হিজড়াদের পুনর্বাসন না করায় নানা সমস্যা

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০৭:২৯, এপ্রিল ০৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:২৮, এপ্রিল ০৫, ২০১৬


হিজড়াপান্থপথ সিগন্যালে বসে আছেন বাবা-মেয়ে। কয়েকজন হিজড়া এসে ঘিরে ধরেন তাদের। দাবি করেন ‘বকশিশ’। ছাড়া পেতে পকেট থেকে ১০টাকা বের করে দিতেই একজন টাকা ছুড়ে ফেলেন। হিজড়াদের দাবি অন্তত ৫০ টাকা দিতে হবে।  ট্রাফিক পুলিশ সিগন্যাল ছেড়ে দিলেও হিজড়া দল অনড়। এক ফাঁকে ভদ্রলোক চিৎকার করে হিজড়াদের সরে যেতে বলেন। জবাবে তার মেয়ের উদ্দেশে অশ্লীল মন্তব্য করে  দৌড় দেয় দলটি। কুঁকড়ে উঠে মেয়ের সামনে লজ্জায় কাতর হয়ে ওঠেন বাবা।
হঠাৎ বাসার গেটে হইচই। দরজা খুলতেই হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে পড়তে চাইলেন সালোয়ার-কামিজ এবং শাড়িপরা সাত-আটজন হিজড়া। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা বলতে থাকেন, আগের ভাড়াটিয়ারা সপ্তাহে তিনশ টাকা দিতেন, এখন মাসে পাঁচশ টাকা চাঁদা দিতে হবে। এত টাকা দেওয়া যাবে না বললে গৃহকর্তাকে শারীরিকভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। পরেরদিন থেকে বাসার সামনে নানা ময়লা ফেলে যেতে থাকেন ওই দলের সদস্যরা।
রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোথাও কাজের ব্যবস্থা না থাকায় হিজড়া সম্প্রদায়  বিয়ে বাড়িতে নেচে-গেয়ে, নতুন সন্তান জন্ম দেওয়া অভিভাবকদের কাছে টাকা চেয়ে জীবনযাপন করতেন। মানুষ যা দিত, তা নিয়েই খুশি থাকতেন হিজড়ারা। কিন্তু সম্প্রতি রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি, দোকানপাট যেখানে-সেখানে টাকার জন্য মানুষকে নাজেহাল করার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। এমনকি সিগন্যালে ট্রাফিক পুলিশ, টহল পুলিশ বা সার্জেন্টের সামনেই এসব হয়রানি চলছে।

সাধারণ লোকজনের ওপর হিজড়াদের এসব হয়রানি দেখেও কোনও ব্যবস্থা কেন নেন না—এমন প্রশ্নের জবাবে দায়িত্বরত ট্রাফিক সদস্যরা বলছেন, আমরা এ ব্যাপারে তেমন কিছু করতে পারি না। কিছু বলতে গেলে দলবেঁধে তারাই আমাদের হয়রানি শুরু করবেন। তাদের লাজ-লজ্জা না থাকায় কাপড়ও খুলে ফেলেন, সেটা অস্বস্তিকর।

তবে ট্রাফিক পুলিশের এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করে নিজেকে নারী হিসেবে পরিচয়দানকারী হিজড়া লিসা বলেন, ‘এসব বলে লাভ নেই। সিগন্যালে থাকতে পারি, কারণ আমরা নিজেরাই তাদের টাকার ভাগ দেই। এখন এসব কথা বলে লাভ আছে? তারা থাকতে না দিলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। ঘরভাড়া থেকে শুরু করে পুরো মাসের খাওয়াদাওয়া বাবদ কম করেও কুড়ি হাজার টাকা লাগে। আমাদের তো সবাই বাসাভাড়াও দিতে চান না।

এদিকে, হিজড়া সম্প্রদায় থেকে পুনর্বাসিত হয়েছেন এমন অনেকে বলছেন, একদিকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকা, আরেকদিকে হিজড়া জনগোষ্ঠীর একেক দলের একেক রকম সংস্কৃতির কারণে এ ধরনের হয়রানিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কিছু হিজড়া আছেন, যাদের প্রতি মাসে ভাতার ব্যবস্থা করে দিলেও তারা রাস্তায় এ ধরনের হয়রানিমূলক আচরণ করা থেকে বিরত থাকবেন না। সেক্ষেত্রে কাউন্সিলিং এর মধ্য দিয়ে সরকারকেই পূর্ণ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

​উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে হিজড়ার ‘লিঙ্গ পরিচয়কে’ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

পুরান ঢাকার দিপালী বলেন, আমরা সিগন্যালে কম দাঁড়াই। দোকানে আর বিয়ের বাড়িতে ধরাবাঁধা টাকার ব্যবস্থা করার দিকেই আমাদের মনোযোগ বেশি। তিনি বলেন, আমাদের জন্য কোনও আয়রোজগারের ব্যবস্থা না করে দিলে এতগুলো মানুষ চলবে কী করে। তিনি আরও বলেন, মনে রাখবেন নিপীড়নের শিকার হয়ে মানুষ সহিংস হয়ে ওঠে। এনজিওরা আমাদের পুনর্বাসনের নামে নিজেরা টাকা আয় করে, আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না।

রাস্তাঘাটে বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও মানুষকে আঘাত করা ঠিক কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা ঠিক না। কিন্তু ওদের আমি বললেও শুনবে না। এটা হরমোনাল দোষ।

হিজড়াদের নিয়ে কাজ করেন এমন সংগঠন বা সমিতির কাছে এমনকি রাষ্ট্রের কাছেও হিজড়াদের কোনও সঠিক পরিসংখ্যান নেই। হিজড়াদের সংগঠন বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি বলছে, সারাদেশে হিজড়ার সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ হাজার। আর বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। 

হিজড়া সম্প্রদায়ের একজন মালতী। তিনি কাজ করেন বেসরকারি সংস্থায়। তিনি বলেন, রাস্তাঘাটের এ ধরনের হয়রানি দেখে আমরা লজ্জিত হই। আমাদের পক্ষ থেকে কোনও উদ্যোগ নিয়ে এর প্রতিকার সম্ভব নয়। এটা করতে পারে সরকার। আমাদের সংস্কৃতিতে আছে, বাসায় হিজড়া যাবেন, টাকা বা অন্যকিছু আবদার করবেন, মানুষ খুশি মনে যা দেবেন, তাই নিয়ে ফিরতে হবে। কিন্তু এখন নানা ধরনের ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তিনি বলেন, হিজড়াদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে তার আচরণ নির্ভর করে। যারা মানুষকে বিপদে ফেলে টাকা নেওয়ার পদ্ধতি মেনে বেড়ে উঠেছেন, তাদের যদি ১০ হাজার টাকার চাকরিও দেন, তারা মেনে নেবেন না। কারণ এভাবে অনেক বেশি আয় করেন তারা।

/এফএস/ এমএনএইচ/

লাইভ

টপ