খুলনায় টেক্সটাইল পল্লি নয়, ফুডকোর্ট-বাণিজ্যিক ভবন চায় বিটিএমসি

Send
এমরান হোসাইন শেখ
প্রকাশিত : ০৭:৫৬, সেপ্টেম্বর ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৫, সেপ্টেম্বর ০৩, ২০১৯

বিটিএমসিবন্ধ হয়ে যাওয়া খুলনা টেক্সটাইল মিল এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত ‘টেক্সটাইল পল্লি’র পরিবর্তে ফুডকোর্ট-রিসোর্টসহ ব্যাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করতে চায় বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল করপোরেশন (বিটিএমসি)। খুলনা নিউমার্কেটের কোল ঘেঁষে অবস্থিত এই টেক্সটাইল মিলের জমিতে প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিটিএমসি এ বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করতে চাচ্ছে। এজন্য বিটিএমসির পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

বিটিএমসির এ প্রস্তাবে সায় দিয়ে সম্প্রতি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি পিপিপির আওতায় টেক্সটাইল মিল এলাকায় বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের সুপারিশ করে। অবশ্য বিটিএমসি তাদের প্রস্তাবনায় বলেছে, টেক্সটাইল পল্লি স্থাপনে উদ্যোক্তাদের সাড়া না পাওয়ায় টেক্সটাইল মিলের সম্পত্তিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, ১৯৩১ সালে ২৬ একর জমির ওপর আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কটন মিল হিসেবে এই টেক্সটাইল মিলের যাত্রা শুরু হয়। নগরীর নিউমার্কেটের পাশে অবস্থিত এই মিলটি ১৯৬০ সালে খুলনা টেক্সটাইল মিল হিসেবে নতুন করে নামকরণ করা হয়। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত এটি আদমজীর অধীনে ছিল। ১৯৭২ সালে মিলটি জাতীয়করণ করা হয়। লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৯৩ সালের ১৯ জুন দেড় হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারীকে ছাঁটাইসহ মিলটি বন্ধ করে দেয় তৎকালীন বিএনপি সরকার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ১৯৯৯ সালে বন্ধ থাকা খুলনা টেক্সটাইল মিলসের জমিতে একটি টেক্সটাইল পল্লি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই প্রস্তাব অনুমোদনও করেন। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের পর ২০০১ সালে তৎকালীন সরকার প্রকল্পটি স্থগিত করে। তবে ২০০৯ সালে বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে আবারও টেক্সটাইল পল্লি স্থাপনের কাজ শুরু হয়। কিন্তু মামলার কারণে খানিকটা জটিলতা দেখা দেয়। মামলা নিষ্পত্তি করে বিটিএমসি খুলনা টেক্সটাইল পল্লি স্থাপনের জন্য ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন সাইজের ২৪টি শিল্প প্লট বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বান করে। কিন্তু এতে সাতটি দরপত্র বিক্রি হলেও কেউ জমা দেয়নি। গত বছর দ্বিতীয় দফা দরপত্র আহ্বান করা হলেও শিল্প উদ্যোক্তারা কেউ সাড়া দেননি।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী আবাসিক এলাকার মধ্যে টেক্সটাইল শিল্প কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই। এ ছাড়া কেউ এখানে টেক্সটাইল শিল্প স্থাপন করতে চাইলে পরিবেশ অধিদফতরেরও ছাড়পত্র পাবে না। সে কারণে শিল্প উদ্যোক্তারা কেউ আগ্রহী হচ্ছেন না।

এ কারণে এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিটিএমসির চেয়ারম্যান খুলনায় গিয়ে কেডিএ চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করে কোনও আশ্বাস পাননি। নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই জায়গায় শিল্প প্রতিষ্ঠায় কেডিএ ঘোর আপত্তি জানিয়েছে।

বিজিএমসি’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা এই প্রকল্প নিয়ে মামলাসহ নানা জটিল সময় পার করেছে। দীর্ঘ প্রচেষ্টায় জটিলতা কাটিয়ে শিল্প প্লট বরাদ্দের জন্য দুই দফায় টেন্ডার দিয়ে শিল্প মালিকদের কোনও সাড়া মেলেনি। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের বিকল্প ভাবতে হচ্ছে।

বিকল্প ভাবনা অনুযায়ী খুলনা টেক্সটাইল পল্লি’র বদলে ডেভেলপিং কোম্পানির মাধ্যমে আবাসিক/বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ওপর জোর দেয় বিটিএমসি। এর অংশ হিসেবে ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ আবাসিক/বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়কে পাঠায় সংস্থাটি। পরে ওই প্রস্তাবনা অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভায় তোলা হলে সেখানে সরকারি মালিকানাধীন অব্যবহৃত জমি বিক্রি না করে প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী সরকারের উন্নয়নমূলক/জনহিতকর কার্যক্রমে ওই জমি ব্যবহারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ বিবেচনা করতে পারে বলে মত দেয়।

ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সেই জমিতে আবাসিক/বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা যাবে কিনা বিষয়টি পর্যালোচনা করে সুস্পষ্ট মতামতসহ পাঠানোর জন্য বিটিএমসিকে চিঠি দেয় মন্ত্রণালয়। তবে, বিটিএমসি ওই সময় কোনও জবাব না পাঠালেও সংসদীয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী গত ৬ আগস্ট প্রস্তাব পাঠিয়েছে।

এর আগে সংসদীয় কমিটির চতুর্থ বৈঠকে বিটিএমসির চেয়ারম্যান খুলনা টেক্সটাইল মিলের জমিতে টেক্সটাইল পল্লি স্থাপনে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পরিবর্তন করে জমির অবস্থান অনুসারে পিপিপির আওতায় ফুডকোর্ট, থিমপার্ক, হাসপাতাল অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ও রিসোর্ট নির্মাণে স্থায়ী কমিটির সুপারিশ চান। পরে বৈঠকে আলোচনা করে তা সুপারিশ করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি মির্জা আজম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, খুলনা টেক্সটাইল মিলটি যে এলাকায় অবস্থিত, সেখানে শিল্পাঞ্চল করার পরিবেশ এখন নেই। যেসব জায়গায় পরিবেশের কারণে শিল্পায়ন সম্ভব নয়, সেখানে অন্যভাবে আয়বর্ধক কর্মসূচি নেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর একটা গাইডলাইন রয়েছে। এটা বিবেচনা করে  বিটিএমসির প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এই সুপারিশ করেছি। এটা এখন বাস্তবায়নের দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের।

বিটিএমসির উপ-মহাব্যবস্থাপক কাজী ফিরোজ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রকল্পটি নিয়ে আমাদের অনেক জটিল সময় পার করতে হয়েছে। জায়গাটা খুলনার হার্ট অব দ্য সিটি। যার কারণে কেডিএ’র নানা আপত্তি। এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না—এসব আর কী। আমরা নিজেদের মতো কাজ করার স্বাধীনতা পাচ্ছি না। এজন্য বিকল্প কিছু ভাবা হচ্ছে। তবে এখনও সুনির্দিষ্ট কোনও প্রকল্প আমরা নিতে পারছি না।

তিনি বলেন, সংসদীয় কমিটি সুপারিশ করেছে পিপিপির আওতায় ওইখানটায় জায়গা ও সময়োপযোগী ভালো একটা কিছু করার। আমরাও মনে করি সেখানে সময়োপযোগী চমৎকার কিছু করা সম্ভব। আমরা সেটা নিয়ে পরিকল্পনা করছি। পিপিপির আওতায় আমাদের আরও ১৬টি প্রকল্প আছে। এটার বিষয়ও আমরা ইতোমধ্যে জানিয়েছি। আমরা এখানে বেস্ট কোনও অপশন বের করার চেষ্টা করছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রকল্প পরিবর্তনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে এখনও কিছু জানানো হয়নি। আগে আমরা কোনটা করতে চাই সেটার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে তা সারসংক্ষেপ আকারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাবো। সেখানে কেন টেক্সটাইল পল্লি সম্ভব হচ্ছে না, সেটা উল্লেখসহ কী এবং কোন কারণে ফুডকোর্ট ও বাণিজ্যিক ভবন করতে চাই সেটা তুলে ধরা হবে।

/ইএইচএস/টিএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ