X
শনিবার, ০৮ মে ২০২১, ২৫ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

ইয়াহিয়া খানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর বঙ্গবন্ধুর ‘জেদ’

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২১, ০২:৪৩

১৯৭১ সালের যুদ্ধে চরম লজ্জাজনক পরাজয়ের পর পাকিস্তান সরকার সেই হারের কারণ খুঁজতে গঠন করেছিল জাস্টিস হামুদুর রেহমান কমিশন। পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হামুদুর রেহমানের নেতৃত্বে আরও দুজন শীর্ষ বিচারপতি, আনোয়ারুল হক ও তুফায়লায়লি আবদুর রেহমান খতিয়ে দেখেছিলেন, কোন ঘটনাপ্রবাহের পরিণতিতে পাকিস্তানের শোচনীয় পরিণতি হয়েছিল। পাকিস্তান সরকার সেই কমিশনের রিপোর্ট ‘ডিক্লাসিফাই’ করে মাত্র বছরকুড়ি আগে। তারপরও রিপোর্টের প্রামাণ্য প্রতিলিপি আজও একটি দুষ্প্রাপ্য দলিল হিসেবেই রয়ে গেছে। সেই রিপোর্টের কয়েকটি নির্দিষ্ট দিক নিয়েই মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলা ট্রিবিউনের ধারাবাহিক প্রতিবেদনমালা। আজ থাকছে প্রথম পর্ব

ইয়াহিয়া পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম সিকি শতাব্দীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলোর সাক্ষী ছিলেন একজন সামরিক শাসক- জেনারেল আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া খান। ১৯৬৯ সালের মার্চে জেনারেল আইয়ুব খানকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করে তিনি পাকিস্তানে মার্শাল ল জারি করেছিলেন। আসীন হয়েছিলেন প্রেসিডেন্টের পদে।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক নির্বাচনের (যাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল আওয়ামী লীগ), পরবর্তী কয়েক মাস ধরে পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত হত্যালীলা এবং অবশেষে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম – এই পুরো সময়টাতেই ইয়াহিয়া খান ছিলেন প্রেসিডেন্ট। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে করা তার আচরণ নিয়েও অনেক লেখালেখি ও গবেষণা হয়েছে।

হামুদুর রেহমান কমিশনের রিপোর্টে একটা পুরো চ্যাপ্টারই আছে ‘জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও তার সহযোগীদের অভিসন্ধি কী ছিল তার বিশ্লেষণ’ এই শিরোনামে। সেখান থেকে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হল।

জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঠিক কী উদ্দেশ্য নিয়ে মার্শাল ল জারি করেছিলেন, তা নিয়েও কমিশন বিস্তর গবেষণা করেছে। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে যখন রাজপথে তুমুল আন্দোলন হচ্ছে, তখন দেশকে রক্ষা করার আন্তরিক অভিপ্রায় থেকেই জেনারেল ইয়াহিযা খান ওই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন না কি তার গোপন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কমিশন সে প্রশ্নও তুলেছে।

এই পটভূমিতে কমিশন টেনে এনেছে সে সময়কার বিখ্যাত গোলটেবিল বৈঠকের অবকাশে ইয়াহিয়া খান ও শেখ মুজিবের একান্ত বৈঠকের কথাও, যখন তার বিখ্যাত ছয় দফা নিয়ে রাজপথ কাঁপাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। 

রিপোর্ট বলছে, ‘এই বৈঠক যে হয়েছিল তাতে এখন সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছিল তা নিয়ে দুটো পরস্পরবিরোধী মত আছে। একটা মত হল, ওই বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল ‘কোনওমতেই মার্শাল ল জারি করা হবে না।’

‘দ্বিতীয় মতটা হল, যেটা ছিল ইয়াহিয়া খানের নিজের ভার্সন, যে তিনি বৈঠকে শেখ মুজিবকে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি যদি শান্ত না-হন তাহলে মার্শাল ল জারি করা ছাড়া উপায় থাকবে না।’

কিন্তু নানা সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে কমিশন এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছে যে প্রথম সংস্করণটাই সম্ভবত সত্যি ও বেশি বিশ্বাস্য। অন্যভাবে বললে, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তখনই এক ধরনের প্রতারণা করেছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে, কমিশনের ভাষায়, “পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় প্রতিটা আসনেই জিতেছিলেন মুজিব। এই নির্বাচনি ফলাফল সত্যিই ছিল বিশাল একটা শক। এরপর ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির অধিবেশন যে বারে বারে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেটা এই ‘সেটব্যাক’ বা ধাক্কার পটভূমিতেই দেখতে হবে।”

‘ভোটের পর ১১ জানুয়ারি ১৯৭১ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত তিনি অ্যাসেম্বলি তো ডাকেনইনি, এমনকি বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনাও শুরু করেননি। ১১ তারিখই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে তার সেই বিখ্যাত বৈঠক হয়। যার পর তিনি শেখ মুজিবকে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ থেকে যে কেউই বুঝবে সেটা ছিল নেহাতই পরিহাসের ছলে বলা’, জানাচ্ছে ওই রিপোর্ট। সোজা কথায়, আরও একটি প্রতারণা।

‘মার্চের মাঝামাঝি যখন আবারও নানা পক্ষের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হলো, শেখ মুজিবের মনোভাব কিন্তু পয়েন্ট অব নো রিটার্নের জায়গায় চলে গেছে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, জেনারেল ইয়াহিয়ার উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টির মধ্যে কোনও বৈঠক পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। একমাত্র ২ মার্চের আলোচনা ছাড়া, যদিও সেটাকে বৈঠকই বলা চলে না। নিঃসন্দেহে এই ব্যর্থতার পেছনে আংশিক কারণ ছিল শেখ মুজিবের জেদ (অ্যাডামেন্ট অ্যাটিচিউড)’, বলছে হামুদুর রেহমান কমিশনের রিপোর্ট।

ফলে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের দুরভিসন্ধি ও প্রতারণার একের পর এক পরিচয় পেয়েই যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে আর একেবারেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, তার প্রমাণ রয়েছে রিপোর্টের ছত্রে ছত্রে।

কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নিজস্ব রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কতটা প্রবল ছিল?

কমিশন জানাচ্ছে, ইয়াহিয়া খানকে ঘিরে থাকতেন তার ঘনিষ্ঠ একদল সেনা কর্মকর্তা- যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জেনারেল হামিদ, জেনারেল গুল হাসান, জেনারেল পীরজাদা, জেনারেল মিঠা, জেনারেল উমর প্রমুখ। জেনারেল উমর যেমন বিশাল পরিমাণ বাজেট-বহির্ভূত গোপন তহবিল খরচ করার অধিকারী ছিলেন– আর সেটা যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ‘প্রভাবিত করার কাজে’ খরচ করা হত, কমিশন তারও প্রমাণ পেয়েছে।

এন এ রিজভি নামে ইয়াহিয়া খানের ঘনিষ্ঠ আর একজন আমলা তখন ছিলেন গোয়েন্দা ব্যুরোর অধিকর্তা। রিজভি যে পাকিস্তানের শিল্পপতিদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা তুলতেন ও সেটা ইয়াহিয়ার রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে খরচ করা হতো, কমিশন সে বিষয়েও নিশ্চিত হয়েছে। ‘নিতান্ত অনিচ্ছায়’ এই সিদ্ধান্তেও উপনীত হয়েছে, ইয়াহিয়া খানের ঘনিষ্ঠ এই জেনারেল ও কর্মকর্তারা তাদের বসের চূড়ান্ত রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই কাজ করছিলেন।

ইয়াহিয়া খানের বিপুল পরিমাণে মদ্যপানের নেশা ও ব্যক্তিগত চরিত্রের কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি নিয়েও যে প্রচুর জল্পনা ছিল, সে কথা রিপোর্টে উল্লেখ করেছে কমিশন। তবে তাতে সত্যতা কতটুকু, সেটা তারা আর খতিয়ে দেখেনি।

*** পরবর্তী দুই পর্ব প্রকাশিত হবে ২৪ ও ২৫ মার্চ

/এফএ/

সর্বশেষ

নারায়ণগ‌ঞ্জের মে‌রিনা লন্ড‌নের অ্যাসেম্বলি মেম্বার নির্বাচিত

নারায়ণগ‌ঞ্জের মে‌রিনা লন্ড‌নের অ্যাসেম্বলি মেম্বার নির্বাচিত

সকাল থেকে যাত্রীবাহী ফেরি বন্ধ

সকাল থেকে যাত্রীবাহী ফেরি বন্ধ

সুহিতা সুলতানা

সুহিতা সুলতানা

আপনার শুভেচ্ছা বার্তায় আমি আপ্লুত: প্রধানমন্ত্রীকে মমতা

আপনার শুভেচ্ছা বার্তায় আমি আপ্লুত: প্রধানমন্ত্রীকে মমতা

আজ বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস

আজ বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস

হাতিয়ায় ইউপি সদস্য প্রার্থীকে হত্যার ঘটনায় আটক ৭

হাতিয়ায় ইউপি সদস্য প্রার্থীকে হত্যার ঘটনায় আটক ৭

খাকদোনের দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে স্থানীয়রা

খাকদোনের দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে স্থানীয়রা

থ্যালাসেমিয়া রোগনিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধের কোনও বিকল্প নেই: প্রধানমন্ত্রী

থ্যালাসেমিয়া রোগনিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধের কোনও বিকল্প নেই: প্রধানমন্ত্রী

মালদ্বীপ যাওয়ার আগে উজ্জীবিত বসুন্ধরা

মালদ্বীপ যাওয়ার আগে উজ্জীবিত বসুন্ধরা

বাড়ি দখলে মালিকের বিরুদ্ধে শকুনের 'যুদ্ধ ঘোষণা'

বাড়ি দখলে মালিকের বিরুদ্ধে শকুনের 'যুদ্ধ ঘোষণা'

যানজট ঠেলে শপিং মলে ক্রেতাদের ভিড়,  উপেক্ষিত বিধিনিষেধ

যানজট ঠেলে শপিং মলে ক্রেতাদের ভিড়, উপেক্ষিত বিধিনিষেধ

কেন এত বজ্রপাত? সাবধানে থাকতে যা করতে হবে

কেন এত বজ্রপাত? সাবধানে থাকতে যা করতে হবে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

রাজাকার নাকি মুক্তিযোদ্ধা, কী তার পরিচয়?

রাজাকার নাকি মুক্তিযোদ্ধা, কী তার পরিচয়?

সলঙ্গার গণহত্যা আলোচিত ৫০ বছর ধরেই, তবুও হয়নি স্মৃতিস্তম্ভ

সলঙ্গার গণহত্যা আলোচিত ৫০ বছর ধরেই, তবুও হয়নি স্মৃতিস্তম্ভ

পূরণ হয়নি রহিমা বেওয়ার একটি বাড়ির স্বপ্ন

স্বাধীনতার ৫০পূরণ হয়নি রহিমা বেওয়ার একটি বাড়ির স্বপ্ন

আদর্শের সমীকরণে রাজনৈতিক লেখচিত্র

আদর্শের সমীকরণে রাজনৈতিক লেখচিত্র

এসএসসিতে দুবার ফেল করেও বিসিএস ক্যাডার তাইমুর

এসএসসিতে দুবার ফেল করেও বিসিএস ক্যাডার তাইমুর

৪৭ বছর পর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন যে চার নারী

৪৭ বছর পর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন যে চার নারী

এখন মানসম্মত বিদ্যুৎ দেওয়াই আসল কাজ

এখন মানসম্মত বিদ্যুৎ দেওয়াই আসল কাজ

‘এরপর আর কোনও আন্দোলন-সংগ্রাম করতে পারিনি’

‘এরপর আর কোনও আন্দোলন-সংগ্রাম করতে পারিনি’

বদলে যাওয়া জাতি

বদলে যাওয়া জাতি

‘বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতি একত্রিত হয়েছিল’

‘বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতি একত্রিত হয়েছিল’

© 2021 Bangla Tribune