মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ভয়াবহতায় ৪৭ দিনে বাংলাদেশে এসেছে পাঁচ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা। সেনাবাহিনীর ক্লিয়ারেন্স অপারেশন ও উগ্রপন্থীদের বৌদ্ধদের তাণ্ডবে জীবন বাঁচাতে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। শরণার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের জন্য মানবিক সহায়তা বৃদ্ধিও অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। শুক্রবার জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ (আইএসসিজি)-এর বরাত দিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের এ সংখ্যা জানিয়েছে আইওএম। এতে বলা হয়, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে তারা পালিয়ে এসেছেন। এ বিষয়ে ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের পরবর্তী প্রতিবেদন আগামী ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত হবে।
আইওএম জানিয়েছে, শুধু ৯ থেকে ১১ অক্টোবরের মধ্যেই বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে প্রায় ১৫ হাজার রোহিঙ্গা।
টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে মোহাম্মদ ইয়াকুব নামের ৫০ বছরের একজন রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে কথা হয় আইওএম-এর। তিনি জানান, ‘পাঁচ দিন আগে আমি এখানে এসেছি। আমার গর্ভবতী স্ত্রীসহ পরিবারের পাঁচ সদস্য এখনও মিয়ানমারে রয়েছে। তাদের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়েছে। ঘরছাড়া হয়ে তারা এখন একটি খোলা সৈকতে অবস্থান করছে। তারা জানিয়েছে, সেখানে আট থেকে নয় হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রমের সুযোগ খুঁজছে।
জীবন বাঁচাতে লাখ লাখ মানুষ যখন জীবন বাঁচাতে মিয়ানমার ছেড়ে পালাচ্ছে তখনও রোহিঙ্গা নিধনের কথা নাকচ করে দিয়েছেন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লায়াং। রাখাইনের জাতিগত নিধন আর মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আইনি রূপরেখার বাইরে গিয়ে কোনও কিছু করা হচ্ছে না।’ বুধবার (১১ অক্টোবর) ইয়াঙ্গুনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্কট মার্সিয়েলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই দাবি করেন।
বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের ফেসবুক পেজে বুধবারের ওই বৈঠক সংক্রান্ত বিবৃতি প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, সম্প্রতি রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পরিচালিত গণহত্যা ও অভিযানের খবর এবং বাংলাদেশে ৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ নিয়ে বৈঠকে উদ্বেগ জানান মার্কিন রাষ্ট্রদূত। এর জবাবে মিন অং হ্লায়াং দাবি করেন, বেআইনি কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব পালনের কাজটি রাষ্ট্র নির্ধারিত বিধিনিষেধ, আইন ও অন্য নির্দেশনাগুলোর রূপরেখার মধ্যে থেকে করতে হবে। আইনি কাঠামোকে ছাপিয়ে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’
ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, বুধবারের বৈঠকের সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিয়ানমারের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে একটি গঠনমূলক পথ তৈরি করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। সেসময় রোহিঙ্গাদেরকে বাঙালি হিসেবে উল্লেখ করে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান বলেন, ‘স্থানীয় বাঙালিরা আরসার নেতৃত্বাধীন হামলায় জড়িত ছিল। আর সেকারণে অনিরাপদ বোধ করায় তারা পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারে।’
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করলেও বুধবার প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে জাতিসংঘ রাখাইনে শুদ্ধি অভিযান নিয়ে সেনাবাহিনীর মিথ্যাচারের আলামত হাজির করেছে। মিয়ানমার ২৫ আগস্টে নিরাপত্তা চৌকিতে আরসার হামলাকে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানের কারণ বললেও ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে এর আগে থেকেইসেখানে জাতিগত নিধনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিলো। জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাখাইন থেকে সব রোহিঙ্গাকে তাড়িয়ে দিতে এবং তারা যেন আর কখনও রাখাইনে ফিরতে না পারে তা নিশ্চিত করতে পরিকল্পিতভাবে সংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ কায়দায় সেনা-প্রচারণা ও অভিযান চালিয়েছে মিয়ানমার।








