গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ দিবস; বহুমুখী সংকট ও সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট: একটি পর্যালোচনা

রেজাউর রহমান লেনিন
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৬ আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ২০:২৯

প্রতি বছর ৩০ আগস্ট বিশ্বজুড়ে ‘আন্তর্জাতিক বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষা ও তাদের স্মরণে এই দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ৩০ আগস্ট কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; বরং অসংখ্য পরিবারের কাছে এক দীর্ঘস্থায়ী শোক, অনিশ্চয়তা ও অপূরণীয় বেদনার প্রতীক।

এই বাস্তবতার মূল ভুক্তভোগী শেখ হাসিনার শাসনামলে গুমের শিকার ব্যক্তিবর্গ ও তাদের পরিবার। তবে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের পরও গুমের সংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; তারই এক স্পষ্ট উদাহরণ বাগেরহাটের মোংলার জেলে মিরাজ শেখের (৩০) নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে দুটি উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয় চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমটি হলো, বলপূর্বক গুমের শিকার মিরাজ শেখের ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়া ও বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরির লক্ষ্যে দুটি গণমাধ্যমের বিতর্কিত ভূমিকা দ্য ডিসেন্ট-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। যেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে সরাসরি গুমের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের বদলে গণমাধ্যম দুটি অভিযুক্ত বাহিনীরই নৌযানে চড়ে তাদের ব্যবস্থাপনায় তথাকথিত ‘অনুসন্ধান’ পরিচালনা করে।

দ্বিতীয়টি হলো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিগত ছয় মাসে দেশে কোনো বলপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হয়েছে এবং ফলাফল অনুযায়ী এই নিখোঁজের পেছনে মূলত বনদস্যু দলের সঙ্গে তার যোগসূত্র ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নাকচ করে তিনি মন্তব্য করেন, ‘মিরাজ শেখের অতীত রেকর্ড ভালো নয়; এমনকি তার বাবা এবং দাদারও একই ধরনের অপরাধমূলক রেকর্ড রয়েছে। এ বিষয়ে আমি আর বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না।’ উল্লেখ্য, গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ ও সুইডেন-ভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘নেত্র নিউজ’-এর যৌথ আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে এই বক্তব্য দেন।

প্রচারমাধ্যম ও গুমের শিকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মিলিত প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভুক্তভোগীর পরিবারের তোলা বলপূর্বক গুমের সুনির্দিষ্ট অভিযোগকে দুর্বল করা এবং ঘটনাটিকে অপরাধমূলক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে জড়িয়ে জনমনে সংশয় তৈরি করা। অভিযুক্ত বাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সংবাদ সংগ্রহের এমন প্রক্রিয়া বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এ ধরনের পক্ষপাতমূলক প্রতিবেদন কার্যত প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করে এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথকে রুদ্ধ করে। সামগ্রিকভাবে, নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের পরিবর্তে কীভাবে অভিযুক্ত কর্তৃপক্ষের সহায়তায় বিকল্প বয়ান তৈরি করে গুমের সত্যতাকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, তা-ই নাগরিকদের পর্যালোচনার মূল প্রতিপাদ্য।

অন্যদিকে, আইনের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়তো ভুলে গেছেন, নিখোঁজ ব্যক্তির অতীত ইতিহাস বা তার পরিবারের অপরাধমূলক অতীতকে সামনে আনা আইনের শাসনের মূলনীতির পরিপন্থী। কোনো ব্যক্তি অপরাধী হলেও সংবিধান অনুযায়ী তাকে গ্রেপ্তার করে প্রচলিত আদালতে বিচার করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে; কাউকে বলপূর্বক গুম বা বিনা বিচারে নিখোঁজ রাখার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

তা ছাড়া অপরাধ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় হওয়ায় ভুক্তভোগীর বাবা বা দাদার কথিত অপরাধের দায় নিখোঁজ ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততাকে আড়াল করার অপচেষ্টা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে গুমবিরোধী আন্দোলন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সুপরিচিত প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’ এবং ‘নেত্র নিউজ’-এর মতো অধিকার আদায়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর মাধ্যমে নিখোঁজের ঘটনা নাকচ করা ও বাহিনীকে দায়মুক্তি দেওয়ার প্রবণতা গভীর প্রাতিষ্ঠানিক বৈপরীত্য প্রকাশ করে।

সর্বোপরি, ‘এ বিষয়ে আমি আর বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না’—বক্তব্যের এই অংশটি নিরপেক্ষ তদন্তের প্রতিশ্রুতির বদলে রাষ্ট্রীয় দায় এড়ানো ও অস্বচ্ছতারই স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

অনুমোদিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ ও বর্তমান সংসদীয় প্রেক্ষাপট

প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনায় দেখা যায়, এটি এখন জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়ে চূড়ান্ত পাসের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো—যেমন অধিকার, টিআইবি ইত্যাদি—আইনের কিছু ধারার সংশোধন এবং আইসিপিপিইডি-এর মানদণ্ডের শতভাগ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে। আগস্ট ২০২৬-এর শুরুতে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং শেষে ২৭ আগস্ট ২০২৬ বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। বিলটি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনার জন্য রয়েছে। কমিটির সুপারিশ ও প্রতিবেদন সংসদে জমা দেওয়ার পর এটি চূড়ান্তভাবে পাস হবে।

মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় কাঠামোগত দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভেঙে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ড সংহত করার একটি মৌলিক রূপরেখা প্রদান করেছে। আইনের ৪ ও ৫ ধারায় জাতিসংঘের বলপূর্বক গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ বা আইসিপিপিইডি-এর আলোকে গুমকে একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এটি প্রচলিত দণ্ডবিধির লঘু অপহরণ ও অবৈধ আটকের সীমানা অতিক্রম করে কঠোর শাস্তি এবং জামিন-অযোগ্য বিধানের মাধ্যমে অপরাধের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে।

একই সঙ্গে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক মাত্রায় সংঘটিত গুমকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচারের এখতিয়ার নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে ৪ ধারার দ্বিতীয় শর্তাংশে সংবিধানের ৩৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে উপস্থাপনের অজুহাতে আটকাদেশের তথ্য গোপন রাখার যে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা আইসিপিপিইডি-এর ১৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত অবিলম্বে আটকাদেশ নিবন্ধন ও আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং হেফাজতে নির্যাতনের প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি তৈরি করে।

আইনের ৬ থেকে ৯ ধারায় অপরাধের চরম পরিণতি, আলামত ধ্বংস, গোপন আটককেন্দ্র ও ষড়যন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ বিচারিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। ৬ ধারায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনের পাশাপাশি পাঁচ বছর নিখোঁজ থাকার ক্ষেত্রে ‘মৃত্যুর আইনি অনুমান’ প্রয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা প্রমাণ ছাড়া সর্বোচ্চ দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ফেয়ার ট্রায়ালের মানদণ্ডে বিচারিক সতর্কতার দাবি রাখে।

তবে এই ধারার শর্তাংশে প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০৩ ধারার ‘ডাবল জিওপার্ডি’ নীতি শিথিল করে পরবর্তী সময়ে মরদেহ পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে খুনের বিচার নিশ্চিতের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। তদুপরি ৭ ও ৮ ধারায় আলামত বিকৃতি রোধ এবং ব্ল্যাক সাইট বা গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণ ও ব্যবহারকে কঠোরভাবে ফৌজদারি অপরাধভুক্ত করা হয়েছে, যা আইসিপিপিইডি-এর সত্য জানার অধিকার ও অননুমোদিত বন্দিশালা বিলোপের নীতিকে বাস্তবে রূপ দেয়। ৯ ধারায় পরিকল্পনা ও প্ররোচনাকে মূল অপরাধের সমপরিমাণ দণ্ডে দণ্ডিত করার মাধ্যমে অপরাধের নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারীদেরও সরাসরি দায়বদ্ধতার মুখোমুখি করা হয়েছে।

১০ থেকে ১৩ নম্বর ধারাগুলোতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায় এবং অপরাধের অবিচ্ছিন্ন চরিত্র সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ১০ ও ১১ ধারায় রোম সংবিধির আদলে ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতাকে মূল অপরাধের সমতুল্য ফৌজদারি দায় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে কমান্ডারের নিয়ন্ত্রণ অনুমানের ক্ষমতা প্রসিকিউশনের প্রচলিত প্রমাণ-ভারের সীমাবদ্ধতা দূর করে।

১২ ধারায় গুমকে একটি ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে ঘোষণা করায় ভুক্তভোগীর ভাগ্য ও মরদেহ হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত তামাদির কোনো আইনি বাধা কার্যকর থাকে না। সর্বাপেক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো ১৩ ধারার সর্বাত্মক অলঙ্ঘনীয়তা, যেখানে নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজের মাধ্যমে জরুরি অবস্থা, জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা ঊর্ধ্বতনের আদেশের চিরাচরিত আইনি সুরক্ষাকে আন্তর্জাতিক জুস কজেন্স নীতির অনুসরণে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।

বিলটির ১৪ থেকে ১৯ ধারায় স্বাধীন তদন্ত ও দ্রুত বিচারের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। অভিযুক্ত বাহিনী ব্যতীত আন্তঃবাহিনী দল গঠন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারার সরকারি পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা রদ এবং ম্যাজিস্ট্রেটের তল্লাশি পরোয়ানায় আটককেন্দ্রে তাৎক্ষণিক প্রবেশের অধিকার প্রাতিষ্ঠানিক বাধাগুলো দূর করেছে।

তবে ১৫ ধারায় কমান্ড স্ট্রাকচার তদন্তে ঊর্ধ্বতনদের ‘অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে’ সাময়িক অব্যাহতির সুযোগ প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি বহন করে। ১৭ থেকে ১৯ ধারায় সত্য প্রকাশে সহায়ক ভূমিকার জন্য দণ্ড হ্রাস এবং অরক্ষিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দণ্ড বৃদ্ধির পাশাপাশি ইন্টারপোলের মাধ্যমে নোটিশ জারি করে বিচার এড়ানো আসামিদের অনুপস্থিতিতে বিচারের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা নিরসনে দায়রা আদালতে ৯০ থেকে ১২০ দিনের বাধ্যতামূলক সময়সীমা ও সুপ্রিম কোর্টে কারণ দর্শানোর বাধ্যবাধকতা একটি বড় সংস্কার।

বিলটির ২০ থেকে ৩২ ধারায় আন্তর্জাতিক এখতিয়ার, ভুক্তভোগীর পুনর্বাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০ ধারায় ‘হয় বিচার করো, নয় প্রত্যর্পণ করো’ নীতির মাধ্যমে সার্বজনীন এখতিয়ার প্রতিষ্ঠা এবং ২২ ধারায় হাইকোর্টে সরাসরি আপিলের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে ২১ ধারায় মিথ্যা মামলার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান সাক্ষ্যপ্রমাণের ঘাটতি থাকা প্রকৃত অভিযোগকারীদের হয়রানি ও ভয়ভীতির মুখে ঠেলার আশঙ্কা তৈরি করে।

প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর ২৩ নম্বর ধারাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি গঠনগতভাবে আপাতদৃষ্টিতে ব্যক্তিগত দায়কে প্রাধান্য দিয়ে সাজানো হলেও চূড়ান্ত আইনি ফলাফলে রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত করেনি; তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও কনভেনশনের মানদণ্ডে এর আইনি বিন্যাসে একটি গভীর নীতিগত ত্রুটি ও অগ্রাধিকারের সংকট রয়েছে।

ধারাটির মূল কাঠামোতে ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রাথমিক ও প্রধান উৎস হিসেবে দণ্ডিত ব্যক্তির স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রকে রাখা হয়েছে কেবল একটি ‘গৌণ’ বা বিকল্প জামিনদার হিসেবে—যেখানে ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে অর্থ আদায় সম্ভব না হলেই কেবল রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ প্রদানে বাধ্য থাকবে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো ‘রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত নীতি’—আর্টিকেলস অন স্টেট রেসপনসিবিলিটি ফর ইন্টারন্যাশনালি রংফুল অ্যাক্টস (আরসিওয়া), যা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় বাহিনী, কর্মকর্তা বা তাদের মদদে সংঘটিত যেকোনো আন্তর্জাতিক অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রাথমিক, সরাসরি ও অলঙ্ঘনীয় ক্ষতিপূরণের দায় একান্তই রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়।

জাতিসংঘের ‘বলপূর্বক গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ’ (আইসিপিপিইডি)-এর ২৪(৪) ও ২৪(৫) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে যে, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন—রেস্টিটিউশন, রিহ্যাবিলিটেশন, স্যাটিসফ্যাকশন অ্যান্ড গ্যারান্টিস অব নন-রিপিটিশন—পাওয়ার অধিকার কোনো ব্যক্তিগত দেওয়ানি বা ফৌজদারি অর্থদণ্ডের প্রাপ্তির ওপর শর্তযুক্ত হতে পারে না।

আন্তর্জাতিক কনভেনশনের দৃষ্টিতে বলপূর্বক গুম কোনো সাধারণ ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতা বা প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়ে সংঘটিত একটি কাঠামোগত অপরাধ। ফলে রাষ্ট্র যখন আইনের মূল বয়ানে ক্ষতিপূরণ প্রদানের মূল দায়িত্বটি ব্যক্তির সম্পত্তির ওপর চাপিয়ে দেয় এবং নিজের দায়িত্বকে একটি শর্তযুক্ত ‘শর্তাংশ’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, তখন এটি ধারণাগতভাবে আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতাকে খাটো করে অপরাধটিকে একটি ব্যক্তিগত বিরোধ বা সাধারণ ফৌজদারি অর্থদণ্ডের পর্যায়ে নামিয়ে আনার ঝুঁকি তৈরি করে।

প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধির দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪৫ বা ৩৮৬ ধারার আদলে আদালতের আরোপিত জরিমানা থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি, আমলাতান্ত্রিক এবং জটিল। ২৩(২) উপধারায় জেলা কালেক্টরের মাধ্যমে সম্পত্তি তালিকাভুক্তকরণ, ক্রোক ও নিলামের যে প্রক্রিয়া রাখা হয়েছে, তা সম্পন্ন হতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

রাষ্ট্র যদি ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রির প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে, তবে ভুক্তভোগী পরিবার তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা, চিকিৎসা ও জরুরি পুনর্বাসন থেকে বঞ্চিত হবে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ‘দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকার’—প্রম্পট অ্যান্ড অ্যাডিকোয়েট রিপারেশন—নীতির পরিপন্থী।

তবে ধারাটির সবচেয়ে ইতিবাচক ও প্রগতিশীল দিক হলো এর শর্তাংশে ‘রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ প্রদানে বাধ্য থাকিবে’ মর্মে এক চূড়ান্ত সংবিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা তৈরি করা। প্রচলিত সাধারণ ফৌজদারি আইনে কোনো অপরাধী নিঃস্ব বা পলাতক হলে ভুক্তভোগীর আর কোনো প্রতিকার থাকে না; কিন্তু এই ধারাটির মাধ্যমে অপরাধীর দেউলিয়া বা অনুপস্থিতির অজুহাতে ক্ষতিপূরণের অধিকার পুরোপুরি খারিজ হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। উপরন্তু, দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তির ওপর অন্যান্য সব ঋণের চেয়ে ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণের দাবিকে ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কনভেনশন, আইসিসিপিআর ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আদালতের মানদণ্ডে নিখুঁত হতে হলে ধারাটির কাঠামো এমন হওয়া সমীচীন ছিল, যেখানে রাষ্ট্র ভুক্তভোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিপূরণ ও সার্বিক পুনর্বাসন প্রদান করতে সরাসরি এবং প্রাথমিকভাবে বাধ্য থাকবে, এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্র তার ব্যয়িত অর্থ দণ্ডিত কর্মকর্তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও নিলামের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত নিয়ে সমন্বয় করবে।

বর্তমান খসড়াটিতে রাষ্ট্র তার চূড়ান্ত দায় স্বীকার করলেও প্রক্রিয়াগতভাবে ক্ষতিপূরণের ভারটিকে প্রথমে ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়ায় এটি পদ্ধতিগতভাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ‘স্টেট-ফার্স্ট’ ক্ষতিপূরণ কাঠামোর তুলনায় কিছুটা ধীরগতির এবং ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল একটি ব্যবস্থার প্রতিফলন ঘটায়।

সর্বশেষে প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর ২৭, ২৮ ও ৩২ নম্বর ধারাগুলো মূলত গুমের শিকার ব্যক্তি, সাক্ষী ও তথ্য প্রকাশকারীদের সামগ্রিক সুরক্ষা, সত্য জানার অধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য সংরক্ষণ এবং ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের এক যুগান্তকারী রূপরেখা প্রতিষ্ঠা করেছে।

ধারা ২৭-এ হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা আইন, ২০১১-এর সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য প্রকাশকারী, সাংবাদিক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় স্বাধীন কণ্ঠস্বরগুলোকে সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে, যা প্রচলিত আইনি সংস্কৃতিতে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ভীতি দূর করে নাগরিক নজরদারি ও অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণকে সুরক্ষিত করে।

একই সঙ্গে আদালতকে সাক্ষী ও তথ্য প্রকাশকারীদের সুরক্ষার্থে তাৎক্ষণিক আদেশ জারির নিরঙ্কুশ এখতিয়ার প্রদান করা হয়েছে, যা প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন সাক্ষীর সুরক্ষার ঐতিহাসিক শূন্যতা মেটাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

ধারা ২৮ আন্তর্জাতিক আইসিপিপিইডি ও আইসিসিপিআর সনদের আলোকে ভুক্তভোগী পরিবারের ‘সত্য জানার অধিকার’-কে সংবিধিবদ্ধ করেছে। এর ফলে তদন্তের অগ্রগতি অবহিত হওয়া, সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম ও নাগরিক নেটওয়ার্ক গঠন করা, সরকারি আইনি সহায়তা প্রাপ্তি এবং দেহাবশেষ পুনরুদ্ধারপূর্বক মর্যাদাপূর্ণ সৎকার দাবি করা কেবল সহানুভূতি নয়, বরং একটি অলঙ্ঘনীয় আইনি অধিকারে পরিণত হয়েছে।

এটি ফৌজদারি তদন্তে প্রচলিত ঔপনিবেশিক গোপনীয়তার সংস্কৃতি ভেঙে ভুক্তভোগী পরিবারকে বিচার প্রক্রিয়ার মূল অংশীদারে রূপ দেয়।

অন্যদিকে ধারা ৩২ প্রচলিত পুলিশি কেস ডায়েরির বিচ্ছিন্ন, ম্যানুয়াল ও বিলুপ্তপ্রায় পদ্ধতির বিপরীতে একটি কেন্দ্রীয়, সমন্বিত ও জেন্ডার-সংবেদনশীল ডিজিটাল ‘জাতীয় তথ্যভাণ্ডার’ গঠনের বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে। এতে ঘটনার প্রেক্ষাপট, অভিযুক্ত বাহিনীর নির্দিষ্ট ইউনিট, কমান্ড কাঠামোর পদবি ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের তথ্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকবে।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা বজায় রেখে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের ভারসাম্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই ডেটাবেজ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ঘটা কাঠামোগত অপরাধের প্যাটার্ন উন্মোচন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং স্মৃতির মুছে ফেলা বা ঐতিহাসিক সত্য বিকৃতির অপচেষ্টা রুখে দিয়ে দায়মুক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারগুলোর বহুমুখী সংকট, আইনি অনিশ্চয়তা এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর গুমের প্রশ্নে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা

গুমের শিকার পরিবারগুলোর অন্তহীন লড়াই বাংলাদেশে দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর রাষ্ট্রের মানবাধিকার কাঠামো পুনর্গঠনে গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর এবং স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে এক ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল।

কিন্তু সমসাময়িক প্রেক্ষাপট, নতুন আইনি কাঠামো ও সামগ্রিক রাজনৈতিক-বিচারিক বাস্তবতার গভীর নির্মোহ পাঠ স্পষ্ট করে যে, কাগজ-কলমে অর্জিত এসব স্বীকৃতি রুক্ষ বাস্তবতার জমিনে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণাকে প্রশমিত করতে পারেনি। বরং নতুন আইনের কাঠামোগত দুর্বলতা, বিগত আমলের ব্যাপক ভুক্তভোগীদের বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা, শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ধীরগতি ও আপাত সিলেক্টিভ বিচারপ্রক্রিয়া এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চরম প্রাতিষ্ঠানিক উপেক্ষা গুমের শিকার পরিবারগুলোকে এক বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

আইনগত কাঠামোর ক্ষেত্রে পরিবর্তনগুলো ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাকে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সনদের পূর্ণাঙ্গ মানদণ্ড ও স্বাধীন তদন্তের বাধ্যবাধকতা মেনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’-এর বিপরীতে আইন প্রণয়নের যে নতুন ধারা দেখা যাচ্ছে, তা কার্যত নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দায়মুক্তিকে টিকিয়ে রাখার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

নতুন আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বা সংশ্লিষ্ট স্বাধীন তদন্ত কাঠামোর ক্ষমতা সংকুচিত করে নিরাপত্তা বাহিনীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ রুদ্ধ হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে বড় আইনি শঙ্কা তৈরি হয়েছে এই আইনের অতীতমুখী কার্যকারিতা—রেট্রোস্পেকটিভ ইফেক্ট এবং অভিযোগকারীর সুরক্ষার অভাব নিয়ে।

এই আইনি রূপরেখায় যদি বিগত শেখ হাসিনার আমলের দীর্ঘ দেড় দশকের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক গুমের ঘটনাগুলোকে পূর্ণাঙ্গ আইনি প্রতিকার ও শাস্তির পরিধির আওতায় আনা না হয়, তবে বিগত স্বৈরশাসনের হাজারো ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার স্থায়ীভাবে আইনের সুরক্ষা ও বিচারপ্রাপ্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন।

তদুপরি, কোনো ভুক্তভোগী বা পরিবার অভিযোগ দায়ের করার পর বিচারিক প্রক্রিয়ায় তা ভুল প্রমাণিত হলে বাদীকেই শাস্তির মুখে ফেলার মতো নিবর্তনমূলক বিধান যুক্ত হওয়ায় পরিবারগুলোর মধ্যে গভীর ভীতি সঞ্চার হয়েছে, যা কার্যত ভবিষ্যৎ অভিযোগ দায়েরের পথকেই অবরুদ্ধ করে।

এই বিচারিক ও আইনি সংকটের সমান্তরালে প্রকট হয়ে উঠেছে ভুক্তভোগীদের শ্রেণি চরিত্র ও অধিকার আদায়ের কাঠামোগত বৈষম্য। গুমবিরোধী আইনের বয়ান ও আলোচনা অনেক ক্ষেত্রেই একটি নব্য-উদারনৈতিক আইনি বৈধতার বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যেখানে শহুরে এলিট ও দৃশ্যমান মানবাধিকার নেটওয়ার্কের কণ্ঠস্বর যতটুকু গুরুত্ব পায়, প্রান্তিক ও গ্রামীণ স্তরের সাধারণ ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ততটাই অদৃশ্য থেকে যায়।

বিশেষ করে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের প্রশ্নে রাষ্ট্র আজও একটি কার্যকর, মর্যাদাপূর্ণ ও সর্বজনীন কাঠামো দাঁড় করাতে ব্যর্থ হয়েছে। নিখোঁজ স্বজনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ‘গুমের সনদ’ বা সুনির্দিষ্ট আইনি স্বীকৃতি না থাকায় ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টন কিংবা সন্তানের অভিভাবকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত আমলাতান্ত্রিক ফাঁদে পিষ্ট হচ্ছে।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে তীব্র আর্থিক অনটনে নিমজ্জিত পরিবারগুলোর কাছে পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণের রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি কেবল ফাইলবন্দি কাগজের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। যে সমস্ত ভুক্তভোগী গোপন বন্দিশালা থেকে জীবিত ফিরে এসেছেন, তারা যেমন অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক ট্রমার শিকার, তেমনি বিগত আমলের চাপিয়ে দেওয়া মিথ্যা রাজনৈতিক মামলার বেড়াজালে এখনও নিয়মিত আইনি হয়রানির মুখে দিনাতিপাত করছেন।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন গুমের মামলাগুলোর অগ্রগতি নিয়েও পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। ‘মায়ের ডাক’সহ সাধারণ ভুক্তভোগীদের দীর্ঘ দেড় দশকের রাজপথের লড়াইয়ের মূল দাবি ছিল বিচার হবে সবার জন্য এবং তা হবে দল-মত নির্বিশেষে সমতার ভিত্তিতে।

অথচ দেড় শতাধিক সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তসমৃদ্ধ অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময়েও সেগুলোর তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। বরং প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডের গুটিকয়েক চাঞ্চল্যকর মামলার বাইরে সাধারণ মানুষের অভিযোগগুলো ফাইলবন্দি পড়ে থাকার ঘটনা বিচারিক অগ্রাধিকার ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা প্রতিটি কেসের জটিলতা ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কারণে সময়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘ অপেক্ষার মানসিক ক্ষত এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তা ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে।

তবে এই প্রাতিষ্ঠানিক ও বিচারিক কাঠামোর সবচেয়ে বৈষম্যমূলক ও অনালোচিত দিকটি ফুটে উঠেছে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের গুমের ঘটনাগুলোকে রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক পরিসরে পুরোপুরি উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে।

গুম-সংক্রান্ত জাতীয় তদন্ত কমিশনের স্পষ্ট ম্যান্ডেট ছিল ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনী দ্বারা সংঘটিত ‘সকল’ গুমের ঘটনা তদন্ত করা; যেখানে জাতীয়তা বা নাগরিকত্বের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। কিন্তু কমিশনের সামগ্রিক কার্যক্রমে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর গুমের অভিযোগগুলো প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থেকেছে, যা কেবল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অনীহাই প্রকাশ করে না, বরং এর মধ্যে এক গভীর পদ্ধতিগত বর্জনকে উন্মোচিত করে।

এই প্রাতিষ্ঠানিক উপেক্ষার সবচেয়ে অকাট্য ও প্রতীকী প্রমাণ হলেন রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তুমব্রু শূন্যরেখার রোহিঙ্গা ক্যাম্প ধ্বংসের পটভূমিতে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক অপহৃত হওয়ার পর দীর্ঘ চার মাস তাকে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ও যোগাযোগ ছাড়াই গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘরে’ আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের আরবিট্রারি ডিটেনশন বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ- ডব্লিউজিএডি; সুস্পষ্ট রায় দেয় যে দিল মোহাম্মদকে নিরাপত্তা বাহিনী বেআইনিভাবে গোপন বন্দিশালায় রেখে জোরপূর্বক গুমের শিকার করেছে।

আন্তর্জাতিক এই রায় এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ কমিশনের দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাদের হাতে সরাসরি পৌঁছানো হয়েছিল এবং ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকেও কমিশনের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবুও কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা তদন্ত প্রক্রিয়ায় এই স্পষ্ট আন্তর্জাতিক রায়সমৃদ্ধ ঘটনাটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

ক্যাম্পের চরম ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, নাগরিক সমাজের কার্যকর সহযোগিতার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনীহার কারণে শূন্যরেখার বহু রোহিঙ্গার গোপন বন্দিশালায় দীর্ঘ নির্যাতনের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতাগুলো তদন্তের বাইরেই থেকে গেছে।

সামগ্রিক এই চালচিত্র প্রমাণ করে যে, গুমের শিকার পরিবারগুলোর সংকট কেবল অতীতের ক্ষত নয়, বরং বর্তমানের আইনি, রাজনৈতিক ও কাঠামোগত দুর্বলতার এক অবিচ্ছিন্ন রূপ। বিগত স্বৈরাচারী আমলের সকল ভুক্তভোগীকে আইনের পূর্ণ সুরক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা, শ্রেণি ও রাজনৈতিক পক্ষপাতহীন সমমর্যাদাপূর্ণ বিচার নিশ্চিত করা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বাস্তব প্রয়োগ ঘটানো এবং দিল মোহাম্মদের মতো রোহিঙ্গা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর নেমে আসা নিপীড়নের নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া জোরপূর্বক গুমের ক্ষত কোনোদিনই নিরাময় সম্ভব নয়।

/আইএএম/
সম্পর্কিত
‘জেন-জি’ বিপ্লবের রেশ: আন্তর্জাতিক করতালি ও ঘরের দায় 
জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির ৪১ বছর: নিহতরা কি মরণসাগরপারে সত্যিই অমর? 
বিশ্ব শিক্ষক দিবস: ৬০ বছরের প্রত্যাশা ও বাংলাদেশের প্রাপ্তি
সর্বশেষ খবর
ইমরান খানের আলোচিত ওসিআই কার্ড কী? ভারতে যাতায়াত-বসবাসে কী সুবিধা মেলে?
ইমরান খানের আলোচিত ওসিআই কার্ড কী? ভারতে যাতায়াত-বসবাসে কী সুবিধা মেলে?
‘লাইব্রেরি অ্যাসিস্ট্যান্ট’ পদে জনবল নেবে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি
‘লাইব্রেরি অ্যাসিস্ট্যান্ট’ পদে জনবল নেবে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি
ককরোচ প্রধান দিপকের বাড়িতে হানা দিল্লি পুলিশের, বিক্ষোভ ঘিরে যে বার্তা দিলেন
ককরোচ প্রধান দিপকের বাড়িতে হানা দিল্লি পুলিশের, বিক্ষোভ ঘিরে যে বার্তা দিলেন
কোলাজেন বাড়ানোর ইনজেকশন: উপকারিতা কতটা, ঝুঁকিই বা কী?
কোলাজেন বাড়ানোর ইনজেকশন: উপকারিতা কতটা, ঝুঁকিই বা কী?
সর্বাধিক পঠিত
অতিরিক্ত খরচ আর ঝুঁকি নিয়ে ভিন্ন রুটে রিয়াদ যাচ্ছেন প্রবাসীরা 
অতিরিক্ত খরচ আর ঝুঁকি নিয়ে ভিন্ন রুটে রিয়াদ যাচ্ছেন প্রবাসীরা 
‘ফিল্মি স্টাইলে’ চলন্ত গাড়ি থেকে যেভাবে ক্রিকেটারদের ৮টি লাগেজ নিয়ে যায় তারা
‘ফিল্মি স্টাইলে’ চলন্ত গাড়ি থেকে যেভাবে ক্রিকেটারদের ৮টি লাগেজ নিয়ে যায় তারা
লালমনিরহাটের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আরিফুল ইসলাম বরখাস্ত
লালমনিরহাটের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আরিফুল ইসলাম বরখাস্ত
অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়ালো এনবিআর
অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়ালো এনবিআর
প্রথমবার মেয়ের ছবি প্রকাশ, আবেগঘন বার্তা অপূর্বর
প্রথমবার মেয়ের ছবি প্রকাশ, আবেগঘন বার্তা অপূর্বর