জাতীয় ঐক্যের বিভক্ত যাত্রা

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ০০:৫৮, অক্টোবর ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০০, অক্টোবর ১৪, ২০১৮






জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনঅবশেষে সরকারবিরোধী কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হলেও শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় বাদ পড়েছে বিকল্পধারা। শনিবার সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবে যখন বিএনপি, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ চলছে, ঠিক সে সময়ে বারিধারায় পৃথক সংবাদ সম্মেলনে বি. চৌধুরী বলেছেন, বিএনপিকে এককভাবে ক্ষমতায় বসানোর ষড়যন্ত্রে নেই বিকল্প ধারা। যদিও প্রেসক্লাবের সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুলসহ অনেকেই আহ্বান রেখেছেন, যারা ঐক্যে আসতে পারেনি, তাদের জন্য দরজা এখনও খোলা। কিন্তু কেন বাদ দেওয়া হল সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর (বি. চৌধুরী) নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারাকে। শনিবার বিকালে ড. কামাল হোসেনের বাসায় গিয়েও কেন ফিরে গেলেন তিনি?

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে ও শনিবার দিনভর ড. কামাল হোসেনের মতিঝিলের চেম্বারে সরেজমিন উপস্থিত থেকে পাওয়া তথ্যে বোঝা গেছে, বি চৌধুরীকে বাদ দিতে পারায় এক ধরনের স্বস্তি তৈরি হয়েছে সেখানে উপস্থিত নেতাদের মধ্যে। এই ঐক্যের মাঝখানে কাঁটার মতো বিঁধছিল বি. চৌধুরীর দেওয়া শর্তগুলো। সেগুলো এড়াতে পেরে স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা। যদিও ঐক্যের অন্যতম উদ্যোক্তা মাহমুদুর রহমান মান্না সবসময় চেয়েছেন বি. চৌধুরীকে নিয়েই ঐক্যের যাত্রা শুরু হোক। গত ২২ সেপ্টেম্বর খোদ কামাল হোসেনের আহ্বানে ডাকা নাগরিক সমাবেশে বি. চৌধুরীকে প্রধান অতিথি করার মধ্য দিয়ে সেই ঐক্য অটুট ছিল বলেই মনে করেছিলেন অনেকে। যদিও গত ৫ অক্টোবর থেকে পুরো ঐক্য প্রক্রিয়ায় শুরু হয় দ্বন্দ্ব-বিরোধ ও প্রশ্ন। এই প্রশ্নের শুরুটা মাহী বি. চৌধুরীকে দিয়ে। বিকল্পধারার এই নেতাই প্রথম শর্ত আরোপ করেন বিএনপিকে ১৫০টি আসনে ছাড় দিতে হবে। আর অবশ্যই জামায়াতকে বাদ দিয়ে আসতে হবে বিএনপিকে। এই শর্তের পর ঐক্যপ্রক্রিয়ার আলোচনা নানাদিকে বেঁকে যেতে শুরু করে। একদিকে আলোচনা চলে ঐক্যের, পাশাপাশি বিএনপি চায় বিকল্পধারাকে বুঝিয়ে ঐক্যে যুক্ত রাখতে। কিন্তু নিজেদের শর্তে অনড় থাকায় বিকল্পধারার নেতাদের সঙ্গে ঐক্যের চেয়ে অনৈক্যের জায়গাটিই প্রবল হয়ে ওঠে। তারপরেও বাঁধন ঢিলে হলেও সুতো তখনও ছিড়ে যায়নি। এই প্রক্রিয়া অনেকটাই বন্ধ হয়ে আসে এবং ঐক্যের সুতোয় টান পড়ে শনিবার সকালের দিকে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। (ছবি: সালমান তারেক শাকিল)

কী হয়েছিলো শনিবার সারা দিন
যুক্তফ্রন্টের একাধিক নেতা জানান, শনিবার সকালে যুক্তফ্রন্টের অন্যতম নেতা জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব গিয়েছিলেন বিকল্পধারা সভাপতি বি চৌধুরীর বারিধারার বাসায়। সেখানে বিএনপির সঙ্গে ঐক্য হবে না মাহী বি চৌধুরী এমন অবস্থান ব্যক্ত করার পর বিষয়টি বিএনপিকে জানান আ স ম আবদুর রব। এরপরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। এদিন বিকালে ডাকা বৃহত্তর ঐক্যপ্রক্রিয়ার বৈঠক আচমকাই বাতিল করে দেন ড. কামাল হোসেন। তার চেম্বারেই চূড়ান্ত হয় সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্য নতুন জোট তৈরির রূপরেখা। আ স ম আবদুর রব এসে যোগ দেন কামাল হোসেনের বৈঠকে। ফোন করে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে আসতে বলা হয় সেখানে। যুক্ত হন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। দুই দফায় আসেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এদিন বিকালে ড. কামাল হোসেনের বাসায় তার সঙ্গে বি চৌধুরীর একান্তে বৈঠক করার বিষয়টি পূর্ব নির্ধারিত ছিল। কিন্তু, ড. কামালকে চেম্বার থেকে বাসায় যাওয়ার বিষয়ে বাধা দেন উপস্থিত নেতারা। তারা বরং বি চৌধুরীকে ড. কামালের বাসার পরিবর্তে চেম্বারে ডাকার পরামর্শ দেন। এদিকে, বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে মাহী বি চৌধুরী ও মেজর (অব.) আবদুল মান্নানসহ দলীয় নেতাদের নিয়ে বেইলি রোডে ড. কামাল হোসেনের বাসায় আসেন বি চৌধুরী। পূর্বনির্ধারিত বৈঠকে অংশ নিতে এসে দেখেন কামাল হোসেনের বাড়িতে দরজা খোলার লোকও নেই। যদিও এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বেলা আড়াইটার দিকে কামাল হোসেনের বাড়ির দুজন দায়িত্বশীল জানান, তাদেরকে কামাল হোসেন ফোন করে জানিয়েছেন বি চৌধুরী আসবেন, তার জন্য নাস্তা তৈরি করে রাখো। সে অনুযায়ী তারা প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। কিন্তু, বি চৌধুরী যখন দলবল নিয়ে কামাল হোসেনের বাড়িতে উপস্থিত হন, তখন কামাল হোসেন মতিঝিলের চেম্বারে বসে শেষবারের মতো চোখ বুলাচ্ছিলেন ঐক্যের দাবি ও লক্ষ্যে। বি চৌধুরীর বাড়ি আসার খবর কামাল হোসেনের কাছে নিয়ে যান জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন। বৈঠক কক্ষে বসা আ স ম আবদুর রব তাকে জানান, এ বিষয়ে কথা হয়েছে, তিনি বিষয়টি জানেন। তাদের অফিসে আসতে বলা হয়েছে।’ পরে এ প্রতিবেদককে মাহী বি চৌধুরী বলেন, ‘আমরা কামাল হোসেন স্যারের বাসায় পৌঁছার আগেই ফোন করেছি তিনবার। কামাল হোসেন স্যারের বাড়িতে পৌঁছার পর কামাল স্যারকে ফোন করার পর ফোন রিসিভ করেছেন মোস্তফা মহসীন মন্টু। তিনি আমাকে বলেছেন, আপনি বি চৌধুরীকে নিয়ে স্যারের অফিসে চলে আসেন।’

বিকল্প ধারাবাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মাহী বলেন, ‘একজন বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিককে ডেকে বাড়িতে এনে দেখা না করাটা শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজ।’

নাগরিক ঐক্যের একাধিক নেতা জানান, বি চৌধুরী যখন ড. কামালের বাসার দরজা থেকে ফিরে যাচ্ছেন, ওই সময় ফোন করা হয় মাহমুদুর রহমান মান্নাকে। তাকে ডেকে নিয়ে বোঝানো হয় ঐক্যের যাত্রা শুরু হচ্ছে আজ শনিবার। তাকে প্রেসক্লাবে যেতে হবে। এ নিয়ে আ স ম আবদুর রব, মির্জা ফখরুল দীর্ঘসময় কথা বলেন। মাহমুদুর রহমান মান্নার পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আপনারা যান। আমি পরে যোগ দেবো।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত অন্য নেতাদের অব্যাহত অনুরোধে তিনি প্রেস ক্লাবে আসতে রাজি হন।

প্রেসক্লাবের সম্মেলনে আসতে মাহী বি চৌধুরীকেও ফোন করে বি চৌধুরীসহ দলের নেতাদের নিয়ে আসতে অনুরোধ করেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সংবাদ সম্মেলন শেষে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বি চৌধুরীও আসবেন। অপেক্ষা করেন।’

কাঠামো হয়নি, নির্বাচন ও ভবিষ্যত সরকার নিয়ে আলোচনা পরে

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি, নাগরিক ঐক্য, জেএসডি, গণফোরাম ও জাতীয় ঐক্যের নেতারা উপস্থিত থেকে লক্ষ্য ও দাবি উত্থাপন করলেও কোনও কাঠামো গঠনের কথা জানাননি। এমনকী আগামী দিনের কর্মসূচিও পরে জানানো হবে বলে জানান আ স ম আবদুর রব। কর্মসূচি দু’একদিন পর দেওয়া হবে, এমন তথ্য জানান তিনি।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আত্মপ্রকাশের আগে বিএনপির বাইরে বাকি দলগুলোর আগ্রহ ছিলো নির্বাচন ও সরকার বিষয়ে আলোচনা সেরে ফেলা। যদিও এই আলোচনা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার আগে নাকি পরে করা হবে তা নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে জোটের উদ্যোক্তাদের অন্যতম সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ কয়েকজনের ভাষ্য, যত দ্রুত সম্ভব এই জোটকে সরকারের বিরুদ্ধে দাবি আদায়ে রাজপথে নামতে হবে। এরপরই এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

বিকল্প ধারা১

যুক্তফ্রন্টের ভবিষ্যত কী হবে

যুক্তফ্রন্টের প্রধান শরিক দল বিকল্প ধারা। দলের সভাপতি বি চৌধুরী এই জোটের চেয়ারম্যান। তিনি বাইরে থাকলেও ফ্রন্টের বাকি দুই শরিক জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য আজ যোগ দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। তাহলে যুক্তফ্রন্টের ভবিষ্যৎ কী? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেলো দুই তথ্য।

অন্যতম একজন উদ্যোক্তা বলছেন, বি চৌধুরী না ডাকলে তো যুক্তফ্রন্ট রান করবে না। সেক্ষেত্রে তাদের ওই জোটে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

এ বিষয়ে মাহমুদুর রহমান মান্না বা আ স ম আবদুর রব, দুজনে এখনই মন্তব্য করতে নারাজ। যদিও মাহী বি চৌধুরী এরইমধ্যে এই দুই নেতাকে নিয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘তাদের বিয়ে যুক্তফ্রন্টে, পরকীয়া করতে গেছেন ঐক্যফ্রন্টে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিকল্পধারা চাইছে যুক্তফ্রন্টের নাম ঠিক রেখে পরিধি বাড়িয়ে নিতে। এক্ষেত্রে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কাদের সিদ্দীকীকে দেখা যেতে পারে বি চৌধুরীর সঙ্গে।

পরিষ্কারভাবে না বললেও মাহী বি চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘বর্তমান বিএনপি আজকে জাতীয় ঐক্যের নামে জাতীয় প্রতারণার জন্য দায়ী। আমরা অত্যন্ত আশাবাদী বি চৌধুরীর নেতৃত্বেই জাতীয় ঐক্যের আত্মপ্রকাশ ঘটবে।’

 

আরও পড়ুন:

রব ও মান্নার বিয়ে যুক্তফ্রন্টে, পরকীয়া ঐক্যফ্রন্টে: মাহী বি

বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর চক্রান্তে বিকল্পধারা নেই: মেজর মান্নান

আজ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নব সূচনার দিন: মির্জা ফখরুল

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যেতে ফের সেই দুই শর্তই দিলেন বি চৌধুরী

যে ৭ দফা ও ১১ লক্ষ্য ঘোষণা করলো জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট

জাতীয় ঐক্যের ডাক জাতীয় স্বার্থে: ড. কামাল

বি. চৌধুরীকে বাদ দিয়েই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

 

 

/টিএন/

লাইভ

টপ