স্থানীয় নির্বাচনের আগে ইসিতে নিয়োগ নিয়ে নতুন বিতর্ক

মহসীন কবির
২৯ জুলাই ২০২৬, ২২:০০ আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ২৩:২১

সম্প্রতি সরকারি বিভিন্ন করপোরেশন ও সংস্থায় ১২ জন বিএনপি নেতাকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পেয়েছেন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য মো. শামসুল আলম।

তবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তাকে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিরোধী দলগুলো এই নিয়োগে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সরকার বলছে, এ ধরনের নিয়োগের আইনগত এখতিয়ার তাদের রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে তাকে নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ায় নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার শঙ্কা থাকতে পারে।

তারা মনে করেন, কেউ পেশাগত জীবনে বঞ্চনার শিকার হলে বিধি মোতাবেক ভূতপূর্ব পদোন্নতি দিয়ে বা পাওনা সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অবসরের পর প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনীতিতে জড়ানো ৬৭ বছর বয়সী একজন ব্যক্তিকে পুনরায় সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনা অগ্রহণযোগ্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচন কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কোন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পেয়েছেন, সেটা তাদের জানা নেই। তবে সরকার যেহেতু তাকে নিয়োগ দিয়েছে, সে অনুযায়ী কমিশন তাকে মেনে নিতে বাধ্য।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশনের মূল ক্ষমতা সিইসির। তারপর সচিবের। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত সচিবের ক্ষমতা খুব একটা থাকার কথা নয়। তবে সরকারি দলের সরাসরি সমর্থক হওয়ায় প্রশাসনিক নানা প্রস্তাবনা দিতে পারেন। এটি অনেক সময় কার্যকর হতেও পারে, নাও হতে পারে।’’ যেহেতু বিরোধী দলসহ বিভিন্ন মহল এ বিষয়ে আপত্তি তুলেছে, তাই বিতর্ক এড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

কে এই শামসুল আলম?

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ পাওয়া মো. শামসুল আলম চাকরি জীবনে একই প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তা ছিলেন। ২০১৭ সালে অবসরে যাওয়ার পর বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর তাকে গ্রেফতার করেছিল তৎকালীন  আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৫ সালের আগস্টে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে দলীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটিরও সদস্য ছিলেন শামসুল আলম।

চাকরি থেকে অবসরের ৮ বছর পর গত ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে তাকে নিয়োগ দেয় সরকার।

কেন বিতর্ক?

নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে মো. শামসুল আলমের নিয়োগের পরপরই এ নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সে কারণে একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ায় অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পরে কিনা, সে আশঙ্কাও করছেন তারা।

আবার কেউ কেউ মনে করেন, বিগত দিনে ফ্যাসিবাদের রোষানলের শিকার ছিলেন শামসুল আলম। সে বিবেচনায় হয়তো সরকার তাকে নিয়োগ দিয়ে থাকতে পারে। তবে কিছু বিষয় বিতর্কমুক্ত থাকাই ভালো বলে মনে করে পর্যবেক্ষকরা।

এ বিষয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল আলীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘শামসুল আলম কীভাবে নিয়োগ পেয়েছেন জানি না। ২০১৮ সালে একতরফা নির্বাচনের আগে তাকে অব্যাহতি দেয় তৎকালীন সরকার। তিনি যদি সেই নির্বাচনের প্রতিবাদ করে থাকেন, সেটা ভিন্ন কথা।’’ তারপরও কিছু জায়গা বিতর্কমুক্ত রাখা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

বিষয়টিকে খারাপ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘ পুরো বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করার একটি প্রক্রিয়া। অথচ আমরা দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ে আন্দোলন করে আসছি। যেন অন্ততপক্ষে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষ রাখা হয়।’’ একজন সরাসরি দলীয় লোককে নিয়োগ দেওয়া ঠিক হয়নি বলে তিনি মনে করেন।

কী করবে বিরোধী দল?

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়ে গত ২৬ জুলাই গণমাধ্যমে বিবৃতি দেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘‘যিনি এত দিন বিএনপির এজেন্ডা বাস্তবায়নে সোচ্চার ছিলেন, তার অধীনে কোনও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না।’’

এ বিষয়ে পরবর্তী পরিকল্পনা জানতে চাইলে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রশাসনিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই এ পদে থাকা কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনও ধরনের বিতর্ক থাকা সমীচীন নয়। সেই বিবেচনায় তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগটি অবিলম্বে বাতিলের করতে হবে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রতিও আমরা দাবি জানিয়ে আসছি।’’  দলীয় ফোরামে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ‘‘সরকার সব প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। তারা এমনটি করতে থাকলে জনগণ নিশ্চয়ই বসে থাকবে না।’’  তিনি অবিলম্বে এ নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান।

পরিণতি কী হতে পারে?

নির্বাচন কমিশনে দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বিতর্কের ফল কী হতে পারে— এ বিষয়টিকে একেকজন একেকভাবে দেখছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটি সঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি। আর বিএনপি মনে করে, এমন নিয়োগ অতীতেও হয়েছে। অহেতুক এ নিয়ে বিতর্কে জরানো উচিত নয়।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এটি অগ্রহণযোগ্য। আমরা একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের কথা বলেছিলাম। কিন্তু বিএনপি কথা রাখেনি। এটি গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। আমরা মনে করি, এর মাধ্যমে সামনে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে।’’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘‘সরকার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে যোগ্য লোককে নিয়োগ দিতেই পারে। নির্বাচন কমিশনে যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, নিশ্চয়ই সরকার যাচাই-বাছাই করে দিয়েছে। আমরা মনে করি, এ নিয়ে বড় সংকট তৈরি হবে না।’’

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন যৌক্তিক, ফ্যাসিস্টদের অনুপ্রবেশ ঘটলে দায় সরকারের: নাহিদ ইসলাম
‘পোশাকশিল্প ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে’, সরকারকে যে পরামর্শ দিলেন জামায়াত আমির
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন শুরু আজ থেকে
সর্বশেষ খবর
শিক্ষার্থীদের দেওয়া তালা ভেঙে অবরুদ্ধ উপাচার্যকে উদ্ধার করলো ছাত্রদল
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের দেওয়া তালা ভেঙে অবরুদ্ধ উপাচার্যকে উদ্ধার করলো ছাত্রদল
যুক্তরাষ্ট্রের জবাব সন্তোষজনক নয়, বললো ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের জবাব সন্তোষজনক নয়, বললো ইরান
বড়দিন উদযাপনে চাওয়া হয়েছিল ২ কোটি, প্রধানমন্ত্রী দিলেন ৩ কোটি টাকা
বড়দিন উদযাপনে চাওয়া হয়েছিল ২ কোটি, প্রধানমন্ত্রী দিলেন ৩ কোটি টাকা
রাস্তায় পাওয়া মুড়ির প্যাকেট ঘরে নিতেই বিস্ফোরণ, দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে জামায়াত নেতা
রাস্তায় পাওয়া মুড়ির প্যাকেট ঘরে নিতেই বিস্ফোরণ, দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে জামায়াত নেতা
সর্বাধিক পঠিত
হীরার ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে শহর
হীরার ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে শহর
যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক হামলা চালালে কী করতে হবে, জনগণকে জানিয়ে দিলো ইরান
যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক হামলা চালালে কী করতে হবে, জনগণকে জানিয়ে দিলো ইরান
‘আমি গরিবের ছেলে, লোভ সামলাতে পারিনি’, জবানবন্দিতে ‘সমন্বয়ক’ রিয়াদ
চাঁদাবাজির মামলায় চার্জশিট দাখিল ‘আমি গরিবের ছেলে, লোভ সামলাতে পারিনি’, জবানবন্দিতে ‘সমন্বয়ক’ রিয়াদ
কোটার বাইরেও যাওয়া যাবে ইতালি, বাংলাদেশিদের জন্য নতুন সুযোগ
কোটার বাইরেও যাওয়া যাবে ইতালি, বাংলাদেশিদের জন্য নতুন সুযোগ
এবার আরেক মহাসড়ক অবরোধ করেছেন কয়েক হাজার শ্রমিক
এবার আরেক মহাসড়ক অবরোধ করেছেন কয়েক হাজার শ্রমিক