শিশু নির্যাতন মামলা: `আলোচনায় না থাকলে বিচারও নেই'

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ২০:১৯, অক্টোবর ১০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:১৯, অক্টোবর ১০, ২০১৭

শিশু নির্যাতন

দেশে অহরহ শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর বিচার পাচ্ছে না ভুক্তভোগীরা। আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, যেসব ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে আসছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেগুলোর বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও এর বাইরে বিপুল সংখ্যক শিশু নির্যাতনের ঘটনা অনালোচিতই থেকে যাচ্ছে। এসব ঘটনায় দেশজুড়ে প্রচুর সংখ্যক মামলা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রচার মাধ্যমে না আসার কারণে সেগুলো কী অবস্থায় আছে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জানা সম্ভব হয় না। 

২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর বিকালে শাজাহানপুর রেলওয়ে মাঠের পাম্পের পাইপে পড়ে যায় শিশু জিহাদ। প্রায় ২৩ ঘণ্টা পর ২৭ ডিসেম্বর বিকালে জিহাদকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এরপর শিশুটিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ২৮ ডিসেম্বর জিহাদের পরিবারের জন্য ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট হয়। পরে শিশুটির পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা দেয় হাইকোর্ট।

আরেক আলোচিত ঘটনায়, ২০১৫ সালের ৮ জুলাই চুরির অপবাদে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন শেখপাড়ায় নির্যাতন করে হত্যা করা হয় সিলেটের জালালাবাদ থানা এলাকার বাদেয়ালি গ্রামের সবজি বিক্রেতা শিশু রাজনকে। নির্যাতনকারীরা ফেসবুকে প্রচারের উদ্দেশে নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে। পরে পুলিশ বাদী হয়ে জালালাবাদ থানায় মামলা করে। ২০১৫ সালের ৮ নভেম্বর রাজন হত্যা মামলায় আসামি কামরুলসহ চারজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন নিম্ন আদালত। এ বছর ১১ এপ্রিল প্রধান আসামি কামরুলসহ চারজনের ফাঁসির রায় বহাল রাখে হাইকোর্ট। একইরকম আলোচিত ঘটনা ছিল খুলনার শিশু রাকিব হত্যার ঘটনাটি। পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়েছিল তাকে। এ মামলাটিরও বিচার হয়েছিল দ্রুত।

শিশু জিহাদ, রাকিব, রাজন হত্যাকাণ্ডের মতো মামলাগুলো ‘আলোচিত’ হওয়ায় বিচার বিভাগের নজরদারি এবং গণমাধ্যমের ‘ফলোআপ’ ছিল বলেই দ্রুত বিচার নিশ্চিত হয়েছে বলে মনে করেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা। তারা বলছেন, ‘সারাবছর যতগুলো মামলা হয় তার কয়টার খোঁজ রাখি আমরা? বেশিরভাগ মামলার হয়তো শুরুটা জানা যায়, পরে আর কোনও খবর পাওয়া যায় না। যে কয়টার বিচার হয় সেগুলোরও জানা না থাকায় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না।’

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এর হিসাব বলছে, গত পাঁচ বছরে পাশবিক নির্যাতন ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ১৩ হাজার ১২টি শিশু। এরমধ্যে হত্যার শিকার হয়েছে ১ হাজার ৫২৬ শিশু। আত্মহত্যা করেছে ৭২৭ জন এবং ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৪৭৫ শিশু। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ৮ মাসে ৩৯৯টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এ সময় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ২২২টি শিশুকে। এছাড়া অপহরণের শিকার হয় ৯৪টি শিশু।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী সালমা আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা বারবারই দেখছি কোথাও কোনও একটি নৃশংস ঘটনা ঘটলে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এর কারণ, অপরাধ করে অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। রাজনের মতো দুই-একটি ঘটনার দ্রুত বিচারের রায় হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন। শিশু রাজনের ক্ষেত্রে চার মাসের মধ্যে বিচারের রায় হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা কেন হচ্ছে বলে মনে করেন?  এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জিহাদ-রাজন-রাকিবের ঘটনাগুলো ছিল ব্যাপক আলোচিত। এ কারণে প্রশাসন ও বিচার বিভাগ এগুলো নজরদারিতে রেখেছিলেন। তবে শুধু আলোচিত ঘটনাগুলোই নয়, সব ক্ষেত্রেই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং সেটা প্রচার করতে হবে। তিনি বলেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় এই বোধটাও অপরাধ কমায়। কিন্তু আমাদের এখানে আলোচনায় না থাকলে বিচারও নাই।

আইনজীবী ও মানবাধিকার নেত্রী এলিনা খান মনে করেন, দেশে যথেষ্ট ভালো আইন আছে। তবে এর প্রয়োগ খুব কম। সঠিকভাবে আইনের প্রয়োগ করতে সরকারকে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। আলোচনায় থাকলে যা একটু বিচারের বিষয়টি জানা যায়, আলোচনায় না থাকলে বিচারকাজ কতটা কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে জানা যায় না। আরেকটি দিক উল্লেখ না করলেই নয়। বিচারের আগের প্রক্রিয়ার জন্যও কিন্তু আলোচনায় আসতে হয় যে কোনও অপরাধকে। তা না হলে পুলিশ মামলা নিতে চায় না, অভিযোগকে গুরুত্ব না দেয় না, ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে; এ রকম নানা অভিযোগ শোনা যায়। এক্ষেত্রে করণীয় কী জানতে চাইলে এলিনা খান বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা পেলে তাদের শুধু বরখাস্ত নয়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যার কোনোটিই সম্ভব হয় না। নির্যাতনের পর শিশু হত্যার বেশিরভাগ মামলার ক্ষেত্রে শিশুর আর্থিক অবস্থা নির্যাতনকারীর চেয়ে খারাপ হওয়ায় মামলা নিয়ে নানা হয়রানির অভিযোগ উঠে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নুর খান মনে করেন, আইনের শাসন নিশ্চিত করা না গেলে অপরাধ কমবে না। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত কুড়ি বছরে আমাদের এখানে নির্যাতনের পরিমাণ ও ভয়াবহতা দুটোই বেড়েছে। কেবল আলোচিত ঘটনার বিচার হবে; এটি সুশাসন নিশ্চিত করে না। কিন্তু এমনটাই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। আবার অনেক ঘটনা ভেতরে ভেতরে ধামাচাপা দেওয়া হয়, দেওয়ার চেষ্টা হয়; সেগুলো আমাদের নজরেও আসে না। সব ধরনের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করলেই আমরা অপরাধ প্রবণতা কমাতে পারবো।

/এমপি/টিএন/

লাইভ

টপ