বাংলা ট্রিবিউনকে একান্ত সাক্ষাৎকারে বিমান প্রতিমন্ত্রী দুর্নীতিবাজরা চিহ্নিত, শিগগিরই ব্যবস্থা

Send
চৌধুরী আকবর হোসেন
প্রকাশিত : ০৭:৪৭, আগস্ট ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০০, আগস্ট ০৪, ২০১৯

single pic template-1 copy-Recoveredবেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ অন্যান্য সংস্থার দুর্নীতিবাজদের আইডেন্টিফাই (চিহ্নিত) করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. মাহবুব আলী। তিনি বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর প্রয়াত মাওলানা আসাদ আলীর ছেলে অ্যাডভোকেট মাহবুব আলী হবিগঞ্জ-৪ আসন থেকে দ্বিতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর। দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত ৭ মাসের অভিজ্ঞতা ও মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত নানা বিষয়ে বুধবার (২৮ জুলাই) বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রথমবারের মতো প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। ৭ মাসের অভিজ্ঞতা কেমন?

মাহবুব আলী: লম্বা সময় বলা যাবে না, আবার একেবারে অল্প সময়ও না। ভালোই লাগছে।

বাংলা ট্রিবিউন: বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রীদের নিয়ে সমালোচনা হয়, বিব্রত হওয়ার মতো কোনও অবস্থায় কি পড়েছেন?

মাহবুব আলী: শুরু থেকে সবাই বলেছে, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয়। সবাই শঙ্কিত ছিল। কিন্তু আমার তেমন কোনও কিছু মনে হয়নি, বরং আমি পজেটিভটি নিয়েছি। দায়িত্ব নেওয়ার আগে ও পরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বিমান সম্পর্কে বিভিন্ন নেতিবাচক সংবাদ এসেছে, এগুলো আমি পজেটিভটি নিয়েছি। সব সমালোচনার ওপর ভিত্তি করে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। এ কারণে আমাদের সফলতাও এসেছে। চ্যালেঞ্জ আমি সাদরে গ্রহণ করেছি। যেকোনও সমালোচনা আমি পছন্দ করি।

বাংলা ট্রিবিউন: কোন ধরনের কতটা চ্যালেঞ্জ আপনাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে?

মাহবুব আলী: আমাদের জীবনটাই তো চ্যালেঞ্জিং। আমরা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই তো দেশকে স্বাধীন করেছি। আমাদের জাতির পিতা আজীবন নির্যাতন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। ফাঁসির রশিকে ফুলের মালার মতো বরণ করেছেন। আমাদের দেশের সৃষ্টি একটা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৫ সালে পরে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে হত্যা, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ধ্বংস করা হয়েছে। এরপর বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি।

বিমান মন্ত্রালয়ের প্রতি প্রধানমন্ত্রী বিশেষ নজর রাখেন। যতটুকু সফলতা এসেছে সেটার কৃতিত্বের দাবিদার প্রধানমন্ত্রী নিজেই। আমরা তার কর্মী হিসেবে কাজ করেছি। আমরা সামনের দিকে অগ্রসর হতে চাই।

বাংলা ট্রিবিউন: যেহেতু বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ আসলো, মুজিববর্ষ নিয়ে আপনার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কী?

মাহবুব আলী: মুজিববর্ষ নিয়ে আমাদের বেশকিছু পরিকল্পনা আছে। জাতীয়ভাবে যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে তার সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবো। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস থেকে যাত্রীদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে। বিমানবন্দরকে বিশেষভাবে সজ্জিত করা হবে। দেশের বিভিন্ন পর্যটনস্থানেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউন: দেশের পর্যটনের বিকাশে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। এ ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বৃদ্ধিতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

মাহবুব আলী: পর্যটন অনেক বিস্তৃত। শুধু আমাদের মন্ত্রণালয়ের একার কাজ না। পর্যটন এমন এক শিল্প, যেখানে পর্যটন নিজের ইচ্ছা, চলাফেরা, কর্মকাণ্ডের সহায়ক পরিবেশ যেখানে পাবে সেখানেই যাবে। আমাদের দেশ এ ব্যাপারে অনেকটা পজেটিভ। শুধু সরকারি নিরাপত্তা দিয়ে হবে না। দেশের মানুষেরও নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে। আমরা সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার চেষ্টা করছি।

বাংলা ট্রিবিউন: বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। সেগুলো সমাধানে কোনও উদ্যোগ কি নিয়েছেন?

মাহবুব আলী: আমাদের বিমানবন্দর, এটি পর্যটক আসার ক্ষেত্রে গেটওয়ে। এখানে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও কাজ করে। ইমিগ্রেশনের কাজটি করে পুলিশ। কিছুদিন আগে আমার সঙ্গে ৫ জন জাপানি নাগরিকের দেখা হলো। তারা অভিযোগ করেন, তারা এসেছেন সাড়ে ১২টায়। তাদের ৪টা পর্যন্ত বিমানবন্দরে বসে থাকতে হয়।

বিষয়টি আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। একজন এডিশনাল এসপিকে আমার কাছে তথ্যসহ পাঠানো হয়েছে। তারা জানালেন, জাপানি নাগরিকদের আধাঘণ্টার মধ্যে সার্ভিস দেওয়া হয়েছে। এখানে ২ ধরনের ভাষ্য পেয়েছি। আমাদের দিক থেকেও অন্য কোনও ত্রুটি থাকতে পারে। এসব সমস্যা যাতে আর না হয় সেজন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছি।

বাংলা ট্রিবিউন: বিমানবন্দরের সেবার মান বৃদ্ধিতে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?

মাহবুব আলী: একটা সময় বিমানবন্দরে লাগেজ দেরিতে পাওয়া নিয়ে অনেক অভিযোগ ছিল। এখন প্রথম লাগেজ ১৬ মিনিটের মধ্যে চলে আসে। সত্য-মিথ্যা বড় কথা নয়, অভিযোগ ছিল মালমাল চুরি হয়। এখন আর সে অভিযোগ নেই। আমরা সর্বত্র সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছি। এনবিআর-এর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি, যাতে বিমানবন্দরে কাস্টমেও কোন হয়রানির ঘটনা না ঘটে। সামগ্রিকভাবে আমাদের সেবার মান বেড়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: নিয়ম না মানায় কখনও কখনও বিমানবন্দরের কর্মীদের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, আমলা ও তাদের সঙ্গে আসা লোকজনদের নিয়ে বিপত্তি পড়তে হয়। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ থাকা সত্ত্বে বায়স্তবায়ন করা যাচেছ না কেন?

মাহবুব আলী: আমরা নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়িয়েছি। অন্যান্য দেশে বিমানবন্দরে প্রবেশের ক্ষেত্রে একটি স্ক্যানিং মেশিন পার হতে হয়, আমাদের এখানে দুটি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যা যা করা দরকার তাই আমরা করছি। এতদিন এসব ছিল না। আমাদের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিচারপতিরা এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন। আমরা সিকিউরিটির প্রশ্নে কোনও ধরনের ছাড় দিইনি। ভবিষতে যেন কোনও এমপি, মন্ত্রী, নেতাদের সঙ্গে লোকজন প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য আমরা সতর্ক। আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি।

বাংলা ট্রিবিউন: সম্প্রতি বিমান ও বেবিচকের কিছু কর্মকর্তার দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনেকেই জিজ্ঞাসাবাদ করছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে মন্ত্রণালয় থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

মাহবুব আলী: সবাই ঢালাওভাবে অপরাধী ভাবলে হবে না। দুদক তাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করছে। মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের যে দায়িত্ব আমরা সেটি পালন করছি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করছি, আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রিভেন্টিভ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনেকগুলো বদলি করা হয়েছে দুর্নীতিবাজদের চেইনকে বিনষ্ট করতে। তবে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে, অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: ২০১৪ সালে ৫ বছরের জন্য মিসরের ইজিপ্ট এয়ার থেকে ২টি উড়োজাহাজ লিজে এনেছিল বিমান। এ জন্য মাসে ১০ কোটি টাকা করে লোকসান গুনতে হয়েছে। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

মাহবুব আলী: মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি থেকে একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। মন্ত্রণালয়ও অনুসন্ধান করছে। আমরা তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবো। বিমানে দুর্নীতি বন্ধ করতে আমরা তৎপর। কিছু লোককে আইডেনটিফাই করা সম্ভব হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলেই শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: বেবিচকের দুর্নীতি রোধে কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছেন?

মাহবুব আলী: সেখানেও সেট-আপে পরিবর্তন এসেছে। সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান, সদস্যপদেও নতুন লোকজন এসেছেন। বিমানবন্দরেও কিছু পদে নতুন লোকজন এসেছেন। আশা করছি নতুন উদ্যমে কাজ হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর নির্মাণের অগ্রগতি কতটা?

মাহবুব আলী: এটির স্থান নির্ধারণে সার্ভে হচ্ছে। আড়িয়াল বিলে একসময় সেখানকার মানুষ বাধা দিয়েছিল। এখন তারাই চাইছে সেখানেই বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর করা হোক। আমরা আশা করছি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: সেবার মান বাড়াতে বেবিচক ভেঙে পৃথক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পৃথক সেবাদাতা সংস্থা করার প্রক্রিয়ার কতদূর এগোলো?

মাহবুব আলী: ভারতেও সার্ভিস ও রেগুলেটরি অথরিটি আলাদা। এই মুহূর্তে আমরা এই ইস্যুতে হাত না দিয়ে প্রাথমিক কাজগুলো নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। আমরা করবো, তবে সময় লাগবে।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রধানমন্ত্রী সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক বিমানবন্দর করার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। এটি বাস্তবায়নে আপনারা কি উদ্যোগ নিয়েছেন?

মাহবুব আলী: সৈয়দপুরে সাড়ে ৯০০ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উন্নয়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন? তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের কাজ কবে নাগাদ শুরু হবে?

মাহবুব আলী: বিমানবন্দরের আউটলুক যাতে আরও ভালো হয় সেজন্য নির্দেশনা দিয়েছি। আমাদের তৃতীয় টার্মিনালের দরপত্র মূল্যায়নের কাজ সমাপ্তির পথে। আশা করছি আগামী ২ মাসের মধ্যে ওয়ার্ক অডার ইস্যু করা সম্ভব হবে। তৃতীয় টার্মিনালে অটোমেশন পদ্ধতিতে সবকিছু হবে।

এইচআই/আপ-এমএএ/

লাইভ

টপ