সাক্ষাতকারে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প পরিচালক ২০১৯ সালের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন

Send
ওমর ফারুক
প্রকাশিত : ১৮:৪১, জুলাই ০৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৩, জুলাই ০৫, ২০১৬


গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহবুব-উল-আলম২০১৯ সালের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার গৃহহীন পরিবারকে আবাসনের সুবিধা দিতে কাজ করছে সরকার। এ জন্য যেখানেই খাস জমি পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই নির্মাণ করা হচ্ছে গুচ্ছগ্রাম। ইতিমধ্যে কয়েকটি গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ প্রায় সম্পন্ন করা হয়েছে। শিগগিরই এগুলো উদ্বোধন করা হবে।
বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে এ কথাগুলো বলেন গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহবুব-উল-আলম। তিনি জানান, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার পোড়াগাছায় গুচ্ছগ্রাম উদ্বোধন করেন। ওই গুচ্ছগ্রামের বেশির ভাগ মানুষই এখন প্রতিষ্ঠিত। এরপর বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে গৃহহীনদের পুনর্বাসন করা হয়।
বাংলা ট্রিবিউন : গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের উদ্দেশ্য কী?
মাহবুব-উল-আলম : মূলত নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গৃহহীনদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রথমে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকার ২০০৯ সালে গুচ্ছগ্রাম-১ নামের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়।
বাংলা ট্রিবিউন : প্রথম পর্বে কোথায় কতটি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়?
মাহবুব-উল-আলম : প্রথম পর্বে ২৫৪টি গুচ্ছগ্রামে ১০ হাজার ৭০৩ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। গুচ্ছগ্রামগুলোর বেশির ভাগের অবস্থান বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে। এর মধ্যে খুলনা বিভাগেই রয়েছে বেশি গুচ্ছগ্রাম।
বাংলা ট্রিবিউন : পুনর্বাসনের জন্য টাকা কে দিল?
মাহবুব-উল-আলম : সরকারের পাশাপাশি জাপানি সংস্থা জাইকার জেডিসিএ থেকে প্রকল্পের জন্য ১৮৪ কোটি টাকা পাওয়া গেছে।
বাংলা ট্রি্বিউন : প্রথম পর্বের পর দ্বিতীয় পর্ব কবে শুরু হলো?

মাহবুব-উল-আলম : প্রথম পর্বের সফল সমাপ্তির পরপরই দ্বিতীয় পর্ব হাতে নেয় সরকার। সে অনুযায়ী, ২০১৬ সালের মার্চে গুচ্ছগ্রাম দ্বিতীয় পর্ব যাত্রা শুরু করে।

 বাংলা ট্রিবিউন : দ্বিতীয় পর্বের প্রকল্পে কী কী থাকছে?

মাহবুব-উল-আলম : দ্বিতীয় পর্বে ৫০ হাজার গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে। এ জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে ২০১৯ সাল পর্যন্ত। সেই টার্গেট অনুযায়ী আমরা দ্রুত গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করছি। বর্তমানে দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলায় পালিবটতলী গুচ্ছগ্রাম নির্মাণের কাজ চলছে। সেখানে পাওয়া আড়াই একর খাস জমিতে ত্রিশটি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে। হিলিতে আরও ৫০ বিঘা খাস জমি পাওয়া গেছে। সেখানেও গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা হয়েছে। মাননীয় ভূমিমন্ত্রী এই গুচ্ছগ্রামটি উদ্বোধন করতে পারেন।

ময়মনসিংহ সদরে চর ঈশ্বরদিয়ায় এক একর ২৩ শতক জমিতে ত্রিশটি পরিবারকে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া চলছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে হবে নওদাপাড়া-৩ নামের একটি গুচ্ছগ্রাম। সেখানে ৩ একর ৩৫ শতক জমিতে ৪০ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে। ফরিদপুর সদরের বাকুন্ডায় তৃতীয় গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা হবে।

চলতি অর্থবছরে সবমিলিয়ে আমরা ১৭ জেলার ২৬ উপজেলায় ৪৭টি গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করে প্রায় ৮০০ পরিবারকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছি।

 বাংলা ট্রিবিউন : প্রথম বছর যদি মাত্র আটশ’ পরিবারকে পুনর্বাসন করেন, তাহলে বাকি তিন বছরে পঞ্চাশ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসনের টার্গেট পূরণ করবেন কিভাবে?

মাহবুব-উল-আলম : সরকারের জন্য এটা কঠিন কিছু না। কেননা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমরা ১৫ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করেছি। এরপর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৬ হাজার এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ হাজার ২০০ পরিবারকে পুনর্বাসনের টার্গেট নির্ধারণ করেছি।

 বাংলা ট্রিবিউন : গুচ্ছগ্রাম দ্বিতীয় পর্বের ব্যয় ধরা হয়েছে কত? টাকার উৎস কি?

মাহবুব-উল-আলম : দ্বিতীয় পর্বটি যখন হাতে নেওয়া হয়, তখন ১০ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসনের টার্গেট করা হয়েছিল। ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৫৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা। পরে প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে ৫০ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসনের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়। এ কারণে প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধন করা হচ্ছে। যেহেতু পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে, সেহেতু প্রকল্প ব্যয়ও বাড়বে।

 বাংলা ট্রিবিউন : গুচ্ছগ্রামে কী কী সুবিধা আছে?

মাহবুব-উল-আলম : প্রতি পরিবারকে ৩-৮ শতাংশ খাস জমি দেওয়া হচ্ছে। এ জমিতে দুই রুমের (তিনশ বর্গফুট) একটি বাড়ি। বাড়ির সবগুলো রুম টিনের। টিন দেওয়া হচ্ছে এ কারণে যে, কখনও নদীভাঙন হলে যেন এসব বাড়ি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া যায়। কোনও কাঠ না থাকায় বাড়িগুলো হয়েছে খুবই মজবুত ও টেকসই। ঘরের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুম নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে।

ঘরের বারান্দায় থাকছে মাটির তৈরি আধুনিক চুলা। পাঁচটি পরিবারের জন্য দেওয়া হচ্ছে একটি নলকূপ। প্রতি পরিবারের জন্য থাকছে পাঁচশ’ টাকা দামের ঔষধি ও ফলজ জাতীয় গাছ। জমির রেজিস্ট্রেশন খরচও আমরা দিচ্ছি।

গৃহহীন পরিবারের ব্যবসার জন্য ঋণ দেওয়া হয় পরিবারপ্রতি ১৫ হাজার টাকা। স্বাবলম্বী হতে পরিবারের সদস্যদের ট্রেনিং এবং ট্রেনিং চলাকালে ভাতা দেওয়া হয়। পাশাপাশি পুরুষ ও নারীদের জন্য দুটি সমিতি করে দেওয়া হয়, যাতে পুনর্বাসিত লোকজন সঞ্চয়ী হতে পারেন। দ্বিতীয় পর্বে এসব ছাড়াও নতুন যোগ করা হয়েছে প্রতিটি গুচ্ছগ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।

 বাংলা ট্রিবিউন : কোন শ্রেণির নাগরিক এসব গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসিত হতে পারেন?

মাহবুব-উল-আলম : দুর্যোগের কারণে গৃহহীনরাই গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসিত হতে পারেন।

 বাংলা ট্রিবিউন : গৃহহীনদের নির্বাচন করেন কিভাবে?

মাহবুব-উল-আলম : প্রতিটি উপজেলায় স্থানীয়ভাবে ‘খাস জমি ব্যবস্থাপনা কমিটি’ রয়েছে। এই কমিটি সবদিক যাচাই করে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের তালিকা তৈরি করে। এ তালিকা দেখে আমরা পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিই।

 বাংলা ট্রি্বিউন : কেউ যদি পুনর্বাসনের নামে গুচ্ছগ্রামে বরাদ্দ পাওয়া বাড়ি বিক্রি করে কিংবা ভাড়া দিয়ে দেন তাহলে আপনারা কী করবেন?

মাহবুব-উল-আলম : গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসিত হওয়ার প্রথম শর্তই হল নির্বাচিত পরিবারকে গৃহহীন ও ভূমিহীন হতে হবে। বরাদ্দ পাওয়া বাড়িতে অবশ্যই ওই পরিবারকে বসবাস করতে হবে। এ বাড়ি বিক্রিও করা যাবে না। কেউ যদি গুচ্ছগ্রামে না থাকেন তাহলে তার বরাদ্দ বাতিল হয়ে যাবে। ইতিপূর্বে এমন অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় কয়েকটি বরাদ্দ বাতিল করা হয়। সুতরাং গুচ্ছগ্রামে জালিয়াতি বা অনিয়মের কোনও সুযোগ নেই।

/ওএফ/এসএ/এপিএইচ/

আরও পড়ুন: 

বগুড়ায় আট একর জায়গায় গুচ্ছগ্রাম, ঠাঁই হবে ৪০ পরিবারের

গুচ্ছগ্রাম যেখানে তুচ্ছ

 

লাইভ

টপ