ড্রোন হামলায় সুয়েজপথে ঝুঁকি, বৈশ্বিক তেল সরবরাহে নতুন শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০১ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৮ আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৯

সুয়েজ খাল বর্তমানে সমুদ্রপথে সৌদি আরবের তেল রফতানির অন্যতম শেষ নিরাপদ পথ। ফলে খালটির কাছে হামলা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টি করেছে। ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী সুয়েজ খালের কাছে দামিয়েত্তা বন্দরে বুধবার (২৯ জুলাই) ড্রোন হামলায় দুটি জাহাজে আগুন ধরে যায়।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পাইপলাইন সৌদি আরবের জ্বালানি তেল রফতানিতে বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাইপলাইনটি লোহিত সাগর থেকে শুরু হয়ে মিসরের বুক চিরে ভূমধ্যসাগরের সিদি কেরির বন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘এমএসটি মারকুই’-এর জ্বালানি গবেষণা বিভাগের প্রধান সল কাভোনিক বলেন, ‘‘হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ ও ভূমধ্যসাগরের দীর্ঘ বিকল্প পথ ব্যবহার করেও তেল পরিবহন এখন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হুমকির মুখে পড়বে।’’

জাহাজ চলাচলের গতিবিধি নজরদারি প্ল্যাটফর্ম ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর বৃহস্পতিবারের (৩০ জুলাই) তথ্য, সুয়েজের ভূমধ্যসাগর প্রান্তের পোর্ট সাইড নোঙরখানায় প্রায় ৩০টি জাহাজ জড়ো হয়েছে। অথচ চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকেও এ সংখ্যা ছিল ২০টির কাছাকাছি।

জ্বালানি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভোর্টেক্সা’-এর জর্জ মরিস বলেন, লোহিত সাগরে তেলবোঝাই করার পর ট্যাংকারগুলোর উত্তর দিকে; অর্থাৎ সুয়েজ খালের দিকে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্টত বেড়েছে। আর এর মূল কারণ হুতিদের নতুন হুমকি (বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল সরবরাহ বন্ধের হুমকি)।

কেপলারের তথ্য বলছে, বাব আল-মানদেব দিয়ে দক্ষিণমুখী রুটে (এশিয়ার দিকে) তেলের প্রবাহ এখনও সচল থাকলেও তা চলতি মাসের শুরুর তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। জুনে সৌদির ইয়ানবু বন্দর থেকে বোঝাই করা তেলের ৮১ শতাংশ যেখানে দক্ষিণে গিয়েছিল, সেখানে জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৩ শতাংশে। অনেক ট্যাংকার বাব আল-মানদেব সম্পূর্ণ এড়িয়ে চললেও চীনের মালিকানাধীন জাহাজসহ কিছু ট্যাংকার হুতিদের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে যাতায়াত করছে।

জর্জ মরিস জানান, হুতিদের হামলা আর নজরদারি এড়াতে এ দক্ষিণমুখী ঝুঁকিপূর্ণ পথে নিজেদের অবস্থান লুকানোর চেষ্টাও বাড়ছে। ফলে ‘ট্র্যাকার’ বা অবস্থান শনাক্তকরণ যন্ত্র বন্ধ করে চলাচলকারী ট্যাংকারের সংখ্যা এখন ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় বর্তমান সংকটে সুয়েজ খালের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ফলে এর কার্যক্রমে যে কোনও বিঘ্নের প্রভাবও হবে ব্যাপক।

তবে মিসরে দামিয়েত্তা বন্দরে হামলার ঘটনার মানে এ নয় যে সুয়েজ খাল এখনই কোনও তাৎক্ষণিক হুমকিতে পড়েছে, এমনটাই মনে করেন ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জি’-এর আটলান্টিক এলএনজি বিভাগের প্রধান অ্যালি ব্লেকওয়ে। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘বাজার এখন পর্যন্ত সুয়েজ খালের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার মতো কোনও ঝুঁকি বা আশঙ্কা তৈরি করেনি।’

এ ড্রোন হামলার পরও শুক্রবার (৩১ জুলাই) বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। মূলত পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার খবরের দিকেই ব্যবসায়ীদের মূল নজর ছিল, যার প্রভাব পড়েছে বাজারে।

সামগ্রিক এ পরিস্থিতি নিয়ে সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে হুতিরা সৌদি আরবের সব ধরনের জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছেন। এর আওতায় ইয়ানবু থেকে তেল বোঝাই করে ভূমধ্যসাগরের দিকে যাওয়া জাহাজও পড়তে পারে।

হুতিরা এরই মধ্যে দেখিয়েছেন, তাদের ড্রোন ও রকেটের পাল্লার মধ্যে সুয়েজ খাল অঞ্চলও রয়েছে। তারা একাধিকবার ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও রকেট ছুড়েছেন। যদিও দীর্ঘ দূরত্বের কারণে সেগুলো ভূপাতিত করার সুযোগও বেশি।

জ্বালানি পণ্যের আন্তর্জাতিক দর নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান ‘আর্গাস’-এর এলএনজি মূল্য নির্ধারণ বিভাগের প্রধান মার্টিন সিনিয়র বলেন, শুধু এ একটি কারণেই এখন জাহাজের বিমা খরচ বেড়ে যেতে পারে।

মিসরে সাম্প্রতিক হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘এ অঞ্চলে জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিমাকারীরা সুয়েজ খালের জন্য বাড়তি ‘যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম’ দাবি করতে পারেন।’ অবশ্য তিনি উল্লেখ করেন যে ইরান এখনও (সুয়েজ নিয়ে) সুনির্দিষ্ট কোনও হুমকি দেয়নি।

একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানায়, সুয়েজ খালের কাছাকাছি মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলোয় চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তাব্যবস্থা ইতিমধ্যে নতুন করে পর্যালোচনা শুরু করেছে শিপিং কোম্পানিগুলো।

সুয়েজ খাল অঞ্চলের যে কোনও স্থানে হামলা হলে যুদ্ধঝুঁকির বিমার প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সেই সঙ্গে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির মূল্যায়নও বদলে যাবে।

ক্লেপলারের প্রধান ফ্রেইট বিশ্লেষক ম্যাথিউ রাইট বলেন, ‘‘সুয়েজ খালের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে এর প্রভাব প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তেলের দামে পড়বে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে যে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে, তার প্রভাব খুব দ্রুত ভোক্তাদের ওপর পড়বে।’’
সূত্র: রয়টার্স

/এনআই/
সম্পর্কিত
সৌদিতে হামলায় নিহত শাহেদের মরদেহ আসছে শুক্রবার
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড: বাবা-মা বললেন ‘সুইটি জীবিত নাকি মৃত এখনও জানি না’
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ২ বাংলাদেশিকে নিয়ে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে
সর্বশেষ খবর
দেশে ধর্মের নামে যেন কোনও বিভেদ না থাকে: প্রধানমন্ত্রী
দেশে ধর্মের নামে যেন কোনও বিভেদ না থাকে: প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশ-জাপান চিকিৎসা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশ-জাপান চিকিৎসা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ
শিক্ষকের রক্তাক্ত ছবি পাঠিয়ে টাকা দাবি, পারে আবাসিক হোটেল থেকে লাশ উদ্ধার
শিক্ষকের রক্তাক্ত ছবি পাঠিয়ে টাকা দাবি, পারে আবাসিক হোটেল থেকে লাশ উদ্ধার
হঠাৎ বাসায় ঢুকে অপবাদ দিয়ে দম্পতিকে মারধর: কৃষকদল নেতা আটক
হঠাৎ বাসায় ঢুকে অপবাদ দিয়ে দম্পতিকে মারধর: কৃষকদল নেতা আটক
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুইপক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুইপক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেলফি তুলতে গাড়ি থামালেন প্রধানমন্ত্রী, দিলেন উপহার
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেলফি তুলতে গাড়ি থামালেন প্রধানমন্ত্রী, দিলেন উপহার
ওআইসির কাশ্মির প্রস্তাবের নিন্দা ভারতের
ওআইসির কাশ্মির প্রস্তাবের নিন্দা ভারতের
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত