X
সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

সন্ধ্যারাতে কাঁটাবন যাত্রা

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২১, ১২:২৬

লোকটা কাঁটাবন যাবে বলে সন্ধ্যারাতে বাসা থেকে বেরুল। রাস্তায় কোনো রিকশা নেই। অনেকক্ষণ পরে একটা পেল।

—কাঁটাবন যাবে?
—না।

পরপর তিনটি রিকশা চলে গেল। কেউ কাঁটাবন যেতে রাজি হল না। চতুর্থ রিকশাওয়ালা রাজি হল।

—ভাড়া কত?
—৮০ টাকা।
—৫০-এ যাবে?
—না।

লোকটা হাঁটতে লাগল। বেশ কটা খালি রিকশা চলে গেল। সে ডাকল। কেউ শুনল না। একজন রাজি হলো।

—ভাড়া কত?
—৮০ টাকা।

লোকটা ভাবল ১০ টাকার রাস্তা তো সে হেঁটেই এসেছে, ভাড়া নিশ্চয়ই ১০ টাকা কম হবে।

—৪০-এ যাবে?
—না।

সে আবার হাঁটতে লাগল। কিছু দূর গিয়ে একটা রিকশা পেল। জিজ্ঞেস করল—কাঁটাবন যাবে?
—যামু।
—ভাড়া কত?
 —৮০ টাকা।
—৩০ দেব।
—না, যামু না।

সে হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তায় চলে এল। এ রাস্তায় বাস চলে। কিন্তু কোনো বাস কাঁটাবন যায় না। বড় রাস্তায় একটা খালি রিকশা পেল।

—কাঁটাবন যাবে?
—না।
—কেন?
—আমার ইচ্ছা। তয় মিরপুর গেলে লইয়া যাইতে পারি। লোকটা রেগে গিয়ে বলল, মিরপুর কি লোম ছিঁড়তে যাব?

রিকশাওয়ালা কিছু না বলে প্যাডেল মেরে দ্রুত চলে গেল। লোকটা দেখল, একটা মেয়ে কাঁধে বড় একটা ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলিয়ে খট্ খট্ করে হেঁটে যাচ্ছে। সে তার পেছন দিকটা দেখতে পাচ্ছে।
বেশ লম্বা। পরনে সবুজ জামদানি। লম্বা চুল। বেণি করা। বেণিটা একবার ডান দিকে একবার বাম দিকে যাচ্ছে, পুরনো  দিনের ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো। সবুজ জামদানি লোকটার পছন্দ। গেল রোজার ঈদে বউকে একটা কিনে দিয়েছিল গাউসিয়া থেকে। বউই পছন্দ করেছিল। তার সৌন্দর্যজ্ঞান ভালো হলেও দাম সম্পর্কে আইডিয়া নেই। দরদাম লোকটাই করেছিল।
মেয়েটা রিকশা খোঁজার জন্য দাঁড়াল। তখন মুখ দেখতে পেল। ফরসা। ডিম্বাকৃতি। টানা টানা চোখ। একটুখানি ক্লান্তি নেমেছে চেহারায়।
লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ল। একটা রিকশা দেখে মেয়েটা ডাকল।

—গাউসিয়া যাবে?
—যামু।
—কত নেবে?
—৬০ টাকা।
—৪০-এ যাবে?
—না।

মেয়েটা হাঁটতে শুরু করল। লোকটা ভাবল, গাউসিয়া থেকে কী কিনব সে? শাড়ি, নাকি ব্লাউজ, ব্রেসিয়ার, প্যান্টি, চুলের ফিতে, ক্লিপ, ইমিটেশন গয়না নাকি কসমেটিক্স?
মেয়েটা আবার হাঁটতে লাগল। লোকটাও। পান্থপথ মোড়ে সিগনাল পড়লে দুজন একসঙ্গে দাঁড়াল। লোকটা মেয়েটার শরীরের ঘ্রাণ পেল। অদ্ভুত সুন্দর একটা পারফিউম মেখেছে, কিংবা বডিলোশন। কোন ব্র্যান্ডের? ব্লু নেভি, ওয়াটার গার্ল, অসম, ভিক্টোরিয়াল সিক্রেট কিংবা ডেইজি ফ্রম মার্ক জ্যাকব? —নাকি এর কোনটাই নয়?
—তখন লোকটার এক বন্ধু তার পাশে এসে দাঁড়াল।

—কোথায় যাস?
—কাঁটাবন।
—কাঁটাবন কোথায়?
—কনকর্ড এম্পোরিয়াম।
—কেন?
—আড্ডা মারতে।
—এই মেয়েটাকে মনে ধরেছে?

লোকটা কোনো কথা বলল না।

—ওর সঙ্গে প্রেম করতে ইচ্ছে করছে?

লোকটা নিরুত্তর।

ওই মেয়েটার প্রেম আছে এক যুবকের সাথে। তোমার মতো লোকের প্রেমে পড়বে না। হা হা হা।

সিগনাল ক্লিয়ার। লোকটার বন্ধু উধাও। দুজন একসঙ্গে রাস্তা পার হলো। একটা রিকশা খালি পেয়ে ডাকল মেয়েটি।

—গাউসিয়া মার্কেট?
—যামু।
—কত নেবে?
—৬০-টাকা।
—৪০-এ যাবে?
—না আফা।

মেয়েটা হাঁটতে শুরু করল। গাড়ির হর্ন, ইঞ্জিনের শব্দ, রিকশার ক্রিং ক্রিংয়ের সঙ্গে মেয়েটার হিলের খট খট আওয়াজ লোকটার কানে বাজতে লাগল। একটু এগিয়ে থামল। পেন্সিল-হিল পরে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে।
লোকটা অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে মেয়েটার ওপর নজর রাখল। তখন তাগড়া জোয়ান এক লোক তার কাঁধে হাত রেখে বলল—কেমন আছেন বড়ভাই?

—ভালো। আপনাকে তো চিনলাম না?
—আমি কাঁঠালবাগানের লাটু। লাটু গুণ্ডা। কই যান?
—কাঁটাবন।
—পকেটে কত আছে?
—শ দুয়েক।
—মাত্র, মিছা কতা কন ক্যা?
—তাহলে আপনিই দেখেন।

তখন চারপাঁচ জন লোক তাকে ঘিরে দাঁড়াল।
একজন বলল—এই মিয়া ক্যাচাল না কইরা যা আছে সব দিয়া দেন, নাইলে গুল্লি ভইরা দিমু।

—আমি তো দিতেই চাই, নেন না কেন।

লাটু লোকটার  হাত থেকে মোবাইল ফোনটা নিয়ে খানিকক্ষণ টেপাটেপি করে আনলক করতে পারল না।

—কদ্দিয়ে কিনছিলেন?
—১৪ হাজার ৩ শ।
—আইচ্ছা লন, যান গা।
—টাকা নেবেন না?
—ধুর, দুই প্যাকেট সিগারেটের দামও না।

মেয়েটা তখনও দাঁড়িয়ে। একটা রিকশা পেতেই বলল—গাউসিয়া যাবে?
—যামু।
—কত চাও?
—৫০ টাকা।
—৪০ নাও।
—না, যামু না।

লোকটা ভাবল, মেয়েটার কাছে বোধহয় ৪০ টাকার বেশি নেই। মাত্র ১০ টাকার জন্য এতটা পথ হেঁটে এল? মেয়েটার  কাছ থেকে একটুখানি পিছিয়ে এল সে। তখন একটা রিকশা পেল।

—গাউসিয়া মার্কেট যাবে, ভাড়া কত?
—৫০ টেকা হইলে যামু।
—ঠিক আছে, এই নাও ৫০ টাকা। ওই মেয়েটাকে নিয়ে যাও। আমি যে টাকা দিয়েছি তা বলবে না উনাকে। সে যে ভাড়া দিতে চাবে তা-ই নিয়ে নেবে। ওটা তোমার ফাউ। কথার যেন নড়চড় না হয়।

—আমাকে চেন?
—না।
—আমি কাঁঠালবাগানের লাটু।
—লাটু গুণ্ডা?
—হ্যাঁ।
রিকশাওয়ালা চমকে উঠল। বলল—ট্যাকা লইয়া যান ছার, লাগত না।
ঠিক আছে নাও। খুশি হয়ে দিলাম। যা বললাম তাই করো।

লোকটা দেখল মেয়েটা রিকশায় উঠছে। তার ভালো লাগল। হাঁটতে হাঁটতে লোকটা এলিফ্যান্ট রোডের ওভারব্রিজ পর্যন্ত চলে এল। নিচে ফুটপাত। প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। হেগেমুতে ভাসিয়ে রেখেছে। চারপাঁচ জায়গায় কালরাতের বাসি মল।
লোকটা ও রাস্তায় না গিয়ে মেইন রোড ধরে হাঁটতে লাগল। বিরাট একটা বাস মতিঝিলের দিকে যাচ্ছে, একটু হলেই চাপা দিত। ফুটপাত ঘেঁষে হেঁটে এলিফ্যান্ট রোডের মুখে এসে দাঁড়াল।
সায়েন্স ল্যাবের গেটে একটা রিকশা পেল। যাত্রীদের সিটে বসে নিজের সিটে পা ছড়িয়ে দিয়ে বিড়ি ফুঁকছে। এরকম অবস্থায় এরা সাধারণত তিনগুণ বেশি ভাড়া দাবি করে। এক কিলোমিটারের জন্যে এই লোক  ৫০ চাইল।

—সামান্য এইটুকু পথ ৫০ টাকা?
—দেখেন না কত্ত জাম। এক ঘণ্টার কমে যাওন যাইত না।

নির্ঘাত গাজা খেয়েছে। তার নাকে গাঁজার গন্ধ আছড়ে পড়ল। রিকশাওয়ালা ধোঁয়া ছাড়ছে। ইদানিং অনেক রিকশাওয়ালা প্রচুর কামায় আর মদ, গাঁজা, হেরোইন ও মেয়ে মানুষের পিছনে ফুকে দেয়। এই পোলাটা এমনই, একথা ভাবার পর লোকটা তার দিকে কটমট করে তাকায়। কী যেন খুঁজতে থাকে।

—কী তালাশ করেন এত এ্যা?
—তোমার পাছা।
—কেন?
—একটা লাথি মারব। গাঁজাখোর।

রিকশাওয়ালা হাসে।
—আগে কইবেন না, ছার?

সে তার লুঙ্গি তুলতে শুরু করে। হাঁটু অবধি আসতেই লোকটা ধাই ধাই করে বাটার সিগনালের দিকে হাঁটতে শুরু করে। মনে মনে ভাবে, আর চিন্তা নেই—ওই তো কাঁটাবন মোড় দেখা যাচ্ছে। ডান দিকে মোড় নিলেই কনকর্ড এম্পোরিয়াম—বন্ধুরা অপেক্ষা করছে!

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষ

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune