‘এটাই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ, সাধারণ মানুষ যার একমাত্র হাতিয়ার’

উদিসা ইসলাম১৭:১৩, ডিসেম্বর ০১, ২০১৫

Brothers platoonড. আনোয়ার হোসেন। ১৯৭১ সালে অংশ নিয়েছেন সম্মুখ সমরে। সাত ভাই দুই বোন মুক্তিযুদ্ধে লড়েছেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। ভাই কর্নেল তাহের দায়িত্বে ছিলেন ১১ নম্বর সেক্টরের। সেই সেক্টরে আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত একসাথে লড়েছেন সবাই। সহযোদ্ধারা নাম দিয়েছিল ব্রাদার্স প্লাটুন। যদিও দুই বোনও সাথে থাকায় আনোয়ার নিজেদের পরিচয় দিতেন ব্রাদার্স সিস্টার্স প্লাটুন।

কর্নেল তাহের ছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। যাকে জিয়াউর রহমান সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বিনাবিচারে ফাঁসি দেয়। একই সময়ে ড. আনোয়ার জেল খেটেছেন দীর্ঘ সময়। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বও পালন করেছেন। সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি শুনিয়েছেন যুদ্ধের গল্প।

ভাইবোন মিলে একসঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

“আমরা সাত ভাই দুই বোন যুদ্ধে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভাই হিসেবে কখনওই কর্নেল তাহের আমাদের বাড়তি সুবিধা দেননি। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে ভাইজান ডাকার অনুমতি ছিল না। সেখানে তিনি কেবলই একজন অধিনায়ক। আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত একসাথে ছিলাম। প্রত্যেকের দায়িত্ব ছিল আলাদা। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না।

আমাদের দুইবোন ডালিয়া আর জুলিয়া ক্যাম্পে ছিল মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই। এরমধ্যে ডালিয়া আমাদের সাথে পেট্রোলে যেত। তাকে মোটরসাইকেল চালানো শেখানো হয়েছিল। যুদ্ধবিদ্যা আমরা ভাইবোনরা একসাথেই শিখেছি। ক্যাম্পের অন্যরা কখনওই তাদের শুধু নারী বিবেচনা করেনি। সহযোদ্ধা হিসেবে তারাও বাড়তি কোনও সুবিধা চায়নি “

কখনও আবেগে চোখ ছলছল, কখনো স্বাধীনতার আনন্দে চোখ চকচক- এভাবেই গড়িয়ে চললো আলাপ।

ড. আনোয়ার হোসেন

-আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে অনেক আগেই। ১০ এপ্রিল ময়মনসিংহ পতন হয়েছে শোনার পর আমরা ঢাকা থেকে হেঁটে চলে গেছি। কর্নেল তাহের সেনাবাহিনী থেকে এসে যোগ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ রংপুরের ১১ নম্বর সেক্টর। মহেন্দ্রগঞ্জে আমাদের হেডকোয়ার্টার আর তার উল্টোদিকে কামালপুর। কামালপুর দুটো কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এক, স্বাধীন বাংলায় প্রচারিত যুদ্ধের যে কাহিনী, তাতে কামালপুরের নাম উঠে আসতো বার বার- সম্মুখ সমরের ভয়াবহতার জন্য। দুই. কামালপুরকে বলা হতো গেটওয়ে টু ঢাকা। আর আমাদের লক্ষ্যও ছিল শত্রুমুক্ত করতে করতে ঢাকায় প্রবেশ করা।

আমি পৌঁছানোর পর ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল তাহেরের স্টাফ অফিসার হিসেবে আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। আমার কাজ ছিল অপস রুমের ম্যাপগুলোর খেয়াল রাখা আর যে পোর্টেবল ওয়ারলেস সেট ছিল- যার মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ও অস্থায়ী সরকারের কাছে বার্তা যেত সেটা দেখভাল করা।সবমিলিয়ে সিচুয়েশন রিপোর্টগুলো তৈরি করার কাজ।

কেবল তন্দ্রা এসেছে, হঠাৎ শুনি বাহারের গলা- আমরা ঘেরাও হয়ে গেছি। তাকিয়ে দেখি গুটি গুটি পায়ে ছায়ার মতো একদম কাছে চলে এসেছে পাকিস্তানি সেনা।

সম্মুখ সমরে যাননি?

গিয়েছি। তবে শুরুতে আমার সরাসরি যুদ্ধ করতে না পারায় কষ্ট ছিল। অন্য ভাইয়েরা সে সুযোগ পেত। একদিন তাহের ভাই ক্যাম্পের বাইরে যাওয়ায় আমি সাঈদ ভাইকে তাদের সাথে টহলে নিয়ে যেতে রাজি করাই। সাঈদ ভাইয়ের ইচ্ছা ছিল কোনও পাকিস্তানিকে জীবন্ত ধরে ফেলা যায় কিনা। আমরা উঠানের পাড়ার দিকে গেলাম। তখন শেষরাত। সীমান্তের বাঙ্করোডে আউড়ের পালে হেলান দিয়ে একটু ঝিমিয়ে নিচ্ছি। আমার ভাই বাহার সেন্ট্রি হিসেবে থাকলো। কেবল তন্দ্রা এসেছে, হঠাৎ শুনি বাহারের গলা- আমরা ঘেরাও হয়ে গেছি। তাকিয়ে দেখি গুটি গুটি পায়ে ছায়ার মতো একদম কাছে চলে এসেছে পাকিস্তানি সেনা। বড় ভাই সাঈদ বললেন আমি কিছুলোক নিয়ে উল্টোদিকে দৌড়াই, তোমরা ভারতের দিকে। পাকিস্তানিরা এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করলো। আমরা বাঙ্করোডে পৌঁছেই পজিশন নিলাম। পরে তাকিয়ে দেখি আমরা মাত্র চারজন। সাথে তিনটা সেল্ফ লোডিং রাইফেল, আমার কাছে সাব মেশিনগান। প্রত্যেকের কাছে ‍দুটো করে গ্রেনেড।

ওরা আমাদের ঠেলতে ঠেলতে নিজেরা বাঙ্করোডের পজিশন নিয়ে নেয়। আমাদের গুলি প্রায় শেষ। বাহার বলল, ভাইজান আমি বাঙ্করোড আর আমাদের মাঝামাঝি যে শিমুল গাছ সেখানে আড়াল করে গ্রেনেড ছুড়ে দিতে পারব। আমি নিষেধ করে কমান্ড নিয়ে নিলাম এবং কাউকে নড়তে মানা করলাম। বের হলেই ঝাঁজরা করে দিবে।এর মধ্যে মর্টার সেল শুরু করেছে। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি একজন নায়েক আর আরেকজন মিডিয়াম মেশিন গান নিয়ে হাজির হয়েছে। গ্রামবাসী তাদের খবর দিয়েছে চারজন মাত্র মুক্তিযোদ্ধা মিলে অনেক পাকিস্তানিকে ঠেকিয়ে রেখেছে, যেকোনও সময় মারা যাবে। তাদের দেখে কী যে শান্তি পেয়েছিলাম। ওদের আনা অস্ত্র দিয়ে সেদিন পাকিস্তানি সেনাদের তাড়িয়েছিলাম।

 

কর্নেল তাহের এ ঘটনা জানতে পেরেছিলেন?

তখন সকাল নয়টা। কর্নেল তাহের এলেন। আমাদেরতো সেই অবস্থা। ভয়ে ভয়ে আছি, উনি কী বলেন। তিনি আমাদের দেখে কিছু বললেন না। কিন্তু চেহারায় খুশি ভাব। তিনি শুধু বললেন, ডোন্ট ডু দিস এগেইন। তোমরা সবাই যদি একসাথে মরে যাও তাহলে কী করে কী হবে?

বাঁশঝাড়ের ঝরাপাতা সরিয়ে গুলির বাক্স বের করে তিনি বললেন, মুক্তিরা যে পলায়ে গেসিলো, আমি এগুলা লুকায়ে রাখসি।আপনাদের কাজে লাগবে।

মূল শক্তি কারা ছিল বলে মনে করেন জানতে চাইলে ড. আনোয়ার বলেন, ‘একটা গল্প বললেই সেটা পরিষ্কার হবে। ইসলামপুরের কাছে সবুজপুর। সেখানে একটা স্কুল ছিল।মুক্তিযোদ্ধারা ছিল সেখানে। খবর এলো সবুজপুরের পতন হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র ফেলে এলাকা ছেড়েছে। সংবাদ পাওয়ার পর রাতেই আমরা পরিকল্পনা করলাম। অনেক পথ, নদীতে গিয়ে হেঁটে পৌঁছাতে হবে। আমরা দুটো পথকে দুভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করে সেখানে পৌঁছালাম। গিয়ে দেখি নৌকা ভরে লুটের মাল তুলে পাকিস্তানি সেনারা পালানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তখন গুলি করতে চাইলে আমাকে থামিয়ে তাহের ভাই বললেন, ওরা রওনা হওয়ার পর পেছন থেকে গুলি করব। ভয়ে তাড়াতাড়ি নৌকা ছোটাবে আর যেখান পৌঁছাবে সেখানে অপেক্ষা করছে আরেক যোদ্ধা দল।

তিনি আরও বলেন, “এর পরপরই একজন বুড়ো মানুষ এসে আমাকে ডেকে পেছনের বাঁশঝাড়ে নিয়ে গেলেন। তখন শীতকাল। বাঁশঝাড়ের ঝরাপাতা সরিয়ে গুলির বাক্স বের করে বললেন, ‘মুক্তিরা যে পলায়ে গেসিলো আমি এগুলা লুকায়ে রাখসি।আপনাদের কাজে লাগবে।’ এটাই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। সাধারণ মানুষ যার একমাত্র হাতিয়ার।”

ড. আনোয়ার বলেন, “যুদ্ধকালে তাহের ভাইয়ের স্টাফ অফিসার হওয়ায় একবার তার সাথে তেলঢালাতে যাওয়ার পর পরিচয় হয় জিয়াউর রহমানের সাথে। তাদের ক্যাম্পের টেন্টে গিয়ে দেখি মেঝেতে কার্পেট লাগানো। টেবিলে রাখা একটা বই- কার্পেট বেগার। সেখানে ঘণ্টাখানেক ছিলাম এবং ভাবছিলাম মূল কাজ কী হওয়ার কথা আর নিজেদের নামে ফোর্স বানিয়ে এখানে কী হচ্ছে। যুদ্ধটাতো আর তাদের কারণে হয়নি, যুদ্ধটা করা গেছে বঙ্গবন্ধুর নামের কারণে। তিনি জেলে। কিন্তু তার নামেই যুদ্ধ হয়েছে। জয় বাংলা আর বঙ্গবন্ধু। সেই জয় বাংলা আমরা ভুলতে বসেছিলাম দীর্ঘসময় জুড়ে, নতুন প্রজন্ম সেটাকে ফিরিয়ে এনেছে, তাদের অভিনন্দন।”

  

/এফএ/

লাইভ

টপ