টাকার অভাব নেই, কমেছে সুদহার: তবু ঋণ নিচ্ছেন না উদ্যোক্তারা 

গোলাম মওলা
২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০

দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকার অভাব নেই। বরং ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে চার লাখ কোটি টাকারও বেশি হয়েছে। নীতি সুদহার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিদেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণের সুদসীমাও কমানো হয়েছে। তারপরও নতুন ঋণ নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। শুধু দেশীয় ব্যাংক থেকেই নয়, বিদেশি উৎস থেকেও ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমেছে।

একদিকে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের স্থিতিও কমছে। ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ বাড়ছে, অথচ সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে এখন এক ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে— টাকা আছে, কিন্তু বিনিয়োগের জন্য ঋণ নেওয়ার আগ্রহ নেই।

ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এর মূল কারণ শুধু ঋণের সুদের হার নয়। জ্বালানি সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা, রফতানি পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসা নিয়ে আস্থার সংকট উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে।

রেকর্ড নিচে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। আগের মাস মে মাসে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ঋণপ্রবৃদ্ধি আরও কমেছে।

একসময় দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও বাড়তো। নতুন শিল্প স্থাপন, কারখানার সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কার্যকরী মূলধনের জন্য উদ্যোক্তারা ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু এখন সেই চাহিদা কমছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩০ জুলাই নীতি সুদহার বা রেপো হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে। নতুন হার ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে। সাধারণত নীতি সুদহার কমানো হলে ব্যাংকঋণের ব্যয় কমার এবং ঋণের চাহিদা বাড়ার একটি প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু এবার এখন পর্যন্ত তার সুস্পষ্ট প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।

ব্যাংকারদের মতে, সুদের হার কমানো ব্যবসার ব্যয় কমাতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু উদ্যোক্তা যদি নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা না দেখেন, তাহলে শুধু সুদহার কমিয়ে ঋণের চাহিদা বাড়ানো সম্ভব নয়।

ব্যাংকের হাতে চার লাখ কোটি টাকার বেশি উদ্বৃত্ত অর্থ

ঋণের চাহিদা কমার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। এক মাস আগের তুলনায় উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর হাতে ঋণ দেওয়ার মতো বিপুল অর্থ রয়েছে। কিন্তু উৎপাদনশীল খাতে সেই অর্থের যথেষ্ট চাহিদা নেই।

উদ্বৃত্ত অর্থের একটি বড় অংশ ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি বা এসডিএফে রাখছে। জুনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এ ব্যবস্থায় প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা রেখেছে, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। বর্তমানে এসডিএফে অর্থ রাখার বিপরীতে ব্যাংকগুলো ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ সুদ পাচ্ছে।

ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য একটি বিপরীতধর্মী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে তাদের হাতে বিপুল উদ্বৃত্ত অর্থ, অন্যদিকে নতুন ঋণের চাহিদা কম। ফলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের পরিবর্তে ব্যাংকগুলোর একটি অংশ অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছেই রেখে দিচ্ছে।

ধারও কমাচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক

ব্যাংকগুলোর হাতে তারল্য বেড়ে যাওয়ায় কলমানি, আন্তব্যাংক রেপো ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো থেকে তাদের ধার নেওয়ার প্রয়োজনও কমেছে।

গত জুলাইয়ে এ তিন উৎস থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট ধার ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। জুনে যা ছিল প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এক মাসের ব্যবধানে ধার নেওয়ার পরিমাণে এই বড় পতন দেখাচ্ছে, ব্যাংকগুলোর হাতে স্বল্পমেয়াদে নগদ অর্থের চাপ কমেছে। কারণ ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান অর্থই তাদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যথেষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে এলেও ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি। ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে নতুন করে তারল্য জমছে।

ডলার কিনেও বাড়ছে টাকার সরবরাহ

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য বাড়ার আরেকটি কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কেনা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজার থেকে নিট প্রায় ৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। বাজার থেকে ডলার কেনার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকা সরবরাহ করে। ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে টাকার পরিমাণ বেড়েছে।

কিন্তু সেই অতিরিক্ত অর্থের সমপরিমাণ বিনিয়োগের চাহিদা তৈরি হয়নি। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ছে। এখানেই তৈরি হয়েছে অর্থনীতির বড় বৈপরীত্য। ব্যাংকের হাতে টাকা বাড়ছে, কিন্তু সেই টাকা নতুন শিল্প, কারখানা বা ব্যবসা সম্প্রসারণে যাচ্ছে না।

বিদেশি ঋণেও একই চিত্র

দেশীয় ব্যাংকঋণের পাশাপাশি বিদেশি উৎসের অর্থায়নেও দেখা দিয়েছে ধীরগতি। ব্যবসায়ীরা সাধারণত মূলধনি যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল এবং অন্যান্য আমদানি ব্যয় মেটাতে বিদেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেন। সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট ও বায়ার্স ক্রেডিটসহ বিভিন্ন ধরনের এ ঋণ আমদানি ও উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের স্থিতি কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২৫ কোটি ডলারে। গত এপ্রিলে এর পরিমাণ ছিল এক হাজার ৩৩ কোটি ডলার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছিল এক হাজার ৪৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ নতুন ঋণ নেওয়ার তুলনায় পুরোনো ঋণ পরিশোধের প্রবণতা বেশি থাকায় বিদেশি ঋণের স্থিতি বাড়ছে না।

করোনা-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। ডলারের সংকট ও আমদানি অর্থায়নের চাপ বাড়ার পর বিদেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণের ব্যবহার দ্রুত বাড়ে। ২০২১ সালে এ ধরনের ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৫৪৬ কোটি ডলারে এবং ২০২২ সালে তা আরও বেড়ে এক হাজার ৬৪২ কোটি ডলারে পৌঁছায়।

পরে ডলারের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হলে ব্যবসায়ীরা বিদেশি ঋণের ঝুঁকি কমাতে শুরু করেন। ২০২৩ সালের শেষে এ ঋণ কমে দাঁড়ায় এক হাজার ১৭৯ কোটি ডলারে। ২০২৪ সালের শেষে তা আরও কমে এক হাজার ১৩ কোটি ডলারে নামে। সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল হলেও বিদেশি ঋণের চাহিদায় আগের গতি ফেরেনি।

গত মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৯৩ কোটি ডলার। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের স্থিতি গত ডিসেম্বরের দুই হাজার ৬ কোটি ডলার থেকে কমে দুই হাজার ২ কোটি ডলারে নেমেছে। এ চিত্র দেখাচ্ছে, শুধু ব্যাংকঋণ নয়, বিদেশি উৎসের অর্থায়নেও নতুন বিনিয়োগের চাহিদা দুর্বল।

কমানো হয়েছে বিদেশি ঋণের সুদসীমাও

ব্যবসায়ীদের বিদেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিতে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত মে মাসে এ ধরনের ঋণের সর্বোচ্চ সুদহারের সীমা কমিয়েছে।

বর্তমানে সব ধরনের খরচসহ সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট বা এসওএফআরের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পর্যন্ত যোগ করে বিদেশি ঋণ নেওয়া যায়। আগে এসওএফআরের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ পর্যন্ত যোগ করার সুযোগ ছিল। অর্থাৎ বিদেশি ঋণের ব্যয় কমানোর জন্যও নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সুদসীমা কমানোর পরও বিদেশি ঋণের স্থিতি বাড়ছে না।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট ব্যাংকার মোহাম্মদ নূরুল আমিন মনে করেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কম থাকায় এ ধরনের ঋণের চাহিদাও কমছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বাড়বে এবং এর সঙ্গে বিদেশি ঋণের প্রয়োজনও বাড়বে।

ব্যবসায়ীদের বড় প্রশ্ন: বিনিয়োগ করে লাভ কী

ব্যবসায়ীদের মতে, ঋণের সুদের হার কিছুটা কমানো হলেও সেটি মূল সমস্যার সমাধান নয়। নতুন ঋণ নেওয়ার আগে একজন উদ্যোক্তাকে নিশ্চিত হতে হয়, কারখানা চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি পাওয়া যাবে কিনা, উৎপাদিত পণ্যের বাজার থাকবে কিনা এবং বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসবে কিনা।

সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের বহু কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কোথাও উৎপাদন কমেছে, কোথাও কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়েছে, এতে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। এ অবস্থায় নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে অনেক উদ্যোক্তা এখন বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদের মতে, সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি প্রায় ২৬ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে তা মাত্র ৫ শতাংশের কাছাকাছি। বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি মনে করেন, ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরি করতে হবে। করপোরেট বন্ড, সুকুক এবং নন-ব্যাংক অর্থায়নের বাজার সম্প্রসারণের ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য হলো, বিদেশি ঋণের সুদ কম হলেও যদি গ্যাস না থাকে, বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চিত হয়, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং বাজার দুর্বল থাকে, তাহলে নতুন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করার ঝুঁকি নিতে উদ্যোক্তারা আগ্রহী হবেন না।

অর্থনীতিবিদদের চোখে বিনিয়োগ আস্থার সংকট

অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে যাওয়া এবং একই সময়ে বিদেশি ঋণের স্থিতি না বাড়া অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। সাধারণত বিনিয়োগ বাড়লে ব্যাংকঋণ ও বিদেশি ঋণ— দুই ক্ষেত্রেই অর্থায়নের চাহিদা বাড়ে। উদ্যোক্তারা দেশীয় ব্যাংক থেকে কার্যকরী মূলধন নেন এবং বিদেশি উৎস থেকে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির অর্থায়ন করেন। এখন দুই ক্ষেত্রেই ধীরগতি দেখা যাওয়ার অর্থ হলো, বিনিয়োগের সামগ্রিক চাহিদাই দুর্বল।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু অর্থের জোগান বাড়িয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যবসার ব্যয় কমানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ।

তাদের আশঙ্কা, ব্যাংকের হাতে বিপুল উদ্বৃত্ত তারল্য থাকার পরও বেসরকারি খাতে ঋণ না বাড়ার প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতিতে এক ধরনের ‘তারল্য-বিনিয়োগ বৈপরীত্য’ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ ব্যাংকের হাতে টাকা থাকবে, কিন্তু সেই টাকা নতুন শিল্প ও উৎপাদনে যাবে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে নতুন কর্মসংস্থান, উৎপাদন সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুধু অর্থের জোগান বাড়িয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যবসার ব্যয় কমানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল উদ্বৃত্ত তারল্য থাকার পরও বেসরকারি খাতে ঋণ না বাড়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগের। কারণ এটি দেখাচ্ছে, অর্থের জোগান থাকা সত্ত্বেও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট চাহিদা তৈরি হয়নি।’’

ঋণের সংকট নয়, বিনিয়োগের সংকট

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু ঋণের সংকট হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে। নীতি সুদহার কমানো হয়েছে। বিদেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণের সুদের সীমাও কমানো হয়েছে। তবুও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়ছে না। এ থেকেই ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের সামনে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে— বাংলাদেশের বর্তমান সমস্যা শুধু অর্থের অভাব নয়; বরং বিনিয়োগের সুযোগ ও ব্যবসায়িক আস্থার সংকট।

উদ্যোক্তারা যদি নিশ্চিত হন যে নতুন কারখানা স্থাপনের পর নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাবেন, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে, নীতিগত সিদ্ধান্তে স্থিতিশীলতা থাকবে এবং দেশি-বিদেশি বাজারে পণ্যের চাহিদা পাওয়া যাবে, তাহলে ব্যাংকঋণ ও বিদেশি অর্থায়ন—দুই ক্ষেত্রেই চাহিদা বাড়বে। অন্যথায়, ব্যাংকের হাতে টাকা বাড়তেই থাকবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উদ্বৃত্ত অর্থ জমা বাড়বে, কিন্তু সেই অর্থ উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজে যাবে না।

দেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে তাই শুধু সুদের হার কমানো বা নতুন তহবিল গঠনের চেয়ে বিনিয়োগের বাস্তব পরিবেশ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। জ্বালানি নিরাপত্তা, নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যবসার ব্যয় কমানো, বাজার সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস গড়ে তোলার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া উদ্বৃত্ত টাকা ও সহজলভ্য বিদেশি অর্থায়নের সুযোগ—কোনোটিই কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগে রূপ নাও নিতে পারে। অর্থনীতির সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—টাকার অভাব নেই, সুদহারও কমছে— তাহলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণ নিচ্ছেন না কেন?

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
৬ মাসে ৯৫ কারখানা বন্ধ, কাজ হারিয়েছেন প্রায় ৬২ হাজার মানুষ: সিপিডি
‌‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ কী 
কর ব্যবস্থায় ‘বিপ্লব’ ও অর্থনৈতিক সংস্কার তদারকিতে নতুন কাঠামোর প্রস্তাব
সর্বশেষ খবর
দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রশ্নে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রশ্নে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
ভেল্লাপাড়া সেতু নির্মাণের ব্যয় বাড়ছে 
ভেল্লাপাড়া সেতু নির্মাণের ব্যয় বাড়ছে 
তেহরানে আসিম মুনির
তেহরানে আসিম মুনির
ভূমির সুরক্ষা ছাড়া জলবায়ু সহনশীলতা ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্ভব নয়: পরিবেশমন্ত্রী
ভূমির সুরক্ষা ছাড়া জলবায়ু সহনশীলতা ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্ভব নয়: পরিবেশমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
জেলেদের সঙ্গে ট্রলারেই দুপুরের খাবার খেলেন প্রতিমন্ত্রী
জেলেদের সঙ্গে ট্রলারেই দুপুরের খাবার খেলেন প্রতিমন্ত্রী
‘ঢাকায় যদি ফুটপাতে একটা দোকান থাকে, মিজানেরটাও থাকতে হইবো’
‘ঢাকায় যদি ফুটপাতে একটা দোকান থাকে, মিজানেরটাও থাকতে হইবো’
৩ দেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা সাবেক ভারতীয় কূটনীতিককে দিতে হচ্ছে নাগরিকত্বের প্রমাণ
৩ দেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা সাবেক ভারতীয় কূটনীতিককে দিতে হচ্ছে নাগরিকত্বের প্রমাণ
মাজারের সেই কুমির এখন কক্সবাজারে
মাজারের সেই কুমির এখন কক্সবাজারে
‘হানিট্র্যাপ’ কেলেঙ্কারি: ওসি জাহেদুল ইসলামকে বদলি
‘হানিট্র্যাপ’ কেলেঙ্কারি: ওসি জাহেদুল ইসলামকে বদলি