X
সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২
৩১ শ্রাবণ ১৪২৯

এ সেতু স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি: প্রধানমন্ত্রী

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২৫ জুন ২০২২, ১১:১২আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ১২:৫১

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এ সেতু কেবল সেতু নয়। এর ৪২টি স্তম্ভ স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না। কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি। আমরা বিজয়ী হয়েছি।’

শনিবার (২৫ জুন) মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। 

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, ‘সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথায় বলতে হয় শাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়। জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়। জাতির পিতা শেখ মুজিব মাথা নোয়াননি। মাথা নোয়াতে শেখাননি। তারই নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমরা তারই অনুসারী।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এই সেতু শুধু যে দুই পাড়ের মানুষের বন্ধন সৃষ্টি করেছে তা নয়, এই সেতু শুধু ইট-বালু-সিমেন্ট-স্টিল-লোহা কংক্রিটের অবকাঠামো নয়; এই সেতু আমাদের অহংকার, এই সেতু আমাদের গর্ব, এই সেতু আমাদের সক্ষমতা, আমাদের মর্যাদার শক্তি।

এ সেতু স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি: প্রধানমন্ত্রী এই সেতু দেশের জনগণের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ, আমাদের সৃজনশীলতা, আমাদের সাহসিকতা এবং আমাদের প্রত্যয়। যদিও ষড়যন্ত্রের কারণে আমাদের প্রায় দুই বছর বিলম্বিত হয়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ষড়যন্ত্রের কারণে পদ্মা সেতু নির্মাণে দুই বছর দেরি হলেও কিন্তু হতাশায় ভুগিনি। শেষ পর্যন্ত অন্ধকার দূর করে আলোর পথে যাত্রা করতে সক্ষম হয়েছি।’

বাংলাদেশের মানুষের সাহস ও আত্মমর্যাদার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পর এক বিদেশি সাংবাদিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বাংলাদেশের কোনও সম্পদ নেই, আপনি কীভাবে দেশ গড়ে তুলবেন? বঙ্গবন্ধু  এর জবাবে বলেছিলেন, ‘আমার মাটি আছে, মানুষ আছে, তা দিয়েই দেশ গড়বো।’ সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের অর্থনীতি সচল আছে। অনেক প্রকল্প নিয়েছি, পদ্মা সেতু তৈরি করেছি। বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে যায়নি। বাংলাদেশের অর্থনীতি করোনা মোকাবিলা করেছে, ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ মোকাবিলা করেও গতিশীল আছে। বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ, জনগণ সাহসের ঠিকানা। বাংলাদেশের জনগণকে আমি স্যালুট জানাই।

তিনি বলেন, ‘অনেকে বলেছিল পদ্মা সেতু সম্ভব না, বিরোধিতা করেছিল, ষড়যন্ত্র করেছিল; আমি মনে করি তাদের চিন্তার ও আত্মবিশ্বাসের দৈন্যতা আছে। তবে আজকের পরে তাদেরও আত্মবিশ্বাস বাড়বে বলে বিশ্বাস করি- না, বাংলাদেশ পারে।’

এ সেতু স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আমরা সিদ্ধান্ত নেই পদ্মা সেতু করার। যে সমীক্ষা জাপান করে দিয়েছিল তারই ভিত্তিতে এই সেতু নির্মাণের পদক্ষেপ নেই। সরকার গঠনের মাত্র ২২ দিনের মধ্যে আমরা এর নকশা করার জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ দেই। আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকসহ অনেকে এগিয়ে আসে। বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পে টাকা দিতে রাজি হয়। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জার যে— একটা পর্যায়ে আমাদের দেশের কোনও এক স্বনামধন্য ব্যক্তি, তিনি একটি ব্যাংকের এমডি ছিলেন, যেহেতু তার বয়স অনুযায়ী একটি ব্যাংকের এমডি পদে থাকতে পারেন ৬০ বছর পর্যন্ত। ৭০ বছর বয়সেও তিনি এমডি পদে বহাল। বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে বলেছিল, আপনি তো এভাবে থাকতে পারেন না। তখন তাকে ওই ব্যাংকের অ্যাডভাইজর এমিরেটাস পদ দেওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু তিনি ক্ষেপে যান। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে। সেই মামলায় তিনি হেরে যান। এরপর দেখলাম— বিশ্বব্যাংক অর্থ বন্ধ করে দিলো দুর্নীতির অভিযোগ এনে। যখন আমি এটা চ্যালেঞ্জ দিলাম, অভিযোগ দেখাতে হবে আমাকে, যাই হোক আমরা থেমে যাইনি। পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতি আমরা করতে পারি না, করবো না। কাজেই অনেক পানি ঘোলা, অনেক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করলাম। এর সঙ্গে যুক্ত হলো বাংলাদেশের অনেক স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে অনেক জ্ঞানীগুণী, অনেক ধরনের মতামত। এমন একটা অবস্থা হলো যে দুর্নীতি নিয়ে যেখানে কোনও টাকা-পয়সাই দেওয়া হয়নি। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক মামলা করলো, কিন্তু কানাডার আদালত রায় দিল— বিশ্ব ব্যাংকের সব অভিযোগ ভুয়া-মিথ্যা। কোনও দুর্নীতি এখানে হয় নাই। তারপর অবশ্য তারা থেমে যায়।

আমি এইটুকুই বলবো—  বাংলাদেশ আমাদের দেশ। এদেশ আমার বাবা স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা, কল্যাণ করা আমরা দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছি। কাজেই যতই অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করুক, সেই সঙ্গে আমাদের ছেলেমেয়েদের ওপর কম ধকল যায়নি। যখন সব প্রতিষ্ঠান পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল, আমি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করবো। এই ঘোষণার পর আমার দেশবাসী, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছিলাম। তারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মানুষের শক্তি হচ্ছে বড় শক্তি। সেই শক্তি নিয়েই আমি সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করি।

তিনি আরও বলেন,   আমি কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলাদেশের মানুষের প্রতি। সেদিন তারা শুধু আমাদের পাশে দাঁড়াননি অনেকে অর্থ পর্যন্ত দিয়েছিলেন। আমি জানি না যারা বলেছিলেন— এটা হবে না, নিজস্ব অর্থায়নে সম্ভব না। যাই হোক আমার কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। তাদের হয়তো চিন্তার দৈন্যতা আছে। আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে বলে আমি মনে করি। কিন্তু আজকে থেকে আমি মনে করি— তাদেরও আত্মবিশ্বাস বাড়বে।

এর আগে সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকার তেজগাঁওয়ের পুরান বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সকাল ১০টায় মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন তিনি। 

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে এই সুধী সমাবেশ থেকেই স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ঘোষণা করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

মঞ্চের সামনে উপস্থিত রয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, মাহবুব-উল হক হানিফ, বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেম্বন, ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন প্রমুখ।

এ সেতু স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি: প্রধানমন্ত্রী প্রসঙ্গত, দেশের দীর্ঘতম এই সেতুর দাফতরিক নাম ‘পদ্মা সেতু’। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু রাজধানীর সঙ্গে মেলবন্ধন সৃষ্টি করলো দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলাকে। দ্বিতল দেশের দীর্ঘতম এই সেতুতে গাড়ি ও রেল দুটোই চলবে। সেতু নির্মিত হয়েছে কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে। সেতুতে থাকছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ পরিবহন সুবিধা। মুন্সীগঞ্জ জেলার মাওয়া, মাদারীপুর জেলার শিবচর এবং শরীয়তপুর জেলার জাজিরার সীমান্তবেষ্টিত পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে সংযোগ সড়ক রয়েছে ১২ দশমিক ১২ কিলোমিটার।

১৯৯৯ সালে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষার মাধ্যমে পদ্মা সেতু প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। মূল কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর। এরপর করোনা মহামারিতেও একদিনের জন্য কাজ থেমে থাকেনি; দীর্ঘ সাত বছরে দিন-রাত হাজারো মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমে বাস্তবে রূপ নিয়েছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু।

/ইউআই/এসও/এফএ/ইউএস/এমএস/এমওএফ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
আর্মেনিয়ায় আতশবাজির গুদামে বিস্ফোরণ, নিহত ৬
আর্মেনিয়ায় আতশবাজির গুদামে বিস্ফোরণ, নিহত ৬
ক্ষেতে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে কৃষকের মৃত্যু
ক্ষেতে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে কৃষকের মৃত্যু
বঙ্গবন্ধু সারা জীবন বঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করেছেন: শিল্পমন্ত্রী
বঙ্গবন্ধু সারা জীবন বঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করেছেন: শিল্পমন্ত্রী
ব্রিজ থেকে বাস ছিটকে পড়লো নিচে, ১৪ যাত্রী আহত 
ব্রিজ থেকে বাস ছিটকে পড়লো নিচে, ১৪ যাত্রী আহত 
এ বিভাগের সর্বশেষ
কঠোর অবস্থানে পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ
কঠোর অবস্থানে পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ
কৌশলে পদ্মা সেতু পার হচ্ছে মোটরসাইকেল
কৌশলে পদ্মা সেতু পার হচ্ছে মোটরসাইকেল
পদ্মা সেতুতে প্রথম দিনে টোল আদায় দুই কোটি টাকা
পদ্মা সেতুতে প্রথম দিনে টোল আদায় দুই কোটি টাকা
জয়পুরহাট থেকে পদ্মা সেতু দেখতে এলেন বৃদ্ধ মোজাহার আলী
জয়পুরহাট থেকে পদ্মা সেতু দেখতে এলেন বৃদ্ধ মোজাহার আলী
পদ্মা সেতুতে সাড়ে ৩ কিলোমিটার যানজট
পদ্মা সেতুতে সাড়ে ৩ কিলোমিটার যানজট