৬৪ বছরের হামিদা হোসেন, গত চার বছর ধরে কিডনি রোগে আক্রান্ত। সঙ্গে ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ। সম্প্রতি তার সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হলেও তিনি যেতে পারেননি। চিকিৎসক তাকে জানিয়েছেন, হাসপাতাল করোনা সংক্রমণের অন্যতম উৎসস্থল। কোনও কারণে তিনি যদি করোনা সংক্রমিত হন, তাহলে সেটা তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত ৭৩ বছরের হাশেম আলী। নিয়মিত চেকআপের জন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি হলেও করোনার এই দেড় বছরে তিনি হাসপাতালে এসেছেন মাত্র একবার। সেই একই ভয়—হাসপাতাল থেকে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি।
এভাবেই দেশের জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীরা করোনায় আক্রান্ত না হয়েও ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
করোনায় আক্রান্ত নন, কিন্তু অন্যান্য জটিল রোগে যারা আক্রান্ত তাদের দিকে মনোযোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক রোবেদ আমিন জানিয়েছেন, করোনা মহামারিতে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের দিকে।
তিনি বলেন, ‘এই অতিমারির সময়ে ডেঙ্গুর পাশাপাশি নন-কোভিড এবং অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগী যারা আছেন, তাদের যেন ভুলে না যাই। অসংখ্য রোগী রয়েছেন হৃদরোগ-ক্যানসার-স্ট্রোক বা অন্য নিউরোলজিক্যাল রোগে আক্রান্ত; তারা যেন সঠিক সময়ে স্বাভাবিকভাবে সেবা নিতে পারেন।’
রোগীদের দুর্ভোগ অনেক বেশি হচ্ছে মন্তব্য করে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতলের শিশু বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. আবু সাঈদ শিমুল বলেন, ‘কারও জরুরি অস্ত্রোপচার দরকার, হার্টে রিং পরানো দরকার, কিন্তু তিনি হাসপাতালে আসতে পারছে না, তার চিকিৎসা হচ্ছে না।’
চিকিৎসকরা বলছেন, যে কেউ এলেই করোনা টেস্ট করে ভর্তি হওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। এতে ভোগান্তি হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি হতে গেলে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে করোনা পরীক্ষা করাতে হয়। একটা মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটা একটা বার্ডেন।’
‘একইসঙ্গে রোগীদের পক্ষ থেকেও অনেকে ভয়ে হাসপাতালে আসছেন না, যতক্ষণ না গুরুতর হচ্ছে’ জানিয়ে ডা. আবু সাঈদ শিমুল বলেন, ‘এমনকি শিশুদের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, শিশুদের যে নিয়মিত টিকা দেওয়ার কথা সেটা সময় মতো দেওয়া যাচ্ছে না।’ চেম্বারেও রোগীদের আসা অনেক কম গেছে বলে জানান তিনি।
ডা. শিমুল জানান, করোনার মধ্যে তার কাছে ৫০ শতাংশ রোগী আসা কমে গিয়েছে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বোনমের্যো ট্রান্সপ্লান্ট ও কার্ডিয়াক সার্জারি বন্ধ রয়েছে।’
এসব বিভাগ বন্ধ থাকাতে রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে জানিয়ে নাজমুল হক বলেন, ‘এসব বিভাগগুলোতে প্রায় এক হাজারের মতো রোগী চিকিৎসা নিত। এই এক হাজার রোগীর বেশিরভাগই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রেফার্ড হয়ে এখানে আসেন, তারা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত।’
‘যে রোগীরা এখনও বিভিন্ন জায়গা থেকে ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসা নিতে আসছেন, তারাতো আর জানেন না যে, এই সার্ভিসগুলো বন্ধ রয়েছে। তাতে করে রোগীদের ভোগান্তি তো অবশ্যই হচ্ছে’—বলেন তিনি।








