ভারতবিরোধী অবস্থানে ফিরলো বিএনপি?

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ২৩:৫৩, অক্টোবর ১১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৫৪, অক্টোবর ১৩, ২০১৯

বাংলাদেশ-ভারত চুক্তির বিষয়ে বিএনপির সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়র নেতারা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিকট-প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে ২০১৮ সালের শুরু থেকেই তৎপর ছিল বিএনপি। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই ‘অ্যান্টি ইন্ডিয়ান’ পার্টি হিসেবে পরিচিতি থাকলেও গত নির্বাচনের আগে দেশটির ক্ষমতাসীন বিজেপিসহ কয়েকটি থিঙ্ক ট্যাংকের সঙ্গে বিএনপির ‘নতুন নীতি ও ভারতের প্রতি পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি’ জানান দিয়ে এসেছিলেন দলের তিন নেতা। কিন্তু নির্বাচনের পর গত জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে এই অবস্থান পাল্টানোর ইঙ্গিত দেয় বিএনপি। এই ইঙ্গিত আরও স্পষ্ট হলো বৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর) হাইপ্রোফাইল সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে দেশটির সঙ্গে করা কয়েকটি চুক্তিকে ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে এর বাতিল চেয়ে দেওয়া হয় দেশব্যাপী কর্মসূচি।

বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ভারতের প্রতি মনোভাব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেকটা ‘মোমেন্টাম’ হিসেবে কাজ করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড। আবরার ফেসবুকে তার স্ট্যাটাসে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। হত্যার পেছনে যা কাজ করেছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করে, আবরার যে প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে খুন হয়েছেন, সেটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের অংশ। ফলে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিরই উচিৎ ছিল ভারতের সঙ্গে চুক্তির প্রতিবাদের বিষয়টি আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলা। এক্ষেত্রে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ‘পলিসিগত ভুল’ হিসেবে তা শোধরানোর চেষ্টা শুরু করেছে।

২০১৮ সালের জুনে ভারত সফরে যাওয়া বিএনপির নেতারাবৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তাতে খুব গুরুত্ব দিয়ে ভারতের সঙ্গে করা চুক্তিগুলোর বিষয়ে দলীয় অবস্থান তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহারের সুযোগ দেওয়া, উপকূলীয় এলাকায় রাডার স্থাপন, ডিউটি ফ্রি এলপিজি গ্যাস রফতানির সুযোগ দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান তুলে ধরেন দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। একইসঙ্গে ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর নির্বিঘ্নে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশের অবকাঠামো, নাগরিক পরিবহন চলাচল এবং অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির নিশ্চিত সম্ভাবনা দেখছে বিএনপি।

বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ, দলের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির (এফএসি) গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে করা দেশটির সঙ্গে কয়েকটি চুক্তির বিষয়ে বিএনপির মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব স্থায়ী কমিটির সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন— বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে এখন থেকে ভারতের সঙ্গে সমতাভিত্তিক আচরণে ফেরার। এক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনও দুর্বলতা না দেখানোর অবস্থান নিয়েছেন বিএনপির হাইকমান্ড।

দলের বিদেশ বিষয়ক কমিটির (এফএসি) প্রধান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী শুক্রবার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশের যখন ক্ষতি হয়, তখন একটি দেশপ্রেমিক এবং জনগণের রাজনৈতিক দল হিসেবে দায়িত্ববোধ থেকে আমাদের অবস্থান ব্যক্ত করতে হবে। ইস্যু তো ভারতের বিরুদ্ধে কিছু না, এটি কারও বিরুদ্ধেও কিছু না। যে পলিসির মাধ্যমে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তখন সেটি নিয়ে কথা বলা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের ভারতবিরোধী অবস্থান থাকার কারণ নেই। এই দেশের সঙ্গে আমাদের বৈদেশিক নীতি শত্রুতারও না। তবে দেশের ক্ষতি করে কিছু হলে,একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।’

‘যাদের জন্য আমরা রাজনীতি করি, তাদের স্বার্থে আমাদের বিষয়গুলো পরিষ্কার করতে হবে। জনগণের কাছে আমাদের জবাবদিহিতা আছে বিধায় আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। ভারতে সঙ্গে যে চুক্তিটা হয়েছে, সে ব্যাপারে জনগণের সামনে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরা জরুরি। দেশের যখনই ক্ষতি হয়েছে বিএনপি প্রতিবারই বলে আসছে।’ বলছিলেন সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়আমীর খসরুর দাবি, ‘এর আগেও তিস্তা আর ফারাক্কা বাঁধের ব্যাপারে বারবার স্টেটমেন্ট দিয়েছে বিএনপি। সীমান্তে নাগরিক হত্যার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বারবার বলা হয়েছে।’ যদিও গত কয়েকবছর সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে দলটি এত বেশি উচ্চকিত ছিল না। এ বছরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ঠাকুরগাঁও সীমান্তে দুজন বাংলাদেশিকে হত্যার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দেখায় বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, দশকের পর দশক ধরে সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যার ধারাবাহিকতা এখনও পর্যন্ত পুরোদমে চলছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে আমাদের তো কথা বলতেই হবে। আমরা তো এদেশের জনগণের জন্য রাজনীতি করি।’

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের প্রশ্ন, ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলে কি আমরা কোনও অন্যায় করেছি? তার মন্তব্য, ‘বিএনপি এদেশের জনগণের দল। দেশের জনগণের স্বার্থ আমাদের কাছে প্রাধান্য পাবে এটাই স্বাভাবিক।’

জাফরুল্লাহ চৌধুরীএ বিষয়ে বিএনপির রাজনীতির গভীর পর্যবেক্ষক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপির ঘুম ভাঙছে, আড়মোড়া দিচ্ছে। পুরোপুরি ঘুম ভাঙেনি। চুক্তি নিয়ে তারা এখনও ভারত প্রসঙ্গে কিছু বলেনি পরিষ্কারভাবে। তাদের রাজনৈতিক বড় ব্যর্থতা ভারতের তোষামোদ করা। বিএনপি মনে করে, ভারত-আমেরিকার সহায়তা ছাড়া ক্ষমতায় আসা যাবে না। এটা সঠিক নয়, দেখতে হবে দেশের মানুষ কোন পক্ষে। শেখ হাসিনা তো নির্বাচিত নন, সেজন্য ভারত তাকে দিয়ে নানা চুক্তি করিয়ে নিচ্ছে। বিএনপিকে আরও  স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড হতে হবে। মানুষ দেখতে চায় আত্মনিয়ন্ত্রণ রাখতে চায় কারা, মানুষ তাদের পক্ষেই দাঁড়াবে। সময় এসেছে বিএনপিকে ভারত নিয়ে পরিষ্কারভাবেই বলতে হবে।’

কেন ভারতের দিকে ঝুঁকেছিল বিএনপি?

বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে কাজ করছেন এমন কয়েকজন সদস্য জানান, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের অন্তত ছয় মাস আগে থেকে প্রতিবেশী ভারত নিয়ে অবস্থান পাল্টানোর পরামর্শ আসে কয়েকটি উইং থেকে। দেশের প্রভাবশালী একাধিক প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে বিএনপির হাইকমান্ডকে আশ্বস্ত করে ভারতের বিষয়ে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনার। এই পরামর্শে যুক্ত হয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ একটি অংশ, যারা দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে কনভিন্স করতে সক্ষম হয়।

ভারত নিয়ে বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি বদলের দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে গত বছরের জুনে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সম্মতি নিয়ে ভারত সফর করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির। ওই সফরে তারা বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউট, বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন, ভারত সরকারের থিঙ্ক ট্যাংক আইডিএস, ওআরএফ, কংগ্রেসের রাজীব গান্ধী কনটেম্পোরারি ইনস্টিটিউটের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলেন।

বিএনপির প্রতিনিধি দল সফরে থাকা অবস্থায় ৮ জুনের দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়— বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির বলেছেন, ‘পেছনে ফিরে তাকানোর পরিবর্তে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। ৮০ ও ৯০ দশকের রাজনীতি এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তারেক রহমান চান আমরা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হই। এখন উভয় দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকারের বিষয়।’ এছাড়া, বিএনপি সরকারের বিগত আমলগুলোতে ভারত ও বাংলাদেশের খারাপ সম্পর্কের নীতিকে ‘ভুল ও বোকামি’ বলেও মন্তব্য করেন হুমায়ুন কবির। ওই সফর শেষে দেশে ফিরে বাংলা ট্রিবিউনকে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘একটা বস্তুনিষ্ঠ ও বাস্তবসম্মত আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকা প্রয়োজন।’

এফএসি’র একজন সদস্য বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরিতে আমাদের অনেকেই ওরিয়েন্টশন করে। এরমধ্যে কয়েকটি উইং আছে। আমরা আসলে ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে ছিলাম। একটা অস্বস্তি তো তৈরি হয়েছিল। দিন শেষে দেখা গেলো, তাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের কোনও ফল নেই।’

শামসুল আলমজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামছুল আলম  মনে করেন, ‘জনগণের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ বা আবেগের বিষয়েও তো বিএনপিকে ভাবতে হবে। ভারতের সঙ্গে যে বন্ধুত্বের কথা বলা হচ্ছে সেটা তো নামে মাত্র ৷ কোনও চুক্তিতেই তো সমতা রক্ষা হয়নি। তাহলে দেশের স্বার্থের কথা চিন্তা করে হলেও তো বিএনপিকে এ বিষয়ে কথা বলতে হবে। সে কারণে বিএনপি হয়তো দেশের কথা,জনগণের কথা চিন্তা করে কথা বলছে।’

বিএনপির একটি দায়িত্বশীল পক্ষ জানিয়েছে, ‘বিএনপির জিয়াউর রহমান সরকারের পররাষ্ট্র নীতিতে ফিরেছে। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে সব সময় বন্ধুত্বসুলত সম্পক রেখেছে, শত্রুরা ভাবাপন্ন না ছিল না। এর প্রমাণ মিলে জিয়াউর রহমানে সরকারের সময়। ১৯৭৫-এর আগে গঙ্গার পানি নিয়ে কোনও চুক্তি হয়নি বরং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি হয়েছে ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে।’

 আরও পড়ুন: 

বদলে যাচ্ছে ভারতবিরোধী অবস্থান

বিএনপি কি চীনকে পাশ কাটাচ্ছে?

ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক বিএনপি: প্রশ্নের মুখে খসরু-মিন্টু-হুমায়ুন

বাংলাদেশে কী হচ্ছে, জানতে চায় ভারত: আমীর খসরু

‘দেশবিরোধী চুক্তি’ বাতিল ও আবরার হত্যার প্রতিবাদে বিএনপির দুই দিনের কর্মসূচি

/এএইচআর/এপিএইচ/

লাইভ

টপ