দেড় মাসব্যাপী জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে পর্দা নামলো ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো; এই তিন স্বাগতিক দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে স্পেন। রানার্সআপ হয়েছে আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ আবারও প্রমাণ করেছে, ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোর একটি। মাঠের লড়াই, দর্শকের আবেগ, সম্প্রচার প্রযুক্তি, বিপণন, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ; সব কিছুকে একসূত্রে বেঁধে দেয় এই প্রতিযোগিতা। চ্যাম্পিয়ন স্পেন পেয়েছে পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার, রানার্সআপ আর্জেন্টিনা পেয়েছে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। বিশ্বকাপের মোট প্রাইজমানিও ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ফুটবলের সৌন্দর্য তার শিল্পে। একটি নিখুঁত পাস, সৃজনশীল আক্রমণ, অপ্রত্যাশিত গোল কিংবা একটি অসাধারণ সেভ কোটি মানুষের অনুভূতিকে এক মুহূর্তে বদলে দেয়। এই নান্দনিকতাই ফুটবলকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলায় পরিণত করেছে। বিশ্বকাপের সময় ভাষা, ধর্ম, জাতি ও ভূগোলের বিভাজন অনেক ক্ষেত্রেই গৌণ হয়ে যায়; মানুষ খেলার সৌন্দর্যকে উদযাপন করে।
বাংলাদেশেও বিশ্বকাপ এক অনন্য সামাজিক উৎসব। বাংলাদেশের দল বিশ্বকাপে অংশ নেয় না, তবু বিশ্বকাপ এলে দেশের গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত উৎসবের আবহ তৈরি হয়। বাড়ির ছাদ, রেলিং, দোকান, রাস্তাঘাট, এমনকি অফিসে অফিসেও বিদেশি পতাকায় সয়লাব হয়ে যায়। চায়ের দোকানে জমে ওঠে তর্ক। অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়, বাজার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম; সব জায়গায় আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে ফুটবল। সারা দেশে বড় পর্দায় খেলা দেখার উন্মাদনা ও প্রাণচাঞ্চল্য বাঙালির সংস্কৃতিরই একটি প্রকাশ। আড্ডা, বিতর্ক, মতবিনিময় এবং সম্মিলিত আনন্দ; এসব সামাজিক জীবনের ইতিবাচক দিক।
কিন্তু এই উৎসবের পাশাপাশি প্রতি বিশ্বকাপেই আরেকটি নির্মম বাস্তবতা সামনে আসে। ফুটবলকে ঘিরে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা এবং প্রাণহানির সংবাদ। এবারের বিশ্বকাপে দেশের বিভিন্ন স্থানে সমর্থকদের সংঘর্ষ, তর্কাতর্কি, পতাকা টানাতে গিয়ে দুর্ঘটনা, বিজয় উদ্যাপনের সময় সড়ক দুর্ঘটনা এবং অন্যান্য ঘটনায় অন্তত ১২ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। একটি ক্রীড়া উৎসবের সঙ্গে এমন মৃত্যুর তালিকা কোনও সভ্য সমাজের পরিচয় বহন করে না।
এই নিহত ব্যক্তিদের কেউ স্পেনের নাগরিক নন, কেউ আর্জেন্টিনার নন, কেউ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী অন্য কোনও দেশেরও নন। তাঁরা বাংলাদেশের মানুষ। যেসব দলকে ঘিরে এই সংঘর্ষ, সেই দলগুলোর খেলোয়াড়রা তাদের চেনেন না। সেই রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় জীবনেও এই ঘটনাগুলোর কোনও প্রতিফলন নেই। কিন্তু ফুটবলের আনন্দযজ্ঞে বাংলাদেশের বহু পরিবার স্থায়ী শোকে নিমজ্জিত হয়ে গেল। খেলার আনন্দ জীবনহানির বেদনায় রূপ নিয়েছে।
২০২২ সালের বিশ্বকাপেও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সমর্থকদের সংঘর্ষ ও বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় পাঁচ জন নিহত, ৩৫ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং অন্তত ৪৫ জন আহত হয়েছিলেন। চার বছর পর সেই সংকট আরও গভীর হয়েছে। প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। সহিংসতার ধরনও বিস্তৃত হয়েছে। এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এগুলো সামাজিক আচরণের ধারাবাহিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
ফুটবলে কোনও দলকে সমর্থন করা সমস্যা নয়, আবেগও নয়। সমস্যা তৈরি হয় অন্ধ সমর্থন, অসহিষ্ণুতা এবং ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে। খেলার ফলাফলকে ব্যক্তিগত সম্মান-অপমানের প্রশ্নে পরিণত করার সংস্কৃতি সমাজে সহিংসতার ক্ষেত্র তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই উত্তেজনাকে আরও তীব্র করেছে। অনেক সময় অনলাইন বিতর্ক বাস্তব জীবনের সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। এই প্রবণতা কি আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার ফল, নাকি সামাজিকীকরণের ব্যর্থতা? উত্তর হিসেবে বলা যায়, এটি পারিবারিক শিক্ষা ও নাগরিক সংস্কৃতির সংকটের প্রতিফলন। খেলাধুলা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা এবং প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলার কথা। অথচ সেই খেলাকে ঘিরেই ঘৃণা, সহিংসতা এবং প্রতিশোধের মনোভাব তৈরি হচ্ছে। এটি সমাজের জন্য গভীর সতর্কবার্তা।
বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। আলো নিভেছে স্টেডিয়ামের। ট্রফি পৌঁছে গেছে চ্যাম্পিয়নের হাতে। কোটি কোটি ডলারের পুরস্কারও পৌঁছে গেছে প্রাপকদের কাছে। কিন্তু বাংলাদেশের কিছু পরিবারে শোকের মাতম শেষ হয়নি। সেই ঘরে কোনও ট্রফি নেই, কোনও উদযাপন নেই। আছে কেবল একজন প্রিয় মানুষকে হারানোর দীর্ঘশ্বাস।
ফুটবল আনন্দের খেলা। বিশ্বকাপ উৎসবের নাম। সেই উৎসবের শেষে মৃত্যুর হিসাব নয়, মানবিকতার হিসাবই সামনে আসা প্রয়োজন।
লেখক: প্রভাষক, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)









