এসি বিস্ফোরণে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ০৫:৩২, মে ২৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৮, মে ২৭, ২০১৭

অগ্নিদগ্ধএসি বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তির সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। জানা গেছে, বার্ন ইউনিটসহ বিভিন্ন হাসপাতালেও চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও এসির কম্প্রেসার বিস্ফোরণে গুরুতর দগ্ধদের মধ্যে অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। এছাড়া বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেও অনেকে মারা গেচ্ছেন। এসি বিক্রেতা ও মেরামতকারীরা বলছেন, এসি নিম্নমানের হওয়া ছাড়াও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কম্প্রেসার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। এর ফলে গুরুতর দগ্ধ ও নিহতের সংখ্যাও বাড়ছে।

চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল এলিফ্যান্ট রোডে এক ভবনে এসি বিস্ফোরণে দগ্ধ হন প্রকৌশলী উৎপল চক্রবর্তী। এরপর বার্ন ও পরে সিটি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়।  চিকিৎসাধীন অবস্থায়ী উৎপল ২০ মে সন্ধ্যায় মারা যান।

এর আগে ২০১৬ সালের ২৭ আগস্ট টিপু সুলতান রোডের অবস্থিত নিজ বাড়িতে এসি বিস্ফোরণে আহত হন শিশু নাতি ফাহিমসহ পারুল বেগম। এ ঘটনার পরপরই দু’জনকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। ওইদিনই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফাহিম মারা যায়। আর ২ সেপ্টেম্বরে মারা যান পারুল বেগম।

একই বছরের ১৮ জুলাই রাজধানীর খামারবাড়িতে একটি অফিসের এসি মেরামতের সময় বিস্ফোরণে দগ্ধ হন টেকনেশিয়ান নাদিম ও হাসান। ঘটনার পরপরই তাদের ঢামেকে ভর্তি করা হয়। সেখানে তারা সাংবাদিকদের জানান, ‘দীর্ঘদিন অচল থাকা এসি মেরামত করে চালুর সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে।’

৫ জুলাই রাজধানীর গুলশানের নর্দা এলাকায় একটি সেলুনে এসি বিস্ফোরণে দগ্ধ হন ১৪ জন। এর মধ্যে ৯ জন গুরুতর দগ্ধ হন। দীর্ঘদিনে চিকিৎসায় তারা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। 

ঢামেক বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত দেড় বছরে এসি বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে আসা রোগীর সংখ্যা ২৫ থেকে ২৭ জনের মতো। তার ভেতরে মারা গেছেন ৯ জন।’ তবে কয়েকবছর আগেও এত এসি বিস্ফোরণ হতো না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এসি বিস্ফোরণে দগ্ধ ও মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে।’

এলজি বাটার ফ্লাই কোম্পানির হাতিরপুল শাখার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার উম্মে কুলসুম সুইটি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেশির ভাগ সময়ই ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না করায় এসি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। অনেক সময় কম্প্রেসারের ভেতরে জ্যাম লেগে থাকে, গ্যাস লিক হয়ে যায়। সময়মতো সার্ভিসিং না করালে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না করলে পুরনো এসিই হয়ে উঠতে পারে ঘাতক।’  

প্রায় ২০ বছর ধরে এসির ব্যবসা করেন বশীর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বৈদ্যুতিক হাই ভোল্টেজের কারণেই এসব ঘটনা ঘটে। হাইভোল্টেজের কারণে যেকোনও ইলেক্ট্রিক মেশিনের ওপর চাপ সৃষ্টি হলেই সেখানে সমস্যা হবে। এ জন্য প্রতিটি ভবনে সার্কিট ব্রেকার, ভালো মানের আর্থিং লাইন থাকতে হবে।’  স্প্লিট এসির চেয়ে উইনডো এসির কম্প্রেসারে বিস্ফোরণের আশঙ্কা বেশি বলেও জানান তিনি।

এলজি বাটারফ্লাই ডেপুটি ম্যানেজার (সার্ভিস) এমডি জাহাঙ্গীর উদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেক সময় বার্নেবল গ্যাসের কারণে এসি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। আবার এসির প্রেসার বেড়ে গেলেও কম্প্রেসার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘নিয়ম করে ভালো মানের টেকনেশিয়ান দিয়ে এসির সার্ভিসিং করাতে হবে। রক্ষণাবেক্ষণ না করলেও অনেক সময় সংযোগস্থলে ধুলোবালি জমে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যেটা সবসময় চেকআপে রাখতে হয়। আবার বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াও এসি বিস্ফোরণের একটি কারণ। ভবনগুলোর ছাদে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা  রাখলে এ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।’

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্র্যান্ডের কর্মকর্তা বলেন, ‘বিদেশ থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এসির যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়। এসব মানহীন যন্ত্রাংশই শহরের বিভিন্ন অনুমোদনহীন কারখানায় দামি ব্র্যান্ডের নাম লাগিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘গত বছরের নভেম্বর মাসেই শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর চট্টগ্রাম থেকে ১০ কোটি টাকার ১ হাজার ১০০ নকল এয়ারকন্ডিশন আটক করেছে। আটকের পর দেখা গেছে, সেগুলোতে নামি ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করা হয়েছে।  মূলত এসব নিম্নমানের  এসিতেই বিস্ফোরণ হচ্ছে।’

এদিকে স্যামসাং বাংলাদেশের হেড অব কাস্টমার স্যাটিসফেকশন সার্ভিস তানভীর শাহেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসি এক নাগাড়ে ৮ ঘণ্টার বেশি চালানো উচিত নয়। চালালে কম্প্রেসারে চাপ পড়ে। আউটডোর ইউনিট ও আউটডোর বিল্ডিংয়ের মধ্যে যথেষ্ট ফাঁকা স্থান রাখা উচিত, যেন কম্প্রেসারে বাধাহীনভাবে বাতাস চলাচল করতে পারে। একইসঙ্গে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে বছরে অন্তত দুই বার সার্ভিসিং করানো উচিত। ত্রুটিপূর্ণ ইনস্টলেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসি বিস্ফোরণ ঘটে বেশি।’

/এমএনএইচ/আপ-এমডিপি/ 

লাইভ

টপ