টিকিট বিক্রি করা অনেক কঠিন: মালিহা এম. কাদির

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ১০:১৬, মার্চ ১৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:২০, মার্চ ১৮, ২০১৭

মালিহা এম. কাদির

বাংলাদেশের নারী ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা মালিহা এম. কাদির এবার ‘ইয়াং গ্লোবাল লিডার’ পুরস্কার পেয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়া ক্যাটাগরিতে এবার নির্বাচিতদের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশি তিনি।

চ্যালেঞ্জিং ও সৃজনশীল কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ৪০-এর কম বয়সীদের মধ্য থেকে প্রতি বছর ১০০ জনকে ‘ইয়াং গ্লোবাল লিডার’ স্বীকৃতি দেয় সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরাম। তাদের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে— বাংলাদেশের পরিবহন শিল্প ডিজিটালকরণে মালিহা এম. কাদির যুগান্তকারী কাজ করেছেন।

মালিহা এম. কাদির হলেন সহজ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তার প্রতিষ্ঠানের সেবাভিত্তিক পোর্টাল হলো ‘সহজ ডট কম’। এই পোর্টাল বাস ও লঞ্চের টিকিট বিক্রি করে। ‘ইয়াং গ্লোবাল লিডার’ পুরস্কারপ্রাপ্তির পর বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

বাংলা ট্রিবিউন: ইয়াং গ্লোবাল লিডার হলেন। এমন স্বীকৃতি পেয়ে কেমন লাগছে?

মালিহা এম. কাদির: খুবই ভালো লাগছে। এটা এমন একটি বিশ্বমানের প্ল্যাটফর্ম যেখানে কোনও প্রকারের লবিং চলে না। সেখানে আমাদের দেশের একজন নারী উদ্যোক্তার পুরস্কার পাওয়া অনেক বেশি প্রেরণাদায়ক। আরও ভালো লাগছে কারণ, বিশ্বব্যাপীই প্রযুক্তিক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক কম। তার মধ্যে এই পুরস্কার প্রাপ্তি অনেক বেশি উৎসাহ দেয়। গত বছর আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক যোগ্যতর ব্যক্তি হিসেবে এই পুরস্কার পেয়েছেন। এমন বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে পারায় ভালো লাগছে।

বাংলা ট্রিবিউন: এই স্বীকৃতি পাওয়ার পেছনে কী কী কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন?

মালিহা: দেশের ট্রান্সপোর্ট ইন্ডাস্ট্রির (পরিবহন খাত) ডিজিটাইজেশনের জন্য এই পুরস্কার পেলাম। আমার শিক্ষার ব্যাকগ্রাউন্ডও কিছুটা সহায়তা করেছে এতে। আমি হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে পড়েছি। চাইলে অন্য ক্যারিয়ার বেছে নিতে পারতাম। কিন্তু আমি এই ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছি। যে কোনও দেশের জন্যই ট্রান্সপোর্ট ইন্ডাস্ট্রির ডিজিটাইজেশনের কাজ অনেক কঠিন। আমি সেই কঠিন কাজটাকেই বেছে নিয়েছি। সত্যি বলতে, আমি সৃষ্টিশীল কাজ পছন্দ করি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার কাজ কী হবে?

মালিহা: এই সৃজনশীল ও উদ্যমী ব্যক্তিরা বিশ্বের জটিল পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবেন। তাদের একটি কমিউনিটিতে যোগদান এবং পাঁচ বছরের একটি লিডারশিপ জার্নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিভিন্ন দেশে সম্মেলন হয়। সেসবে অংশ নিয়ে নিজের দেশের অবস্থানকে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরা যায়। নেটওয়ার্কিং হয়, যোগাযোগ বাড়ে, বিভিন্ন প্রজেক্ট তৈরি করা যায়। কোনও সমস্যা থাকলে তার সমাধানও করা যায়। এটা একটা গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম। এখানে অনেক কিছু করা সম্ভব।

বাংলা ট্রিবিউন: উদ্যোক্তা কেন হলেন?

মালিহা: উদ্যোক্তা কেন হলাম সেটা বলা তো কঠিন, তবে ক্যারিয়ারের শুরুতে অনেক বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। ওই সময়ে মূলত আইটিভিত্তিক কাজে যুক্ত ছিলাম। তখন থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল সৃষ্টিশীল কিছু করার। তাছাড়া যারাই দেশ থেকে বিদেশে যায় তাদের ফিরে আসার একটা ইচ্ছা থাকে। দেখলাম আমার নিজের দেশেই কাজ করার অনেক সুযোগ আছে। তাই দেশে ফিরে নতুন কিছু করতে চেয়েছি।

বাংলা ট্রিবিউন: টিকিট বিক্রির জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কেন বেছে নিলেন?

মালিহা: আমি সবসময়ে চেয়েছি গণমানুষের প্রাত্যহিক জীবনে কাজে লাগে এমন একটা কিছু করতে। আর যানবাহনের টিকিট মানুষের প্রতিদিনই প্রয়োজন হয়। সেই ভাবনা থেকে এই ক্ষেত্রে কাজ করার আগ্রহ জন্মায় আমার মধ্যে।

বাংলা ট্রিবিউন: শুরুটা কেমন ছিল?

মালিহা: শুরুটা অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমাদের মূল চ্যালেঞ্জটা ছিল বাস মালিকদের বোঝনো যে তাদের কেন প্রযুক্তি প্রয়োজন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে দেখেছি, আমাদের বাস মালিকরা অনেক মেধাবী ব্যবসায়ী। তারা খুব সহজেই ধরে ফেলেছেন তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা। কিন্তু সমস্যা হয়েছে কাউন্টারের লোকদের বেলায়। তারা কম্পিউটারে যাবেই না বা যেতে চায়ও না। ক’দিন আগে একজন তো বলেই বসলেন, ‘জীবন গেলেও কম্পিউটার ছোঁব না!’ এরকম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হই আমরা। আমাদের লোকজন সবসময় কাউন্টারে থাকছে। প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সে হিসেবে বলতে পারেন সোশ্যাল সার্ভিসও দিচ্ছি আমরা।

শুরুর দিককার আরেকটি চ্যালেঞ্জ ছিল ভালো টিম বানানো। আমাদের দেশে যুতসই কাজের লোক পাওয়া খুব কঠিন। ডিজিটাইজেশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও বড় একটা চ্যালেঞ্জ। তাদের বোঝাচ্ছি যে, একটা কোম্পানি ডিজিটাল মাধ্যমে এলে ইন্টারনাল সিস্টেমেও কিছু পরিবর্তন আসে। যেমন ডিজিটাল রিপোর্ট বোঝানো, আমাদের চুক্তির ধারাগুলো বোঝানো। এমন ছোট ছোট অনেক চ্যালেঞ্জ থাকে। তবে আগের তুলনায় এখন কিছুটা সহজ হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার কাজের অভিজ্ঞতাটা কেমন?

মালিহা: এই ইন্ডাস্ট্রিতে এর আগে কোনও নারী কাজ করেননি। তবে এখানকার মানুষরা নারীদের সম্মান দেয়। তারা মনে করে নারীরা সৎ। সম্মানটাও মেলে। তবে চ্যালেঞ্জ তো থাকেই। একটা সন্দেহ তাদের থাকে যে, নারীরা কি কাজ করছে এবং ঠিকমতো করছে কিনা। কারণ সবসময় তো আর আমি যেতে পারি না। সহজ ডট কমের কর্মীরা যায়। সেটা কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়।

বাংলা ট্রিবিউন: এখনকার অবস্থা কেমন?

মালিহা: যেখান থেকে শুরু করেছি তার চেয়ে এখন অনেক ভালো। এখনও আমরা বেশি বড় কিছু হতে পারিনি। তবে ই-কমার্সে আমরা লেনদেনের দিক থেকে সর্বোচ্চ জায়গায় আছি এটা বলতে পারি। বাস অপারেটররা আমাদের ওপর খুশি। আসলে কেবল ব্যবসা করলেই আমাদের হচ্ছে না। আমাদের দুই দিক থেকেই প্রশিক্ষণ দিতে হচ্ছে। কাউন্টারম্যানদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি ক্রেতাদেরও বলতে হচ্ছে কীভাবে টিকিট কিনতে হবে। আমরা এসেছি তো খুব বেশিদিন হয়নি। এই তো আড়াই বছরের কিছু বেশি সময় হলো। এই সময়ে আমরা নিজেদের অবস্থান নিয়ে খুশি। প্রতি বছর দ্বিগুণ, তিনগুণ করে লেনদেন বাড়ছে। তবে সংখ্যার দিক থেকে চিন্তা করলে এখনও সেটি খুবই নগন্য। আসলে ই-কমার্স এভাবেই বাড়ে।

বাংলা ট্রিবিউন: টিকিট বিক্রি করা সহজ না কঠিন?

মালিহা: টিকিট বিক্রি করা অনেক কঠিন। আমাদের জনগণ এখনও বোঝে না আসলে কীভাবে অনলাইনে টিকিট কাটতে হবে। অনেকে অনলাইন অর্ডার করে বসে আছে টিকিট হাতে পাওয়ার জন্য। অথচ সেখানেই লেখা আছে ‘প্রিন্ট ইউর টিকিট’। প্রিন্ট দিলেই কিন্তু টিকিট সঙ্গে সঙ্গে হাতে পাওয়া যায়। এটা তো সেলফ সার্ভিস। তবুও টিকিট কাটার জন্য মানুষ কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে। কাস্টমার কেয়ারে প্রতিদিন হাজার হাজার কল এলে সব তো আর যথাসময়ে উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।

 ‘টিকিট বুক’ না করেই মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে যদি কেউ অভিযোগ করেন সহজ ডট কম টাকা মেরে দিয়েছে সেক্ষেত্রে আমাদের কী করণীয় থাকতে পারে বলুন? আবার অনেকে ভুল পরিমাণ টাকাও আমাদের পাঠান। এমনও দেখা গেছে এক টাকা বেশি পাঠিয়েছেন কেউ। তবে এমন হলে আমরা ওই ১ টাকাও ফেরত পাঠিয়েছি। যদিও ১ টাকা ফেরত পাঠানো অনেক কঠিন। তবুও আমাদের অঙ্গীকারের জায়গা থেকে এটা করেছি। তবে আগের চেয়ে আমাদের সেবার বিপরীতে অভিযোগ আসা অনেক কমেছে। যদিও এসব অভিযোগের মধ্যে গ্রাহকের ভুলের কারণই অনেক বেশি।

বাংলা ট্রিবিউন: আগামীর পরিকল্পনা কী?

মালিহা: আগামীতে পরিবহন খাতের আরও কিছু সেবা নিয়ে আসবো আমরা। আরও বড় পরিসরে সেবা সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।

বাংলা ট্রিবিউন: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মালিহা: বাংলা ট্রিবিউনকেও অনেক ধন্যবাদ।

/জেএইচ/

লাইভ

টপ