বাইরে তালা, ভেতরে খোলা

Send
তাসকিনা ইয়াসমিন
প্রকাশিত : ২০:৫৯, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:১০, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮

শ্যামলীর একটি ভবনের চারতলায় ডেকোরেশন চলছে নিউ ওয়েল কেয়ার হাসপাতালের

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বন্ধের নির্দেশ পাওয়া লাইসেন্সবিহীন ১৪টি হাসপাতালের বেশিরভাগেরই বাইরে তালা, কিন্তু ভেতরে এখনও চলছে রোগী ভর্তিসহ নানা কার্যক্রম। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষগুলো জানিয়েছে, মানবিক কারণে রোগীদের ছেড়ে দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় তাদের এখনও হাসপাতালে রাখা হয়েছে।

আজ বুধবার সরেজমিনে এই হাসপাতালগুলো পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, গত রাতের মতো আজও বেশিরভাগ হাসপাতালের কর্মী হাইকোর্টের রায় নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন।  

লাইসেন্সবিহীন নিউ ওয়েল কেয়ার হাসপাতালের সামনে আজও ছিল রোগীর স্বজনদের উপস্থিতি। হোসপাতালে এখনও ভর্তি আছে রোগী।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত নিউ ওয়েল কেয়ার হাসপাতালটি এখন স্থান পরিবর্তন করে শ্যামলীর রূপায়ন শেলফোর্ড টাওয়ারের চতুর্থ তলায় অবস্থিত। এই টাওয়ারের দারোয়ান জনি বলেন, এই নামে একটি হাসপাতাল আছে ভবনে, কিন্তু বাইরে কোনও সাইনবোর্ড নেই।  এরপর চারতলায় গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালটির এখনও ডেকোরেশনের কাজ চলছে। কয়েকজন রোগীর আত্মীয় রিসেপশনে টিভি দেখছেন। হাসপাতালের রিসেপশনিস্ট বলেন, প্রায় সব রোগী হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়ে দিয়েছি। আমাদের কাগজপত্র ঠিক করে আবার নতুন করে হাসপাতাল চালু করবে কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালের ম্যানেজার বিএম জাহাঙ্গীর বলেন, আমাদের কাগজপত্র নতুন করে নিবন্ধনের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে। আগে  মোহাম্মদপুরে যে নামে ছিল সেই নামে আর চলবে না। তাই নতুন নামে হাসপাতাল নিবন্ধন করার চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, ঢাকা ট্রমা সেন্টারের কাছে আমাদের রোগীগুলো শিফট করে দেবো। যে স্যারের ( বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক) অধীনে এখানে রোগীরা আছেন তার অধীনেই থেকে যাবেন। তিনি ওখানেও রোগী দেখেন।  এই হাসপাতালের সত্ত্বাধিকারী মো. দেলোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার একটা ভাগ্নে স্বাস্থ্য অধিদফতরে চাকরি করত। তার মাধ্যমে লাইসেন্স (নিবন্ধন) নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। প্রথমে রামপুরাতে যৌথভাবে এই হাসপাতাল ছিল। তখন নাম ছিল নিউ কেয়ার হাসপাতাল। এরপর মোহাম্মদপুরে নিয়ে আসি তখন আমার ভাগ্নে পরামর্শ দেয় যে, নিজের নামে রেজিস্ট্রেশন করতে চাইলে নিউ ওয়েল কেয়ার নাম দিলে ভালো হয়। এটা এই নামে চালানোর সময় ম্যাজিস্ট্রেট এসে সিলগালা করে দেয়। এরপর থেকে এখানে নতুন নামে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে করার চেষ্টা করছি। ডেকোরেশনে এক কোটি টাকার মতো খরচ করেছি। নতুন রোগী আসে না। পুরনো রোগীরাই আসে।

তিনি বলেন, বাকি ১৩ টি হাসপাতালের মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। অন্যরা করবে আমরাও তাই করবো। আসলে কি লাইসেন্স দেবে না বন্ধ করে দেবে? সরকারের আইন মেনে চলতে হবে। ২০ শয্যা আছে এই হাসপাতালের।

বিডিএম হাসপাতালের রিসেপশনের সামনে অপেক্ষা করছেন রোগীর স্বজনরা

অনুমোদনহীন এই হাসপাতালের রোগীদের আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বললে তারা নিজেদের সন্তুষ্টির কথা জানান। রোগীর আত্মীয় ওয়াকিল উদ্দিন তার রোগী মাহমুদা আক্তারকে এখানে ভর্তি করেছেন। গত বৃহস্পতিবার থেকে রোগী ভর্তি আছে। তিনি বলেন, আমার রোগীর পড়ে গিয়ে মাজায় আঘাত পেয়েছে। সে  এখন ভালো আছে।

তবে, বেশিরভাগ হাসপাতাল মালিক এবং কর্মীরা হাইকোর্টের নির্দেশনা শুনেছেন বলে জানান। মালিকপক্ষ বলেন, তারা আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আইনগতভাবেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন। অন্যদিকে, লঅইসেন্স থাকার দাবি করে এই তালিকায় কেন তাদের নাম দেওয়া হলো সেটা নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছে  বিডিএম হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ।

মোহাম্মদপুরের লাইসেন্সবিহীন ১৪টি হাসপাতালের বন্ধের দাবি জানিয়ে আদালতে রিট আবেদন করেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল  মোরসেদ। মঙ্গলবার দুপুরে গতকাল মঙ্গলবার সেই রিট আবেদনের শুনানি শেষে লাইসেন্সবিহীন তথাকথিত এই ১৪টি হাসপাতাল অবিলম্বে বন্ধের আদেশ দেন বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। এই আদেশ বাস্তবায়নের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ও র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তারা।

বন্ধের তালিকায় থাকা রয়্যাল মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালের গেট বন্ধ ছিল বুধবার

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বিপরীতে বাবর রোড, হুমায়ুন রোড ও খিলজী রোডে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে এই ১৪টি হাসপাতাল। তালিকায় থাকা ১৪টি হাসপাতাল হচ্ছে বিডিএম হাসপাতাল, সেবিকা জেনারেল হাসপাতাল, জনসেবা নার্সিং হোম, লাইফ কেয়ার নার্সিং হোম, রয়্যাল মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতাল, নবাব সিরাজউদ্দোলা মেন্টাল হাসপাতাল, মনমিতা মেন্টাল হাসপাতাল,  প্লাজমা মেডিক্যাল সার্ভিস অ্যান্ড ক্লিনিক, শেফা হাসপাতাল, ইসলামিয়া মেন্টাল হাসপাতাল,  মক্কা মদীনা জেনারেল হাসপাতাল, নিউ ওয়েল কেয়ার হাসপাতাল ও  বাংলাদেশ ট্রমা স্পেশালাইজড হাসপাতাল।

মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর বাবর ও খিলজি রোড ঘুরে দেখা গেছে, অভিযুক্ত ১৪টি হাসপাতালের দুটি বন্ধ, বাকিগুলো খোলা রয়েছে। হাসপাতালগুলোর প্রায় প্রতিটির সামনে ঝুলছে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নামখচিত বোর্ড। তবে কোনও হাসপাতালে গিয়ে বিশেষজ্ঞ কোনও চিকিৎসকের দেখা মেলেনি। হাসপাতালের কর্মীরা জানান, রোগী আসার খবর দিলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এসে রোগী দেখে যান।

রয়েল মাল্টিস্পেশালিস্ট হাসপাতালে গেলে সেখানকার গেট বন্ধ পাওয়া যায়। এখানকার ম্যানেজার মো. হেলাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের হাসপাতাল বন্ধ রেখেছি। রোগী যে কয়জন আছে তাদের আমরা মানবিক কারণে চিকিৎসা দিচ্ছি। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা অলরেডি স্বাস্থ্য অধিদফতর ও আদালতে গেছি। হাইকোর্টের অর্ডারটা হাতে পেলে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।

বিডিএম জেনারেল হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. শেখ মো. মতিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মোহাম্মদপুরের বহু হাসপাতাল বন্ধ হয়েছে। ১৪টি নামের মধ্যে আমাদের নাম কিভাবে ঢুকল এটাই আমাদের প্রশ্ন। আমরা এই হাসপাতাল থেকে চেষ্টা করি মানুষকে সাহায্য করতে।

বিডিএম হাসপাতালের ম্যানেজার মো. সাইদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আজও সব পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে। সেখানে লাইসেন্সবিহীন কথাটা আছে। আমার মনে হয় এরপর আর কিছু জানার দরকার নেই। আমাদের লাইসেন্স আছে। গত ২২ বছর ধরে আমরা এই হাসপাতালটি চালাই। লাইসেন্স ছাড়া এই হাসপাতাল এতদিন চালানো সম্ভব হতো না। সবকিছু থাকার পর আমরাই জানি না যে আমাদের লাইসেন্স নেই।

তিনি বলেন, আমি কেন হাসপাতাল বন্ধ করবো। আমার তো লাইসেন্স আছে। আমি কিছুই করব না। আমাদের এখানে কর্তৃপক্ষ আসবে। তারাই সিদ্ধান্ত নেবে। আমাদের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে।

আদালত নির্দেশ দেওয়ার পর বন্ধ রাখা হয়েছে মক্কা মদীনা জেনারেল হাসপাতালটিও

মক্কা মদীনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের খোলা গেটের সামনে বসে এক ভদ্রলোক চা পান করছিলেন। তিনি নিজেকে এই হাসপাতালের এমডি  পরিচয় দিয়ে বলেন, আমাদের হাসপাতাল বন্ধ আছে। আর কিছু বলতে চাই না।

সেবিকা জেনারেল হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় লিটন বলেন, আমাদের এখানে কোনও রোগী ভর্তি নাই। কোনও চিকিৎসা হচ্ছে না। এসময় পাশেই রিসেপশনে তিনজনকে বসে থাকতে দেখা যায়।  তাহমিনা বেগম বলেন, আমার স্বামী জহুরুল ইসলামের গত ২৯ তারিখ অস্ত্রোপচার হয়েছিল। তার সেলাই কাটার জন্য নিয়ে এসেছি। এখন পর্যন্ত ৪০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে।

এসময় তার সঙ্গে তার দুই ছেলে ও ভাই ছিলেন। তারা কেউই হাসপাতাল বন্ধের ব্যাপারে কোনও তথ্য  জানেন না।

আদালতের বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশের পরও খোলা রাখা হয়েছে শেফা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার

শেফা হাসপাতালে গতকালের মতোই রোগীর আত্মীয়রা রিসেপশনে বসা ছিল। হাসপাতালের গেটও খোলা আছে। এখানকার মালিক দুইজন আলমগীর হোসেন ও রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা এখন বোঝার চেষ্টা করছি। চার সপ্তাহ কার্য দিবসের মধ্যে উত্তর দিতে বলেছে। এই মোহাম্মদপুরে তো বহু কাগজবিহীন হাসপাতাল আছে। আমাদেরটা কেন অবৈধ বলল তা জানার চেষ্টা করছি। আইনগতভাবেই ব্যবস্থা নেবো। আমাদের তো লাইসেন্স আছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর আমাকে লাইসেন্স দিয়েছে, তারা কেন আমাকে অবৈধ বলবে?

হাসপাতালের বাইরে তানভীর আহমেদ তার কন্যা শিশুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, রংপুরে আমার মেয়ের হাতের চিকিৎসা করায় উপকার পাইনি কিন্তু এখানে উপকার পাচ্ছি। এই হাসপাতাল বন্ধের ঘোষণায় বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমি তো এই হাসপাতালে আমার বাবা ও আমার চিকিৎসা করিয়ে উপকার পেয়েছি। এখানকার চিকিৎসকরা অনেক ভালো। কেন এটা বন্ধ করতে চাইলো বুঝতে পারছি না।

সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায় মনমিতা মেন্টাল হসপিটাল ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা মেন্টাল হাসপাতাল দুটি। তবে বন্ধ ঘোষণার তালিকায় থাকা লাইফ কেয়ার নার্সিং হোম, প্লাজমা মেডিক্যাল সার্ভিস অ্যান্ড ক্লিনিক, ইসলামিয়া মেন্টাল হসপিটাল ও  বাংলাদেশ ট্রমা স্পেশালাইজড হসপিটালের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

ছবি : নাসির হোসেন।

/টিএন/

লাইভ

টপ