শিশু বাঁচানোর অসমাপ্ত লড়াই

অধ্যাপক আবু হাসানাত মোহাম্মদ কিশোয়ার হোসেন
২৫ জুলাই ২০২৬, ১০:১৫আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০:১৫

বাংলাদেশ গত তিন দশকে শিশুমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম সফল উদাহরণ তৈরি করেছে। টিকাদান কর্মসূচি, খাবার স্যালাইন এবং নিউমোনিয়ার চিকিৎসা সম্প্রসারণের ফলে ডায়রিয়া, হাম ও নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যু আশির দশকের তুলনায় ভগ্নাংশে নেমে এসেছে। জন্মের সময় গড় আয়ুও ঊনসত্তরের দশকের ৫৮ বছর থেকে বেড়ে এখন প্রায় ৭৫ বছরে পৌঁছেছে। কিন্তু এই সাফল্যের মধ্যেও একটি অধ্যায় এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে—পানিতে ডুবে মৃত্যু। যেসব রোগকে টিকা ও ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে, সেসবের জায়গায় এখন বড় ঘাতক হয়ে উঠছে এমন একটি ঝুঁকি, যা ঠেকাতে প্রয়োজন কেবল সচেতনতা, নজরদারি ও সামাজিক দায়িত্ববোধ।

আগামী ২৫ জুলাই বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ইউনাইট টু টার্ন দ্য টাইড’—স্রোতের মোড় ঘোরাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পানিতে ডুবে মৃত্যু ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার নয়; বরং শিশুস্বাস্থ্যে অর্জিত সাফল্যকে পূর্ণতা দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

পরিসংখ্যান বলছে, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ এখন পানিতে ডুবে যাওয়া। পাঁচ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এটি তৃতীয় প্রধান কারণ। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ হাজারের বেশি শিশু এভাবে প্রাণ হারায়—অর্থাৎ দিনে গড়ে ৪০ জন। এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের একটি সংকট, যা অন্যান্য শিশুঘাতী রোগ নিয়ন্ত্রণে আসার পর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এক অর্থে বলা যায়, রোগের বিরুদ্ধে আমরা অনেকটাই সফল হলেও পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকর লড়াই শুরুই করতে পারিনি।

এই ব্যর্থতার একটি বড় কারণ আমাদের সামাজিক কাঠামো। সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় ছিল টিকাকেন্দ্র, স্বাস্থ্যকর্মী ও জাতীয় কর্মসূচি। কিন্তু একটি শিশুকে পানিতে ডোবা থেকে রক্ষা করার দায় প্রায় পুরোপুরি পরিবারের, বিশেষ করে মায়ের ওপর বর্তেছে। অথচ একজন গ্রামীণ নারীকে একই সময়ে রান্না, পানি সংগ্রহ, গৃহস্থালির কাজ, অন্য সন্তানের যত্ন এবং অনেক ক্ষেত্রে আয়মূলক শ্রমও সামলাতে হয়। কয়েক মুহূর্তের অসতর্কতায় কোনো শিশু মারা গেলে সমাজ প্রথমেই মাকেই দোষারোপ করে। অথচ প্রশ্ন হওয়া উচিত—কেন একজন নারীকে এতগুলো দায়িত্ব একাই বহন করতে হয় এবং কেন নিরাপদ শিশুযত্নের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি? ব্যক্তিকে দোষারোপ করে কাঠামোগত ব্যর্থতা আড়াল করা যায়, সমাধান হয় না।

নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া বা মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধে জাতীয় কর্মসূচি, বাজেট ও তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া পানিতে ডুবে মৃত্যুর জন্য নেই কোনো স্বতন্ত্র জাতীয় পরিকল্পনা, নির্দিষ্ট বাজেট বা নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের কাঠামো। কোথায়, কখন, কোন বয়সের শিশু ডুবে মারা যাচ্ছে—এই মৌলিক তথ্যও নিয়মিতভাবে সংরক্ষিত হয় না। যে সমস্যাকে পরিমাপ করা হয় না, সেটি কখনও অগ্রাধিকারও পায় না। এটি নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতা, কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়।

এদিকে পুরোনো এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন ঝুঁকি। বন্যা, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ বাড়ছে, আর বন্যাজনিত মৃত্যুর বড় অংশই পানিতে ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে আগে থেকেই অবহেলিত এই সমস্যা ভবিষ্যতে আরও তীব্র হতে পারে। এখনই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

তবে আশার বিষয়, সমাধান নাগালের মধ্যেই রয়েছে এবং তা ব্যয়বহুলও নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামভিত্তিক ‘আঁচল’ শিশুযত্নকেন্দ্রে দিনের ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের নিরাপদ তত্ত্বাবধানে রাখলে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৮০ শতাংশের বেশি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে স্কুলগামী শিশুদের জীবনরক্ষাকারী সাঁতার শেখানো হলে ঝুঁকি আরও কমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এই দুটি উদ্যোগ ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৭ লাখ ৭৪ হাজার শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব এবং প্রতিটি বিনিয়োগের বিপরীতে নয় গুণ পর্যন্ত সামাজিক প্রতিদান মিলতে পারে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, এখনো কেন আমরা এগোতে পারিনি? উত্তরটি বিজ্ঞানে নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছায়। যেমন একসময় জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার পেয়েছিল, তেমনি পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধকেও একটি স্বতন্ত্র জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট বাজেট, নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ এবং কার্যকর জবাবদিহি। একই সঙ্গে সমাধানের পরিকল্পনায় নারীর বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে—নিরাপদ শিশুযত্নকেন্দ্র, প্রতিবেশীভিত্তিক নজরদারি এবং মায়ের ওপর একক দায় চাপিয়ে না দিয়ে সামষ্টিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে। পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার প্রতিটি স্তরেও পানি-নিরাপত্তাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের দুর্যোগ আজকের অবহেলাকে আরও ভয়াবহ করে না তোলে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে শিশুমৃত্যুর মতো কঠিন সংকটও মোকাবিলা করা সম্ভব। পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধও তেমনই একটি চ্যালেঞ্জ, যার সমাধান আমাদের হাতের নাগালেই রয়েছে। প্রয়োজন কেবল সেই একই অগ্রাধিকার, একই দৃঢ়তা এবং সমন্বিত উদ্যোগ। শিশু বাঁচানোর যে লড়াই কয়েক দশক আগে শুরু হয়েছিল, পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের মাধ্যমেই সেই লড়াই প্রকৃত অর্থে পূর্ণতা পেতে পারে।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান ও প্রকল্প পরিচালক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

/ইউএস/
সম্পর্কিত
রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি 
‘এমপি ও রাজনীতিকরা’ ভালো হবেন কবে? 
গাজী সিনড্রোম এবং তার পেছনের মনস্তত্ত্ব 
সর্বশেষ খবর
স্কুলছাত্রী বান্ধবীর টানে বাংলাদেশে এলেন চীনা নাগরিক
স্কুলছাত্রী বান্ধবীর টানে বাংলাদেশে এলেন চীনা নাগরিক
যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা বিষয়ে দূতাবাসের নির্দেশনা
যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা বিষয়ে দূতাবাসের নির্দেশনা
ককরোচ পার্টির কঠোর অবস্থান, পদত্যাগ নিয়ে আপস করবে না
ককরোচ পার্টির কঠোর অবস্থান, পদত্যাগ নিয়ে আপস করবে না
রহস্য, প্রেম আর অ্যাকশন: সপ্তাহজুড়ে ওটিটির পর্দায় রঙিন আয়োজন
রহস্য, প্রেম আর অ্যাকশন: সপ্তাহজুড়ে ওটিটির পর্দায় রঙিন আয়োজন
সর্বাধিক পঠিত
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে, একজনের নাম উল্লেখ করে যা বললেন আসিফ নজরুল
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে, একজনের নাম উল্লেখ করে যা বললেন আসিফ নজরুল
অবশেষে আলোচিত সেই প্রকৌশলী দম্পতিকে দুই সিটিতে বদলি
অবশেষে আলোচিত সেই প্রকৌশলী দম্পতিকে দুই সিটিতে বদলি
প্রেমিকার জন্য স্পেনের রাজকন্যাকে কি প্রত্যাখ্যান করেছেন গাভি
প্রেমিকার জন্য স্পেনের রাজকন্যাকে কি প্রত্যাখ্যান করেছেন গাভি
সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে যেসব সুবিধা পাবেন মো. সাহাবুদ্দিন
সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে যেসব সুবিধা পাবেন মো. সাহাবুদ্দিন
সংগৃহীত নামগুলো থেকেই একজন রাষ্ট্রপতি হবেন: বিএনপি নেত্রী
সংগৃহীত নামগুলো থেকেই একজন রাষ্ট্রপতি হবেন: বিএনপি নেত্রী