X
বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি, জেলখানা ওর আব্বার বাড়ি

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১৬:০৪

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত সময়কালের ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। ফলে সঙ্গত কারণেই ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণকারী  ছোট ছেলে শেখ রাসেলকে নিয়ে কোনও তথ্য নেই এ বইটিতে। তবে জেলজীবন নিয়ে বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ে অন্তত ১৫টি জায়গায় রয়েছে রাসেলকে নিয়ে বাবা বঙ্গবন্ধুর বর্ণনা। পুরো বর্ণনায় রয়েছে জেলে গেলে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিবারের সাক্ষাতের সময়কালের ঘটনা। ঐতিহাসিক ৬ দফা দেওয়ার পর প্রথমে বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ দিন কারাভোগ করেন বঙ্গবন্ধু। এরপর ১৯৬৬ সালের ৮ মে গ্রেফতার হন তিনি। এ সময় বঙ্গবন্ধু এক হাজার ২১ দিন কারাগারে  থাকার পর ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান। কারাগারে এই দীর্ঘ  সময় থাকাকালে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে শিশু রাসেলও পিতার সঙ্গে দেখা করতে যেতো। আর এই সময়কালে রাসেলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কথোপকথন ও খুনসুটির স্মৃতি উঠে আসে তাঁর এই বইয়ে।

বঙ্গবন্ধুর লেখায় রাসেল কারবন্দি পিতা মুজিবকে না পেয়ে মাকে আব্বা বলে ডাকতো, সেই প্রসঙ্গও এসেছে। জেলখানাকেই তিনি আব্বার বাড়ি মনে করতো, সেটাও বর্ণনা করেছেন বঙ্গবন্ধু।

রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রথম স্মৃতিচারণ পাওয়া যায় কারাগারের রোজনামচা বইয়ের ৯৩ পৃষ্ঠায়। এটা ছিল ১৯৬৬ সালের ১৫ জুনের ঘটনা। ওইদিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকা ১৮ মাস বয়সী রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু স্মৃতিচারণ করেছেন। সেদিনের সাক্ষাতের প্রসঙ্গ টেনে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘‘দূর থেকে দেখি রাসেল, রেহানা ও হাচিনা চেয়ে আছে, আমার রাস্তার দিকে। ১৮ মাসের রাসেল জেল অফিসে এসে একটুও হাসেনা,যে পর্যন্ত আমাকে না দেখে। দেখলাম, দূর থেকে পূর্বের মতো ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে চিৎকার করছে। একটু পরেই ভেতরে যেতেই রাসেল আমার গলা ধরে হেসে দিলো। ওরা বললো, আমি না আসা পর্যন্ত শুধু জানালার দিকে চেয়ে থাকে, বলে ‘আব্বার বাড়ি’। এখন ওর ধারণা হয়েছে— এটা ওর আব্বার বাড়ি। যাবার সময় হলে ওকে ফাঁকি দিতে হয়।” 

১৯৬৬ সালের ৬ জুলাইয়ের বর্ণনায়ও রয়েছে রাসেলের প্রসঙ্গ। বইয়ের ১৪৯ পৃষ্ঠায় স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতের কথা বলা হয়েছে। দিনটি ছিল বুধবার। এখানে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন,“..... তাড়াতড়ি পাঞ্জবি পরেই হাঁটা দিলাম গেটের দিকে। সেই পুরনো দৃশ্য। রাসেল হাচিনার কোলে। আমাকে দেখে বলছে, ‘আব্বা!’ আমি যেতেই কোলে এলো। কে কে মেরেছে নালিশ হলো। খরগোস কীভাবে মারা গেছে, কীভাবে দাঁড়াইয়া থাকে দেখালো।”

বইয়ের ১৫৯ পৃষ্ঠায় ১৯৬৬ সালের ১২ জুলাই সাক্ষাৎ শেষে বিদায়ের সময়ের স্মৃতিচারণে রাসেলের প্রসঙ্গ এসেছে। এখানে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “.... বিদায় নিয়ে রওয়ানা হলে গেটে দাঁড়াইয়া ওদের বিদায় দিলাম। গেট পার হলেও রাসেল হাত তুলে আমার কাছে থেকে বিদায় নিলো। বোধ হয় বুঝে গিয়েছে এটা ওর বাবার বাড়ি, জীবনভর এখানেই থাকবে!”

 ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ের ১৮৮ পৃষ্ঠায় ৩ আগস্ট ১৯৬৬ সাল, বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘...ছোট ছেলেটা আমার কানে কানে কথা বলে। ২১ মাস বয়স। বললাম, আমার কানে কানে কথা বললে আইবি নারাজ হবে, ভাববে একুশ মাসের ছেলের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে কানে কানে কথা বলছি। সকলেই হেসে উঠলো। এটা রাসেলের একটা খেলা, কানের কাছে মুখ নিয়ে চুপ করে থাকে আর হাসে। আর আমার কাছ থেকে ফিরে যাবার চায় না। ওর মায়ের কাছে দিয়ে ভেতরে চলে আসলাম।’

ওর কাছ থেকে বিদায় নিতে কষ্ট হয়

১৯৬৭ সালের ঈদে ছেলেমেয়েরা কোনও কেনাকাটা করবে না, এমন প্রসঙ্গ এনে রাসেলকে নিয়ে ২০১ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু বর্ণনা করেছেন এভবে, ‘ওরা বুঝতে শিখেছে। রাসেল ছোট্ট তাই এখনও বুঝতে শিখে নাই। শরীর ভালো না, কিছুদিন ভুগেছে। দেখা করতে এলে রাসেল আমাকে মাঝে-মধ্যে ছাড়তে চায় না। ওর কাছ থেকে বিদায় নিতে কষ্ট হয়।’

রাসেল ফুলের মালা হাতে দাঁড়াইয়া আছে

১৯৬৭ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ৪৭তম জন্মবার্ষিকীতে পরিবারের সদস্যরা জেলখানায় সাক্ষাৎ করেন। এ প্রসঙ্গে বইয়ের ২১০ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “...পাঁচটাও বেজে গেলো। ঠিক সেই মুহর্তে জমাদার সাহেব বললেন, ‘চলুন, আপনার বেগম সাহেবা ও ছেলেমেয়েরা এসেছে।’ তাড়াতাড়ি কাপড় পরে রওয়ানা করলাম জেল গেটের দিকে। ছোট মেয়েটা আর আড়াই বৎসরের ছেলে রাসেল ফুলের মালা হাতে দাঁড়াইয়া আছে। মালাটা রাসেলকে পরাইয়া দিলাম, সে কিছুতেই পরবে না, আমার গলায় দিয়ে দিলো।... আওয়ামী লীগ একটা বিরাট কেক পাঠাইয়া দিয়েছে। রাসেলকে দিয়ে কাটালাম, আমিও হাত দিলাম।’’

বইয়ের ২১১ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘রাসেলও বুঝতে আরম্ভ করেছে, এখন আর আমাকে নিয়ে যেতে চায় না।’

কারাগারের রোজনামচার ২২১ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু ১৯৬৭ সালের ১৪ ও ১৫ এপ্রিলের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। সেখানে রাসেলকে নিয়ে তিনি লিখেছেন, “জেল গেটে যখন উপস্থিত হলাম, ছোট ছেলেটা আর বাইরে এসে দাঁড়াইয়া নাই দেখে একটু আশ্চর্য হলাম। আমি যখন রুমের ভেতর যেয়ে ওকে কোলে নিলাম, আমার গলা ধরে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কয়েকবার ডাক দিয়ে ওর মার কোলে যেয়ে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে ডাকতে শুরু করলো। ওর মাকে ‘আব্বা’ বলে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যাপার কী?’ ওর মা বললো “বাড়িতে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কাঁদে তাই ওকে বলেছি আমাকে ‘আব্বা’ বলে ডাকতে।” রাসেল ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকতে লাগলো। যেই আমি জবাব দেই, সেই ওর মার গলা ধরে বলে, ‘তুমি আমার আব্বা।’ আমার ওপর অভিমান করেছে বলে মনে হয়। এখন আর বিদায়ের সময়ে আমাকে নিয়ে যেতে চায় না।’’

কথা একটাও মুখে রাখে না

১৯৬৭ সালের ২৮-৩০ এপ্রিলের ঘটনাবলির বর্ণনায় রাসেলের প্রসঙ্গ এসেছে। এখানে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন,“… রাসেল একবার আমার কোলে, একবার তার মার কোলে, একবার টেবিলের ওপরে উঠে বসে। আবার মাঝে মাঝে আপন  মনেই এদিক-ওদিক হাঁটাচলা করে। বড় দুষ্ট হয়েছে, রেহানাকে খুব মারে। রেহানা বললো, ‘আব্বা দেখেন আমার  মুখখানা কী করেছে রাসেল মেরে।’ আমি ওকে বললাম, তুমি রেহানাকে মার? রাসেল বললো, ‘হ্যাঁ মারি।’ বললাম, ‘না আব্বা আর মেরো না।’ উত্তর দিলো, ‘মারবো।’ কথা একটাও মুখে রাখে না।’’

বইয়ের ২৪০ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘রাসেল আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে। এক বৎসর হয়ে গেছে জেলে এসেছি। রাসেল একটু বড় হয়ে গেছে।’

আব্বা, আর  তোমাদের দরকার নাই এ পথের

১৯৬৭ সালের ২৭ ও ২৮ মে’র ঘটনাতেও  রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু বর্ণনা করেছেন। বইয়ের ২৪৬ ও ২৪৭ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, ‘‘.. .রাসেল আমাকে পড়ে শোনালো, আড়াই বৎসরের ছেলে আমাকে বলছে, ৬ দফা মানতে হবে- সংগ্রাম সংগ্রাম-চলবে চলবে,পাকিস্তান জিন্দাবাদ, ভাঙা ভাঙা করে বলে কী মিষ্টি শোনায়! জিজ্ঞাসা করলাম, ও শিখলো কোথা থেকে? রেণু বললো, ‘বাসায় সভা হয়েছে, তখন কর্মীরা বলেছিল তাই শিখেছে।’ বললাম, আব্বা, আর তোমাদের দরকার নাই এ পথের। তোমার আব্বাই পাপের প্রায়শ্চিত করুন।’’

আব্বা বালি চলো

বঙ্গবন্ধুর ১৯৬৭ সালের ২২ জুনের ঘটনা উঠে এসেছে বইয়ের ২৪৯ পৃষ্ঠায়। এখানে  তিনি লিখেছেন, ‘‘ …দুই বৎসরের ছেলেটা এসে বলে, ‘আব্বা বালি চলো’। কী উত্তর ওকে আমি দেবো। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, তোমার মা’র বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো। ও কি বুঝতে চায়! কী করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীন থেকে!

দুঃখ আমার লেগে গেলো। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনও বুঝতে শিখে নাই। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।

/এপিএইচ/

সম্পর্কিত

বেগম রোকেয়া ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন আধুনিক নারী: প্রধানমন্ত্রী

বেগম রোকেয়া ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন আধুনিক নারী: প্রধানমন্ত্রী

বেগম রোকেয়া ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী: রাষ্ট্রপতি

বেগম রোকেয়া ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী: রাষ্ট্রপতি

আবরার হত্যা মামলার রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে: আইনমন্ত্রী

আবরার হত্যা মামলার রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে: আইনমন্ত্রী

ক্রয় কমিটিতে ২২ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব অনুমোদন

ক্রয় কমিটিতে ২২ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব অনুমোদন

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

বেগম রোকেয়া ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন আধুনিক নারী: প্রধানমন্ত্রী

বেগম রোকেয়া ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন আধুনিক নারী: প্রধানমন্ত্রী

বেগম রোকেয়া ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী: রাষ্ট্রপতি

বেগম রোকেয়া ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী: রাষ্ট্রপতি

আবরার হত্যা মামলার রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে: আইনমন্ত্রী

আবরার হত্যা মামলার রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে: আইনমন্ত্রী

ক্রয় কমিটিতে ২২ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব অনুমোদন

ক্রয় কমিটিতে ২২ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব অনুমোদন

আমার মতামত কাজে লাগবে না: প্যানডোরা পেপারস প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী

আমার মতামত কাজে লাগবে না: প্যানডোরা পেপারস প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী

উসকানির বিষয়ে শ্রমিকদের সতর্ক থাকতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

উসকানির বিষয়ে শ্রমিকদের সতর্ক থাকতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

করোনার চ্যালেঞ্জ ও প্রভাব মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর

করোনার চ্যালেঞ্জ ও প্রভাব মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর

দ্বীপের নাম ‘চর মুজিব’

দ্বীপের নাম ‘চর মুজিব’

বেগম রোকেয়া পদক ২০২১ পাচ্ছেন যারা

বেগম রোকেয়া পদক ২০২১ পাচ্ছেন যারা

ডা. মুরাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন

ডা. মুরাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন

সর্বশেষ

আবরার হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি

আবরার হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি

শপথ নিলেন নতুন জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস

শপথ নিলেন নতুন জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস

রাশিয়া ও কানাডা থেকে ৯০ হাজার টন সার কিনছে সরকার

রাশিয়া ও কানাডা থেকে ৯০ হাজার টন সার কিনছে সরকার

রূপপুর প্রকল্পে যন্ত্রপাতি আসছে পরমাণু শক্তিচালিত জাহাজে

রূপপুর প্রকল্পে যন্ত্রপাতি আসছে পরমাণু শক্তিচালিত জাহাজে

রাবি রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি রাশেদ, সম্পাদক রিয়াদ

রাবি রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি রাশেদ, সম্পাদক রিয়াদ

© 2021 Bangla Tribune