আওয়ামী লীগের অনেক সংগঠনে সম্মেলন ও কমিটি নিয়ে অসন্তোষ

Send
মাহবুব হাসান
প্রকাশিত : ০৯:৪৯, মে ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:০০, মে ৩০, ২০১৯

আওয়ামী লীগের দলীয় পতাকামূল দলের নিয়মিত সম্মেলন হলেও আওয়ামী লীগের কিছু শাখা, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনে মেয়াদ শেষেও সম্মেলন হচ্ছে না। বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে কমিটি। নিয়মিত কর্মসূচি পালন করলেও তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা চলছে। এগুলোর কোনোটার সম্মেলন হয় না, কোনোটার মেয়াদ পার হয়ে গেলেও কমিটি হয় না। আবার কোনোটার কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের কমিটি নিয়েও রয়েছে বিতর্ক।
আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান করা হবে। আগামী অক্টোবরে মূল দলের সম্মেলনের আগেই তৃণমূল পর্যায়ে এবং সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের সম্মেলন হবে। নতুন কমিটি আসলে নব উদ্যোমে সংগঠনগুলো চলবে। জানতে চাইলে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগামী অক্টোবরে সম্মেলনের লক্ষ্যে এরই মধ্যে দলের সাংগঠনিক সফর শুরু হয়েছে। ঈদের পর সম্মেলনের অন্যান্য প্রস্তুতিও শুরু হবে। সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্মেলন করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। দলের কোথাও কোনও অসামঞ্জস্যতা থাকলে সেগুলো চিহ্নিত করে মিটিয়ে ফেলা হবে।’
প্রসঙ্গত, আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ৮১ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ গঠিত হয়। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য থাকার কথা ১৭ জন, কিন্তু ১৫ জন নিয়েই আড়াই বছর পার করেছে দলটি। এর মধ্যে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এ বছরের শুরুর দিকে মারা যাওয়ায় সভাপতিমণ্ডলীতে এখন সদস্য আছেন ১৪ জন। একইভাবে দলের নির্বাহী সদস্য পদে ২৮ জনের জায়গায় আছেন ২৬ জন।

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ
ক্ষমতাসীন দলের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ। ২০১২ সালের সম্মেলনের সময় ঢাকা মহানগরকে উত্তর ও দক্ষিণ নামে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। দীর্ঘদিন পর ২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল দুই অংশের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটির মেয়াদ গত এপ্রিলে শেষ হয়ে গেলেও রাজধানীতে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি মহানগর আওয়ামী লীগের উত্তর-দক্ষিণ কোনও অংশই।

যুবলীগ
আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয় প্রায় ছয় বছর আগে। সংগঠনটির তিন বছর মেয়াদি সর্বশেষ কমিটি হয় ২০১২ সালের ১৪ জুলাই। আওয়ামী লীগের ২০১৬ সালের সম্মেলনের আগে অন্যান্য সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি গঠন করা হলেও যুবলীগের সম্মেলন বা কমিটি হয়নি। এমনকি ২০১৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের কমিটি ভেঙে দিতে বলেছিলেন স্বয়ং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। সেই নির্দেশ তখন বাস্তবায়ন হয়নি বরং কমিটি এখনও বহাল আছে। সূত্র জানিয়েছে, মূলত শীর্ষ নেতাদের অনীহার কারণেই সম্মেলন হচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংগঠনটির একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী একক নিয়ন্ত্রণে সংগঠন চালান। তার ইচ্ছা-অনিচ্ছায় সব কিছু হয়। এর ভালো-মন্দ দুই দিকই রয়েছে। ভালো দিক হলো, অভ্যন্তরীণ কোনও দ্বন্দ্ব কখনও বড় আকার ধারণ করতে পারেনি। মন্দ দিক হলো, সংগঠন নিয়ে কেউ কোনও মতামত দিতে পারেন না। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, সবার মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সম্মেলনের জন্য তারা প্রস্তুত। দল থেকে নির্দেশ পেলেই সম্মেলনের প্রস্তুতি শুরু হবে।

স্বেচ্ছাসেবক লীগ
সংকট রয়েছে দলের সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগেও। সংগঠনটির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সম্মেলন হয় না প্রায় ১৪ বছর ধরে। ফলে মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতারা হতাশ। সৃষ্টি হয়েছে সাংগঠনিক স্থবিরতা। রুদ্ধ হয়ে গেছে নেতৃত্ব বিকাশের পথ। ২০০৬ সালের ৩১ মে ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন হয়। এ সম্মেলনে মহানগরকে দুটি ভাগে ভাগ করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগ কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় সম্মেলন। আবার ২০১২ সালে এসে কেন্দ্রের আরেক দফা সম্মেলন হয়। তখন মহানগরের সম্মেলন না হলেও উত্তর-দক্ষিণ উভয় অংশের কমিটি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি আজও। দুই শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে ব্যর্থ হয়েছেন বর্তমান নেতৃত্ব। আগের ৭১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি দিয়েই চলছে সাংগঠনিক কাজ। এছাড়া সম্মেলনের ১৩ বছর পার হলেও দীর্ঘ সময়ে মহানগরের দুই অংশ এখনও পুরনো অনেক থানার কমিটি দেয়নি। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোল্লা আবু কাওছার বলেন, ‘সম্মেলন হলেই উদ্ভূত সমস্যাগুলো কেটে যাবে।’ শিগগিরই সম্মেলন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ছাত্রলীগ
ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন ছাত্রলীগের সম্মেলন হওয়ার এক বছর পর সম্প্রতি ঘোষণা হয়েছে পূর্ণাঙ্গ কমিটি। কিন্তু কমিটিতে পদ বঞ্চিতরা আন্দোলন করছেন। বিষয়টি গড়িয়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা পর্যন্ত। তিনি এরই মধ্যে নতুন কমিটি সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বাদ দিয়ে সেসব পদে অপেক্ষাকৃত যোগ্যদের বসানো হবে।’ ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে ১৯ জনের পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।

কৃষক লীগ
২০১২ সালের ১৯ জুলাই কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে সম্মেলন না হওয়ায় বর্তমান কমিটি দিয়েই খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে চলছে আওয়ামী লীগের এই সহযোগী সংগঠনটি। বর্তমান কমিটির মেয়াদ পার হয়েছে প্রায় চার বছর আগেই। সর্বশেষ সম্মেলনের পর আওয়ামী লীগ সভাপতির স্বাক্ষরিত ১১১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটিতে বর্তমানে সব সদস্য আছেন কিনা তা জানেন না সংগঠনের সিনিয়র নেতারা। সংগঠনটির সহ-সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে অপরিচিত একাধিক ব্যক্তিকে হঠাৎ দেখে বিস্মিত হন সংগঠনটির সিনিয়র নেতারা। ওয়ার্কিং কমিটির অনুমতি না নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বশীলদের কাছের লোকদের এসব পদে বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। আবার কাউকে কাউকে বাদ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। যেমন শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত কমিটিতে শামসুল আলমকে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দেখানো হলেও পরে তাকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। জানা যায়, ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত কৃষক লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক হয়েছে ছয় থেকে সাতবার। প্রতিবার বৈঠকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নতুন নতুন নেতা পরিচয় করিয়ে দিতেন। এ রকম কয়েকজন হলেন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার ইসহাক সর্দার, রাজবাড়ীর নূর এ আলম প্রমুখ। সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় করানো হলেও শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত কমিটিতে তাদের নাম ছিল না। এছাড়া সহ-সভাপতি দাবি করা শাহ আশরাফুল হক জর্জ, এ টি এম আনিসুর রহমান বুলবুল, নুরুল ইসলাম মোল্লা, আব্দুল লতিফ, কাজী সিরাজের নামও শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত কমিটিতে নেই। ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন সাবুকেও পরবর্তীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যদিও কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খন্দকার শামসুল হক রেজা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা যাদের নাম অনুমোদন করেছেন তাদের সবার নাম কমিটিতে আছে। পরবর্তীতে যে কয়েকজনের নাম সংযোজন হয়েছে তা আলোচনা সাপেক্ষেই হয়েছে। তিনি বলেন, সম্মেলনের জন্য তারা প্রস্তুত। নিয়ম মাফিকভাবে যখন সম্মেলনের নিদের্শ আসবে তখন কৃষক লীগের সম্মেলন হবে।


আরও পড়ুন: যে কারণে সম্মেলন হয় না আ. লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর

               ৭ সহযোগীসহ আ. লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ পার

              স্থবির হয়ে পড়েছে ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ

             ঝুলে আছে আ. লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্মেলন

 

 

/এপিএইচ/ওআর/

লাইভ

টপ