খুনের রাজনীতি নয়, জবাবদিহির রাষ্ট্র চাই

সালেক উদ্দিন
১৯ জুলাই ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১৪:০০

একটি সমাজ কখন সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে? যখন অপরাধীরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, তারা পার পেয়ে যাবে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে সংঘটিত ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডগুলো সেই উদ্বেগজনক বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

গণঅভ্যুত্থানের পর এক অবিস্মরণীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় এসেছে। বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী হত্যার ঘটনা শুধু একটি দলের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়— এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জবাবদিহির কাঠামোর জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত।

বর্তমানে খবরের কাগজের পাতায় প্রতিদিন খুনের খবর ফলো করে প্রকাশিত হচ্ছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে এইসব হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মী নিহত হওয়ার খবরও এসেছে ।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশে ৩৪৭টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫৫ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬৩৬ জন আহত হয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ঘটনাই সবচেয়ে বেশি।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে— কেন মানুষ এত সহজে খুনের মতো ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে?

এর একটি বড় কারণ হলো— শাস্তির ভয় কমে যাওয়া। বহু মানুষের মধ্যে এমন ধারণা জন্মেছে যে, রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার ছায়া কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আশ্রয় থাকলে অপরাধ করেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব। যখন অপরাধী মনে করে— আইনের চেয়ে তার রাজনৈতিক পরিচয় শক্তিশালী, তখন খুন তার কাছে আর শেষ সীমার অপরাধ বলে মনে হয় না।

অপরাধবিজ্ঞানের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ধারণা হলো— অপরাধ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় কেবল কঠোর শাস্তি নয়, বরং নিশ্চিত শাস্তি। অর্থাৎ অপরাধীকে দ্রুত শনাক্ত করা হবে, বিচারের আওতায় আনা হবে এবং শাস্তি কার্যকর হবে— এই বিশ্বাস সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। একজন খুনি যদি জানে যে রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ কিংবা প্রভাব কোনোটিই তাকে রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে অপরাধ করার আগে সে বহুবার ভাববে।

এ কারণেই প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে দল-মত-পরিচয় নির্বিশেষে দ্রুত তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিচার বিলম্বিত হলে শুধু একটি মামলার ক্ষতি হয় না, সমাজে একটি বার্তা ছড়িয়ে পড়ে—অপরাধ করেও বেঁচে থাকা যায়।

বিশেষত যখন কোনও খুনের ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের কোনও ব্যক্তি বা সমর্থকের নাম আসে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেশি বেড়ে যায়। কারণ জনগণ তখন শুধু অপরাধীকে নয়, রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতাকেও বিচার করে। অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা পাওয়া মাত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সম্পর্ক স্থগিত বা বিচ্ছিন্ন করা, তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করা এবং প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি। এতে দল শক্তিশালী হয়, দুর্বল নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা বারবার দেখেছি, যখন কোনও দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকে, তখন কিছু সুবিধাবাদী ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যক্তিগত ব্যবসা ও প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। ফুটপাত, বাজার, পরিবহন, টেন্ডার, ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা কিংবা স্থানীয় আধিপত্য—এসবের সঙ্গে রাজনীতি জড়িয়ে গেলে আদর্শের জায়গা দখল করে নেয় অর্থনৈতিক স্বার্থ। তখন প্রতিপক্ষ আর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে না, হয়ে ওঠে ব্যবসায়িক প্রতিযোগী। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় সহিংসতা।

এ কারণেই দলীয় হাইকমান্ডের দায়িত্ব শুধু বিবৃতি দেওয়া নয়— মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে খুন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সন্ত্রাস কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার কোনও অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। যারা অপরাধ করবে, তারা যত প্রভাবশালীই হোক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে— এ বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তবে এই নীতি শুধু ক্ষমতাসীন দলের জন্য নয়। বিরোধী দলগুলোর ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হতে হবে। কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান যদি ব্যক্তি বা দলের পরিচয় দেখে বদলে যায়, তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না। একটি দলের সন্ত্রাস অন্য দলের সন্ত্রাসকে বৈধতা দেয় । রাষ্ট্রের চোখে সব অপরাধীর পরিচয় একটাই— অপরাধী।

আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়, রাজনৈতিক জবাবদিহি। প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে কোনও খুনি ভাবতে না পারে যে, সে পার পেয়ে যাবে, কোনও দল ভাবতে না পারে যে, রাজনৈতিক পরিচয় আইনের ঊর্ধ্বে এবং কোনও নাগরিক মনে না করে যে, বিচার কেবল দুর্বলদের জন্য।

খুনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স শুধু বক্তৃতার ভাষা হলে চলবে না। সেটিকে রাষ্ট্রের আচরণে, রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডে এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতায় দৃশ্যমান করতে হবে।

কারণ সভ্য সমাজের প্রথম শর্ত হলো— মানুষের জীবন সস্তা নয়। আর রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো সেই জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

লেখক:  সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, আজীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রেকর্ডের মহামঞ্চে মেসি: ফাইনালে ভাঙতে পারেন যেসব কীর্তি
রেকর্ডের মহামঞ্চে মেসি: ফাইনালে ভাঙতে পারেন যেসব কীর্তি
ফাইনালের আগে মেসিকে নিয়ে এমবাপ্পের চমকপ্রদ মন্তব্য
ফাইনালের আগে মেসিকে নিয়ে এমবাপ্পের চমকপ্রদ মন্তব্য
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
বগুড়ার আলোচিত সেই তিন ইউনিয়নের নতুন নাম ঘোষণা
বগুড়ার আলোচিত সেই তিন ইউনিয়নের নতুন নাম ঘোষণা
সর্বশেষসর্বাধিক