সোমবার রাত সাড়ে আটটা। সারাদেশে সীমিত লকডাউনে চারপাশের জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন রাজধানী ঢাকা। এ ছাড়া গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সোবহানবাগের রাস্তা প্রায় জনশূন্য। সেখানেই একটা পিকআপ ভ্যান সাইড করে রাখা। ভ্যানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখ আটকে যায়।
ছোট পিকআপ ভ্যানে একটা পুরো সংসার ঠাসা। চার তাকের পাখির বাসা, হাড়ি বাসন আর নিজ হাতে ফুল তোলা হাতপাখাটাও। পুরো সংসার আগলে বসে আছেন রাহেলা (ছদ্মনাম)। সঙ্গে বোন, এক মেয়ে আর কোলে আরেক সদ্যজাত সন্তান। দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করি, কোথায় যান? প্রশ্ন শুনেই ভ্যানে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা আরেক কিশোরী ওঠে বসেন। আবার জিজ্ঞেস করতেই রাহেলা জবাব দেন, ‘পোষা পাখির সংসার নিয়ে চলে যাচ্ছি আর আসব না।’ সে যেন এক আকাশ সমান অভিমান।
পাবনার মেয়ে রাহেলা স্বামী সন্তান নিয়ে থাকতেন নারায়ণগঞ্জ। সামনে কঠোর লকডাউন, এরপর ঈদ। মাসের পর মাস এই কাজ আছে, এই নেই - এসব থেকে মুক্তি পেতে শেষমেশ গ্রামে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে রওনা দিয়েছেন পাবনার পথে। মোটা পলিথিন দিয়ে পিকআপ ভ্যান ঢেকে কোনমতে রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে ঢাকায় ঢুকেছেন বটে কিন্তু সোবহানবাগে ট্রাফিক ঠিকই ধরে ফেলেন। ভেতরে কোন পণ্য নেই, পুরো একটি সংসারের বাস।
পিকআপ ভ্যানের ড্রাইভার যখন পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পেতে কাকুতি-মিনতি করছেন, তখন কথা হয় পরিবারের চারজনের সঙ্গেই। কেন চলে যাচ্ছেন প্রশ্নে রাহেলা বলেন, ‘কেন আসে দেশ ছেড়ে মানুষ? কাজ করে বাঁচতে। কাজ নেই, এখানে বাঁচার আর রাস্তাও নেই। তাই ফিরে যাচ্ছি।’
পরিবারের পুরুষ সদস্য কোথায়- জানতে চাইলে সামনে দেখিয়ে বলেন, ‘ওস্তাদের (গাড়িচালক) পাশের সিটে। আর বোনের স্বামী বেতনের টাকাটা পেলেই চলে আসবেন।’
লকডাউনের সময় এ ছাড়া বৃষ্টি বাদলের রাতে কেন রওনা দিলেন- প্রশ্নে এবার গাড়ির হেলপার এগিয়ে এসে বলেন, ‘আমরা রাজি হচ্ছিলাম না। পথে হয়রানি হবে জানি। কিন্তু উনারাতো জানতেন না হুট করে গাড়ি বন্ধ হবে। বাসা ছেড়ে দিয়েছেন, থাকবেন কোথায়। তারপর আমরা রাজি হই। আমিন বাজার পার হইতে পারলেই আর সমস্যা হবে না। কিন্তু এখানেই আটকে গেলাম।’
আধঘণ্টা ধরে তাদের অপেক্ষা শেষ হয় না। সাংবাদিক দাঁড়িয়ে থাকলে ছাড়বে না। তাদের অনুরোধে সরে দাঁড়াতেই কানে এলো কিশোরীর কণ্ঠ, ‘পাখির খাঁচাটা ঢেকে দাও।’ এদিকে কোলের বাচ্চা গরমে আর দীর্ঘ অপেক্ষায় কেঁদে ওঠলো। অন্যদিকে গাড়ির হেলপার ছুটলো পুলিশ বক্সের দিকে, যদি ছাড়পত্র মেলে।









