behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

রফিক আজাদ এক অবিনাশী কবিসত্তা

দুলাল সরকার১৩:১৫, মার্চ ১৩, ২০১৬

রফিক আজাদসময় ২ টা ৩০ মিনিট। বসে বসে ‘নতুন দিগন্তে’ প্রকাশিত ‘লেনিনের মৃত্যু’ প্রবন্ধটি পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম তাঁরও শত্রু ছিল? হ্যাঁ পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদীরা তাঁর শত্রু ছিল। এসব ভাবছিলাম। এর মধ্যে মুঠোফোনটি বেজে উঠল। প্রায় আর্তকণ্ঠে এক তরুণ কবি বলল, কাকু শুনেছেন, রফিক আজাদ মারা গেছেন?
শুনে আমি নির্বাক হয়ে যাই। হোচট সামলে বলি, ‘জনকণ্ঠে ওনার অসুস্থতার সংবাদ পড়েছিলাম।’ ওই তরুণ কবি বলল, ‘এতদিন তাঁকে লাইফ-সাপোর্টে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। তাঁকে নিয়ে একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা দিন।’
ভাবলাম স্মৃতিকথা! চুপচাপ বসে থাকলাম। কী লিখব? আজ উনি নেই; কিছুক্ষণ পূর্বে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সেখান থেকে কেউ আসে না। অন্তত পুরোনো নামে, পুরোনো দেহে, পুরোনো চেহারায় আর কেউ ফিরে আসে না। আপাত যে সত্যের মধ্যে মানুষের বসবাস, যে দীর্ঘ পরিচয়ের তন্তুজালে মানব অস্তিত্ত্ব গড়ে ওঠে তা এক স্বাভাবিক লহমায় মৃত্যু নামক অন্ধকারে হারিয়ে যায়। কত স্বাভাবিক, তবু তাঁর অন্তর্ধানটি এত সহজ নয়। কারণ তাঁকে ঘিরে যে মায়াবী স্তর তৈরি হয়েছিল তাকে কি ভোলা যায়? মহাভারতের যযাতি মরতে চাননি’- বেঁচে থেকে ভোগ করতে চেয়েছিলেন এ বিষয় মুগ্ধতা, অন্তহীন কামনা বাসনার জালে জড়িয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। তাঁর পুত্র তাঁকে সব দিয়েও ধরে রাখতে পারেননি। এ তো রূপক।
কিন্তু তাও ব্যর্থ হল। ব্যর্থ হতে হয়। এ কথাটি আমার ক্ষেত্রেও সত্য হবে। ভাবতে ভাবতে হাসি পেল। এক মুহূর্তে সব শূন্য হয়ে গেল। কিন্তু তারপর পুনরায় ফিরে এলাম সংসারে, জীবনে। যেখানে মৃত্যুর মতই ছড়িয়ে আছে এক অন্তহীন জীবন।
প্রিয় রফিক ভাই- কবি রফিক আজাদ নেই। সকলে তো প্রিয় হতে পারে না। কোন কোন কথা, কোন কোন ব্যবহার মানুষকে মানুষের মধ্যে স্মৃতিময় রাখে। রফিক আজাদকে ঘিরে আমারও মধ্যে তাই রয়েছে। জীবনের পথ চলতে চলতে কোন কোন কথা, কোন কোন আচরণ এই মুহূর্তে আমাকে আদ্র করছে। রফিক ভাইকে ঘিরে সে সব কথা ও স্মৃতি আজ এই মুহূর্তে আমাকে বেদনায় আপ্লুত করছে।
তখন সত্তর দশক চলছে। সদ্য স্বাধীন দেশ। বহু ক্ষত, বহু আকাঙ্ক্ষায় মানুষ উদ্বেলিত। আমি ১৯৭৪-এর দিকে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে দর্শনে অনার্সে ভর্তি হয়েছি। থাকি জগন্নাথ হলে। মাথায় কবিতা- বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও কবিতাকে কেন যেন এক রহস্যময়ী নারীর মতো ভালোবেসে ফেললাম। কবিতার জন্য, কবিতার টানেই যেন ঢাকা আসা। বাংলায় না পড়ে কেন যে দশর্নে পড়লাম তাও জানি না। তবে দশর্ন নিয়ে পড়তে ভালো লাগত- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন কবিতা-গানে ভরপুর। কত অনুষ্ঠান। আমি সংস্কৃতি সংসদের সদস্য হলাম। সেখানে সক্রিয় হয়ে কবিতার আকর্ষণ আরও বেড়ে যায়। হঠাৎ একটি কবিতার লাইন আমার কানে এলো। যেন এক ঝলক অগ্নি-শলাকার মতো আমার চেতনাকে কাঁপিয়ে দিল।
‘ভাত দে হারামজাদা’- এই একটি বাক্য আমাকে দারুণভাবে নাড়া দিল। একজন আমাকে বলল, এ কবিতাটির রচয়িতা কবি রফিক আজাদ। এই প্রথম আমি তাঁর অদৃশ্য বন্ধনে বাঁধা পড়ি। মানুষটিকে চিনি না, তাঁর সাথে পরিচয় নেই কিন্তু তাঁর লিখিত একটি বাক্যের মুগ্ধতায় আমি দূর থেকে তাঁকে ভালোবেসে ফেললাম। ভাবতে শুরু করলাম, এ শুধুমাত্র একটি বাক্য নয়- এর পশ্চাতে কাজ করছে কত ভাবনা, কত ক্ষোভ, কত জ্বালা, কত অন্তর্ভেদী হাহাকার। নিরন্ন নিরাশ্রয় মানুষের প্রতি দুর্বার দুর্বলতা থেকে উৎসারিত এ পঙক্তিমালার সাথে যুক্ত হয়ে আছে কত মানবিক বোধ ও চেতনা।
এই মানুষটিকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে হল। কিন্তু কোথায় পাব তাঁকে? ভাবনা আমাকে নিয়ে যায় বাস্তবতার দিকে। ততদিনে পঞ্চাশ, ষাট দশকের কবিদের কবিতায় আমি আকণ্ঠ নিমজ্জিত। যে নামগুলো তখন নক্ষত্রের মতো জ্বলছিল তাদের মধ্যে মুগ্ধ করেছে কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী। কবি আল মাহমুদের কবিতার বিশেষ-শৈলী ও শব্দসমূহ অতি সহজেই মনে দাগ কেটে গেল। তারপর এলেন যারা তাঁদের মধ্যে অন্যতম রফিক আজাদ। তাঁর কবিতার ঋজুতা, অন্তরঙ্গতা আমাকে আবেগ তাড়িত করল।
জানলাম তিনি আমার পাশেই। অর্থাৎ বেশি খুঁজতে হবে না। পাওয়া যাবে বাংলা একাডেমিতে। আমার আশৈশব একটু সাহস বেশি। যা করব, যা ভাবব, যেখানে যাব নির্দ্বিধায় তা করে ফেলি। আর ততদিনে জেনে ফেলেছি, ঘর কুনো হয়ে শুধু কবিতার খাতার মুগ্ধ পোকা হয়ে থাকলে হবে না, বেরুতে হবে, প্রকাশিত হতে হবে।

অনেক পরে লেখা থেকে মুখ সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, একটা আমি রেখে দিলাম তবে এই দুটো, তিনটি শব্দ নিয়ে আরেকটু ভাব। আমি ওখানে বসেই শব্দ ক’টি ঠিক করলাম এবং ওনাকে দিলাম। হাতে নিয়ে হেসে বলল, ভালো হয়েছে। ছাপব।

তখন তো কম্পিউটার, ই-মেল এসব ছিল না। দুটো কবিতা সুন্দরভাবে হাতে লিখে বাংলা একাডেমিতে যাব বলে মনস্থির করলাম। মনে আমার প্রতিজ্ঞা, রফিক আজাদকে দেখতে হবে এবং তাঁকে কবিতা দিতে হবে। তখন তিনি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘উত্তরাধিকার’ দেখেন। অপরিচিত বাংলা একাডেমি। কোথাও পাব তাঁকে? হঠাৎ নামটি দেখে সটান ঢুকে পড়ি। প্রথম একটু সংকোচ হয়েছিল এই ভেবে যে কিভাবে তিনি গ্রহণ করেন।
ঢুকলাম। উনি বসতে বললেন। মুখে মৃদু হাসি। সত্যি বলছি, আমি প্রথম ওনার দিকে তাকিয়ে যা চেয়েছিলাম অর্থাৎ চোখ যা চেয়েছিল তা পাইনি। কোন আকর্ষণ বোধ হয়নি। উনি হয়ত আমার মনের কথাটি পড়তে পেরেছিলেন। একটু হাসলেন। আমার বিব্রত ভাবটা কাটার জন্য জিজ্ঞেস করলেন কোথায়, কী পড়ি। বলার পরে বললেন, কবিতা লেখ নিশ্চয়ই। কিছু এনেছ? দেখি। আমি দুটো কবিতা এগিয়ে দেই। সংকোচ নিয়ে অপেক্ষা করি। অনেক পরে লেখা থেকে মুখ সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, একটা আমি রেখে দিলাম তবে এই দুটো, তিনটি শব্দ নিয়ে আরেকটু ভাব। আমি ওখানে বসেই শব্দ ক’টি ঠিক করলাম এবং ওনাকে দিলাম। হাতে নিয়ে হেসে বলল, ভালো হয়েছে। ছাপব।
তারপর আরো যা বললেন, তা এখানে আসতে আমাকে সাহায্য করেছে। বললেন, একজন কবি মানে একজন পিতা। প্রথম জন্ম মুহূর্তে সব কবিতাই সন্তানের মতো প্রিয় হয়। তবে কবিতাকে ফেলে রাখতে হয়। ক’দিন বাদে দেখতে হয়। তাতে প্রথম লেখার কাঁচা আবেগটি আর থাকে না। ভুলটি ধরা পড়ে।
কথাগুলো মনে রাখার মত। যা আমি আজো মনে রেখেছি। কতটুকু সফল হয়েছি জানি না। তবে যে সব কবিতার ক্ষেত্রে এ নিয়মটি প্রয়োগ করেছি সেটাই হয়ত কবিতা হয়ে উঠেছে।

রফিক আজাদআজ কবি আর নেই যে একদিন ছিল। যার বাইরের রূপটি যেমনই হোক কিছুদিন বাদেই বুঝেছিলাম তাঁর অন্তরের মাধুর্য, তাঁর উদার প্রশ্রয়। তারপর ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে সময় পেলেই বলতে গেলে প্রায় অকারণেই এসে বসতাম। উনি প্রশ্রয় দিতেন, দিয়েছেন। সেই দিনগুলো আমার স্মৃতির খাতায় মুদ্রিত হয়ে আছে। তা আমি ভুলব কী করে? এ প্রসঙ্গে কবি বেলাল চৌধুরীর কথাও শ্রদ্ধার সাথে মনে পড়ে। তিনিও অসুস্থ। শ্রদ্ধার সাথে মনে করছি হায়াৎ মামুদ ও কবি আহসান হাবীবকে। আমার মন বলছে, চিত্তের এ ঔদার্য ও মৌলিক প্রতিভার কবি ও লেখকের সংখ্যা কমে আসছে। এখন প্রায়শই সাহিত্য সম্পাদককে ঘিরে একটি তোষামোদী গোষ্ঠী তৈরি হয়ে রচিত লৈখিক গুণকে ধ্বংস করছে। অথচ একদিন তা ছিল না। আমি কাউকে অসম্মান করার জন্য এ কথাগুলি বলিনি। সেদিনও যদি তাই হত তাহলে এক অল্প দিনে রফিক ভাই আমার কবিতা এত বেশি উত্তরাধিকারে ছাপতেন না।
শুধু কি তাই? মন হয়ত এমনই ছিল যে উনি অতি সহজেই অন্যের ভালো চাইতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। সেদিন হয়ত বুঝিনি কিন্তু আজ বুঝতে পারি তিনি কত সহানুভূতিশীল ও মমত্বের অধিকারী ছিলেন। একদিন বললেন, কবি যদি হতে চাও তবে দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতায় তোমার কবিতা ছাপাতে হবে। দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতা দেখেন কবি আহসান হাবীব। তাঁর কাছে যাও।
আমি তাই করেছিলাম। সে আমার জীবনের আরেক অর্জন। কুড়িয়ে পাওয়া আরেক অনুভব। কবিতা ছাপা হল। সে কবিতা উনি দেখে বললেন, এবার তোমার হবে।
সেই মানুষটাকে ভুলি কী করে? যখন তিনি বিভিন্ন জায়গায় আমাকে কবিতা পড়ার জন্য নিয়ে যেতেন অথবা বেশ কিছুদিন দেখা না হলে ধমক দিতেন। সেই মানুষটি হয়ত অনেকের কাছে, অনেকের স্মৃতিতে আরো ভিন্নভাবে, ভিন্ন মাত্রায় বেঁচে থাকবেন, কিন্তু আমার কাছে যতটুকু তা স্বল্প হলেও আমার কাছে এর মূল্য অনেক।
তিনি কবিতায় জেদী ও সাহসী উচ্চারণে সুদক্ষ ছিলেন এ কথা সত্য। কারণ ‘ভাত দে হারামজাদা’ এ কথাটি কবিতায় আনয়ন করা এক সাহসী কাজ। কবি তো বর্তমান সময়ের সাথে সাথে মহাকালের কথাও বলবেন। বর্তমানের দাবিও পূরণ করে মহাকালের দাবিকে অলঙ্কৃত করবেন। সে ব্যাপারে তাঁর কবিতাই কথা বলে উঠবে। তবে পরবর্তিতে রফিক আজাদ হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃতি ও মৃত্তিকালগ্ন এক মহৎ কবি। তার ‘পরিবেশ কবিতা’ তাই আমাকে ভিন্ন স্বাদে টানে। সেখানে তিনি যে কত মমতা নিয়ে জীবনের বোধকে কবিতায়িত করেছেন! মনকে যা ছুঁয়ে যায়- বোঝা যায় তাঁর অকৃত্রিম অনুভবের সঙ্গে ভাষা কত প্রগাঢ় হয়ে উঠেছিল-

একটি ঘাস ফড়িংয়ের জন্য

আজ বুকের বা পাশে ব্যথা হয়

নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য অসংখ্য সবুজ চারা

কেন আমি করিনি রোপন?

স্বচ্ছ জলে কেলি পরায়ন চাপিলার ঝাঁক

কেন দেখিনি দু’নয়ন ভরে

হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে?
একটি পিঁপড়েও যদি
না মাড়িয়ে বেঁচে থাকা যেতো
লতাগুল্মময় এই অরণ্য শোভার জগতে!
প্রতিটি গাছের কাছে
শস্য ক্ষেত্রে বয়ে যাওয়া হু-হু বাতাসের কাছে,
সোদাগন্ধী এই অরণ্যের কাছে,
মাটির দাওয়ার কাছে,
বুনোঘাস, ফুল, প্রজাপতি,
কাছিমের ডিম, গাভীর সজল দৃষ্টি, বহমান
নদীর ঢেউয়ের কাছে
করজোড়ে আমি ক্ষমা চাই;
আামি অপরাধী-
বাঙলার প্রতি ধূলিকণা ছেপে
রয়ে গেল এ আমার গাঢ় অপরাধ!’
যেন মর্ত্যপ্রেমী একজন ভালোবাসার দীন মানুষের আর্ত ও মর্মভেদী উচ্চারণ। এক সময়ে তাঁর অন্তরে জগতের তুচ্ছ বিষয়টিও অতি গুরুত্বের সাথে, শ্রদ্ধার সাথে অনুভূত হয়ে তাদের যোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি বলে বিশ্বের সকল তুচ্ছের কাছে করজোড়ে নতজানু। এ যেন কবিতা নয়- মন্ত্র। কবিতা তো এক অর্থে মন্ত্রই।
আজ সেই কবি নেই। কেউ থাকবে না। কিন্তু কিছুই কি থাকবে না? এর উত্তর মহাকাল বলবে। আজ তাঁর শারীরিক অস্তিত্ব নেই কিন্তু থকলেন আমার অন্তরের মণিকোঠায় আর বাংলা কবিতায়, বাংলার মরমী ধূলিতে। আজ ১২ মার্চ তাঁর তিরোধানের দিবসে তাঁকে জানাই আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।


 

দুলাল সরকার  কবি ও ঔপন্যাসিক

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ