কাউকে চেনেন না আব্দুর রহমান, ছেলের নাম বলেন ‘জয়বাংলা’

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১১:০৬, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১১, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯

আব্দুর রহমানঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পুরাতন ভবনের ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভেতরের দিকের বারান্দা। পাশেই বাথরুম, ময়লা রাখার বিন। পুরো জায়গা দুর্গন্ধে ভরা। নাম ঠিকানা ছাড়া রোগী বা যাদের সঙ্গে স্বজন থাকে না, তাদের এই বারান্দায় রাখা হয়। এই বারান্দার একটি বেডের একজন আব্দুর রহমান। বয়স ৭০-এর কম নয়। প্রায় দুই মাস ধরে এখানে আছেন। কাউকে চিনতে পারেন না। ঠিকানাও ঠিকঠাক বলতে পারেন না। সন্তানদের কথা জানতে চাইলে বলেন, মেয়ের নাম আমেনা। আর এক ছেলের নাম জয়বাংলা।   

রবিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ওই ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় ঘিয়ে রঙের একটি ফতুয়া গায়ে আর লুঙ্গি পরে আবদুর রহমান বিছানায় শুয়ে আছেন। তার মুখ ভর্তি সাদা দাড়ি, মাথার চুলও সাদা। গাল ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেছে, জীর্ণ হাত, নখ বাদামি। বিছানার পাশেই পড়ে আছে খাবারের উচ্ছিষ্ট। তাতে তেলাপোকা আর মাছি ঘুরে বেড়াচ্ছে। পায়ের দিকে বেডের সঙ্গে একটি ছোট টেবিল ফ্যান। কিন্তু কোনও কিছুতেই তার নজর নেই। মাথায় হাত দিয়ে শুয়ে আছেন। কাছে গিয়ে নাম জিজ্ঞেস করতেই চোখ মেলে তাকালেন, তবে উত্তর দিলেন না। কেবল হাত নেড়ে কিছু বলতে চাইলেন। এমন সময় তার বিছানার চাদর, বালিশের কাভার বদলে দিতে এলেন হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী পিন্টু।

পিন্টু বলেন, ‘উনি কানে শুনতে পান না। জোরে কথা বলতে হবে। তার কথাও জড়িয়ে যায়।’

আরেক রোগীর স্বজন তার কাছে গিয়ে জোরে নাম জিজ্ঞেস করতে তিনি বলেন, নাম…? আবার নাম জিজ্ঞেস করলে বলেন, আব্দুর রহমান। বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে প্রথমে হাসি দেন, পরে বলেন কিশোরগঞ্জ। ছেলেমেয়ে আছে কিনা জানতে চাইতে প্রথমে মাথা নেড়ে না করেন। পরে আবার বলেন, সেগুনবাগিচা। পরে হাত দিয়ে দেখিয়ে দেন দুই ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের নাম আমেনা। আর এক ছেলের নাম জয়বাংলা।’

তারা কোথায় থাকেন জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘সেগুনবাগিচা, সেখানে অফিস আছে তো।’ বাকি আর কিছু তিনি বলতে পারেননি।

পরিচ্ছন্নতাকর্মী পিন্টু বলেন, ২৭ জুলাই আব্দুর রহমানকে এখানে ভর্তি করা হয়। দুই মাস ধরে তিনি এখানে আছেন। কেবল নিজের নামটাই বলতে পারেন। আর কিছু তিনি বলেননি। এতদিনে কেউ তার খোঁজ নিতে আসেনি। তাই এখন তারাই তাকে দেখাশোনা করেন। তবে তাদের সঙ্গেও খুব একটা কথা হয় না তার।

তিনি বলেন, ‘তিনি হাসপাতালের নিচ তলায় পড়ে ছিলেন। পরে মারুফা জালাল নামের একজনের সহযোগিতায় তাকে ভর্তি করা হয়।’

মারুফা জালাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২৭ জুলাই সন্ধ্যার দিকে তাকে আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সিঁড়ির নিচের জায়গাতে পেয়েছিলাম। তখন অনেক খারাপ অবস্থায় ছিলেন তিনি। এটা চিন্তার বাইরে। দাড়ি-গোঁফে তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না। পুরো শরীরে মাটি, প্রস্রাব-পায়খানাতে মাখামাখি। শরীর জুড়ে পিঁপড়া, মাছিসহ পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রথমে মৃত ভেবেছিলাম। যেহেতু ওখান দিয়ে মানুষ চলাফেরা করছে, কী মনে করে তাই পাশে যাই। পাশে গিয়ে বসতেই তিনি মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলাম, আপনার নাম কী? বললেন, আব্দুর রহমান। কথা যেহেতু বলছেন, তাই জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি কিছু খাবেন? উনি প্রথমেই আমাকে বলেন, মা-আমাকে একটা লুঙ্গি দিবা?  ততক্ষণে লোক জড়ো হয়েছে। আমার কাছে থাকা কলা-কেক খাইয়ে দিলাম। চারপাশ থেকে সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করছে, আমার কিছু হয় কিনা। আমার কিছু হয় না জানিয়ে বললাম, মানুষ তো…। আমি সে দৃশ্য কোনোদিন ভুলবো না।’

তিনি বলেন, ‘একটা মাদুরে করে তাকে সিঁড়ির নিচ থেকে সরালাম। কেউ একজন গিয়ে লুঙ্গি নিয়ে আসেন। এরপর সবাই মিলে তাকে পরের দিন পরিষ্কার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।’

মারুফা এখনও প্রতিদিন আব্দুর রহমানকে দেখতে যান। তিনি বলেন, ‘আমার পক্ষে আর কতটুকুই বা করা সম্ভব? এখন যদি তাকে কোনও বৃদ্ধাশ্রমে নেওয়া যেতো তাহলে ভালো হতো। এর জন্য টাকা লাগলে তার ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু একটা সুইটেবল জায়গাতে যদি তাকে রাখা যেতো, তাহলে যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন কেউ তাকে দেখে রাখতো।’

হাসপাতাল সূত্র জানা গেছে, আব্দুর রহমান বর্তমানে নিউরো সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. অসিত চন্দ্র সরকারের অধীনে ভর্তি আছেন। ডা. অসিত বলেন, ‘আব্দুর রহমান এখন একটি দু’টি করে কথা বলছেন। যদিও সেগুলো অ্যাপ্রোপ্রিয়েট নয়। সেজন্য এখন পর্যন্ত তার সব আইডেন্টিটি এক্সপ্লোর করা যায়নি।’

তিনি বলেন, ‘এমনিতে তার মাথায় আঘাত রয়েছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত রয়েছে। সেগুলোর আরও ডিটেলস পরীক্ষা লাগবে। সেগুলো শুরু হয়েছে। যে পর্যন্ত না নিজের কথা নিজে বলতে পারছেন, সে পর্যন্ত সবকিছু জানা যাচ্ছে না। আরেকটু উন্নতি হোক, তখন সব বোঝা যাবে।’

/জেএ/এসটি/টিএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ