কমিটিতে থাকতে ছাত্রদলের ‘বয়স্ক’দের যত যুক্তি

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ২২:৫৬, জুন ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:২৭, জুন ২৪, ২০১৯

ছাত্রদল

চার যুক্তিতে ছাত্রদলের পরবর্তী কমিটিতে ‘বয়স্করা’ থাকতে চান। তাদের এই যুক্তিগুলো হলো—দুই বছর মেয়াদি কমিটির বয়স ৫ বছর পার হয়ে যাওয়ায় পদবঞ্চিত হওয়া, রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, সংগঠনের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করা এবং সংগঠনকে সিন্ডিকেটমুক্ত করা। এই চার যুক্তিতে তারা অভিভাবক সংগঠন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে টানা আন্দোলনও করে আসছেন। আর আন্দোলন করতে গিয়ে সংগঠন থেকে ১২ জন বহিষ্কারও হয়েছেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে অক্টোবরে রাজীব আহসানকে সভাপতি ও আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দুই বছর মেয়াদি ওই কমিটি পাঁচ বছর পর ভেঙে দেওয়া হয় চলতি বছরের ৩ জুন। এরপর রবিবার (২৩ জুন) পরবর্তী কাউন্সিলের তারিখ ঘোষণা করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। ওই ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১৫ জুলাই ছাত্রদলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে।

দুই বছর মেয়াদি কমিটির বয়স ৫ বছর পার হয়ে যাওয়া

আন্দোলনরত ছাত্রদল নেতাদের দাবি, সদ্য বিলুপ্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল ২০১৪ সালের অক্টোবরে। দুই বছর মেয়াদি ওই কমিটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালের অক্টোবরে। কিন্তু নানা কারণে ২০১৯ সালের ২ জুন পর্যন্ত ওই কমিটির বয়স গড়ায়। এরপর গত ৩ জুন ওই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আন্দোলরত ‘বয়স্ক’ নেতাদের দাবি, সদ্য বিলুপ্ত কমিটি নির্ধারিত সময়ে ভেঙে দিয়ে পরবর্তী কমিটি গঠন করলে সেখানে নতুন নেতৃত্ব আসার সুযোগ ছিল। তারাও তখন নিয়মিত ছাত্র হিসেবে ওই কমিটিতে স্থান পেতে পারতেন। কিন্তু কমিটির মেয়াদ দুই বছরের জায়গায় পাঁচ বছরে গড়ানোর কারণে তারা ছাত্রদলের পদ-পদবি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে ছাত্রদলের সদ্য বিলুপ্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এজমল হোসেন পাইলট (বর্তমানে বহিষ্কৃত) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী রাজিব-আকরাম কমিটির কাউন্সিল হওয়ার কথা ২০১৬ সালে। ওই সময় কাউন্সিল হলে আজ প্রার্থী হওয়ার জন্য আমাদের আন্দোলন করতে হতো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘৩৫/৩৬ বছর বয়সী সিনিয়র নেতাদের সম্মানজনক বিদায়ের জন্য বয়সের নিয়ম না করে ৬ মাস মেয়াদি একটি কমিটি গঠনের দাবি জানাচ্ছি।’

রাজনৈতিক ক্যারিয়ার

আন্দোলনরত ছাত্রদল নেতাদের অভিযোগ, গত কমিটির সভাপতি রাজীব আহসান, সিনিয়র সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন ও সাধারণ সম্পাদক আকরাম হাসান—এই তিনজন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু নিয়মিত কাউন্সিল না হওয়ায় যারা ছাত্রদলের কমিটিতে আসতে পারেননি, অথচ বয়সও বেড়ে গেছে, তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে কী হবে? কারণেও ছাত্রদলের ‘বয়স্ক’ নেতাদের সম্মানজনকভাবে বিদায়ের জন্যও অন্তত ৬ মাস মেয়াদি একটি কমিটিও দাবি করেন তারা।

সংগঠনের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করা

সংগঠনের বয়স্ক নেতাদের দাবি, সংগঠনের সুপার ১২টি ইউনিটের কাউন্সিলসহ বিভিন্ন জেলা কমিটির অনেক কাজই অসমাপ্ত রয়ে গেছে। এসব কাজ সম্পন্ন করার জন্য বয়সসীমা না করে অভিজ্ঞদের দিয়ে ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন করা উচিত। তাহলে নিয়মিত ছাত্ররা কোনও সংকটে পড়বেন না বলেও তারা দাবি করেন।

এ প্রসঙ্গে এজমল হোসেন পাইলট বলেন, ‘সংগঠনের সুপার ১২ ইউনিটের বেশ কিছু অসমাপ্ত কাজ রয়েছে। যা শেষ করতে অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। এ কারণে আমাদের দাবি, অন্তত এবার বয়সসীমা না রেখেই কমিটি করা হোক।’

সংগঠনকে সিন্ডিকেটমুক্ত করা

ছাত্রদলকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে সংগঠনটির আন্দোলনরত নেতাদের। তাদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের নেতারা ছাত্রদলের ত্যাগীদের মূল্যায়ন না করে নিজেদের অনুসারীদের শীর্ষপদে আনতে চান।

এ প্রসঙ্গে সদ্য বিলুপ্ত ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আজম সৈকত (বর্তমানে বহিষ্কৃত) বলেন, ‘২০০০ সালে যারা এসএসসি পাস করেছেন, তাদের বয়স এখন ৩৫-৩৬ বছর হবে। তারা প্রার্থী হতে পারলে ৩৭ বয়সীরা কেন পারবে না। কারণ, ৩৫ বছর বয়সী কেউ নিয়মিত ছাত্র নন।’ তিনি আরও বলেন, ‘মূলত সিন্ডিকেটের অনুসারীদের পদপদবি দিতেই এই শর্ত আরোপ। আর এই উদ্দেশ্যেই তারা তারেক রহমানকে ভুল বুঝিয়ে আগামী কাউন্সিলে প্রার্থিতার যোগ্যতা হিসেবে বয়সের বিষয়টি শর্ত হিসেবে আরোপ করিয়েছেন।’

ছাত্রদলের এই নেতা আরও বলেন, ‘বছরের পর বছর রাজপথে আন্দোলন করেছি, হামলা-মামলার শিকার হয়েছি। তার বিনিময়ে সংগঠন থেকে এখন আমাদের বহিষ্কার করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংগঠনকে সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত করার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। ছাত্রদলকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে হলে বয়সসীমা না রেখেই অন্তত পরবর্তী কমিটি করতে হবে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনে নিয়মিত ছাত্রদের দিয়ে কমিটি গঠন করা যেতে পারে।’
এদিকে, ২০০০ সালের পরে যারা এসএসসি পাস করেছেন, সেসব ছাত্রদল নেতা ‘বয়স্ক’দের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করছেন। তারা বলছেন, আন্দোলনকারী সিনিয়র (বয়স্ক) নেতাদের সঙ্গে আমরাও গত ৫ বছর সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতেও আন্দোলন করেছি।

তারা আরও বলছেন, সিনিয়রদের প্রস্তাব অনুযায়ী ৩৭-৩৮ বয়সীদের দিয়ে নতুন কমিটি করার এবং ৬ মাস মেয়াদি কমিটি গঠনের দাবি অযৌক্তিক। তবে, এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলতে রাজি হননি। কাউন্সিলকে সামনে রেখে তারা কারও বিরাগভাজন হতে চান না।

এ প্রসঙ্গে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি তানবীর রেজা (২০০৩-৪ সেশনে এসএসসি পাস) বলেন, ‘বয়সসীমা না করে ধারাবাহিক কমিটির দাবিতে আন্দোলনকারীরা আমাদের বড় ভাই। গত ৫ বছর দলের জন্য তারা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু ছাত্রদলের আগামী কাউন্সিলে প্রার্থী হওয়ার জন্য বিএনপি থেকে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, সেগুলো যুক্তিসঙ্গত মনে করেই দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আমরা কিছু বলার নেই।’

এক প্রশ্নের জবাবে তানবীর রেজা আরও বলেন, ‘আগামী কাউন্সিলে আমি প্রার্থী হবো। তবে কোন পদের জন্য প্রার্থী হবো, সেটা ঠিক করিনি।’

সদ্য বিলুপ্ত কমিটির একজন সহ-সম্পাদক বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো অযৌক্তিক। কারণ, ৩৭-৩৮ বছর বয়স ছাত্রদলের রাজনীতির জন্য উপযুক্ত নয়। তবে, তাদের বহিষ্কার করা ঠিক হয়নি। কারণ, ছাত্রদল করতে গিয়ে তারা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এখন দলের উচিত তাদের যু্বদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলে পুনর্বাসন করা।’

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ