বিশ্ব বেতার দিবসদলিত নারীদের অবস্থা বদলে দিচ্ছে কমিউনিটি রেডিও

Send
প্রতিভা ব্যানার্জী
প্রকাশিত : ০১:৪৬, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৩৬, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৭

ভোলার চরফ্যাশনে স্থাপিত কমিউনিটি রেডিও মেঘনার প্রতিবেদক ও অনুষ্ঠান প্রযোজক জান্নাত বেগম দলিত জনগোষ্ঠীর নারী হিসেবে একসময় সমাজে অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হতেন। এমনকি রেডিওতে কাজ শুরু করার পরও সইতে হয়েছে নানা মানুষের কথা। তার ভাষায়, ‘আমার বাবা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টয়লেট পরিষ্কার করেন। মা অন্যের বাড়িতে বুয়ার কাজ করেন। আমরা ৫ ভাই-বোন। রাস্তার পাশে আমাদের আবাস। রেডিও মেঘনায় কাজের শুরুর দিকে আশেপাশের অনেককে বলতে শুনেছি, ‘সুইপারের বেটি আবার রেডিওতে কাজ করে!’

রেডিওতে কথা বলছেন দলিত নারীরাআবার কখনও মায়ের সঙ্গে প্রতিবেশী কোনও নারীর কথা কাটাকাটি হলে মাকে বলত, ‘রাস্তার পাশে থাকিস আবার মেয়েকে রেডিওতে পাঠাস!’ কোনও প্রতিবাদ না করে কথাগুলো নীরবে শুনতাম। ভাবতাম ওরা তো সত্যি কথাই বলছে!

কিন্তু সময় আর সুযোগ জান্নাতকে বদলে দিয়েছে। একসময় যারা তাকে হেয় করে কথা বলত, আজ তারাই রেডিওতে তার অনুষ্ঠান শোনার জন্য অপেক্ষা করে থাকে। জান্নাত বলেন, ‘রেডিওতে কাজ করার মাধ্যমে বাহ্যিকভাবে আমার পরিবর্তন হয়তো সামান্যই হয়েছে। তবে আমার মানসিকতার পরিবর্তন যে অশেষ সেটা আমি বুঝতে পারি। কেননা এখন আর আমি নিজের জন্ম-পরিচয় কিংবা বাবা-মায়ের কর্ম পরিচয় নিয়ে লজ্জিত নই। কিছুদিন আগের সেই মাথা নিচু করে হেঁটে যাওয়া জান্নাত আর আমি নই। এখন আমি মাথা উঁচু করে, আত্মবিশ্বাস নিয়ে পথ চলার প্রত্যয়ী জান্নাত।’

দেশে বর্তমানে চলমান ১৭টি কমিউনিটি রেডিওতে জান্নাতের মতো গ্রামীণ যুব নারী বিশেষ করে সমাজের দলিত শ্রেণী যেমন-মুচি, মেথর, ঋষি, নাপিত, সুইপার, জেলে, বেদে, রবিদাস, কারিকর, কলু এবং স্থানীয় নৃ-তাত্ত্বিক মুণ্ডা, সাঁওতাল ও রাখাইন ইত্যাদি সম্প্রদায়ের নারীরা পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করছেন। তবে কিছুদিন আগেও সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে সাংবাদিকতা পেশায় পল্লী অঞ্চলের নারীরা ছিল পিছিয়ে। সেই চিত্রটা এখন বদলাতে শুরু করেছ।

২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)-এর উদ্যোগে এই কমিউনিটি রেডিওগুলো বাস্তবায়ন করছে ফেলোশিপ ফর ইয়ুথ উইমেন ইন কমিউনিটি মিডিয়া অ্যান্ড জার্নালিজম নামের কর্মসূচি। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়নে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় দলিত যুব নারীদের অংশগ্রহণে উৎসাহ প্রদান এবং তাদের সক্ষমতা অর্জনে সহায়কের ভূমিকা পালন করার লক্ষ্যে এই কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়।

ইতিমধ্যে এই কর্মসূচি আওতায় দেশের মোট ১৭টি কমিউনিটি রেডিওতে বিভিন্ন মেয়াদে ৫টি ব্যাচে সর্বমোট ৮৭জন স্থানীয় নারী সাংবাদিকতায় ফেলোশিপ গ্রহণ করছেন। এই নারীদের মধ্যে ৬০ জনই এসেছে দলিত সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে। বর্তমানে ৩৮ জন ফেলো সংশ্লিষ্ট রেডিওগুলোতে প্রযোজক (অনুষ্ঠান ও সংবাদ), বার্তাকক্ষ সম্পাদক, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, উপস্থাপক, সহযোগী প্রযোজক এবং প্রতিবেদক হিসেবে নিজেদের যোগ্যতার প্রমান রেখে চলেছেন।

দেশের সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবস্থিত কমিউনিটি রেডিও মহানন্দার স্টেশন ম্যানেজার আলেয়া ফেরদৌস জানান, তার রেডিওতে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন দলিত ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নারীরা। এমনই কয়েকজন- সোনিয়া শীল, মৌটুসি চৌধুরী, প্রতিমা রানী পাল, হাসিনা মারান্ডি ও লিলি কিস্কু। তারা রেডিও মহানন্দায় তুলে ধরছেন তাদের সম্প্রদায়ের নানান সমস্যা, সম্ভাবনা ও নিজস্ব সংস্কৃতি। তারা ভাঙছেন তাদের সমাজের নানা কুসংস্কারের বেড়াজাল।

রেডিও বিক্রমপুরের প্রতিবেদক রিংকি রানী দাস জানান, মুন্সীগঞ্জের প্রত্যন্ত চর অঞ্চলে বসবাসরত বেদে সম্প্রদায়ের কিশোরীদের বয়সন্ধিকাল সচেতনতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন করতে গিয়ে পরিচয় হয় ওই সম্প্রদারের এক কিশোরী সুমি আক্তারের সঙ্গে। নদীর পাড়ে নৌকায় বাস করেও যার পরিশীলিত চিন্তা ভাবনা ও প্রতিভা নজর কাড়ার মতো। একপর্যায়ে শুধু সুমিকে নিয়ে একটি আলাদা কেস স্টোরি তৈরি করে রেডিওতে সম্প্রচার করি। কেস স্টোরিটি দারুণ শ্রোতা প্রিয়তা লাভ করে।

পরবর্তীতে সুমিকে নিয়ে রেডিওতে একটি লাইভ শো করি। ক্রমান্বয়ে সুমি হয়ে ওঠে রেডিও বিক্রমপুরের একজন স্বেচ্ছাসেবক। এখন সুমি রেডিওতে কাজের পাশাপাশি স্কুলে যাচ্ছে। সুমির জীবনের গল্প নিয়ে তৈরি রেডিও অনুষ্ঠান করে অর্জন করেছে ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০১৬। তৃণমূলের আশা জাগানিয়া এই নারী সাংবাদিকরা এখন অভিজ্ঞ মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ইউনিসেফ কর্তৃক মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ও জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন।

নদীবন্দর খ্যাত উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় স্থাপিত রেডিও চিলমারীর যুগ্ম বার্তা সম্পাদক হেনা পারভীন তার, হরিজন সম্প্রদায়ের শিশু-কিশোরদের অবহেলিত জীবনাচার শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য ২০১৫ সালে ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন।

লেখক: কর্মসূচি কর্মকর্তা, বিএনএনআরসি

/এইচএএইচ/এমও/

লাইভ

টপ