সন্দেহভাজন জঙ্গিরা কে কবে দেশ ছেড়েছে?

নুরুজ্জামান লাবু
১০ আগস্ট ২০১৬, ১০:৫৩আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৬, ১৩:১২

নিখোঁজ তালিকা

নিখোঁজ থাকা সন্দেহভাজন জঙ্গিরা কোথায়? তারা কি দেশেই নাকি দেশ ছেড়েছে চলে গেছে? কবে গেছে? কেউ কি আবার দেশে ফিরেছে? এছাড়া প্রকৃত নিখোঁজের সংখ্যাই বা কত? নিখোঁজ হওয়া সবাই কি সন্দেহভাজন জঙ্গি? এমন নানা প্রশ্ন এখন সবার মুখে।

গুলশান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর পুলিশি তৎপরতায় জানা গেছে, জঙ্গিদের কেউ কেউ তিন থেকে ছয় মাস, অন্যরা এক বছর ধরেও নিখোঁজ ছিল। এরপরই নিখোঁজদের তালিকা তৈরি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। র‌্যাবের দুই দফা সংশোধিত তালিকায় নিখোঁজের সংখ্যা এখন ৭০। পুলিশের বিশেষ শাখা এসবি নিখোঁজ থাকা ৮৪ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিআইবি) একটি তালিকা করেছে, যাতে নিখোঁজের সংখ্যা ৬০ এর অধিক নয়। আর পুলিশ সদর দফতর যে তালিকা করেছে তাতে নিখোঁজের সংখ্যা ৫১। এসব তালিকার মধ্যে অন্তত ৩৮ জন এরই মধ্যে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, নিখোঁজদের মধ্যে ১৩ জন সিঙ্গাপুর, ৯ জনু তুরস্ক, সাত জন মালোয়শিয়া, চার জন আরব আমিরাত, দুইজন জাপান ও একজন করে কাতার, ইরান এবং সৌদি আরব গিয়ে নিখোঁজ হয়েছে। তাদের ধারণা, যারা দেশ ছেড়ে গিয়েছে তাদের বেশিরভাগই সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে সিরিয়ায় চলে গেছে। সেখানে তারা আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের হয়ে কাজ করছে। এসব ব্যক্তিদের বিষয়ে দেশের সকল ইমিগ্রেশন চেকপয়েন্টে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। তারা কেউ দেশে ঢুকতে চাইলেই তাদের যেন পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয় সেই নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক (এআইজি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, নিখোঁজ তালিকা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটি প্রতিনিয়ত সংশোধিত, পরিবর্ধন বা পরিমার্জিত হয়ে থাকে। ফলে নির্দিষ্ট করে কোনও সংখ্যা বলা সম্ভব নয়। পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, একই সঙ্গে নিখোঁজদের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ-খবর করা হচ্ছে। তারা কে, কবে, কখন দেশ ছেড়েছে বা দেশে ফিরেছে, আর যারা দেশে অবস্থান করছে তাদের বিষয়েও অনুসন্ধান চলছে।

জানা গেছে, নিখোঁজদের বেশিরভাগই দেশের ভেতরে অবস্থান করলেও অন্তত ৩৮ জন গত কয়েক বছরে দেশ ছেড়ে গেছে।  বিদেশে পাড়ি জমানোরা বিভিন্ন ভাবে সিরিয়ায় গিয়ে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে বলেও তথ্য রয়েছে। সম্প্রতি সিরিয়ার আইএস নিয়ন্ত্রিত রাক্কা শহর থেকে একটি ভিডিওবার্তা আপলোড করে বাংলাদেশি তিন তরুণ। ওই ভিডিও বার্তায় গুলশান হামলার প্রশংসা করে আরও হামলা চালানোর হুমকি দেওয়া হয়।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এই তিন জনের একজন তাহিমদ রহমান সাফি দেশ ছাড়ে গত বছরের ২৩ এপ্রিল। আর তার অন্য সহযোগী ডা. আরাফাত হোসেন তুষার ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর। এই দু’জনই তুরস্কের ইস্তাম্বুল হয়ে সিরিয়া চলে যান। গত বছরের ৫ জুন ইস্তাম্বুল হয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করেন নিয়াজ মোর্শেদ। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে জামিনে থাকা সন্দেহভাজন জঙ্গি জুন্নুন শিকদার দেশ ছাড়েন গত বছরের ২০ এপ্রিল। জুন্নুন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিলেন ধানমণ্ডির বাসিন্দা তাওসিফ হোসেন। মালোশিয়ার মোনাস ইউনিভার্সিটির এই ছাত্র গত ২০ এপ্রিল মালোশিয়া থেকে দেশে এসেছিলেন বলে এক গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে। পরবর্তী সময়ে সে সিরিয়ায় পাড়ি জমালেও তার নতুন পাসপোর্ট নম্বর জানতে না পারায় দেশত্যাগের নির্দিষ্ট তারিখটি জানা যায়নি।

পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখা সূত্র জানায়, নিখোঁজ তালিকায় থাকা ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহীম হাসান খান দেশত্যাগ করে গত বছরের ৮ জুলাই। আর ধানমণ্ডির বাসিন্দা  জুবায়েদুর রহিম দেশত্যাগ করে ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি। জুবায়েদুর রহিম ঢাকার ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড স্কুলে পড়াশোনা শেষে মালোশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে পড়ত। ঢাকা থেকে তিনি তেহরান হয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করে। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এটিএম তাজউদ্দিন ঢাকা থেকে সর্বশেষ ২০১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যায়। এরপর থেকেই তার আর খোঁজ মেলেনি। সেও সিরিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। রবিউল ইসলাম নামে এক তরুণ চলতি বছরের ৭ মার্চ সিঙ্গাপুর চলে যায়। এরপর থেকে তার আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

বহুল আলোচিত খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা ডা. রোকন উদ্দিন খন্দকার তার স্ত্রী নাঈমা আক্তার ও দুই মেয়ে রেজোয়ানা রোকন, রমিতা রোকন ও সাদ কায়েস দেশ ছাড়বেন গত বছরের ১০ জুলাই। তারা তুরস্ক হয়ে সিরিয়া চলে যায়। এছাড়া শাহরিয়ার খাঁন ওরফে শাজাহান নামে অন্য এক তরুণ গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দেশ ত্যাগ করে। আবুধাবির শারজাহ যাওয়া চলে যাওয়ার পর তার খোঁজ নেই। এর আগে ওই গত বছরের ৯ আগস্ট থেকে নিখোঁজ ছিলেন তিনি। পাবনা থেকে সাত মাস আগে নিখোঁজ হওয়া এমদাদুল হক মালোশিয়া অবস্থান করলেও তার দেশত্যাগের তারিখটি জানা যায়নি। মাকসুদ নামে আরেক তরুণ ২০১৪ সালের ৫ আগস্ট দুবাই থেকে দেশে আসে। এরপর থেকেই নিখোঁজ রয়েছে তিনি। এছাড়া তেহজিব করিম নামে গ্রিনরোডের বাসিন্দা চলতি বছরের ১৭ মে ব্যাংকক থেকে দেশে আসে। দেশে আসার পর বিমানবন্দর এলাকা থেকেই লাপাত্তা হয়ে যায় সে। তার বিষয়ে কোনও খোঁজ পায়নি পরিবার। এছাড়া গত ১৫ জুন আলামিন মোল্যা নামে আরেক যুবক কোলকাতা থেকে ঢাকায় আসার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছে। এছাড়া নিখোঁজ তালিকায় থাকা সফিউল আলম ও মেহেদী হাসান দেশের বাইরে রয়েছে বলে জানালেও দেশত্যাগের তারিখ জানা যায়নি।

এছাড়া বহুল আলোচিত ব্লগার হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড রেজওয়ানুল আজাদ রানা ২০০৮ সালের ৮ আগস্ট রিয়াদ যায় বলে একটি গোয়েন্দা নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর রানা একাধিকবার দেশে আসা-যাওয়া করলেও তার নতুন পাসপোর্ট নাম্বার উদ্ধার করতে পারেনি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা। ঢাকার কাউন্টার টেররিজম ইউনিট তাকে অনেকদিন ধরেই খুঁজছে বলে জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন: তিনমাসে দুই ‘হাইপ্রোফাইল কর্মকর্তা’ নিখোঁজের পর লাশ

/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
জনআস্থা ও জবাবদিহিমূলক সংসদ গঠনে সাংবিধানিক জ্ঞান জরুরি: ডেপুটি স্পিকার
জনআস্থা ও জবাবদিহিমূলক সংসদ গঠনে সাংবিধানিক জ্ঞান জরুরি: ডেপুটি স্পিকার
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী