এমন আরও র‌্যাংকিং হওয়া প্রয়োজন: ইউজিসি চেয়ারম্যান

Send
শেগুফতা হাসনাইন সূরুর
প্রকাশিত : ২৩:৪৫, নভেম্বর ১২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:১০, নভেম্বর ১৩, ২০১৭

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নানবাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং ২০১৭’-এর প্রশংসা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান। এই ধরনের র‌্যাংকিংকে উচ্চ শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অভিহিত করে তিনি বলেন, এমন র‌্যাংকিং শিক্ষার্থীদের নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও নীতিনির্ধারকদেরও সহায়তা করে থাকে। এ ধরনের আরও র‌্যাংকিং করার জন্যও আহ্বান জানিয়েছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান।

বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং ২০১৭ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

এটা নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য জনপ্রিয় ও স্বীকৃত র‌্যাংকিং রয়েছে। এই জরিপের মতো অনেক জরিপই পরিচালনা করে থাকে গণমাধ্যম, বিশেষ করে পত্রিকাগুলো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়— যুক্তরাজ্যে টাইমস, যুক্তরাষ্ট্রে ইউএস নিউজ ও ভারতে ইন্ডিয়া টুডে প্রকাশ করে থাকে এমন র‌্যাংকিং। এছাড়া, কিউএস র‌্যাংকিংয়ের মতো কিছু জরিপ পেশাদার এজেন্সিগুলোও পরিচালনা করে থাকে। অনেক দেশে আবার সরকারি অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং করে থাকে।

আমি আশা করি, এই র‌্যাংকিংয়ের মতো আরও অনেক র‌্যাংকিং বাংলাদেশে হবে। অন্যদের যেমন এটা করা উচিত, ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউনেরও এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখা উচিত। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একসঙ্গে নিয়ে যেমন র‌্যাংকিং হতে পারে, তেমনি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা র‌্যাংকিংও হতে পারে।

এসব র‌্যাংকিংয়ের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো তাদের যতটা সম্ভব নৈর্ব্যক্তিক হতে হবে। এতে পক্ষপাত থাকা যাবে না। কোনও র‌্যাংকিংয়ের সঙ্গেই সবাই একমত হবে না। তবে র‌্যাংকিংকে অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং শিক্ষার্থী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কতটা দরকারি হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশে আমরা এ ধরনের র‌্যাংকিংয়ের সঙ্গে পরিচিত নই। তাই রাতারাতি সবাই এই র‌্যাংকিংকে স্বাগত জানাবে— এমনটি প্রত্যাশা করার কারণ নেই। তবে আমি আশা করব সবাই একে ইতিবাচকভাবে নেবেন। এটা ভালো একটি কাজ এবং আমরা আশা করি এই উদ্যোগ প্রশংসিত হবে। এই র‌্যাংকিংয়ে কোনও ঘাটতি রয়েছে মনে করলে কিংবা এর কোনও অংশ নিয়ে কোনও দ্বিমত থাকলে সেটাও সবার তুলে ধরা উচিত। এমন মতভিন্নতা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। যেকোনও ভালো কাজকেই সমালোচনা ও অন্যদের মতামতের জন্যও উন্মুক্ত থাকা উচিত।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো— তা বাছাই করার জন্য শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা এই র‌্যাংকিং ব্যবহার করতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের যেসব বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন র‌্যাংকিংয়ে ক্রমাগত ভালো করতে থাকে, তারা সরকারের কাছ থেকে বেশি বেশি বরাদ্দ পায়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেশি আর্থিক সুবিধা পায় বা সহজে শিক্ষা ঋণ পেতে পারে।

আবার ইংল্যান্ডে প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট কলেজ রয়েছে। সরকারের উচ্চ শিক্ষা বিষয়ক তহবিল কাউন্সিল (এইচইএফসিই) নিয়মিত কলেজগুলোকে মূল্যায়ন করে থাকে। মূল্যায়নে ভালো ফল করা কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা বেশি সুবিধা পেয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, এইচইএফসিই’র র‌্যাংকিংয়ে গোল্ড-রেটেড কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের বলতে গেলে কোনও খরচই হয় না।

কাজেই, একটি র‌্যাংকিংকে বিভিন্নভাবেই ব্যবহার করা যেতে পারে।

এই র‌্যাংকিংয়ে কোনও চমক আছে বলে মনে হয়েছে আপনার কাছে?

এই র‌্যাংকিংয়ে দেশের সবচেয়ে পুরনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি রয়েছে ওপরের দিকে। আবার ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এর অনেক পরে প্রতিষ্ঠিত হলেও এটিও র‌্যাংকিংয়ের ওপরের দিকে উঠে এসেছে। এটাকে আমার কাছে ইতিবাচক লক্ষণ মনে হয়েছে। বয়সের দিক থেকে নতুন হলেও বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় দেখাতে সক্ষম হয়েছে যে তারাও ভালো করছে।

অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই অনেক আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমার মনে হয়, তারাও এখন উপলব্ধি করবে যে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা করানোই যথেষ্ট নয়, চাকরিদাতারা এখন নিয়োগের সময় এ ধরনের র‌্যাংকিংও বিবেচনায় নেবে। অনেক দেশেই এমনটি হয়ে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রকাশিত বিশ্বের বিভিন্ন র‌্যাংকিং বিষয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই।

একেকটি র‌্যাংকিংয়ে একেক ধরনের মাপকাঠি ব্যবহার করা হয়। যেমন— টাইমস হায়ার এডুকেশন র‌্যাংকিংয়ে শিক্ষাদানকে স্কোরিং প্রক্রিয়ার জন্য আবশ্যক উপাদান হিসেবে ধরা হয়। এছাড়া, গবেষণা, আয় ও খ্যাতিকেও বিবেচনায় নেওয়া হয় এই র‌্যাংকিংয়ে। এর অর্থ হলো— শীর্ষ পর্যায়ের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল অনেক বেশি গবেষণা করাকেই তাদের আকার ও খ্যাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। একইসঙ্গে এই গবেষণাগুলোর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি কেমন আয় করছে, সেটাও বিবেচনায় নেওয়া হয়।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাকাল্টি ও শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কিছু কিছু র‌্যাংকিংয়ে বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষে অবস্থান করে তাদের নোবেল জয়ীদের সংখ্যা দিয়ে, মেধাস্বত্ব বিক্রি করে কত অর্থ আয় করছে, সাবেক শিক্ষার্থীদের দেওয়া বৃত্তির অর্থের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে। আমার তো মনে হয়, হার্ভার্ডের বার্ষিক বৃত্তির অর্থের পরিমাণ চারশ থেকে পাঁচশ কোটি ডলার।

ফলে ওই র‌্যাংকিংগুলোর সঙ্গে এটির তুলনা করা যায় না। আমরা ওই পর্যায়ে যেতে পারিনি। আমরা আমাদের নিজস্ব র‌্যাংকিং করতে পারি। যেমন করেছে ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউন। অন্যরাও এটা করতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন পেশাদারিত্ব ও বস্তুনিষ্ঠতা।

কীভাবে উচ্চ শিক্ষা কমিশন উচ্চ শিক্ষার পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারে?

কিছুদিন ধরেই আমরা উচ্চ শিক্ষা কমিশন গঠনের চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার আগের চেয়ারপারসনও একই চেষ্টা করেছেন। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের একাধিক বৈঠক হয়েছে। আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। আমার আশাবাদী, বিষয়টি এগিয়ে যাচ্ছে।

যখন ইউজিসি গঠন করা হয় তখন মাত্র ছয়টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এখন কমিশনের কাজ শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আমাদের কাজের ক্ষেত্র বেড়েছে অনেক। এখন দেশে ৪২টি সরকারি ও ৯৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৫ লাখ শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে।

আমাদের যে সামর্থ্য ও আইনি কাঠামো রয়েছে তা আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের সবটুকু করার জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে যখন উচ্চ শিক্ষা কমিশন গঠনের কথা বলা হয়, তখন আমরা নতুন কিছু গঠন না করে বরং ইউজিসির আওতা ও আইনি সামর্থ্য বৃদ্ধির কথাই বলি।

এই ধরনের কমিশন এ অঞ্চলের প্রায় সব দেশেই রয়েছে। ভারতে আছে ইউজিসি, তারা এখন হায়ার এডুকেশন এমপাওয়ারমেন্ট রেগুলেশন এজেন্সি’তে পরিণত হতে যাচ্ছে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কারিগরি, মেডিক্যাল কলেজ ও উচ্চ শিক্ষার সব প্রতিষ্ঠানই এর আওতায় থাকবে।

উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ের সব বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সবসময় মনোযোগ দিতে পারে না। তারপরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কমিশনকে এখনও মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। আমরা তাদের শুধু পরামর্শ দিতে পারি এবং তারাও সবসময় সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে না। অদূর ভবিষ্যতে দেশে আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় হবে এবং অনেক বেশি শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করবে। তাই সময়ের তাগিদেই আমাদের উচ্চ শিক্ষা কমিশন প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী নিজেই ব্যক্তিগতভাবে এর পক্ষে থাকায় শিগগিরই ইতিবাচক ফল আসবে বলে আমরা আশাবাদী।
আরও পড়ুন:
শীর্ষে ব্র্যাক, দ্বিতীয় নর্থ সাউথ
যে প্রক্রিয়ায় হলো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং ২০১৭

/এএ/টিআর/

লাইভ

টপ