার থেকে এসেছে। সেখানে সুনসান নীরবতা। এই শীতের সন্ধ্যায় কে আর কাজ ছাড়া বের হয়। পেটে ক্ষুধা, বাচ্চা দুইটাকে দোকান থেকে ৫ টাকার মুড়ি কিনে দিয়ে এসেছে। বলে এসেছে কিছুক্ষণ পর এসে ভাত রেঁধে খাওয়াবে। খুশিতে চকচক চোখ মুখ নিয়ে দুজন মুড়ি খেতে বসেছে। আহারে! মায়ায় আর্দ্র মন নিয়ে পাপের উদ্দেশ্যে ঘর ছেড়েছে সুমি। অনেকক্ষণ হয়ে গেলো। কোনও খদ্দের মেলেনি। কি করে রাতের খাওয়া জুটবে,কদম ভাইয়ের আধ বেলার টাকা দেবে এসব ভাবতে ভাবতে মনে মনে অস্থির সুমি।

হঠাৎ করে কদম ভাইয়ের কথায় সম্বিত ফেরে...

কিরে আর কতক্ষণ ঘুরবি?

কি করুম কদম ভাই,ঘরে এক দানা চাল নাই। মুদি দোকানে বাকি। আর চাওন যায়না। পোলা দুইটা না খাইয়া আছে। আসনের সময় কইয়া আইছি,আইসা ভাত রান্ধুম। এহন কেমনে যাই। তুমার টেহা দিমু কেমনে? কিচ্ছু বুজতাসি না কদম ভাই।

আমার টেহার কথা বাদ দে। নিজের কথা ভাব। নিঃস্পৃহ ভাবে বললো কদম ভাই।

কদম ভাই, চল চন্দ্রিমা উদ্যানে যাই। ঐহানে পাওয়া যাইতে পারে।

চল। বলে কদম রিকশা ঘুরালো চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে ।

খামার বাড়ির মোড়ে সুমির রিকশার সামনে থামলো দামী একটি গাড়ি। সুমির চোখ চকচক করে উঠলো। আস্তে করে কদম ভাইকে থামতে বললো।

: দেখতো কদম ভাই। ওদের লাগবো নাকি? মনে লয় আল্লাহ কাম একটা দিসে। সুমির গলায় খুশির সুর।

: তুই বয় রিকশায়। আমি দেহি। বলে কদম নেমে এগিয়ে গেলো গাড়ির কাছে।

সুমি রিকশায় বসে দেখলো কদম ভাই মুখ বাড়িয়ে কথা বলছে। গাড়িতে কে আছে বোঝা যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ পর ফিরে এলো কদম ভাই।

: যাইবি সুমি? সারা রাত থাকতে হইবো। ৫০০ দিবো। রাজী থাকলে ক?

: আচ্ছা যাইমু,তুমি কিছু টেহা লইয়া যাওগা। হাসুনির মারে কইডা চাইল দিয়া ভাত রাইন্ধা দিতে কইবা? পুলা দুইটা খাইয়া ঘুমাইতে পারবো। আমি বিয়ান বেলা আমুনে।

: আইচ্ছা। কমুনে।

একটু থেমে কদম ভাই বললো, হুন সুমি, যাইবি, তুই? পুলা দুইটা ছোড ছোড, কার পুলা কে জানে, বাসায় কেউ নাই মনে হয়, এই আকাম করতে বাইর হইসে।

: ইতা চিন্তা কইরা লাভ নাই কদম ভাই,আমরার পেটে ভাত নাই।

কদম আর কথা বাড়ালো না। গাড়ির কাছে ফিরে গিয়ে টাকা নিল। সুমিরে তারাতারি গাড়িতে তুলে দিয়ে রিক্সা ঘুরালো বস্তির দিকে।

সুমি গাড়িতে বসেই,টের পেলো। কদম ভাই এর কথা ঠিক। কত আর বয়স হবে পুলা দুইটার। হের নিজের পুলার থেইকা কয়েক বছরের বড়। মনটা কেমন করে উঠলো। পাপ করলেও মনের অন্দরে পাপীও কিছু বিশ্বাস লালন করে। সেই মন থেকে একটা নিষেধ টের পেল।

কিচ্ছুক্ষনের মধ্যেই সুমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো তার বুকে চাপ বাড়ছে, তাকে অষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বুক খামচে ধরেছে তারই সন্তানের বয়সী আজকের খদ্দের। সুমির ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে নিজের পুলার বয়সী এই দুই খদ্দের তার শরীরটা চেটেপুটে খাবে। আর বেশি কিছু ভাবতে পারলো না - কাঠ হয়ে বসে রইলো সে। 

লাইভ

টপ