ক্রোয়েশিয়ার ‘জাদুকর’ দালিচ

Send
ফাহিম হোসেন মাজনুন
প্রকাশিত : ১১:২৯, জুলাই ১৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৬, জুলাই ১৫, ২০১৮


মদরিচের সঙ্গে ক্রোয়েশিয়া কোচ দালিচ

ক্রোয়েশিয়ার জার্সি জ্লাৎকো দালিচের পরা হয়নি কোনোদিন। কোচিংয়ে এক যুগের অভিজ্ঞতা, তাও আবার ‘অখ্যাত’ সব ক্লাবে। নিচু সারির ক্লাবের কোচ হয়ে পোড় খেতে খেতে তিনি পণ করেছিলেন- আর যাই হোক, গড়পড়তা কোচ হবেন না। দৃঢ়চেতা দালিচ তাই হুট করে ডাক পেয়ে ক্রোয়েশিয়ার দায়িত্ব এমন সময়ে নিলেন, যখন দলটি বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার শঙ্কায়। অবাক হতেই হয়, কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই ক্রোয়েশিয়াকে তিনি এনে দিলেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার দোরগোড়ায়! জাদুকর তাকে না বলে কাকে বলবেন!

আরও অবাক করা বিষয়, কোনও ধরনের লিখিত চুক্তি ছাড়া গত অক্টোবরে ক্রোয়েশিয়া জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব নেন দালিচ। শর্ত দেন, কেবল বিশ্বকাপের টিকিট কাটতে পারলে করবেন চুক্তি। ঝুঁকি নিয়ে যে তিনি সফল, সেটা না বললেও চলে। তার অধীনে বলকান দেশটি ছাড়িয়ে গেছে আগের সেরা সাফল্যকে, সঙ্গে দালিচও। ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপে অভিষেকের আসরে মিরোস্লাভ ব্লাজেভিচের অধীনে তৃতীয় হয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। ২০ বছর পর এবার বলকান অঞ্চলের দেশকে প্রথমবার ফাইনালে তুলে দালিচ ছাড়িয়ে গেলেন আগের ‘সেরা কোচকে’।

২০০৫ সালে ভারতেকসে কোচিং ক্যারিয়ারের শুরু দালিচের। তারপর রিজেকা, ডায়নামো তিরানা, স্লাভেন বেলুপো, আল-ফায়সালির মতো নাম না জানা দলের কোচ ছিলেন তিনি। সেই কোচই খাদের কিনারায় থাকা ক্রোয়েশিয়ার দায়িত্ব নেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ নিলেন। দালিচ কারণ ব্যাখ্যা করলেন এভাবে, ‘আমার জীবন ও ক্যারিয়ারজুড়ে আমি কঠিন পথ পাড়ি দিয়েছি। আমি ক্রোয়েশিয়ার গড়পড়তা কোচ হতে চাইনি। নিচু ক্লাব থেকেই শুরু করতে হতো আমাকে।’ কিন্তু সবশেষ এশিয়ান ফুটবলের অভিজ্ঞতা তাকে এনে দিয়ে অফুরন্ত আত্মবিশ্বাস, ‘এশিয়ায় এক বছরের মধ্যে আমি সেরা কোচ হলাম। তিন বছরের জন্য ছিলাম আল আইনে (সংযুক্ত আরব আমিরাত), যারা ইউরোপের রিয়ালের (মাদ্রিদ) মতো। এই অভিজ্ঞতাগুলো ছিল আমার জন্য অসাধারণ। এশিয়ার অন্যতম বড় দুটি দলের কোচ ছিলাম, তাই যখন ক্রোয়েশিয়ার ডাক পেলাম আমি কোনও দ্বিধায় ভুগিনি।’

অথচ ওই সময় ক্রোয়েশিয়ার ডাকে সাড়া দেওয়ার আগে দ্বিতীয়বার ভাবার কথা ছিল যে কারও। কারণ, বাছাই শেষ হতে আর মাত্র এক ম্যাচ বাকি, ক্রোয়েটদের প্লে অফ খেলাই অনিশ্চিত। গত বছর ৬ অক্টোবর রিজেকায় ফিনল্যান্ডের সঙ্গে ড্র করার পর ৬৩ বছর বয়সী কোচ আন্তে ক্যাকিচকে বরখাস্ত করলো দেশটির ফুটবল ফেডারেশন, আর ডাকলো দালিচকে। এই সুযোগ লুফে নিলেন ৫১ বছর বয়সী কোচ। তার ছোঁয়ায় বদলে গেল আগের চার ম্যাচে মাত্র ৪ পয়েন্ট পাওয়া ক্রোয়েশিয়া। শেষ ম্যাচে ইউক্রেনকে হারিয়ে গ্রুপের দ্বিতীয় দল হিসেবে নিশ্চিত করলো প্লে অফ, তারপর গ্রিসের বিপক্ষে দুই লেগে ৪-১ গোলের অগ্রগামিতায় (৪-১, ০-০) ক্রোয়েশিয়াকে তুললেন বিশ্বকাপে। ২০২০ সালের ৩০ জুলাই পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ হলেন তিনি।

বাকিটা ইতিহাস। তবে বিশ্বকাপের শুরুতেই ঝামেলায় পড়তে হয়েছে দালিচকে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে বদলি নামতে অস্বীকৃতি জানানোয় স্ট্রাইকার নিকোলা কালিনিচকে দেশে পাঠিয়ে দেন তিনি। এ নিয়ে মিডিয়া জলঘোলা করলেও দালিচ সেটা সামলেছেন ঠান্ডামাথায়। ২২ জন খেলোয়াড় নিয়েই এখন তার দলকে ফাইনালে নিলেন। ১৯৯৮ সালের দারুণ সাফল্যের পর তিনটি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে বিদায় নেওয়া দলটি এখন শিরোপার লড়াইয়ে। মাত্র ৪০ লাখ মানুষের এই ছোট্ট দেশটির বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠাকে অনেকে ‘অলৌকিক’ মনে করলেও দালিচ সেটা মানেন না। দলের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে দেখছেন তিনি।

নাইজেরিয়া, আর্জেন্টিনা ও আইসল্যান্ডকে গ্রুপ পর্বে হারাতে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে কেবল নির্দেশনাই দেননি দালিচ। কোনও খেলোয়াড় হতাশ হয়ে পড়লে তার কাঁধে হাত রেখেছেন। এই তো শেষ ষোলোর ম্যাচে ডেনমার্কের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে যখন লুকা মদরিচ পেনাল্টি মিস করলেন, তাকেই আবার টাইব্রেকারে স্পটকিক নেওয়ার দায়িত্ব দিলেন। পরে বলেছেনও, আবার সুযোগ এলে পেনাল্টি নিতে বলবেন তার অধিনায়ককে। দালিচের এই আস্থা পুরো দলের ওপর ছিল শুরু থেকে।

সাবেক যুগোস্লাভিয়ার বসনিয়া-হার্জেগোভিনার লিভনোতে জন্ম নেওয়া দালিচের সবচেয়ে বড় গুণ- দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়দের নির্ভার রাখতে পারদর্শী তিনি। সবাইকে উপভোগের মন্ত্রে উজ্জীবিত রাখতে চান সাবেক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। ২০১৬ সালে এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে আল আইন এফসিকে তোলার পর তিনি বলেছিলেন, ‘শিরোপা, ইতিহাস ও গৌরবের জন্য আর মাত্র ৯০ মিনিট খেলতে হবে। আমাদের সেরাটা দেওয়ার দারুণ সুযোগ আছে। আমার কাজ হলো ফুটবল খেলতে, ফাইনালকে উপভোগ করতে, চাপমুক্ত হয়ে সেরাটা দিতে দলকে প্রস্তুত করা।’ যদিও তার দল দক্ষিণ কোরিয়ার জিওনবুক হুন্দাই মোটরসের কাছে হেরে হয় রানার্সআপ। চূড়ান্ত সাফল্য না পেলেও আল আইনকে নিয়ে গেছেন উৎকর্ষের শিখরে। ২০১৪ সালের মার্চে আরব আমিরাতের দলটির দায়িত্ব নিয়ে র‌্যাংকিংয়ে ২০০ ধাপেরও বেশি এগিয়ে নেন। বিশ্বের ৩৩৫তম ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি করে দুই বছরেরও কম সময়ে ১২২তম স্থানে আল আইনকে নেন দালিচ।

তার আগে সৌদি আরবের দল আল হিলালকে এনে দেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স কাপ। সৌদি প্রফেশনাল লিগের ফাইনালে তুলেও দালিচ হাতে নিতে পারেনি শিরোপা। এই দুটি ক্লাব দিয়েই অভিজ্ঞতার ডালি সাজিয়েছেন বসনিয়ান কোচ। হাতে নিয়েছেন জাদুর কাঠি। যার ছোঁয়ায় মাত্র ৭ মাসে বদলে দিয়েছেন ক্রোয়েশিয়াকে। তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন ২০০২ সালে ব্রাজিলকে পঞ্চম বিশ্বকাপ জেতানো কোচ লুইস ফিলিপে স্কোলারিকে। দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে খেলাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল ব্রাজিলের। বাছাইয়ের ৫ ম্যাচ হাতে রেখে ছন্নছাড়া ব্রাজিলের দায়িত্ব নেন ‘অখ্যাত’ সব ক্লাবে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা থাকা স্কোলারি। উরুগুয়ের কাছে হার দিয়ে শুরু হলেও তুলে দেন বিশ্বকাপে। তারপর তো রোনালদোদের নিয়ে এনে দিলেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মর্যাদা।

এবার দালিচের মাঝে দেখা যাচ্ছে স্কোলারির ছায়া। তিনি কি পারবেন ফাইনালে উঠেই ‘হতবাক’ হয়ে যাওয়া ক্রোয়েশিয়ার মানুষকে আরও অবাক করে দিতে! ফিনিক্স পাখির মতো ক্রোয়েশিয়াকে ভস্ম থেকে তুলে এনেছেন দালিচ। এবার সেই পুনর্জাগরণকে গৌরবোজ্জ্বল করার পালা। মদরিচ-রাকিতিচরা তৈরি, আল-আইনের ফাইনালে হারের পর আক্ষেপ নিয়ে ক্রোয়েশিয়ার বিমান ধরা দালিচ প্রস্তুত শেষ থেকে শুরু করতে, ‘আল আইনে আমরা শিরোপার খুব কাছাকাছি ছিলাম, যেটা ওখানকার সব মানুষ খুব বেশি চেয়েছিল। জিওনবুকের কাছে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল হারের কথা এখনও মনে আছে আমার। সবসময় মনে থাকবে।’

সেই হতাশা নিশ্চিহ্ন করার সুযোগ এসে গেছে দালিচের সামনে। স্বপ্ন দেখছেন এবার তিনি, ‘আমরা এখনও স্বপ্নের মধ্যে আছি। আমরা শিরোপার খুব কাছে।’ হ্যাঁ, একেবারেই কাছে। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকে ক্রোয়েশিয়া হারালে তাকে নির্দ্বিধায় ‘জাদুকর’ বলবে ছোট্ট দেশের ৪০ লাখ জনগণ। শুধু ক্রোয়েটদের কাছে নয়, পুরো বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবেন ‘আন্ডারডগ’ হিসেবে ক্রোয়েশিয়াকে ফাইনালে জেতালে।

/এফএইচএম/চেক-এমওএফ/

লাইভ

টপ