চাপ কমাতে বিষয় ও নম্বর কমছে জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষায়

Send
রশিদ আল রুহানী
প্রকাশিত : ০১:৪৮, জুন ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১০, জুন ১৩, ২০১৮





জেএসসি

প্রাথমিক স্কুল সার্টিফিকেট (পিইসি) ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা চালুর পর থেকে শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকরা দাবি করে আসছিলেন, এই পরীক্ষা দুটি শিশুদের মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে, শিক্ষার্থীদের ওপর অনেক চাপ পড়ছে। ফলে পরীক্ষা দুটি বাতিলে জোর দাবি তোলেন তারা। তবে সরকার বাতিলের পক্ষে মত না দিলেও পরীক্ষা পদ্ধতির কিছুটা সংস্কার করা হবে বলে গত কয়েক বছর ধরেই গুঞ্জন ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় এবার জেএসসি এবং জেডিসি (জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট) পরীক্ষার বিষয় ও প্রশ্নপত্রের নম্বর কমিয়ে নতুন মানবণ্টন চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ বছর থেকে এই মানবণ্টন অনুযায়ী এ দুটি পরীক্ষা নেওয়া হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে জানানো হয়েছে, এতদিন ধরে জেএসসি পরীক্ষা হতো ৮৫০ নম্বরের এবং জেডিসি পরীক্ষা হতো ১ হাজার ৫০ নম্বরের। কিন্তু আগামী পরীক্ষা থেকেই জেএসসিতে ৮৫০ নম্বরের পরিবর্তে ৬৫০ নম্বর এবং জেডিসিতে ১ হাজার ৫০ নম্বরের পরিবর্তে ৮৫০ নম্বরের পরীক্ষা হবে। এছাড়া বাংলা প্রথম ও বাংলা দ্বিতীয়পত্রের আলাদা ২ বিষয়ের পরীক্ষা বাদ দিয়ে একত্র করে ১টি পরীক্ষা এবং ইংরেজি প্রথম এবং ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রের ২ বিষয়ের ২টি পরীক্ষা বাদ দিয়ে একত্র করে ১টি পরীক্ষা নেওয়া হবে। এতে বাংলার দুটি পত্র একত্রে ১০০ নম্বরের এবং ইংরেজি দুটি পত্র একত্র করে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা হবে। এতদিন এই ৪ বিষয়ের পরীক্ষায় মোট ৩০০ নম্বরের পরীক্ষা হতো। এছাড়া ঐচ্ছিক বিষয়ের (গার্হস্থ্য অর্থনীতি অথবা কৃষিসহ অন্যান্য) ১০০ নম্বরের পরীক্ষা হবে না। শ্রেণিতেই ধারাবাহিকভাবে এর নম্বর মূল্যায়ন করা হবে।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যানদের সংগঠন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির সুপারিশের আলোকে এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জানতে চাইলে এই কমিটির অন্যতম সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক কায়কোবাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পিইসি এবং জেএসসি পরীক্ষা শুরুর পর থেকেই শিশুদের মাঝে নানারকম সমস্যা দেখা দিয়েছে। শিশুরা ঠিকমতো খেতে পারে না, ঘুমাতে পারে না, খেলতে পারে না। সব সময় পাড়াশোনা নিয়েই থাকে, তাদের ওপর রীতিমতো নির্যাতন চালানো হয়। এতে তাদের মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে অনেকদিন ধরেই বারবার বলা হচ্ছে এই পরীক্ষা দুটি বাতিল করতে, কিন্তু সেটা সহজেই সম্ভব হবে না। ফলে নম্বর ও বিষয় কমিয়ে শিশুদের ওপর থেকে কিছুটা চাপ কমানো সম্ভব বলে মনে করি।’
তিনি বলেন, ‘কোনও গবেষণা নেই, কোনও বিশ্লেষণ নেই, হঠাৎ করে যা খুশি তা করার প্রবণতা দেখা যায়। পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা চালু করা হয়েছিল সেভাবেই। এই পরীক্ষা চালু করার আগে কোনও গবেষণা করা হয়নি। এখন তো দেখতেই পাই শিশু ও অভিভাবকদের কী অবস্থা। তারা নাভিশ্বাস পরিস্থিতির মধ্যে দিন পার করেন। এ থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া জরুরি।’

এদিকে নম্বর ও বিষয় কমানোয় শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে আসলেই চাপ কমবে কিনা জানতে চাইলে কয়েকজন অভিভাবক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, নম্বর ও বিষয় কমানোয় শিশুদের ওপর থেকে চাপ কিছুটা কমবে ঠিকই, তবে সেটা খুবই যৎসামান্য। ঐচ্ছিক বিষয়ের ১০০ নম্বর যদি ক্লাসের পারফরম্যান্সের ওপর ধারাবাহিকভাবে করা হয় তাহলে সেটা হয়তো কিছুটা চাপ কমাবে। কিন্তু পরীক্ষা ৪টির জায়গায় ২টি হলে চাপ একদিক দিয়ে কমলেও মূলত চাপ আরও বেড়ে গেল। কারণ, ১০০ নম্বরের জন্য আগের মতো পুরো বই-ই তো পড়তে হবে।
নম্বর কমানোর সিদ্ধান্তের পর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) থেকে এ মানবণ্টন তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে নতুন এ মানবণ্টন এনসিটিবি’র ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
ওই মানবণ্টন থেকে জানা গেছে, বাংলার ১০০ নম্বরের মধ্যে সৃজনশীল ও রচনামূলক অংশে ৭০ নম্বর এবং বহুনির্বাচনি অংশে ৩০ নম্বর বরাদ্দ থাকবে। প্রতিটি সৃজনশীল প্রশ্নের নম্বর ১০ এবং প্রতিটি বহুনির্বাচনি (এমসিকিউ) প্রশ্নে নম্বর থাকবে এক। বাংলায় গদ্যাংশ থেকে ৪টি এবং কবিতা থেকে ৩টি করে মোট ৭টি সৃজনশীল প্রশ্ন থাকবে। এরমধ্যে গদ্য ও কবিতা অংশ থেকে ২টি করে মোট ৪টি সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, যার নম্বর থাকবে ৪০।
সারাংশ, চিঠি এবং ভাবসম্প্রসারণ— এই ৩টি অংশের জন্য মোট ১৫ নম্বর বরাদ্দ থাকবে, প্রতিটির জন্য ৫ নম্বর। ৩টি রচনার মধ্যে যেকোনও ১টির উত্তর লিখতে হবে; এর জন্য ১৫ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও বহুনির্বাচনি প্রশ্নে গদ্য অংশ থেকে ৮টি, কবিতা থেকে ৮টি এবং ব্যাকরণ থেকে ১৪টি, মোট ৩০ বহুনির্বাচনি প্রশ্ন থাকবে।
আবার ইংরেজি বিষয়কে ৪টি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। পার্ট ‘এ’ অংশে এমসিকিউ রাখা হয়েছে; সেখানে সিন প্যাসেজ অংশে (রিডিং টেস্ট) ৭টি প্রশ্ন, শূন্যস্থান পূরণে ৫টি এবং সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তরমূলক ৮টি (প্রতিটিতে ২ নম্বর) প্রশ্ন থাকবে। পার্ট ‘বি’-তে ইনফরমেশন ট্রান্সফারে ৫ নম্বর, সত্য/মিথ্যায় ৫ নম্বর, বিষয় শনাক্তকরণ (সূত্র ছাড়া ও সূত্রযুক্ত) ৫ যোগ ৫ মোট ১০ এবং মিলকরণে ৫ নম্বর রয়েছে।
এদিকে, পার্ট ‘সি’-তে রয়েছে গ্রামার প্রশ্ন। এ অংশে থাকবে মোট ২৫ নম্বর; সেখানে বক্তৃতা ৫, যতিচিহ্ন প্রশ্নে ৫, ইউজ অব আর্টিক্যালে ৫, ভয়েস, সেনটেন্স, ইন্ট্রোগেটিভ, অ্যাফারমেটিভ, নেগেটিভ, এক্সক্ল্যামেটরি, সাফিক্স এবং প্রি-ফিক্স প্রশ্নে ৫ নম্বর দেওয়া থাকবে। সর্বশেষ ‘ডি’ অংশে রয়েছে ডায়ালগ ১০, প্যারাগ্রাফ ১০, ফরমাল/ইনফরমাল ই-মেইল ১০ নম্বর যুক্ত করা হয়েছে।
এ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নম্বর এবং বিষয় কমানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে গত ৩১ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে শিক্ষা সচিব সোহরাব হোসাইন বলেন, ‘বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর লেখাপড়ায় চাপ দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয় আমলে নিয়ে জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় বিষয় ও নম্বর কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে এখানে শিখন ফলাফল অক্ষুণ্ন রেখে নম্বর এবং বিষয় কমানো হয়েছে, যাতে একজন শিক্ষার্থী সঠিক শিক্ষাটা আয়ত্ত করতে পারে।’

বিভিন্ন বোর্ড চেয়ারম্যানদের সুপারিশের ভিত্তিতে বিষয় এবং নম্বর কমানো হয়েছে জানিয়ে সচিব বলেন, ‘সে অনুযায়ী সিলেবাসও তৈরি করা হবে। যেহেতু বিষয় এবং নম্বর কমানো হয়েছে, তাই শিক্ষার্থীদের ওপর এর কোনও চাপ পড়বে না।’

/এইচআই/চেক-এমওএফ/

লাইভ

টপ