ভারতের সঙ্গে চুক্তি ইস্যুতে ঐক্যফ্রন্টে দ্বিমত

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ২৩:৩৮, অক্টোবর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৭, অক্টোবর ১৭, ২০১৯

জাতীয়-ঐক্যফ্রন্টের-বৈঠকে-জোটনেতারাপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে দেশটির সঙ্গে করা চুক্তির বিষয়গুলোকে রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরাকে কেন্দ্র করে দ্বিমত সৃষ্টি হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। ফ্রন্টের অন্যতম প্রধান শরিক দল বিএনপি বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে আনতে চাইলেও ‘এজেন্ডা’ আকারে রাখতে অনীহা রয়েছে জোটের আরেক গুরুত্বপূর্ণ শরিক দল গণফোরামের। বুধবার (১৬ অক্টোবর) বিকালে রাজধানীর মতিঝিলে অনুষ্ঠিত ফ্রন্টের বৈঠকের দীর্ঘ আলোচনায় বিষয়টি উঠে আসে।

বৈঠক শেষে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া সাংবাদিকদের জানান, দেশের সার্বিক বিষয়ে আগামী ২২ অক্টোবর সমাবেশ করবে ঐক্যফ্রন্ট। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশটি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। অনুষ্ঠিতব্য এই সমাবেশ থেকে ঐক্যফ্রন্টের পরবর্তী রোডম্যাপ সম্পর্কেও ধারণা দেবেন ফ্রন্টের নীতিনির্ধারকরা।

বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক দায়িত্বশীল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বৈঠকের একপর্যায়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তোলেন। তিনি জানান, আবরারের হত্যাকাণ্ডে মোটিভ হিসেবে তার যে স্ট্যাটাসটি কাজ করেছে, সেই বিষয়টিকে সামনে তুলে আনতে হবে।

বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে টুকু বলেন, ‘দলের অভ্যন্তরে চাপ আছে, ভারতের সঙ্গে অসম যে চুক্তিগুলো হয়েছে, সেগুলো বাতিল করার বিষয়ে আরও সোচ্চার হতে হবে। সেক্ষেত্রে সমাবেশে এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে আনা দরকার।’

টুকুর পর জেএসডির সহ-সভাপতি তানিয়া রব, নাগরিক ঐক্যের শহিদুল্লাহ কায়সার, ডা. জাহেদ উর রহমান ইস্যুটিকে সামনে আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। পরে গণফোরামে নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া এজেন্ডা হিসেবে না রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তবে তারা উভয়েই সমাবেশের বক্তব্যে বিষয়টি তুলে ধরার পক্ষে অভিমত দেন।

পরে এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আবরারের হত্যাকাণ্ড হয়েছে, এটা ২২ তারিখের সমাবেশে স্বাভাবিকভাবেই তুলে ধরে হবে। কী কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এটার তদন্ত আমরা চাই। সঠিকভাবে আমরা এর কারণ জানতে চাই।’

রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আর দুই নম্বর ব্যাপার হলো, ভিন্নমতের কোনও মানুষ এদেশে থাকবে না—এমন বিষয়টি আবরার হত্যাকাণ্ডে উঠে এসেছে। এটি আমাদের আলোচনার মধ্যে ছিল।’

তবে এজেন্ডা হিসেবে থাকবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আবরারের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিয়েই সমাবেশে প্রথম বক্তব্য রাখা হবে। তবে, এজেন্ডা হিসেবে থাকবে কিনা, তা জানি না। চুক্তি নিয়ে আমি জানি না, ওভাবে সেটা এখনও তোলা হয়নি।’

রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আমাদের লাইন হচ্ছে, এই সরকারের ওপর কোনও আস্থা নেই। আমাদের দেশের স্বার্থ যে সরকার রক্ষা করবে, এর কোনও ভরসা নেই। রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে দেখেছি, সরকার দেশের স্বার্থরক্ষা করতে সক্ষম হয়নি। আরেক দেশের সরকার কী দাবি করেছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকার যেভাবে আলোচনা করেছে, তাতে আমরা সন্তুষ্ট নই।’

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে দেশটির সঙ্গে করা চুক্তিগুলোকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিয়েই বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে সামনে রাখার পক্ষে। এ নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে ‘ভারতবিরোধী অবস্থানে ফিরলো বিএনপি?’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। 

বিএনপির ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কমিটির একাধিক দায়িত্বশীল বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো তাদের দৃষ্টিতে অসম এবং ভবিষ্যতে তারা ক্ষমতায় এলে এসব চুক্তি বাতিল করা হবে।

রেজা কিবরিয়া মনে করেন, ‘বিএনপির সঙ্গে ভারত প্রসঙ্গে কৌশলগত কোনও ব্যবধান তৈরি করবে না। আমরা এ ব্যাপারে একমত, তবে হতে পারে একজন একভাবে বলছেন, আরেকজন আরেকভাবে বলছেন। আমাদের কথা খুব সহজ, এই দেশ পরিচালনা করা হবে এ দেশের মানুষের স্বার্থের জন্য। আর কিছু না, এর থেকে জটিল কিছু না। বিভিন্ন মত উঠে আসে, কেউ হয়তো খুব স্ট্রংলি বলবেন, কেউ হয়তো অত স্ট্রংলি বলবেন না, কিন্তু আমরা একই ডিরেকশনে যাচ্ছি।’

আলোচনায় ভারত প্রসঙ্গে বিএনপি ও গণফোরামের চিন্তায় পার্থক্য ধরা পড়েছে। এ বিষয়ে ফ্রন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আবরার হত্যাকাণ্ডের মতো কোনও ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেই বিষয়টিসহ দেশের সামগ্রিক অবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থা, ভারতের সঙ্গে চুক্তি ইত্যাদি বিষয়গুলো সমাবেশে থাকবে। আমরা ভারতবিরোধী নই, কিন্তু দেশটির অসম ব্যবহারকে বিরোধিতা করতে চাই আমরা।’

বৈঠকে সিনিয়র নেতাদের একজন এ প্রসঙ্গে অনীহা প্রদর্শন করেছেন, এমন তথ্য সম্পর্কে ফ্রন্টের আরেক সিনিয়র নেতার মন্তব্য, ‘বয়স্ক নেতাদের কিছু বিষয়ে হিসাব থাকেই, এটা বড় কিছু না।’

এদিকে, বৈঠকের পর রেজা কিবরিয়া সাংবাদিকদের জানান, আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে দেশে-বিদেশে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এস এম কিবরিয়া গ্রেনেড হামলায় নিহত হওয়ার পর প্রতিবাদে সারাদেশে ‘রক্তের অক্ষরে শপথের স্বাক্ষর’ শীর্ষক কর্মসূচি পালিত হয়। আবরার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদের ধরন অনেকটাই সেই রকমই হবে। আমরা আবরার হত্যার বিচারের দাবি আন্দোলন করবো। আমরা শপথ নেবো। সারাদেশে বিভিন্ন সময়ে এই কর্মসূচি পালন করা হবে।’

ড. রেজা কিবরিয়া প্রয়াত শাহ এএমএস কিবরিয়ার সন্তান। ২০০৫ সালে শাহ এএমএস কিবরিয়া গ্রেনেড হামলায় নিহত হন। রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘‘তার বাবার মৃত্যুর পর মা আসমা কিবরিয়ার কাছে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ কর্মসূচি ‘রক্তের অক্ষরে শপথের স্বাক্ষর’ নামকরণ করার প্রস্তাব করেছিলেন কবি সৈয়দ শামসুল হক।’’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একাধিক দায়িত্বশীল জানান, আবরার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শপথের স্বাক্ষর সংবলিত ব্যানার আগামী ডিসেম্বরে রাজধানী ঢাকায় প্রদর্শনের আয়োজন করা হবে।

বুধবার (১৬ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ফ্রন্টের বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন ড. কামাল হোসেন, জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, নগর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রমুখ।

/এএইচআর/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ