‘তারপরও স্যালুট জানাই মাতৃভূমিকে’

Send
আশরাফ উদ্দিন সিজেল, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত : ১০:৪৮, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৭, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৫

মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিনছোট একটি ভাঙা মাটির ঘরে স্ত্রী ও মেয়েদের নিয়ে বাস মহিউদ্দিনের (৬৫)। বছর তিনেক আগে ব্রেনস্ট্রোক করে শরীরের ডান পাশ অবশ হয়ে যায় তার। অর্থাভাবে চিকিৎসা করতে পারছেন না তিনি। চিকিৎসার খরচ মেটাতে একাত্তরের রণাঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য পাওয়া স্বর্ণ পদকটিও বিক্রি করে দিয়েছেন। এখানেই শেষ নয়, মাত্র ২০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়ায় বসতভিটাও কৃষি ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ রয়েছে। এমনই দুর্বিসহ দিন কাটাচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিনের।

মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিনের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার মহিরখারুয়া গ্রামে। ছোট্ট একটি মাটির ঘরে স্ত্রী ও ৪ মেয়ে নিয়ে তার বসবাস। এর মধ্যে ২ মেয়ের বিয়ে দিলেও এক মেয়েকে যৌতুক না দিতে পারায় তাকে বাবার বাড়ি ফিরে আসতে হয়েছে। কলেজ পড়ুয়া এক মেয়েকে গার্মেন্টে চাকরিতে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে এসএসসি পাশ করার পর কলেজে ভর্তি হলেও টাকার অভাবে লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আর যে বসতভিটা আছে তাও ব্যাংকে বন্দক রাখা। ৩ বছর আগে ব্রেনস্ট্রোক হয়ে শরীরের ডান পাশ অবশ হয়ে আছে। এ অবস্থায় সরকারি ভাতার টাকায় চিকিৎসা ও সংসারের খরচ যোগাতে না পেরে অর্ধাহারে দিন কাটছে এই মুক্তিযোদ্ধার।

বিছানায় শুয়ে ভাঙা ভাঙা গলায় কোনও রকমে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণের স্মৃতির কথা বললেন। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার  ৪৪ বছরে বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে কোনও রকম বেঁচে আছি। গোল্ড মেডেলটি বিক্রি করে দিয়েছি। এখন আমার আর কিছু নেই। আমি শূন্য হাতে চিকিৎসাহীন অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছি। ভাতার টাকায় অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের চাহিদা মেটাতে পারছি না। তারপরও স্যালুট জানাই প্রিয় মাতৃভূমিকে।’

মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া প্রসঙ্গে তিনি শুধু বলেন, ‘খুব খুশি হইছি।’

মহিউদ্দিন ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করে পাকিস্তানি নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। নৌবাহিনীতে সি কে টু পদে ২ বছর ৬ মাস চাকরি করেন। করাচি বি এন এস বাহাদুর ট্রেনিং সেন্টারে হয়ে উঠেন সাহসী এক নৌকমান্ডো। এরই মধ্যে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি দেশে ফিরে আসার সুযোগ খুঁজতে থাকেন। একদিন সুযোগ এসেও যায়। ২ মাসের ছুটির জন্য আবেদন করেন এবং ছুটি পেয়েও যান। ফিরে আসেন দেশে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ নিতে ৩৫ জনের একটি দলের সঙ্গে মহিউদ্দিন চলে যান ভারতের বিশাখা পত্তমে (ভারতীয় নৌবন্দর)। তার সঙ্গে বাকি ৩৪ জনের মধ্যে ২৫ জন ছিলেন নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীর সদস্য। এ কারণে তাদের সবাইকে খুব তাড়াতাড়ি মুক্তিযোদ্ধে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

মহিউদ্দিন ডাকাতিয়া, কচুয়া, বড়চুনা, সাগরদিঘীসহ মোট ২৫টি অপারেশনে সরাসরি অংশ গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, যমুনা নদীতে ৪০/৬০ বাপার পাকিস্তানি গানবোট বিস্ফোরণে অংশও নেন তিনি। নদীতে নামার দায়িত্ব পড়ে তার ও ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমানের ওপর। আনুমানিক রাত ২টায় অপারেশন শুরু করেন যমুনা নদী বয়রাতলী বাজারের দিক থেকে। তিনজন  তীরে পাহারায় রেখে তিনি, ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান, রবিউলসহ নদীতে নেমে যান। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তারা অগ্রসর হন গানবোটের দিকে। ২ ঘণ্টা চেষ্টার পর তারা পৌঁছে যান গানবোটের কাছে। গান বোটে লাগিয়ে দেওয়া হয় মাইন। পানি থেকে উঠে আসেন তারা তিন মুক্তিযোদ্ধা। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিস্ফোরিত হয় মাইনটি।

স্বাধীনতার পর ওই তিনজনকে বিশেষ অবদানের জন্য কাদেরিয়া বাহিনী স্বর্ণ পদক দেয়। মহিউদ্দিন ১৯৭৩ সালে আবার বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। শারীরিক অসুস্থতার জন্য ১৯৮০ সালে তাকে চাকরি ছেড়ে চলে আসতে হয়। মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিনের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন, বর্তমানে তার স্বামীর অর্থাভাবে চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে। সরকারি ভাতায় কোনও রকম খেয়ে পরে বেঁচে আছেন।

 

/এসটি/

লাইভ

টপ