‘আমরা মিটু ভিকটিম না, ফাইটার’

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২৩:৪৩, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৫৫, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৮


মিটু বিষয়ক বৈঠকি
আমরা যারা হ্যাশট্যাগ মিটু আন্দোলনে নিজেদের ওপর হওয়া যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছি আপনারা আমাদের ভিকটিম বলবেন না, আমরা ভিকটিম না, ফাইটার। রাজধানীতে ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং ও সাংগাত বাংলাদেশের আয়োজনে এক গোলটেবিল বৈঠকে মি টুর অভিযোগ তোলা মুশফিকা লাইজু এ কথা বলেন।
নিজেকে ভিকটিম না ফাইটার উল্লেখ করে মুশফিকা লাইজু বলেন, গণমাধ্যমে বা আলোচনায় আমরা যখন কথা বলছি তখন আমাদের ভিকটিম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা ভিকটিম নই। তিনি আরও বলেন, বাংলদেশে ৫০ বছর আগেও যৌননিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে এবং এখনও ঘটছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির কমিটি থাকতে হবে।  অত্যাচারীর বিরুদ্ধে সামাজিক ঘৃণা তৈরি করতেই হবে।
সাংবাদিক, আইনজীবী, উন্নয়নকর্মী, করপোরেট চাকুরীজীবীসহ আরও বিভিন্ন পেশার নারী ও পুরুষদের উপস্থিতিতে আয়োজনের শুরুতেই নিজেরা করি’র সমন্বয়ক  খুশী কবির বলেন, কী করা যেতে পারে সে বিষয়ে একটি গাইড লাইন দরকার। আজকের আলোচনা থেকে আমরা একটি স্পষ্ট গাইডলাইন  তৈরি করতে চাই।
এর আগে মি টু আন্দোলনে আরেক শরিক তাসনুভা শিশির বলেন, কেন জানি  নিপীড়নকারীকেই সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। অনেকটা হতাশ কণ্ঠেই তিনি বলেন, আমাদের দেশে কোনও আন্দোলনই টিকে থাকে না। শেষ পর্যন্ত কিছু একটা ঘটে। কোন ইস্যু এলে কয়েকদিন সেটা নিয়ে কথা হয় তারপর সবকিছু ম্লান হয়ে যায়। আমি একটা কথাই বলব এবার আমরা ম্লান হতে চাই না ।
কারোর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলে পক্ষ অপক্ষের যে বিষয়টি দাঁড়িয়ে যায় সেখান থেকে বের হয়ে যতক্ষণ পযন্ত নির্মোহ হয়ে কিছু ভাবতে না শিখবো, যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পর্কের সুবিধাগুলো ত্যাগ করতে না শিখবো ততক্ষণ এ সমস্ত জায়গায় আমাদের কমতি থেকেই যাবে বলে উল্লেখ করেন মানবাধিকারনেত্রী সুলতানা কামাল।
তিনি বলেন, নারীর পারস্পরিক ঐক্য জরুরি। আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলি না। দায়সারাভাবে মিটিং করে ডোনারকে উপস্থিতি স্বাক্ষর দিয়ে আমাদের কাজ শেষ করি। সেটার পরিবর্তন দরকার।
নিজের ওপর ঘটা নিপীড়নকে বলতে পারার বিষয়টি আজকে নতুন তা নয়, এটি অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। সবাই মিলে বললে সেটি একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অনেকে মিলে বললে, অনেক বেশি ক্ষমতায়িত হতে পারে।
লেখক ও নৃবিজ্ঞানী রেহনুমা আহমেদ বলেন, মনে হতে পারে মি-টু মুভমেন্ট বিশেষ আন্দোলনকে ধরে এবং সেটি আমাদের মধ্যে কত আলোড়ন ফেলেছে সেটি ধরেই কথা হচ্ছে। মনে হবে আমাদের প্রতিবাদের কোনও ইতিহাস নেই। জাহাঙ্গীরনগরের প্রতিবাদের ইতিহাস, এদেশের জন্মের ইতিহাস উল্লেখ করে তিনি আন্দোলনকারীদের নিজেদের ইতিহাস স্মরণে রাখার কথা বলেন। নারীবাদ যেমন শক্তিমত্তার জায়গা তেমন ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী এই জায়গাকে আত্মসাৎ করছে।
নারী আন্দোলন যা কিছু অর্জন করেছে সেগুলোকে শক্তিশালী মহল তার স্বার্থ  হাসিলের জন্য ব্যবহার করতে পারে এবং প্রতিবাদী হতে যে ঐক্য তৈরি হতে পারে সেটাকেও যে ব্যবহার করা হতে পারে সে ব্যাপারেও আমাদের সতর্কতা প্রয়োজন।
আলোচনায় সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস বলেন, মিটু আন্দোলন জারি রাখার পাশাপাশি এই আন্দোলন থেকে কী পেতে চাই সেটি বিবেচনায় নেওয়ার সময় এসেছে। আমরা কিছু সুপারিশ তৈরী করে সরকারের কাছে সেগুলো দিতে পারি। তিনি ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়টিও ভেবে দেখা জরুরি বলে মত দেন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেউতি সবুর বলেন, কোনও একটি ঘটনায় অভিযুক্ত হলে যখন তাকে চাকরিচ্যুত করার মতো সিদ্ধান্ত আসছে সেখানে যৌন হয়রানির অভিযোগে চাকরি গেছে এমন রেওয়াজ নেই।

১৯৯৯ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাধন এর ঘটনার পরে যৌন হয়রানির বিষয়টি ধাক্কা দিতে সমর্থ হয় উল্লেখ করে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সালমা আলী বলেন, ২০০৯ সালে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে পরিষ্কার আইন এসেছে এবং হয়রানির সংজ্ঞা দেওয়া আছে। সুতরাং যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে আইন আছে, এসব আইনের মাধ্যমে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি। তবে এভিডেন্স রাখাটা জরুরি। দুঃখের কথা এটাই যে সুপ্রিম কোর্ট বারে এখন পর্যন্ত এই কমিটি করা হয়নি।

নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু বলেন, মিটু শব্দটা এখন এসেছে কিন্তু এই আন্দোলন আমরা করে আসছি দীর্ঘদিন ধরে। মানুষ আগে হয়তো বলতে পারেনি। অনেক নারী মুক্তিযোদ্ধারাও লুকিয়ে ছিল, তাদের কথাটা বলেনি। তিনি বলেন, আমেরিকাতে আমরা দেখেছি যে দীর্ঘদিন পর মামলা করলেও নির্যাতনকারীর শাস্তি হয়েছে। সেই অবস্থাটা আমাদের দেশেও দেখতে চাই।




/ইউআই/টিএন/

লাইভ

টপ