জীবন যুদ্ধে পরাজিত মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ মৃধা

Send
তানভীর হোসেন, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশিত : ১২:০৮, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:১৩, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৫

খোরশেদ মৃধা‘আমরা মাথায় তেল নাই তো তাই কেউ গরজ করে না। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করছি। কিন্তু কেউ খবর নেয়ও না, সাহায্যও করে না। এখন এগুলোর আর দরকার নেই। বাঁচবো আর ক’দিন। যে রোগে ধরছে এখন আল্লাহ আল্লাহ করে মরতে পারলেই বাঁচি। জীবন যুদ্ধে আমি এখন একজন পরাজিত সৈনিক।’

এমনভাবেই জীবনের কথা বলছিলেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা এলাকায় বসবাসরত ষাটোর্ধ্ব মুক্তিযোদ্ধা মো. খোরশেদ মৃধা। জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করে হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন এ বীর মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু জীবন যুদ্ধে অভাবের কাছে পরাজিত এ মুক্তিযোদ্ধা। তার দেহে বাসা বেধেছে নানা রোগ। অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে দিন দিন তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

ফতুল্লা লঞ্চঘাট সংলগ্ন ফুটপাতের ওপরে একটি চায়ের দোকান ছির তার। ওই দোকানের আয় দিয়েই চলতো সংসার। সম্প্রতি ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানের সময় ভেঙে দেওয়া হয় তার চায়ের দোকানটি।

স্ত্রী, তিন সন্তান ও ৯৫ বছরের মাকে নিয়ে খোরশেদ মৃধার পরিবার। আট ছেলে-মেয়ের মধ্যে মধ্যে ২ ছেলে বিয়ে করে আলাদা সংসার সাজিয়েছে। ৫ মেয়ের মধ্যে তিনজনের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ছেলে কালু মিয়া তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। আর দুই মেয়ের সালমা আক্তার ও রিমা আক্তারের এখনও বিয়ে হয়নি। অর্থের অভাবে তাদের লেখাপড়া করাতে পারেননি খোরশেদ মৃধা।

ঢাকা-পাগলা-নারায়ণগঞ্জ সড়কের পাশেই ডিআইটি মাঠ সংলগ্ন দুই কামরার চৌচালা টিনের ঘরে ভাড়া থাকেন খোরশেদ মৃধা। ঘরে দরিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট। একটি রুমের মধ্যে অনেক দিনের পুরনো খাট, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল। টেবিলের ওপর একটি সাদা কালো টিভি।

খোরশেদ মৃধা বলেন, ‘ওই যে রাস্তার পাশে দোকানটা ওইটা দিয়ে কোনও রকমে সংসার চলত। তাও গত ৪ থেকে ৫ মাসের বেশি হবে অসুস্থতার কারণে খুলতে পারি নাই। তার উপর উচ্ছেদ করে দিয়েছে। বাজারের লোকজন মুক্তিযোদ্ধার দোকান বলে কয়ে টিকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ভেঙে দিয়েছে। দুইটা রুম নিয়া ভাড়া থাকি। মাসে সাড়ে ৪ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। কয়েক মাসের ভাড়াও জমে গেছে। দেশ স্বাধীন করছি। আজ আমাদের থাকার জন্য একটু জায়গা নেই। এসব নিয়ে চিন্তা করি না। এখন এগুলোর আর দরকার নাই।’

নিজের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে অসুস্থ। খাওয়া-দাওয়া করতে পারছিলাম না। প্রতিবেশী রনজিৎ মোদকসহ আরও কয়েকজন ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ কিনে দিয়েছেন।’

১৯৫৩ সালে সালে বরিশাল জেলার মেহেদিগঞ্জ থানার সিন্নিরচর গ্রামে খোরশেদ মৃধার জন্ম। বাবার নাম নাজিম আলী মৃধা। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় আদরের কমতি ছিল না তার।

যুদ্ধের স্মৃতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কি শুনতে চাও। অনেক কষ্ট করে দেশ স্বাধীন করেছি। সবাইকে ফেলে যুদ্ধে চলে গেছি। দেশ স্বাধীন করাই ছিল সংকল্প। এসব কষ্টের কথা বলে লাভ কী? যারা বড়লোক তারাই ভালো আছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পর লুটপাট করতে পারি নাই। তারা ভালো নাই।’

মুক্তিযোদ্ধা মো. খোরশেদ মৃধার সনদ

মুক্তিযুদ্ধে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার বয়স তখন ১৬ কি ১৭ হবে। আমাদের এলাকার কয়েকজন যুবক যাদের বয়স ২৫ থেকে ৩০ হবে। তারা মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেওয়ার জন্য ভারত যাচ্ছিল। আমি ওদের পিছু পিছু যাই। ভারতে শিয়ালদাতে ট্রেনিং দেওয়া হয়। আমার বয়স কম বলে আমাকে ট্রেনিং দেওয়া হত না। দেড় মাস অপেক্ষার পর একদিন ট্রেনিং মাস্টার জিজ্ঞাসা করেন ‘তুম কন হে’। আমি বলি ‘বাঙালি’। তারপর জিজ্ঞাসা করে ‘কিয়া চাহতে হো’। আমি বলি ‘ট্রেনিং করতে চাই’। তারপরই আমাকে নিয়ে ট্রেনিং দেয়, অস্ত্র দেয়। আমরা ২৭ জনের একটা গ্রুপ ছিলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধে ৭ নং সেক্টরে স্থানীয় কমান্ডার শাহজাহান মৌলভীর নেতৃত্বে আমি যুদ্ধ করি। আমরা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, সীমান্ত এলাকায়, পিরোজপুরে যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধের শেষ দিকে আমরা মেহেদিগঞ্জের হানাদার বাহিনীর সদস্যদের তাদের ক্যাম্পে সাতদিন আটকে রেখেছিলাম। শেষে শুনলাম দেশ এখন স্বাধীন, আর যুদ্ধ করতে হবে না। হানাদাররা স্যারেন্ডার করছে। তারপর বরিশালে অস্ত্র জমা দিয়ে নারায়ণগঞ্জে ফতুল্লায় চলে আসি। সেই থেকেই ফতুল্লায় আছি।’

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি সহযোগিতা পাওয়া পসেঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফতুল্লার মুক্তিযোদ্ধা সংসদে অনেক দিন আগে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে একটা ফরম পূরণ করতে দিয়েছিল। তা জমাও দিছি। কিন্তু তারপর আর কোনও খবর নেই। কেউ কোনও মূল্যায়ন করে না। সবাই কেমন জানি বিরক্ত হয়। কত জায়গায় গেছি, কেউ কোনও সহযোগিতা করে নাই। এখনও পর্যন্ত সরকারি কোনও সহযোগিতা পাইনি। একের পর এক সরকার আসছে। একটু পুনর্বাসন করে দিলেও তো হতো। এখন এগুলো নিয়ে কষ্ট পাই না।’

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি তাদের মনে আনন্দটা অনেক বেশি। কারণ আমরা দেখেছি তাদের বর্বরতা। এজন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।’

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে ‘দেশ ও জনগণের অতন্দ্র প্রহরী’ স্লোগানে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন সোসাইটি কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল এর মুক্তিযোদ্ধা ১০১৭ নম্বর সনদ দেখিয়ে বলেন, ‘এটিই এখন আমার স্মৃতি। এছাড়া কিছুই নেই দেখানোর মতো।’

খোরশেদ মৃধা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের কোনও অনুষ্ঠান হলে আমাদের ডাকাডাকি করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি। ভাতাও পাচ্ছি না।’

খোরশেদ মৃধার শারিরীক অবস্থা সম্পর্কে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আনন্দ কিশোর ঘোষ জানান, কয়েকবার তার চিকিৎসা করা হয়েছে বিনামূল্যে। ওষুধ দিয়েও সহযোগিতা করা হয়েছে। খোরশেদ মৃধার গ্যাস্টিক থেকে আলসারের মতো হয়ে গেছে। তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।

প্রতিবেশী ও রঞ্জিত ফার্মেসির রনজিৎ মোদক বলেন, ডাক্তার এক মাসের ওষুধ দিয়েছে। যার দাম এক হাজার ৩২০ টাকা। দোকান থেকেই ওষুধ দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। ব্যক্তি পর্যায়ে সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। এখন সরকারি সহযোগিতা পেলে উপকার হতো। ছেলেটা পড়ালেখা করতে পারতো।

 

/এসটি/

লাইভ

টপ